📄 ইজতেহাদ
এ অধ্যায়ে যে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনার ছিল, তার ভেতরে অন্যতম হচ্ছে, কুরআনের আয়াত থেকে মাসআলা বের করা বা ইস্তেম্বাত। এটা বড়ই বিশ্লেষণ-সাপেক্ষ বিষয়। কারণ কোন আয়াত থেকে বিশেষ কোন হুকুম আহকাম জানতে হলে আয়াতের মর্ম, ইংগিত ও চাহিদা দেখতে ও বুঝতে হয়। তাই বুদ্ধির মারপ্যাঁচ খেলার এটা এক প্রশস্ত ময়দান। আর মতানৈক্যের পুরো সুযোগ এখানে দেখা দেয়। তার ফল দাঁড়ায় এই, সঠিক সিদ্ধান্ত পৌঁছা কিংবা কোন নিশ্চিত নির্দেশ জানা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। হুকুম-আহকাম ইস্তেম্বাত করার জন্যে যত পন্থা অনুসরণ করা হয়েছে, আমি সেগুলোকে দশ ভাগে ভাগ করেছি। সেগুলো বিশেষ এক পদ্ধতিতে সাজিয়ে একটা পুস্তিকা লিপিবদ্ধ করেছি। ইস্তেম্বাত করার বিধিবিধানগুলো যাচাই করার জন্য আমার সেই পুস্তিকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানদন্ড।
📄 তাঅবীহ বা বিশ্লেষণ
কুরআন ব্যাখ্যার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারের আরেকটি হচ্ছে তাওজীহ্। এটা স্বতন্ত্র একটি বিষয়। এর অনেক শাখা-প্রশাখা ও ধরন রয়েছে। বইয়ের ব্যাখ্যাকাররা যখন কোন বই লেখা আরম্ভ করে, তখন সে সব ধরন থেকে কোন না কোনটি অনুসরণ করে তারা যে রীতিতে তাওজীহ্ (ব্যাখ্যা) করে, সেটা তাদের মন ও মগজের মানদন্ড হয়ে দেখা দেয় এবং ব্যাখ্যাকার হিসেবে তাদের স্তরও নির্দিষ্ট হয়ে যায়। এতে জানা যায় যে, প্রত্যেকে একই ধরনের ব্যাখ্যা করে না। একই ধরনের সিদ্ধান্তেও পৌঁছে না। তাই মর্ম নির্ধারণ ও বিধি নিষেধ বের করায় মতানৈক্য দেখা দেয়। সাহাবাদের যুগে তাওজীহ্ বিশেষ কোন বিদ্যা হিসেবে রূপ নেয়নি। তাই তার রীতিনীতিও নির্ধারিত ছিল না। এ সত্ত্বে ও সে মান্যবরেরা কুরআনের আয়াতের বিশ্লেষণ ব্যাপক হারেই দান করেছেন।
তাওজীহ্ মূলত জটিলতার সমাধানকে বলা হয়। যেমন, কোন লেখকের লেখায় যখন কোন জটিল স্থান আসে, তখন ব্যাখ্যাকার থেমে গিয়ে সেটাকে এমনভাবে খুলে মেলে বলে, যেন সবাই সহজে ব্যাপারটা বুঝতে পারে। এটাকেই আরবী পরিভাষায় তাওজীহ্ বলা হয়।
কিন্তু যেহেতু সব পাঠকই সমস্তরের নয়, সবার বোধশক্তি সমান নয়, তাই একই বিশ্লেষণ সবার জন্যে যথেষ্ট নয়। বস্তুত নবীশদের জন্যে বিশ্লেষণের ধারা ভিন্ন হতে বাধ্য। পক্ষান্তরে বিশেষজ্ঞদের জন্যে ধারাও অন্যরূপ হবে। তারা এ ব্যাপারে ইংগিত পেলেই যথেষ্ট ভাবে। পক্ষান্তরে এক নবীশের পক্ষে এ সব সূক্ষ্ম জটিলতার কল্পনাও করা অসম্ভব। এটা তো সোজা কথা যে, একজন নবীশের পক্ষে যা জটিল, বিশেষজ্ঞের কাছে তা কিছুই নয়। আর বিশেষজ্ঞের কাছে যা জটিল, নবীশরা সে সম্পর্কে ভাবতেও পারে না।
📄 উত্তম বিশ্লেষণের ধরন
