📄 হযরত উসমানের যুগে কুরআন
কুরআন যথারীতি না সাজানো পর্যন্ত এ ধারাবাহিকতা ও ভাগ ঠিক ছিল। কিন্তু যখন যথারীতি সংকলিত হল, তখন এতে কিছুটা রদবদল ঘটেছে। আয়াতের মর্ম ও ব্যঞ্জনা অনুসারে মাসানীর তিন ভাগের দুভাগই মিথুনখন্ডের অন্তর্ভুক্ত হল। এভাবে অন্যান্য অংশের অল্প-বিস্তর রদবদল হয়েছে। হযরত উসামন (রাঃ) তাঁর খিলাফতের যুগে মাস্হাফের কয়েকটি কপি করিয়ে দেশের বিভিন্ন অংশে পাঠিয়ে দেন, যেন সবাই এটাকেই অনুসরণ করে ও অন্য আকার দানের চেষ্টা না করে।
📄 কোরআনের গুরু ও শেষ শাহী ফরমানের রূপে
যেহেতু কুরআনের সূরাগুলো ঠিক বাদশাহ্ ফমানের রীতিতে রচিত, তাই তার শেষ ও শুরু ঠিক দলীল পত্রাকারে রয়েছে। যে ভাবে কোন দলীল-পত্র আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে শুরু হয়, কোনটা লেখার উদ্দেশ্য দিয়ে শুরু হয়, কোনটিতে পত্রের লেখক ও প্রাপকের নাম শুরুতে থাকে, কোন পত্র শিরোনাম ছাড়াই লেখা হয়। কোন পত্র হয় লম্বা, কোনটি সংক্ষেপ। ঠিক তেমনি আল্লাহ্ পাক কোন সূরা প্রশংসা দিয়ে আর কোনটি উদ্দেশ্যের ওপরে আলোকপাত করে শুরু করেছেন। যেমন:
ذَالِكَ الْكِتَبُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ
'এ হচ্ছে অনন্য গ্রন্থ। কোন সংশয়ের ফাঁক নেই এতে। সরল মানুষের পথ প্রদর্শক।' (সূরা বাকারা-২)
কিংবা سُورَةُ اَنْزَ لَنَاهَا وَفَرَضْنَاهَا ... الخ এ সূরাটি আমিই নাযিল করেছি। আর আমিই ফরয করেছি। (সূরা নূর-১) এ যেন ঠিক সাধারণ পত্র-রীতি। যথা: هَذَا مَا صَالَحَ عَلَيْهِ فُلَانٌ وَفُلَانٌ
এ সেই পত্র যার ওপরে অমুক আর অমুক একমত। কিংবা هذا ما اوصی به فلان
এটা সেই দলীল যেটা অমুকে ওসীয়ত করে গেছে।
আমাদের হুযূর (সঃ) হুদায়বিয়ার যে শপথ ও সন্ধিনামা লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তার প্রারম্ভও এভাবে হয়েছিল: هذا ما قضى عليه محمد -
এ সেই শপথনামা যা মুহাম্মদ (সঃ) সম্পাদন করল।
কোন কোন সূরা ঠিক পত্রের আরম্ভের মত লেখক প্রাপকের নাম দিয়ে শুরু হয়েছে। যেমন :
تَنْزِيلُ الْكِتَابِ مِنَ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ 'এ সেই মহান মর্যাদাবান বিজ্ঞ শ্রেষ্ঠ আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ গ্রন্থ।' (সূরা জাছিয়াহ-২)
كِتَابٌ أُحْكِمَتْ آيَاتُهُ ثُمَّ فُصِّلَتْ - এ সেই গ্রন্থ, যার আয়াতগুলো মুহ্কাম করে আবার খুলে বর্ণনা করা হয়েছে। (সূরা হুদ-১)
কিংবা : مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ - এতো সেই প্রভুর কাছ থেকে, এসেছে, যিনি বিজ্ঞতম ও সর্বজ্ঞ।
এ সব আয়াতের শুরুতে যে রীতি অনুসৃত হয়েছে, তা যে কোন ফরমান বা উর্দ্ধতনের পত্রের সাথে সামঞ্জস্য রাখে। তাও এভাবে শুরু হয় : 'মহামান্য খলীফার নির্দেশ জারী হল।' কিংবা 'অমুক শহরের বাসিন্দাদের মাহমান্য খলীফার নির্দেশ শুনানো হল।'
হযরত (সঃ) রোম-সম্রাট হেরাক্লিয়াসের কাছে যে পত্র লিখেছেন, তার প্রারম্ভও এভাবে হয়েছিল :
مِنْ مُحَمَّدٍ رَّسُوْلِ اللهِ اِلَى هِرَقْلَ عَظِيمِ الرُّوْمِ আল্লাহ্ রসূল মুহাম্মদ (সঃ) এর পক্ষ থেকে রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াসের নামে।
কোন কোন সূরা পত্রের ঢঙে কোন শিরোনাম ছাড়াই অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন :
قَدْ سَمِعَ اللهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا আল্লাহ্ তায়ালা সে নারীদের কথা শুনেছেন যারা নিজ স্বামীকে নিয়ে ঝগড়া করেছে। (সূরা মুজাদালাহ-১)
