📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 কুরআন নিজেই নিজের ব্যাখ্যা

📄 কুরআন নিজেই নিজের ব্যাখ্যা


এখানে আরেকটি অত্যন্ত মজার ব্যাপার রয়েছে। তা হল এই, কুরআনে একই ঘটনা কোথাও সংক্ষেপে, কোথাও বা অপেক্ষাকৃতবিস্তারিত ভাবে বলা হয়েছে। যেমন ফেরেশতাদের আপত্তি সম্পর্কে একখানে বলা হয়েছে :
قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ - আল্লাহ্ বললেন, তোমরা যা জান না আমি তাও ভালভাবেই জানি। (সূরা বাকরা ৩০)
তারপর অপর এক আয়াতে বলা হল:
أَلَمْ أَقُلْ لَّكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَأَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنْتُمْ تَكْتُمُونَ -
আমি তোমাদের বলি নাই যে, আকাশ ও পৃথিবীতে তোমাদের যত প্রকাশ্য ও গোপন কথা রয়েছে, সবই আমার জানা আছে। (সূরা বাকারা - ৩৩)
এটা ঠিক আগের কথাটিই। তবে তফাৎ এতটুকু যে, আগের বার সংক্ষেপে ও এবারে কিছুটা খুলে বলা হয়েছে। সুতরাং পয়লা আয়াতে যেটা বিশ্লেষণ সাপেক্ষ ছিল, দ্বিতীয় আয়াতে তা পূর্ণ হয়ে গেল। এভাবে দ্বিতীয় আয়াত যেন পয়লা আয়াতের তাফসীর হল।
এভাবে সূরা মরিয়মে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কাহিনী সংক্ষেপে বলা হয়েছে। যেমনঃ
وَلِنَجْعَلَهُ آيَةً لِلنَّاسِ وَرَحْمَةً مِّنَّا وَكَانَ أَمْرًا مَّقْضِيًّا - আর আমি তাকে মানুষের জন্যে নিজ নিদর্শন ও অনুগ্রহস্বরূপ গড়েছি। এটা এভাবেই হওয়া আমার মর্মী ছিল। (সূরা মারয়াম-২১)
আর এ ঘটনাটিকেই সূরা আল ইমরানে খুলে বলা হয়েছে :
وَرَسُولاً إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ - এবং বনী ইসরাঈলদের কাছে নবী করে পাঠালাম, (সে বলল) আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর নিদর্শন নিয়ে এসেছি। (সূরা আল ইমরান-৪৯)
বস্তুত এ আয়াতে সুসংবাদটি খুলে বলা হল। পয়লা আয়াতে যেহেতু এ সংবাদটির সংক্ষেপে উল্লেখ ছিল, তাই তা থেকে আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে,.... দ্বিতীয় আয়াতের অর্থটি দাঁড়ায় এই :
رَسُولاً إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِّنْ رَبِّكُمْ وَرَحْمَةً -
আমি বনী ইসরাঈলের কাছে এ খবর দেবার রসূল পাঠিয়েছি, (যে বলবে) আমি আল্লাহর নিদর্শন ও অনুগ্রহ নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছি।
বস্তুত এ মর্মই সুসংবাদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লামা সূয়ূতী এর ব্যতিক্রমে অন্য একটি উহ্য কাজের সাথে এগুলোর সম্পর্ক জুড়ে দিয়ে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেনঃ فَلَمَّا بَعَثَهُ اللَّهُ تَعَالَى إِلَى بَنِي إِسْرَائِلَ قَالَ لَهُمْ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ بِأَنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ .. الخ
যখন আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে বনী ইসরাঈলদের নিকট পাঠালেন, তিনি বললেন, আমি তোমাদের প্রভুর প্রেরিত পুরুষ। কারণ আমি তোমাদের জন্যে আল্লাহ্র নিদর্শন ও অনুগ্রহ নিয়ে এসেছি।
আমার মতে, আল্লামা সুয়ূতীর অভিমত ঠিক নয়। অবশ্য আল্লাহই ঠিক জানেন কোন্টা সত্য।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা দানে সলফের মতানৈক্যের কারণ ও তার-সমাধানের উপায়

📄 দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা দানে সলফের মতানৈক্যের কারণ ও তার-সমাধানের উপায়


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা

📄 দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা


কুরআনের 'গরীব' অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত অপরিচিত ও দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা সম্পর্কিত ব্যাপারটিও মনোযোগ আকর্ষণের বস্তু। কারণ এর ভিত্তি দুটি বস্তুত' ওপরে রয়েছে। এক তো আরবী অভিধানে এর অর্থ খুঁজে দেখা। দ্বিতীয়, বাক্যের আকার-ইংগিত ও অন্যান্য শব্দের যোগাযোগে এর অর্থ উদ্ধার করার প্রচেষ্টা চালানো। আর দুটো ব্যাপারই নিজের ব্যক্তিগত মত ও চিন্তাশক্তির প্রয়োগের ওপরে নির্ভরশীল। সুতরাং এখানেও বুদ্ধি এসে মাঝখানে দাঁড়ায়। এখান থেকেই মতানৈক্যের সুযোগ দেখা দেয়।
এ ব্যাপারে দুটো সত্য স্মরণ রাখা দরকার। একটা এই, একই আরবী শব্দ বিভিন্ন অর্থে প্রয়োগ করা যেতে পারে। দ্বিতীয়, মানুষের বুদ্ধির পরিমাণ এক নয়। তাই যখন বিভিন্ন লোক বাক্যের আকার-ইংগিত ও অন্যান্য শব্দের সাথে রেখে শব্দের বিভিন্ন অর্থের একটাকে নির্ধারিত করে, তখন তারা জ্ঞানের পরিমাপের বিভিন্নতার দরুন স্বভাবতই ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছে। এ কারণে মতানৈক্য দেখা দেয়।
এ ক্ষেত্রে সাহাবী ও তাবেঈনদের ভেতরে মতানৈক্য দেখা দেবার কারণ এটাই। প্রত্যেকেই নতুন মত দিয়েছেন। তাই নিরপেক্ষ তাফসীরকারের প্রয়োজন হচ্ছে দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দু'বার দু'দিক থেকে বিবেচনা করে দেখা। এক তো আরববাসী সে শব্দটিকে যত অর্থে ব্যবহার করেছে, সবগুলো দেখা চাই। আর ভেবে দেখা চাই যে, এর ভেতরে কোন্ অর্থটি এখানে অধিকতর প্রযোজ্য। দ্বিতীয়, বাক্যের আকার-ইংগিত দেখা দরকার কোন্ অর্থটি এখানে অধিকতর উপযোগী মনে হয়। তারপরে সঠিক ও উপযুক্ত শব্দটি বেছে নেয়া দরকার।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 আমার সিদ্ধান্ত