বিশেষজ্ঞরা নবীশদের মন মগজের পরিমাণ সামনে রেখে সে হিসেবেই বক্তব্য পেশ করেন। বস্তুত যে সব আয়াতে বিভিন্ন মতাবলম্বীর ভেতরে বিতর্কের ব্যাপার রয়েছে, তা বিশ্লেষণের উত্তম পন্থা হল এই, সেই মতগুলো আগে ব্যাখ্যা করা হবে। তারপর তার ওপরে আরোপিত অভিযোগগুলো পুরোপুরি যাচাই করবে। আর যে সব আয়াত বিধি বিধান সংশ্লিষ্ট, সেগুলোর বিশ্লেষণের ধারা হবে এই, বিধি বিধানের যত রূপ হতে পারে, সব উল্লেখ করবে। তার ভেতরে যে সব শর্ত ও বাধা-বন্ধক রয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করবে। দেখবে, সেগুলো থাকা বা না থাকায় কি পরিণাম দেখা দেয়। মূল মাআলার ওপরে আলোকপাত করতে পারে, এভাবে সব বিষয়ই একে একে আলোচনা করবে।
যে সব আয়াত আল্লাহ্ অবদান সম্পর্কিত, সেগুলোর বিশ্লেষণের ধারা হবে এই, সে অবদানগুলোর চিত্র অংকিত করবে, আর তার সব আনুষঙ্গিক দিকগুলো বলে দেবে। যে সব আয়াত ঘটনা বা দুর্ঘটনা সম্পর্কিত, সেগুলোর বিশ্লেষণের ধারা হল এই, এ ধরনের সব ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে বলে দেবে। আর তার ভেতরে যত রহস্য ও ইংগিত রয়েছে সব উদ্ঘাটিত করে দেবে।
যে সব আয়াত মৃত্যু আর তার পরবর্তীকালের অবস্থা সম্পর্কিত, তা এভাবে বিশ্লেষণ করবে, যে সব অবস্থা দেখা দেবার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর চিত্র সুস্পষ্ট করে তুলে ধরবে এবং সব অবস্থাগুলোর পুরোপুরি বিশ্লেষণ দান করবে।
এ পর্যন্ত বিশ্লেষণের একটি ধরন সম্পর্কেই বলা হল। এর আরও অনেক ধরন আছে। যেমন, কোন আয়াতের মর্মে জটিলতার জন্যে অসামঞ্জস্য মনে হল সেখানে বিশ্লেষণের ধরন হবে এই, অনুরূপ উদাহরণ তুলে ধরে পাঠকের ধারণার কাছাকাছি করে দেবে। দুটি পরস্পর বিরোধী প্রমাণের জন্যে যদি তার বুঝতে অসুবিধে হয়, তার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দুটি প্রমাণের ভেতরকার বিরোধ মিটিয়ে দেবে। দুটি মর্ম যদি পরস্পর বিরোধী হয়ে দেখা দেয়, কিংবা সাধারণ অর্থের সাথে যদি যুক্তি-জ্ঞানের বিরোধ দেখা দেয়, তখনও এ দুয়ের ভেতরকার বিরোধ দূর করার মত বিশ্লেষণের দরকার। তেমনি দুটো আলাদা ব্যাপার যদি মিলে জগাখিচুড়ি হয়ে দাঁড়ায়, তখন ভুল সৃষ্টির কারণ দূর করে দেবার জন্যে বিশ্লেষণ প্রয়োজন। যদি একই আয়াত ভিন্ন ভিন্ন দুটো বিধানের প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সে দুটো বিধানের ভেতরে সামঞ্জস্য বিধানের প্রয়াস পাবে। কোন কোন স্থানে বিশ্লেষণের ধারা এও হতে পারে, আয়াতে যে সব প্রতিশ্রুতির কথা রয়েছে, তার সত্যতা ও যথার্থতা সুষ্পষ্ট করে তুলে ধরা। বিশ্লেষণের এও একটি ধরন যে, কোন ব্যাপারে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবন থেকে উদাহরণ সংগ্রহ করে ব্যাপারটি সুপ্রমাণিত করে দেবে।
মোট কথা, সাহাবাদের তাফসীরে বিশ্লেষণের অনেক নজীর রযেছে। বস্তুত এ বিষয়টি সব জটিলতার সর্ববিধ কারণ সবিস্তারে না করে যথাযথভাবে বুঝানো সম্ভব নয়। বিশ্লেষণ-সাপেক্ষ সব ব্যাপারগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ দ্বারা সমাধান বের করে দিতে পারলেই এ বিষয়টির পুরোপুরি আলোচনা সফল হতে পারে।
📄 তা’বীল বা গূঢ় অর্থ
