📄 ভারতীয় বাক্য রীতি
ভারতীয় কাব্য রীতি ইরানী ও আরবদের থেকে স্বতন্ত্র। তারা কবিতার জন্যে যে মাত্রা ঠিক করেছে, তা অক্ষরের সংখ্যার ভিত্তিতে। হোক সে হসন্ত যুক্ত কিঙবা স্বরচিহ্ন যুক্ত। এ সত্ত্বেও এ মাত্রারীতি, রস সঞ্চার ও আকর্ষণ সৃষ্টি সমানেই করছে। আমি অনেক মুর্খ পল্লীবাসীকেও কবিতা রচনা করতে দেখেছি। তারা সুরের ওপরে ভিত্তি করে মিলিয়ে মিলিয়ে ছড়া গেঁথে যায়। আর তাতে এক বা একাধিক শব্দের কোরাস মিলাবার ছোট্ট চরণ থাকে। এরাও যে মাত্রা ও ছন্দ ঠিক করে, তার ব্যাতিক্রম করে না। তারা নিজেদের কবিতা পাঠের ঢঙে ঠিক আরবদের কাসীদা পাঠের ঢঙ অনুসরণ করে। আর এতেই সবাই রস ও আনন্দ পায়। এভাবে প্রত্যেক সম্প্রদায় ও জাতি ভিন্ন ভিন্ন কাব্যরীতি অনুসরণ করছে। বাহ্যত সেগুলোর ভেতরে তারতম্য অনেক। তথাপি সবগুলোর ভেতরে একটা মৌলিক ঐক্যসূত্র রয়েছে।
📄 সঙ্গীত-রীতি
কবিতার মত গানেও মানুষের আকর্ষণ স্বভাবতই রয়েছে। আর দুনিয়ার সব এলাকার মানুষই গানে আনন্দ লাভ করে। কিন্তু রীতিনীতির বেলায় এখানেও বিভিন্ন জাতির ভেতরে পার্থক্য দেখা যায়। গ্রীকরা সংগীত চর্চার জন্যে যে রীতির প্রবর্তন করেছে, ও যে মাত্রা নির্ধারিত করেছে, তারা তার নাম রেখেছে মাকামাত। মাকামাতকে সামগ্রিক বস্তু ধরে নিয়ে তা থেকে বিভিন্ন সুর ও রাগসৃষ্টি করে। এভাবে ক্রমাগত এগিয়ে সংগীতরীতি একটা স্বতন্ত্র ও ব্যাপক বিদ্যায় রূপ নিল।
পক্ষান্তরে, ভারতীয়রা নিজেদের সংগীত চর্চার জন্যে ছ'টি মূলনীতি ঠিক করেছে। তার নাম দিয়েছেন রাগ। সে রাগ থেকে নানারূপ রাগীনী জন্ম নেয়। এভাবে ক্রমোন্নয়নের ধারা বেয়ে তারাও এটাকে একটা ব্যাপক ও স্বতন্ত্র বিদ্যায় পরিণত করল। আর তা গ্রীক সংগীত রীতি থেকে স্বতন্ত্র রূপ নিল। কিন্তু আমরা পল্লীবাসীদের দেখে বুঝতে পাই, তারা গ্রীক ও ভারতী দু'রীতিকেই বাতিল করে দিয়ে নিজেদের রুচি ও মর্ষী মোতাবেক স্বতন্ত্র সংগীত পদ্ধতি অনুসরণ করে চলছে। সব আইন কানুন ভেংগে চুরে তারা এক জগাখিচুড়ি হৈ-হল্লা জুড়ে দেয়। অথচ ভাতেও তারা গ্রীক ভারতী সংগীত শাস্ত্র অনুসারীদের চাইতে কোন অংশে কম আনন্দ পায় না।
যখন আমরা এসব ব্যাপার সামনে রাখি আর সংগীত চর্চার নানা বিদ্যা ও সেগুলোর ভেতরকার ঐক্যসূত্র তালাশ করি, তখন জানতে পাই কাব্যের মত গানেরও সেই ঐক্য নেহাৎ কাল্পনিক ও আপেক্ষিক।
সারকথা, সংগীত-বিদ্যা হোক আর কাব্য-শাস্ত্র হোক, দুয়ের বিভিন্ন রীতির ভেতরে যে ঐক্যসূত্র রয়েছে সেটা হল সুর সৃষ্টি। আর তার সম্পর্ক সেই মাত্রা বা রাগের সাথে জড়িত, যা আমরা কবিতা ও গানের সব রীতির ভেতরে সমানে পাই। বস্তুত, গান ও কবিতার সেই মূল সুরই সব বিদ্যার ভেতরকার একমাত্র ঐক্যসূত্র। রুচি ও রসবোধের সম্পর্ক সেই সুরের রেশেই বাঁধা। আর তা অবশ্যই কোন রীতি নীতির রশিতে ধরা দেয় না।
📄 কুরআনের বর্ণনারীতিতে চিরন্তন সৌন্দর্যের চয়ন
বস্তুত আল্লাহ্ যখন এই মাটির মানুষের সাথে কথা বলতে চাইলেন, তখন সব কাব্য ও সংগীতের মূল ঐক্যসুর চিরন্তন সৌন্দর্যটি তিনি বেছে নিলেন এবং নানা দেশের নানান রীতি নীতি বর্জন করলেন, যা সদা পরিবর্তনশীল। আদতে, যুগে যুগে মানুষ সীমাবদ্ধ জ্ঞান যে রীতি গড়ে তোলে, তা তাদের ক্রমাগত মূর্খতার পরিচয় দিয়ে চলে। তাই তা ছেড়ে বাক্য, বাক্য বা সংগীতের সামগ্রিক সৌন্দর্য সমষ্টিকে এভাবে কাজে লাগানো যেন বর্ণনার প্রতিটির ক্ষেত্রেই যথাযথ ও সুষমামন্ডিত হয়ে ওঠে। সেটাই নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর ও সাড়ম্বর বর্ণনারীতি।
📄 আয়াতের রচনারীতি
যদিও কুরআনের আয়াতের মাত্রারীতি প্রচলিত সব রীতির থেকে আলাদা, তথাপি তা রীতি নীতি ছাড়া নয়। তার নিজস্ব বিশেষ নিয়মনীতি রয়েছে।
বস্তুত, কুরআনে বিভিন্ন সূরার ভেতরে যে রীতি অনুসরণ করা হয়েছে, সে সবের ভেতরকার সব রীতিগুলোর বৈশিষ্ট্যের মূল সূত্র ধরে নতুন এক রচনা রীতি নির্ধারিত করা চলে। কুরআনে মাত্রার জন্যে শ্বাস ও স্বরকে ভিত্তি করা হয়েছে। 'বাহরে ত্বাবীল' بحر طویل ও 'বাহরে মদীদ' بحر مديد এর মত ধরা বাঁধা মাত্রার আশ্রয় নেয়া হয়নি। তেমনি ছন্দের জন্যেও সেই পন্থা অনুসরণ করা হয়নি যা আমরা কবিতায় দেখতে পাই। বরং একটি শ্বাস নিয়ে যে শব্দ নিঃশেষিত হয়, সেই শব্দটি কুরআনের আয়াতে ছন্দের গ্রন্থি হয়ে দেখা দেয়; হোক তা আমাদের পরিকল্পিত ছন্দরীতির প্রতিকূল। কুরআনের মাত্রা ও ছন্দ রীতির এটাই চরম সংক্ষিপ্ত পরিচয়। অবশ্য এটা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বটে।