📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 কুরআনের আয়াত ও কবিতার চরণের মধ্যে পার্থক্য

📄 কুরআনের আয়াত ও কবিতার চরণের মধ্যে পার্থক্য


কবিতার চরণ ও কুরআনের আয়াতের ভেতরে একটা সুস্পষ্ট পার্থক্য হচ্ছে, এই, খলীল নাভী (বৈয়াকরনিক) কবিতার জন্যে যে রীতি-নীতি ও ছন্দ অলংকার শর্ত করেছেন, কবিতায় সেগুলো মেনে চলতে হয়। অন্য কবিরা এ ব্যাপারে তাঁর থেকেই শিখে নিয়েছিল। পক্ষান্তরে, কুরআনের আয়াতে যে ওজন ও ছন্দ নির্ধারিত হয়েছে, তা কবিতায় নির্ধারিত ছন্দ-স্পন্দনের বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের এবং অধিকতর প্রকৃতি সম্মত। কবিদের কৃত্রিম ও ধরা-বাঁধা রীতি নীতির সাথে এর কোনই সম্পর্ক নেই। কবিতা ও আয়াতের ভেতরে যে সব ঐক্যসূত্র রয়েছে, সেগুলো সাধারণ পর্যায়ের বৈ নয়। সে গুলো যাচাই করা কিংবা তা নিয়ে আলোচনা করা নিরর্থক। অবশ্য এ দূয়ের ভেতরকার পার্থক্য সৃষ্টিকারী ব্যাপারগুলো আলোচনা ও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 কুরআন ও কবিতার ঐক্যসূত্র

📄 কুরআন ও কবিতার ঐক্যসূত্র


ওপরে সংক্ষিপ্ত আলোচনাটির এবারে বিশ্লেষণ দিচ্ছি। ছন্দোবদ্ধ ও অলংকারপূর্ণ কবিতা থেকে প্রত্যেক রসবোদ্ধাই রসগ্রহন করতে পারে। তাতে বিশেষ এক ধরনের রসানুভূতি ও আকর্ষণ থাকে। যদি সেগুলোর কারণ খুঁজে দেখা হয়, তা হলে জানা যাবে যে, বাক্যের অংশগুলো পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ ও পরস্পর সম্পৃক্ত, সেরূপ প্রত্যেকটি বাক্যই শ্রোতার ওপরে প্রভাব বিস্তার করে। সংগে সংগে তার আরও শোনার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। এ আগ্রহ ও অপেক্ষার মুহূর্তে যখনই সেরূপ আরও সাজানো বাক্য সামনে আসে, তখন সে খুশীতে উথলে ওঠে। যদি সে চরণ ছন্দের সাথে অলংকারের দিক দিয়েও সমান সফল হয়, তাহলে তো কথাই নেই। সুতরাং কবিতায় আকর্ষণ ও আনন্দ লাভের রহস্যটি মানুষের জন্মগত সূত্রেই পাওয়া। বস্তুত কোন দেশের কোন জাতি এমন নেই, যারা রসবোদ্ধা ও রুচিবান মানুষ হয়েও কবিতা দ্বারা প্রভাবান্বিত হয় না。
মাত্রা ও ছন্দের গাঁথুনীর এ প্রাকৃতিক ও সার্বজনীন সম্পর্ক সত্ত্বেও সব এলাকায় সে সবের ধারণা এক নয়। বরং মাত্রার অংশ ছন্দের শর্তসমূহের ব্যাপারে প্রত্যেক জাতির ভিন্ন ধারণা ও দর্শন রয়েছে। তাই প্রত্যেক ভাষার কবিতা সৃষ্টির নিয়মনীতি ভিন্ন ভিন্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। আরবরা বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ খলীলের দেয়া নিয়ম নীতির অনুসারী। ভারতবাসী এ ব্যাপারে ঠিক তাদের রুচি ও রীতি অনুসারে আলাদা নিয়মকানুন রচে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, যুগ বদলের সাথে সাথে মাত্রা ও ছন্দের নিয়মও বদলে যাচ্ছে। যখন মাত্রা ছন্দের সব নিময় কানূন সামনে রাখা সম্ভব হবে, আর তার সব গুলোর ভেতরে কোন ঐক্যসূত্র খুঁজে দেখা যাবে, তখন দেখা যাবে, সেগুলোর ভেতরে কাল্পনিক ও আপেক্ষিক কোন সূত্র ছাড়া কিছুই মিলবে না।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 আরবী ও ইরানী নীতি