তা'বীল সাধারণত মুতাশাবিহ্ আয়াতে করা হয়। তা'বীল অর্থ হচ্ছে, বাক্যের এমন কোন অর্থ বলে দেয়া, যা বাহ্যিক অর্থের বিরোধী। মুতাকাল্লেমীনরা এ ব্যাপারে বেশ বাড়া-বাড়ী সাথে কাজ করেছেন। তাঁরা প্রায় সব মুতাশাবিহ্ আয়াতেরই তা'বীল করার প্রয়াস পেয়েছেন। তবে আমি তা'বীল পছন্দ করি না। কারণ অধিকাংশ মুতাশাবিহ্ আয়াতের সম্পর্ক স্বয়ং আল্লাহ্ ও তাঁর গুণাবলীর সাথে সংযুক্ত। আল্লাহর সত্তা ও তাঁর গুণাবলীর তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা আমার মত নয়। আমার তো ইমাম মালিক, সাওরী, ইবনুল মুবারাক ও আগেকার সব মনীষীর মতেই মত। তা হচ্ছে এই, মুতাশাবিহ্ আয়াতেরও বাহ্যিক অর্থ অনুসরণ করা এবং তা নিয়ে গবেষণা ও তা'বীলের প্রশ্রয় না নেয়া। কারণ, এ ধরনের আয়াত থেকে উদ্ভুত আহ্কাম নিয়ে ঝগড়া করা, সে ব্যাপারে নিজ মতবাদ সুপ্রতিষ্ঠিত করে অন্যের মতবাদকে ঘায়েল করা ও কুরআনের সুষ্পষ্ট প্রমাণ পাল্টে দেয়া আমার কাছে বৈধ নয়। বৈধ পন্থা হচ্ছে এই, আয়াত স্পষ্টত যে মর্ম প্রকাশ করে তা মেনে নেয়া এবং সেটাকেই নিজের মতবাদ মনে করা। অপরে কি বলল বা না বলল, তার পরোয়া করা ঠিক নয়।
কি কি কারণে আয়াতে সন্দেহ ও গরমিল দেখা দেয়, তা বলে এসেছি। এখানে প্রতিটি কারণের জন্যে ভিন্ন ভিন্ন কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
لغة القرآن
যদি অনিশ্চয়তার (তাশাবুহ্) কারণ হয় কোন শব্দ, তা হলে কর্ম পন্থা হবে এই, দেখতে হবে যে, প্রাচীন আরবরা সে শব্দটিকে কোন অর্থে ব্যবহার করত। তার পরে দ্রষ্টব্য হল সাহাবা ও তাবেঈদের ব্যবহার। যে অর্থের ওপরে তাঁরা একমত হয়েছেন, সেটাই গ্রহণ করবে।
نحوا لقرآن
কুরআনে নাহ্ভী (ভাষা ও উচ্চারণ তত্ত্ব) আলোচনার ফলেও কিছুটা জটিলতা দেখা দিয়েছে। কারণ একদল সিবওয়ায় নাহ্ভীর অনুসরণ করে তার প্রতিকূল যা কিছু পেয়েছে, সম্ভব অসম্ভব সব রকমের হেরফেরের আশ্রয় নিয়ে নিজ মত প্রতিষ্ঠা করেছে। আমার মতে এটা অন্যায়। আয়াতের আকার ইংগিতে যা বেশী উপযোগী মনে হয়, সেটাই অনুসরণ প্রয়োজন। তা ফাররা নাহ্ভীর অনুকুল হোক, কিংবা সিবওয়ায়। যেমন:
وَالْمُقِيمِينَ الصَّلوةَ وَالْمُؤْتُونَ الزَّكَاةَ
এবং নামায কায়েমকারী ও যাকাত আদায়কারী
এ আয়াত সম্পর্কে হযরত উসমান (রাঃ) বলেন-
سَتُقِيمُها العَرَبُ بِالْسِنَتِها -
আমার মতে, এ বাক্যাংশ ও বাক-রীতি বাহ্যত আরবদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত বাগধারার বিপরীত হলেও মুলত তা নয়। কারণ আরবরাই আরবী ভাষার জন্মদাতা। তাদের মুখ থেকে যাই বের হবে সেটাই দলীল হয়ে দাঁড়ায়। এটা কোন নতুন কথা নয় যে, আরবরা দৈনন্দিন জীবনের কথাবার্তায় ধারাবাহিক রীতি নীতির লংঘন ও করে থাকেন এবং তা কেউ অন্যায় ভাবে না।
কুরআনও প্রাচীন আরবদের ভাষায়ই নাযিল হয়েছে। তাই কোথাও ‘ও’ স্থলে ‘ঈ’ এসে থাকে, কিংবা দ্বিবচনে একবচন বা পুংলিংগে স্ত্রী লিংগে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, আশ্চর্যের কিছু নেই। তাই এটা সর্বসম্মত কথা যে الْمُقِيمِينَ আদতে الْمُقِيمُونَ অর্থেই এসেছে।