📄 দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা
কুরআনের 'গরীব' অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত অপরিচিত ও দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা সম্পর্কিত ব্যাপারটিও মনোযোগ আকর্ষণের বস্তু। কারণ এর ভিত্তি দুটি বস্তুত' ওপরে রয়েছে। এক তো আরবী অভিধানে এর অর্থ খুঁজে দেখা। দ্বিতীয়, বাক্যের আকার-ইংগিত ও অন্যান্য শব্দের যোগাযোগে এর অর্থ উদ্ধার করার প্রচেষ্টা চালানো। আর দুটো ব্যাপারই নিজের ব্যক্তিগত মত ও চিন্তাশক্তির প্রয়োগের ওপরে নির্ভরশীল। সুতরাং এখানেও বুদ্ধি এসে মাঝখানে দাঁড়ায়। এখান থেকেই মতানৈক্যের সুযোগ দেখা দেয়।
এ ব্যাপারে দুটো সত্য স্মরণ রাখা দরকার। একটা এই, একই আরবী শব্দ বিভিন্ন অর্থে প্রয়োগ করা যেতে পারে। দ্বিতীয়, মানুষের বুদ্ধির পরিমাণ এক নয়। তাই যখন বিভিন্ন লোক বাক্যের আকার-ইংগিত ও অন্যান্য শব্দের সাথে রেখে শব্দের বিভিন্ন অর্থের একটাকে নির্ধারিত করে, তখন তারা জ্ঞানের পরিমাপের বিভিন্নতার দরুন স্বভাবতই ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছে। এ কারণে মতানৈক্য দেখা দেয়।
এ ক্ষেত্রে সাহাবী ও তাবেঈনদের ভেতরে মতানৈক্য দেখা দেবার কারণ এটাই। প্রত্যেকেই নতুন মত দিয়েছেন। তাই নিরপেক্ষ তাফসীরকারের প্রয়োজন হচ্ছে দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দু'বার দু'দিক থেকে বিবেচনা করে দেখা। এক তো আরববাসী সে শব্দটিকে যত অর্থে ব্যবহার করেছে, সবগুলো দেখা চাই। আর ভেবে দেখা চাই যে, এর ভেতরে কোন্ অর্থটি এখানে অধিকতর প্রযোজ্য। দ্বিতীয়, বাক্যের আকার-ইংগিত দেখা দরকার কোন্ অর্থটি এখানে অধিকতর উপযোগী মনে হয়। তারপরে সঠিক ও উপযুক্ত শব্দটি বেছে নেয়া দরকার।
📄 আমার সিদ্ধান্ত
আমি এ ব্যাপারে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করে কাজ করেছি। সব পূর্ব শর্তগুলোর ওপরে গভীর দৃষ্টি দিয়ে প্রয়োগ স্থলে পুরো বিবেচনার সাহায্যে প্রাসংগিক সব ব্যাপার খতিয়ে দেখে তারপর নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। আর তা এতই সূক্ষ্ম ও যথাযথ হয়েছে যা পক্ষপাতদৃষ্ট মনোভাব না থাকলে কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। নীচে কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি : তা থেকে এর সত্যতা বুঝতে সুবিধে হবে।
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى
নিহত ব্যক্তির রক্তের বিনিময় গ্রহন তোমাদের ওপরে ফরয করা হল। (সূরা বাকারা-১৭৮) এখানে কিসাসের যে নির্দেশ রয়েছে, তার মূল রহস্য, হল এই, নিহত ব্যক্তি ও কিসাসের ভেতরে সামঞ্জস্য বিধান প্রয়োজন। এ আয়াতে ক্ষতি ও বিনিময়ের জন্যে শর্ত ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তাকেও কিসাসের নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত ধরে নেয়া প্রয়োজন।। بِالْأُنْثَى-এর ভেতরে এমনকি লিংগের যে শর্ত রয়েছে, তাও যেন লোপ না পায়। এ লিংগের শর্ত লোপ কিংবা শব্দের সাধারণ অর্থকে অপ্রয়োজনীয় বলার জন্যে এমন ধরনের কোন হেরফেরের প্রয়োজন নেই, যাঁ সামান্য চিন্তা করলেই অর্থহীন মনে হতে পারে।
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَهِلَّةِ (সূরা বাকারা-১৮৯) জনসাধারণ আপনার কাচে চাঁদ নিয়ে প্রশ্ন করে? আমার গবেষণা মতে এখানে 'আহিল্লা (চাঁদ) শব্দ দ্বারা 'আশহুর' (মাস) অর্থ নেয়া হয়েছে। কারণ এর পরেই যখন হজ্জের উল্লেখ এসেছে, তাতে এখানে হজ্জের মাস সম্পর্কেই প্রশ্ন করা হয়েছে। তাই জবাবে বলা হয়েছে:
هِيَ مَوَاقِيْتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ
এটা মানুষের সময়-জ্ঞানের ও হজ্জের উপায় স্বরূপ。
এখানে বিশেষ করে হজ্জের উল্লেখ আমার অনুসৃত অর্থের দিকে ইংগিত করে। তা না হলে শুধু সময়-নিদের্শক বলাই যথেষ্ট ছিল।
هُوَ الَّذِي أَخْرَجَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِنْ دِيَارِهِمْ لِأَوَّلِ الْحَشْرِ -
তিনিই আহলে কিতাবের ভেতর থেকে আল্লাহ্ দ্রোহীদের দেশ হতে নির্বাসিত করেছেন প্রথম হাশরের জন্যে। (সূরা হাশর - ২)
এখানে আমার মতে اول الحشر দ্বারা (প্রথম প্রেরিত সেনাদল) অর্থ নেয়া হয়েছে। দেখতে যদিও দুয়ের ভেতরে তেমন সাদৃশ্য মেলে না, কিন্তু অনুসরণ করলে দেখা যায়, কোন কোন স্থানে 'হাশর' শব্দ দ্বারা সেনাদল অর্থ নেয়া হয়েছে। যেমন:
وَابْعَثْ فِي الْمَدَائِنِ حَاشِرِينَ
এবং মাদায়নে সেনাদল পাঠাও। (সূরা শুয়া'রা-৩৬)
অপর এক জায়গায় হযরত সুলায়মান (আঃ) সম্পর্কে বলা হয়েছে।
وَحُشِرَ لِسُلَيْمَنَ جُنُودُهُ -
এবং সুলায়মান নিজ সেনাদল সমবেত করল। (সূরা নমল-১৭)
এ বাক্যে 'হাশর' শব্দ সৈন্য সমাবেশের অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।
আলোচ্য যে, আয়াতটিতে আহলে কিতাবদের ভেতরকার কাফিরদের কথা বলা হয়েছে, মূলত তা বনু নজীরদের ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট। তাই আমার ধারণা যে, আমি যে অর্থ বলেছি এখানে সেটাই অধিকতর প্রযোজ্য।
📄 নাসিখ-মনসুখ-এর ব্যাখ্যা দিতে পূর্ববর্তী ও পরবর্তীবাদের মতভেদ
আয়াতের নাসিখ-মনসুখ প্রশ্নও কুরআন ব্যাখ্যার কঠিনতম সমস্যা। কারণ সেটার যদি সঠিক জ্ঞান না থাকে তাহলে আয়াতের মর্মোদ্ধার মুশকিল হতে বাধ্য। তাই এ ব্যাপারে যে সব জটিলতা রয়েছে, তা বুঝে নেয়া দরকার।