📄 আরবী ও ইরানী নীতি


উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আরবরা মাত্রা ও ছন্দের ব্যাপরে যতখানি স্বাধীনতা দেয়, ইরানীরা ঠিক ততখানিই কঠোরতা অবলম্বন করে। আরবদের কাছে কবিতার মাত্রার ক্ষেত্রে সামান্য এদিক ওদিক অন্যায় নয়। যেমন, তারা কবিতার মাত্রা "মাফাএলুন" مفاعیل এবং 'মুফতা এলুন' مفتعلن কে "মুস্তাফ এলুন مستفعلن এর স্থলে ব্যবহার বৈধ রাখে, আর বিনা দ্বিধায় তা অনুসরণ করে চলে। এমনকি তারা 'ফাএলাতুন' فاعلاتن ও 'ফুলাতুন فعلاتن সমান মাত্রা বলতেও দ্বিধা করে না। এ ধরনের আরও বহু ছোট খাট ব্যাতিক্রমকে তারা কবিতার ক্ষেত্রে বৈধ মনে করে ও অবাধে তারা কবিতায় তা অনুসরণ করে চলে।
পক্ষান্তরে ইরানীরা মাত্রার বেলায় এরূপ ব্যাতিক্রম ন্যায় মনে করে না, এক্ষেত্রে কোনরূপ ত্রুটি বিচ্যুতি ক্ষমার যোগ্য মনে করে না। ছন্দের ক্ষেত্রেও ঠিক সেই অবস্থা। আরবদের কাছে 'কুবুর' قبور শব্দের সাথে 'মুনীর' منيرا শব্দের মিল ছন্দ পতন ঘটায় না। কিন্তু ইরানীরা এ ব্যাপারে একমত নয়। আরব কবিরা হাসিল, حاصل নাযিল نزل ইত্যাদি শব্দ একই মিলের মনে করে। কিন্তু ইরানীরা এ ব্যাপারে একমত নয়। আরববাসীর কাছে কোন শব্দের অর্ধেক এক চরণে বাকী অর্ধেক অন্য চরণে ব্যবহার চলে। কিন্তু ইরানীরা এ ধরনের শব্দ ব্যবহার সর্বতোভাবে অবৈধ মনে করে।
মোটকথা, আরব আর ইরানীদের ভেতরে কবিতার রীতিনীতি নিয়ে যত বেশী মতানৈক্য রয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে বলতে হয়, এ দু'দেশের মাত্রা ও ছন্দের ঐক্যেসূত্র কাল্পনিক ও আপেক্ষিক ছাড়া আর কিছুই নয়।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 ভারতীয় বাক্য রীতি

📄 ভারতীয় বাক্য রীতি


ভারতীয় কাব্য রীতি ইরানী ও আরবদের থেকে স্বতন্ত্র। তারা কবিতার জন্যে যে মাত্রা ঠিক করেছে, তা অক্ষরের সংখ্যার ভিত্তিতে। হোক সে হসন্ত যুক্ত কিঙবা স্বরচিহ্ন যুক্ত। এ সত্ত্বেও এ মাত্রারীতি, রস সঞ্চার ও আকর্ষণ সৃষ্টি সমানেই করছে। আমি অনেক মুর্খ পল্লীবাসীকেও কবিতা রচনা করতে দেখেছি। তারা সুরের ওপরে ভিত্তি করে মিলিয়ে মিলিয়ে ছড়া গেঁথে যায়। আর তাতে এক বা একাধিক শব্দের কোরাস মিলাবার ছোট্ট চরণ থাকে। এরাও যে মাত্রা ও ছন্দ ঠিক করে, তার ব্যাতিক্রম করে না। তারা নিজেদের কবিতা পাঠের ঢঙে ঠিক আরবদের কাসীদা পাঠের ঢঙ অনুসরণ করে। আর এতেই সবাই রস ও আনন্দ পায়। এভাবে প্রত্যেক সম্প্রদায় ও জাতি ভিন্ন ভিন্ন কাব্যরীতি অনুসরণ করছে। বাহ্যত সেগুলোর ভেতরে তারতম্য অনেক। তথাপি সবগুলোর ভেতরে একটা মৌলিক ঐক্যসূত্র রয়েছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px