📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 সাহাবাদের ধারা

📄 সাহাবাদের ধারা


আমার মতে, শানে-নুযূল সম্পর্কে ভূল বুঝাবুঝি সাহাবা ও তাবেঈনের বর্ণনারীতির পার্থক্যের দরুন দেখা দিয়েছে। তাঁরা শানে-নুযূল বর্ণনা উপলক্ষে সাধারণ 'নাযালাতিল আয়াতৃ ফী কাযা' (এ ব্যাপারে আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে) কথাটি ব্যবহার করতেন। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে যে, তাঁরা এ কথাটি কেবল আয়াত সংশ্লিষ্ট বিশেষ ঘটনাটি সম্পর্কেই বলতেন না। বরং এ আয়াত যে সব ঘটনায় প্রযোজ্য, সেগুলো সম্পর্কেও এরূপ বলতেন। তাঁদের উদ্দ্যেশ্য থাকত, আয়াত দ্বারা যা যা বুঝা যেতে পারে, তারও উল্লেখ করা। তাঁরা এটা ভাবতেন না যে, ঘটনাটি আয়াতের আগে ঘটেছে, না পরে আর তার সম্পর্ক বনী ইসরাঈলদের বর্ণনার সাথে রয়েছে, না জাহেলী কিংবা ইসলামী যুগের সাথে রয়েছে। এমন কি সে ঘটনাটি উল্লেখিত আয়াতের শর্তাবলীর সাথে পুরোপুরি যোগ রাখে কিনা তাও তাঁরা ভাবতেন না।
এসব আলোচনায় জানা গেল, তাফসীর সম্পর্কিত বর্তমান আলোচ্য বস্তুটি কেবল রসূল (সঃ)-এর হাদীস ও সাহাবাদের বর্ণনায়ই সীমাবদ্ধ নয়; পরন্তু সাহাবা ও তাবেঈনের ব্যক্তিগত মতামত গবেষণাও এর অর্ন্তভূক্ত হয়েছে। দ্বিতীয়, একই আয়াত প্রসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের কয়েকটি ঘটনাই বর্ণিত রয়েছে, যেগুলোর আয়াতের হুকুমের সাথে পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট থাকার প্রশ্ন নেই। এই দু'টো রহস্য সামনে থাকলে শানে-নুযূলের ব্যাপারে যত প্রশ্নই দেখা দিক না কেন, সামান্য খেয়াল করলেই সমাধান মিলে যাবে।
এ প্রসঙ্গে ঘটনার বিস্তারিত আলোচনার ব্যাপারটি ও এসে যায়। কুরআন ঘটনার বিস্তারিত আলোচনা ছেড়ে শুধু সেদিকে ইংগিত দিয়ে চলে গেছে। তাফসীরকার যখন সেরূপ আয়াত নিয়ে লিখতে বসেন, তিনি গোটা কাহিনী খুজে ফিরেন। তখন তাঁরা ইয়াহুদীদের বর্ণনা কিংবা তাদের ইতিহাস গ্রন্থ হাতড়িয়ে পুরো ঘটনাটি সংগ্রহ করেন। অথচ কুরআনের প্রতিটি ইংগিতই বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে না। অনেক আয়াতের মর্মই সংশ্লিষ্ট ঘটনার বিশ্লেষণ ছাড়া আয়াতের ইংগিত বুঝা যায় না, সেগুলোর উল্লেখ তাফসীরকারদের কর্তব্য বটে। কিন্তু যেগুলো সেরূপ নয়, যেমন বনী ইসরাঈলের গরুটি কি গাই ছিল, না বলদ কিংবা আসহাবে কাহাফ্ এর কুকুর লাল ছিল, না কালো, সম্পূর্ণ বাজে আলোচনা। সাহাবারা এ ধরনের অহেতুক আলোচনাকে অন্যায় ও সময়ের অপচয় ভাবতেন।
এ ব্যপ্যারে দুটো প্রশ্ন সামনে থাকা চাই। এক তো কুরআনে বর্ণিত ঘটনাগুলোর কোনরূপ অনুমানের আশ্রয় নেয়া উচিত নয়। যেভাবে ঘটনা পাওয়া গেছে, সেভাবেই বলে দেয়া চাই। কিন্তু আগেকার তাফসীরকারদের একটি দল সম্পূর্ণ নয়া রীতি অনুসরণ করেছেন। তাঁরা কুরআনের ইংগিতকে সামনে রেখে তার আলোকে ঘটনাটি মোটামুটি ভাবে অনুমান করে সংশয়ের সাথে বলে দিতেন। তাঁদের এই রীতির পরিণাম দাঁড়ালো এ, পরবর্তীকালের তাফসীরকাররা তাঁদের সে সংশয়ের সূত্রটিকে ধরে ঘটনাটিকে নিশ্চিত বলে ধরে নিলেন।
এ পর্যন্ত যেহেতু বিভিন্ন ধরনের কথার জন্য ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা রীতি নির্ধারিত ছিল না, তাই সংশয়পূর্ণ ও নিশ্চিত কথা গুলো মিলে জগাখিচুড়ী হয়েছে। ফলে অনিশ্চিতকে নিশ্চিত ও নিশ্চত কথাকে কখনও অনিশ্চিত ধরা হয়েছে।
বস্তুত ঘটনা লেখার এ ধারা আর অনির্ধারিত বর্ণনা পদ্ধতিও সত্য বস্তুতে সংশয় ইত্যাদি বলে দেয়, তাফসীরের এ অংশটিও ব্যক্তিগত গবেষণা ও এ অনুমান প্রয়োগ থেকে মুক্ত নয়। তাই এখানেও মাথা খাটানো ও তর্ক-বিতর্কের বিরাট সুযোগ রয়েছে। যারা এ কথাটি মনে রাখে, তাদের জন্যে তাফসীরকারদের মতানৈক্যের স্বরূপ বুঝা ও সে সম্পর্কে সঠিক কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় না। তারা সহজেই বুঝতে পারে, আলোচ্য সমস্যাটি সাহাবাদের চূড়ান্ত মীমাংসা নয়। বরং সেটাও গবেষণা সাপেক্ষ। গোটা ব্যপারই সাহাবাদের তর্ক-বিতর্কের আর শংশয়-অনুমানের সমষ্টি মাত্র।
আমার মতে, ওযুর ব্যপারে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের ভূমিকাটি ও তদরূপ।
فَامْسَحُوا بِرُوسِكُمْ وَأَرْجُلِكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ
এবং তোমাদের মাথা মুছে ফেল ও পায়ের গিরা পর্যন্ত।
এ আয়াত সম্পর্কে তিনি বলেন- "আল্লাহ্ গ্রন্থ থেকে আমি শুধু মোছার নির্দেশ পেয়েছি। কিন্তু কেউ কেউ ধোয়া ছাড়া কিছুই স্বীকার করে না।"
বস্তুত হযরত ইবনে আব্বাসের এ কথা থেকে আমি যা বুঝেছি তা এই যে, তিনি পা মোছার মত পোষণ করেন না এবং সেটাকে ওযুর জন্য শর্ত ও ভাবে না। তাঁর মতেও পা ধোয়া প্রয়োজন। এখানে তিনি কেবল সে সমস্যাটির দিকে ইংগিত দিয়েছেন, যেটা প্রকাশ্য আয়াতের বিন্যাস অনুসারে সাধারণত ধরা দিয়েছে। তাই তিনি এরূপ কথা দ্বারা এ সমস্যাটি সম্পর্কে সমসাময়িক ব্যাখ্যা কাররা কি সমাধান দিতে চান, তাই জানতে চেয়েছেন। অথচ যারা তাঁর এ উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন এবং তাঁদের বর্ণনারীতি সম্পর্কে ধারণা রাখতেন না, তাঁরা এ কথাটিকে তারা তাঁর সিদ্ধান্ত ধরে নিয়ে পা ধোয়ার স্থলে মোছাকেই তাঁর মযহাব বলে ঠিক করেছেন। অথচ এটা সত্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থে ষড়যন্ত্রমূলক ইয়াহুদী বর্ণনার অনুপ্রবেশ