📄 আমার সিদ্ধান্ত


আমি এ ব্যাপারে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করে কাজ করেছি। সব পূর্ব শর্তগুলোর ওপরে গভীর দৃষ্টি দিয়ে প্রয়োগ স্থলে পুরো বিবেচনার সাহায্যে প্রাসংগিক সব ব্যাপার খতিয়ে দেখে তারপর নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। আর তা এতই সূক্ষ্ম ও যথাযথ হয়েছে যা পক্ষপাতদৃষ্ট মনোভাব না থাকলে কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। নীচে কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি : তা থেকে এর সত্যতা বুঝতে সুবিধে হবে।
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى
নিহত ব্যক্তির রক্তের বিনিময় গ্রহন তোমাদের ওপরে ফরয করা হল। (সূরা বাকারা-১৭৮) এখানে কিসাসের যে নির্দেশ রয়েছে, তার মূল রহস্য, হল এই, নিহত ব্যক্তি ও কিসাসের ভেতরে সামঞ্জস্য বিধান প্রয়োজন। এ আয়াতে ক্ষতি ও বিনিময়ের জন্যে শর্ত ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তাকেও কিসাসের নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত ধরে নেয়া প্রয়োজন।। بِالْأُنْثَى-এর ভেতরে এমনকি লিংগের যে শর্ত রয়েছে, তাও যেন লোপ না পায়। এ লিংগের শর্ত লোপ কিংবা শব্দের সাধারণ অর্থকে অপ্রয়োজনীয় বলার জন্যে এমন ধরনের কোন হেরফেরের প্রয়োজন নেই, যাঁ সামান্য চিন্তা করলেই অর্থহীন মনে হতে পারে।
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَهِلَّةِ (সূরা বাকারা-১৮৯) জনসাধারণ আপনার কাচে চাঁদ নিয়ে প্রশ্ন করে? আমার গবেষণা মতে এখানে 'আহিল্লা (চাঁদ) শব্দ দ্বারা 'আশহুর' (মাস) অর্থ নেয়া হয়েছে। কারণ এর পরেই যখন হজ্জের উল্লেখ এসেছে, তাতে এখানে হজ্জের মাস সম্পর্কেই প্রশ্ন করা হয়েছে। তাই জবাবে বলা হয়েছে:
هِيَ مَوَاقِيْتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ
এটা মানুষের সময়-জ্ঞানের ও হজ্জের উপায় স্বরূপ。
এখানে বিশেষ করে হজ্জের উল্লেখ আমার অনুসৃত অর্থের দিকে ইংগিত করে। তা না হলে শুধু সময়-নিদের্শক বলাই যথেষ্ট ছিল।
هُوَ الَّذِي أَخْرَجَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِنْ دِيَارِهِمْ لِأَوَّلِ الْحَشْرِ -
তিনিই আহলে কিতাবের ভেতর থেকে আল্লাহ্ দ্রোহীদের দেশ হতে নির্বাসিত করেছেন প্রথম হাশরের জন্যে। (সূরা হাশর - ২)
এখানে আমার মতে اول الحشر দ্বারা (প্রথম প্রেরিত সেনাদল) অর্থ নেয়া হয়েছে। দেখতে যদিও দুয়ের ভেতরে তেমন সাদৃশ্য মেলে না, কিন্তু অনুসরণ করলে দেখা যায়, কোন কোন স্থানে 'হাশর' শব্দ দ্বারা সেনাদল অর্থ নেয়া হয়েছে। যেমন:
وَابْعَثْ فِي الْمَدَائِنِ حَاشِرِينَ
এবং মাদায়নে সেনাদল পাঠাও। (সূরা শুয়া'রা-৩৬)
অপর এক জায়গায় হযরত সুলায়মান (আঃ) সম্পর্কে বলা হয়েছে।
وَحُشِرَ لِسُلَيْمَنَ جُنُودُهُ -
এবং সুলায়মান নিজ সেনাদল সমবেত করল। (সূরা নমল-১৭)
এ বাক্যে 'হাশর' শব্দ সৈন্য সমাবেশের অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।
আলোচ্য যে, আয়াতটিতে আহলে কিতাবদের ভেতরকার কাফিরদের কথা বলা হয়েছে, মূলত তা বনু নজীরদের ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট। তাই আমার ধারণা যে, আমি যে অর্থ বলেছি এখানে সেটাই অধিকতর প্রযোজ্য।

ফন্ট সাইজ
15px
17px