এখানে সর্বাগ্রে মনে রাখা দরকার যে, 'নস্থ' শব্দটি বিভিন্ন দল ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করেছেন। সাহাবা ও তাবেঈন এক অর্থে, মুহাদ্দিসরা অন্য অর্থে এবং উসূলী (মূলনীতি নির্ধারক) আলেমরা আরেক অর্থে ব্যবহার করেছেন। একই শব্দের তিন অর্থ অবশ্যই জটিলতা সৃষ্টির ছিল; তাই হয়েছে।
📄 সাহাবাদের প্রয়োগ বিধি
সাহাবা ও তাবেঈন 'নস্থ' শব্দটিকে প্রায়ই আভিধানিক অর্থে অর্থাৎ কোন কিছু দূর করা বা লোপ করার অর্থে প্রয়োগ করেছেন। তাঁদের ব্যবহার অনুসারে 'নস্থ' অর্থ দাঁড়ায় এই, আগের আয়াতের কোন নির্দেশ পরের আয়াত দ্বারা বাতিল করা এবং তার বিভিন্ন ধারা হতে পারে। হয়তো পরবর্তী আয়াত দ্বারা এটা ব্যাখ্যা করে বলে দেয়া যে, আগের আয়াতের নির্দেশটির সময় পার হয়ে গেছে। অথবা পরবর্তী আয়াতে এমন কোন কথা থাকে, যার ফলে আগের আয়াতের সাধারণ নির্দেশটির বদলে চিন্তাধারা অন্য দিকে চলে যায়। ফলে পয়লা আয়াতের হুকুমটি আপনা আপনিই বাতিল হয়ে যায়। তানসীখের কখনও এরূপ রীতিও দেখা যায়, পরবর্তী আয়াতে বিশেষভাবে কোন শর্তের ওপরে জোর দেয়ার ফলে আগের আয়াতের ব্যাপক নির্দেশটি সীমিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ নির্দেশটিকে মনসূখ ধরা হয়। কখনও আবার পরবর্তী আয়াতে এরূপ তথ্য মেলে যাতে করে আগের আয়াতের একটা অস্পষ্ট অর্থ সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। ফলে আগের অর্থটি মনসূখ হয়ে যায়।
এটা এমনি এক ক্ষেত্র যে, মানবীয় বুদ্ধি প্রয়োগের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। যার ফলে দেখা দিয়েছে প্রচুর মতানৈক্য। যার ফলে মনসূখ আয়াত পাঁচশত পর্যন্ত পৌছে গেছে।
মনসূখ আয়াতের ব্যাপারে দ্বিতীয় স্বরণযোগ্য কথা হচ্ছে এই, সবকিছু নির্ভর করে ইতিহাস জানার ওপরে। কারণ সাহাবাদের ব্যবহারে 'নস্থ, যতরূপ অর্থ দিয়েছে, তা থেকে এটা নির্ধারণ করা মুশকিল যে, কোন্টি সত্যিকারের মনসূখ, আর কোনটি নয়। তাই 'মনসূখ' আয়াত ঠিক করার জন্যে অতীতের ইতিহাস ঘাটতে হয়। কখনো অতীতের পূণ্যাত্মাদের সর্ববাদী সম্মত মতকে দলীল ঠিক করা হয়। কখনও আবার আলেমদের সর্বসম্মত রায়কে ভিত্তি করে মনসূখ ঠিক করা হয়। সাধারণের কথা থাক-বড় বড় ফিকাহ্ বিদরা পর্যন্ত এ পথেই পা বাড়িয়েছেন। অথচ এ ধরনের ঐক্যমত বা ইজমার ওপরে নির্ভর করা ভুল। কারণ এ সম্ভাবনা থেকেই যায় যে, আয়াতের মর্ম ভুল বুঝা হয়েছিল। সে অবস্থায় ‘মনসূখের আর আস্থা কোথায়? স্থূল কথা, মনসূখ আয়াতের বিতর্কটি অনেক ঘোরালো ব্যাপার। এর শেষ প্রান্তে পৌঁছা কঠিন ব্যাপার।