📄 আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থে ষড়যন্ত্রমূলক ইয়াহুদী বর্ণনার অনুপ্রবেশ


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 ইয়াহুদীদের বর্ণনা

📄 ইয়াহুদীদের বর্ণনা


এ প্রসংগে ইয়াহুদীদের বর্ণনা আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। তাদের বর্ণনার ভিত্তিতে কুরআনের অনেক ঘটনার বিশ্লেষণ দেয়া হয়েছে। অথচ তাদের বর্ণনার সত্যাসত্য সম্পর্কে আমাদের চুপ থাকতেই হয়েছে। সুতরাং সংশ্লিষ্ট ঘটনার ব্যাপারে আমাদের দুটি ব্যাপার লক্ষ্য রাখতে হবে। কুরআনে ইংগিতময় ঘটনার যেগুলো সম্পর্কে আমাদের রসূল (সঃ)-এর কোন হাদীস মেলে না, আহলে কিতাবদের বর্ণনা বের করে সেগুলো বিশ্লেষণ করা আদৌ উচিত নয়। হাদীসে কিছু মিললেই সেটাই যথেষ্ট ভাবতে হবে। যেমন :
وَلَقَدْ فَتَنَّا سُلَيْمَانَ وَأَلْقَيْنَا عَلَى كُرْسِيِّهِ جَسَدًا ثُمَّ أَنَابَ
এবং অবশ্যই আমি সুলায়মানকে পরীক্ষা করেছি ও তার তক্ত কাত করে ফেলে আবার সোজা করেছি। (সূরা ছদ-৩৭)
এ আয়াত প্রসংগে হযরত (সঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার সুলায়মান (আঃ) কোন ব্যাপারে ইচ্ছা জ্ঞান করতে গিয়ে 'ইনশা-আল্লাহ' বলতে ভুলে গিয়েছিলেন। সে কারণে আল্লাহ্ তা'আলা পাকড়াও করেন। অথচ ইয়াহুদীরা এ ব্যাপারে একটি পাথর ও একটি সাপের কাহিনী বর্ণনা করেছে। এরূপ ক্ষেত্রে হযরত (সঃ) এর বর্ণনার মুকাবিলায় সে বর্ণনার কি বৈধ্যতা থাকতে পারে?
দ্বিতীয়, ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে এ বিখ্যাত প্রবাদটি মনে রাখা দরকার, 'ততটুকুই চাই, যতটুকু প্রয়োজন।' মানে, কুরআনের ইশারার সাথে যতটুকু ঘটনা সংশ্লিষ্ট থাকে, ঠিক ততটুকুই বর্ণনা করা, উচিত। তাহলে যা বলা হবে, কুরআনেও তার সমর্থন মিলবে। অতিরিক্ত বিশ্লেষণ বর্জনীয়।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 কুরআন নিজেই নিজের ব্যাখ্যা

