📄 আয়াতের রচনারীতি
যদিও কুরআনের আয়াতের মাত্রারীতি প্রচলিত সব রীতির থেকে আলাদা, তথাপি তা রীতি নীতি ছাড়া নয়। তার নিজস্ব বিশেষ নিয়মনীতি রয়েছে।
বস্তুত, কুরআনে বিভিন্ন সূরার ভেতরে যে রীতি অনুসরণ করা হয়েছে, সে সবের ভেতরকার সব রীতিগুলোর বৈশিষ্ট্যের মূল সূত্র ধরে নতুন এক রচনা রীতি নির্ধারিত করা চলে। কুরআনে মাত্রার জন্যে শ্বাস ও স্বরকে ভিত্তি করা হয়েছে। 'বাহরে ত্বাবীল' بحر طویل ও 'বাহরে মদীদ' بحر مديد এর মত ধরা বাঁধা মাত্রার আশ্রয় নেয়া হয়নি। তেমনি ছন্দের জন্যেও সেই পন্থা অনুসরণ করা হয়নি যা আমরা কবিতায় দেখতে পাই। বরং একটি শ্বাস নিয়ে যে শব্দ নিঃশেষিত হয়, সেই শব্দটি কুরআনের আয়াতে ছন্দের গ্রন্থি হয়ে দেখা দেয়; হোক তা আমাদের পরিকল্পিত ছন্দরীতির প্রতিকূল। কুরআনের মাত্রা ও ছন্দ রীতির এটাই চরম সংক্ষিপ্ত পরিচয়। অবশ্য এটা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বটে।
📄 প্রকৃতিগত শ্বাস প্রশ্বাসে যাতায়াতই কুরআনের আয়াতের ছন্দ রীতি
মূলত বুকের ভেতরে শ্বাস প্রশ্বাসের যাতায়াত চিরন্তন ও প্রকৃতিগত ব্যাপার। যদিও শ্বাস বাড়ানো কমানো মানুষের ইচ্ছার ওপরে নির্ভরশীল, তথাপি শ্বাসকে যদি স্বাভাবিক অবস্থায় ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে তার আসা যাওয়াটা একটা নির্ধারিত সময় অনুসরণ করে চলে। মানুষ যখন একবার শ্বাস টানে, তখন তার ভেতরে বিশেষ এক ধরনের প্রশ্বাস ক্রিয়া শুরু হয়। সেটা ধীরে ধীরে থেমে যায় এবং তখনই মানুষের দ্বিতীয়বার শ্বাস টানার প্রয়োজন হয়। শ্বাস প্রশ্বাসের এই আসা যাওয়ার নির্দিষ্ট একটা সময় পেরিয়ে যায়। যদিও তা সুনির্দিষ্ট সময় নয়, সামান্য এদিক ওদিকও হয়ে থাকে, তথাপি এ বেশ-কমটা সীমার ভেতরেই থাকে।
সুতরাং বাক্য বা চরণের ভিত্তি যদি এই শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপরে রাখা হয়, তাহলে বিভিন্ন চরণের ভেতরে দু'তিন শব্দের বেশী তারতম্য দেখা দেয় না। বরং অধিকতর খাঁটি কথা তো এই যে, কোন শব্দের এক চতুর্থাংশ কিংবা এক তৃতীয়াংশের বেশী তারতম্য কমই দেখা দেয়। আর এ সামান্য পার্থক্য এমন গুরুতর কিছু নয়, যার ফলে চরণটি রীতির সীমা লংঘন করে কিংবা মাত্রা হারিয়ে ফেলে।
বস্তুত এর ফলে ক্ষতি তো তেমন হয়ই না, পরন্তু রচনার ক্ষেত্রে বাড়ানো কমানোর স্বাধীনতা পাওয়া যায় ও আগু পিছু করার সুযোগ মেলে। যার ফলে নিয়ম নীতির ভেতর দিয়েও বাক্যের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রাখার, এমনকি বাড়ানোরও সম্ভাবনা থাকে। (বলা বাহুল্য, কুরআন চৌদ্দশ বছর আগে আধুনিক মুক্ত ছন্দেরই প্রবর্তন করে গেছে।)
📄 আয়াতের ওজন বা মাত্রা
বলা বাহুল্য, শ্বাসের এ সময়টিকেই কুরআনের মাত্রার মানদন্ড করা হয়েছে। সেটাকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। দীর্ঘ, طويل মধ্যম, قصير ও متوسط। দীর্ঘ মাত্রার উদাহরণ হল সূরা নিসা, মধ্যম মাত্রার উদাহরণ হল সূরা আরাফ ও আনআম এবং হ্রস্ব মাত্রার উদাহরণ হল সূরা শূরা ও সূরা দুখান।
📄 কাফিয়া বা আয়াতের ছন্দ রীতি
আয়াতের মাত্রার মতই তার ছন্দরীতির ভিত্তিও হল শ্বাসের সময়। শ্বাসটি যে শব্দে গিয়ে নিঃশিষিত হবে, আয়াতের 'কাফিয়া' সেটাই নির্ধারিত হবে। কেবল সুক্ষ্ণ অনুভূতি সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারবে। শ্বাস গিয়ে 'আলিফে'ই শেস হোক কিংবা 'ইয়া'য় হোক, সে বাক্যের শেষ অক্ষর 'বা' হোক কিংবা 'জীম', তথাপি সেই 'কাফিয়া' হয়ে রসানুভূতির উদ্রেক করবে।
এই হিসেবেই 'য়ালামুন' 'মুমিনীন' ও 'মুস্তাকীম' তিনটা ভিন্ন ধরনের শব্দ হয়েও পরস্পর সম্পর্ক রাখে এবং পরস্পরের 'কাফিয়া' হয়ে দাঁড়ায়। আর 'খুরুজ', 'মারাজ' 'তাওহীদ, 'তেবার', ফেরাক', 'এজাব', ইত্যাদি পরস্পরের ভেতরে যতই পার্থক্য রাখুক, তথাপি নির্ধারিত রীতির ভেতরেই শামিল থাকছে।