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ ... الخ হে রসূল! আপনি হালালকে হারাম করছেন কেন ? (সূরা তাহরীম -১)
আরবদের বিশুদ্ধতম বাক্য কাসীদা আকারে লিপিবদ্ধ রয়েছে। কাসীদায় মূল বক্তব্যের আগে ভূমিকাস্বরূপ 'তাশবীব' লেখা হয়। তাশ্বীবের ভেতরে অদ্ভুত ও দুর্লভ চরণ, বিস্ময়কর ও ভয়াবহ ঘটনাবলী উল্লেখ করা অত্যন্ত প্রাচীন রীতি। কুরআনের কোন কোন সূরায় এ রীতিও অনুসৃত হয়েছে।
إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ وَإِذَا النُّجُومُ انْكَدَرَتْ .. الخ সূর্য যখন আঁধার কুন্ডলী ও তারকারাশি নিষ্প্রভ হবে.... ইত্যাদি। (সূরা তাকবীর-১-২)
وَالصَّافَاتِ صَفًّا فَالزَّاجِرَاتِ زَجُراً পূণ্য শ্রেণীবদ্ধদের সারি ও শয়তান বিতাড়কদের বিতাড়ন কার্যের শপথ। (সূরা ছফফাত ১/২)
وَالذَّارِيَاتِ ذَرُوا فَالْحَامِلَاتِ وقُراً ... الخ বিক্ষিপ্তকারী হওয়ার বিক্ষেপণ ও ভারি মেঘ বহনকারীর ভার বহন... ইত্যাদি। (সূরা জারিয়াত ১-২)
📄 সূরার শেষ ফরমানের রূপে
যেভাবে পত্রের শেষে সারকথা বলে দেয়া হয়, কখনও মূল্যবান উপদেশ ও ওসীয়ত থাকে, কখনও উপসংহারে, পেছনের কথাগুলোর ওপরে জোর দেয়া হয়, কখনও তাদের সতর্ক করে দেয়া হয় যারা পত্রোল্লিখিত বিধি-নিষেধের বিরোধিতা করতে চায়, তেমনি কুরআনের বিভিন্ন সূরায়, কখনও বা কঠোরভাবে কিছুর ওপরে জোর দানের আয়াত দিয়ে শেষ করা হয়েছে। কখনও আবার ঠিক এভাবেই সূরাও শুরু করা হয়েছে।
এ ধরনের যে সব সূরা শুরু করা হয়েছে, সেগুলোর ভেতরে কোথাও আবার এমন ধরনের আয়াত রয়েছে যা বিরাট কল্যাণকর। আর তাতে অত্যন্ত উত্তম ও আলংকারিকভাবে আল্লাহ্ প্রশংসা করা হয়েছে। ঠিক তেমনি ভাবেই কোথাও আল্লাহ্ তায়ালার অবদান ও অনুগ্রহ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
যেমন, এক সূরা শুরু করা হয়েছে স্রষ্টা ও সৃষ্টির ভেতরে পার্থক্য ও বৈষম্যের কথা দিয়ে। মাঝখানে এ আয়াত রয়েছে : قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ وَسَلَامٌ عَلَى عِبَادِهِ الَّذِينَ اصْطَفَى اللَّهُ خَيْرٌ أَمَّا يُشْرِكُونَ
বলে দাও, সব প্রশংসা শুধু আল্লাহ্রই প্রাপ্য। আর সেই বান্দাদের ওপরে আল্লাহ্ শান্তি রয়েছে, যাদের তিনি সম্মানিত করেছেন। যাদের তারা অংশীদার ঠিক করেছে, তিনি তাদের থেকে উত্তম। (সূরা নামাল-৫৯)
এরপর ধারাবাহিক পাঁচটি আয়াতে এ বিষয়টিই অত্যন্ত উত্তম ও আলংকারিক রীতিতে বর্ণনা করা হয়েছে। আর এ রীতিই সূরা বাকারায় যেখানে বনী ইসরাঈলদের সাথে যুক্তি-তর্কের অবতারণা করা হয়েছে, সেখানে অনুসৃত হয়েছে। বিতর্কের সূচনা এভাবে করা হয়েছে:
يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اذْكُرُوا نِعْمَتِي الَّتِي .. الخ হে বনী ইস্রাঈলগণ! আমার সে সব অবদান স্মরণ কর। (সূরা বাকারা ৪৮/১২২) ইত্যাদি আর এ বিতর্কের পরিসমাপ্তিও এ আয়াত দ্বারা করা হয়েছে। যে কথা দিয়ে বিতর্ক শুরু ঠিক তা দিয়েই তার সমাপ্তি ঘটানো চরম পান্ডিত্যের ওপরে নির্ভর করে।
এভাবে সূরা আল্ ইমরানে আহলে কিতাবদের সাথে বিতর্কের উদ্বোধন করা হয় এ আয়াত দিয়ে:
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ . নিশ্চয়ই আল্লাহ্র কাছে ধর্ম শুধু ইসলাম। (সূরা আল ইমরান-১৯)
যেহেতু আহলে কিতাবদের থেকে ইসলামের স্বীকৃতিটাই আলোচ্য বিষয় ছিল, তাই বিতর্কের শুরুই করা হয়েছে মূল দাবী উত্থাপনের ভেতর দিয়ে যেন বিতর্কের মূল কথা ধারণায় জেগে থাকে। এর আলোকেই যেন বিতর্ক চলে এবং জবাবের বেলায়ও এ উদ্দেশ্যটি সামনে থাকে।