📄 কুরআন নিজেই নিজের ব্যাখ্যা


এখানে আরেকটি অত্যন্ত মজার ব্যাপার রয়েছে। তা হল এই, কুরআনে একই ঘটনা কোথাও সংক্ষেপে, কোথাও বা অপেক্ষাকৃতবিস্তারিত ভাবে বলা হয়েছে। যেমন ফেরেশতাদের আপত্তি সম্পর্কে একখানে বলা হয়েছে :
قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ - আল্লাহ্ বললেন, তোমরা যা জান না আমি তাও ভালভাবেই জানি। (সূরা বাকরা ৩০)
তারপর অপর এক আয়াতে বলা হল:
أَلَمْ أَقُلْ لَّكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَأَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنْتُمْ تَكْتُمُونَ -
আমি তোমাদের বলি নাই যে, আকাশ ও পৃথিবীতে তোমাদের যত প্রকাশ্য ও গোপন কথা রয়েছে, সবই আমার জানা আছে। (সূরা বাকারা - ৩৩)
এটা ঠিক আগের কথাটিই। তবে তফাৎ এতটুকু যে, আগের বার সংক্ষেপে ও এবারে কিছুটা খুলে বলা হয়েছে। সুতরাং পয়লা আয়াতে যেটা বিশ্লেষণ সাপেক্ষ ছিল, দ্বিতীয় আয়াতে তা পূর্ণ হয়ে গেল। এভাবে দ্বিতীয় আয়াত যেন পয়লা আয়াতের তাফসীর হল।
এভাবে সূরা মরিয়মে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কাহিনী সংক্ষেপে বলা হয়েছে। যেমনঃ
وَلِنَجْعَلَهُ آيَةً لِلنَّاسِ وَرَحْمَةً مِّنَّا وَكَانَ أَمْرًا مَّقْضِيًّا - আর আমি তাকে মানুষের জন্যে নিজ নিদর্শন ও অনুগ্রহস্বরূপ গড়েছি। এটা এভাবেই হওয়া আমার মর্মী ছিল। (সূরা মারয়াম-২১)
আর এ ঘটনাটিকেই সূরা আল ইমরানে খুলে বলা হয়েছে :
وَرَسُولاً إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ - এবং বনী ইসরাঈলদের কাছে নবী করে পাঠালাম, (সে বলল) আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর নিদর্শন নিয়ে এসেছি। (সূরা আল ইমরান-৪৯)
বস্তুত এ আয়াতে সুসংবাদটি খুলে বলা হল। পয়লা আয়াতে যেহেতু এ সংবাদটির সংক্ষেপে উল্লেখ ছিল, তাই তা থেকে আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে,.... দ্বিতীয় আয়াতের অর্থটি দাঁড়ায় এই :
رَسُولاً إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِّنْ رَبِّكُمْ وَرَحْمَةً -
আমি বনী ইসরাঈলের কাছে এ খবর দেবার রসূল পাঠিয়েছি, (যে বলবে) আমি আল্লাহর নিদর্শন ও অনুগ্রহ নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছি।
বস্তুত এ মর্মই সুসংবাদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লামা সূয়ূতী এর ব্যতিক্রমে অন্য একটি উহ্য কাজের সাথে এগুলোর সম্পর্ক জুড়ে দিয়ে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেনঃ فَلَمَّا بَعَثَهُ اللَّهُ تَعَالَى إِلَى بَنِي إِسْرَائِلَ قَالَ لَهُمْ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ بِأَنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ .. الخ
যখন আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে বনী ইসরাঈলদের নিকট পাঠালেন, তিনি বললেন, আমি তোমাদের প্রভুর প্রেরিত পুরুষ। কারণ আমি তোমাদের জন্যে আল্লাহ্র নিদর্শন ও অনুগ্রহ নিয়ে এসেছি।
আমার মতে, আল্লামা সুয়ূতীর অভিমত ঠিক নয়। অবশ্য আল্লাহই ঠিক জানেন কোন্টা সত্য।

ফন্ট সাইজ
15px
17px