📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 কেনায়া

📄 কেনায়া


কেনায়া অর্থ এমন কোন কথা বলা, যাতে বাহ্যিক অর্থ বুঝানো উদ্দেশ্য না হয়ে বরং সেটার অপরিহার্য পরিণতি বুঝানোই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে।

এ অপরিহার্যতা দু'ধরনের হতে পারে। স্বাভাবিক ও যুক্তিভিত্তিক। যদি বক্তব্যের পরিণতিটা স্বভাবতই বুঝা যায়, তবে হয় সাভাবিক। আর যদি বক্তব্য থেকে যুক্তির সাহায্যে পরিণতি বের করতে হয়, তা হলে হয় যুক্তিভিত্তিক। যেমন, তার পাক ঘর থেকে সর্বদা ধোঁয়া বেরোয়। তার মেহমান অনেক। অর্থাৎ, সে যাকে পায় দাওয়াত দেয়। আর সর্বদা পাক চলে বলেই সব সময়ে পাক ঘরে চুলা জ্বলে। এধরনের কেনায়া বাক্য হচ্ছে:

بَلْ يَدَاهِ مَبْسُوطَتَانِ -
অর্থাৎ 'তার হাত বড় খোলা।' মানে, সে খুব দাতা। (সূরা মায়েদা-৬৪)

ঠিক, তেমনি যদি কল্পিত কোন বস্তুকে বাস্তব কোন কিছুর সাহায্যে বুঝানো হয়, তখন তা হয় ইস্তেয়ারা যা কেনায়ার মতই। এ ধরনের বাক্য ব্যবহার আরবদের ভেতরে ব্যাপক দেখা যায়। কুরআন-হাদীসেও এর নজীর প্রচুর। যেমন: وَاجْلِبْ عَلَيْهِمْ بِخَيْلِكَ وَرَجِلِكَ অর্থাৎ তাদের ওপরে পদাতিক ও অশ্বারোহী চড়াও কর। (সূরা ইসরা-৬৪)

এ আয়তে ডাকাতদের এমন এক সর্দারের কথা উল্লেখ করা হল, যে তার সাথীদের নির্দেশ দিচ্ছে, তোমাদের একদল ওদিক থেকে আর একদল এদিক থেকে পথচারীদের ওপর হামলা কর।

وَجَعَلْنَا مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ سَدًّا وَ مِنْ خَلْفِهِمْ سَداً 'আমি তাদের সামনে দেয়াল তুলেছি, পেছনেও দেয়াল তুলেছি। (সূরা ইয়াছিন-৯)
إِنَّا جَعَلْنَا فِي أَعْنَاقِهِمْ أَغْلَالًا আর তাদের ঘাড়ে বেড়ী লাগিয়েছি।' (সূরা ইয়াছিন-৮)

এখানে কাফিরদের মনেরভাব ও উদ্দেশ্যের অসহায়তা ও সংকীর্ণতা ব্যক্ত করা হয়েছে। তাদের যেন চারদিকে প্রাচীর আর ঘাড়ে বেড়ী রয়েছে। তাই যে অবস্থায় আছে, তা থেকে চুল পরিমাণ নড়তে পারছে না। আর ভাল-মন্দ কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।

وَاضْمُمُ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ (সূরা কাছাছ-৩২) 'এবং ভয়ে তুমি জড়োসড়ো হয়ে পা হাত গুটিয়ে বস। অর্থাৎ মন স্থির করে চিন্তার বিশৃঙ্খলা ও কলুষতা বর্জন কর।

আরববাসীর কথোপকথনে এ ধরনের উদাহরণ অনেক মেলে। যেমন, তারা যখন কারুর বীরত্ব প্রকাশ করে, তখন নিজ তরবারির দিকে ইংগিত করে বলে, 'কখনও এদিকে মারে, কখনও ওদিক মারে।' এতে সে বুঝাতে চায়, বীরত্বে পৃথিবীতে তার তুলনা নেই। অথচ জীবনেই সে হয়ত তরবারি হাতে নেয়নি।

কখনও বলে, 'অমুক বলছে, দুনিয়ায় কেউ নেই তার সামনে দাঁড়াবার।' কখনও 'অমুক এরূপ করছিল' বলেই এমন কিছু করে দেখায় যেন রণাংগনে শত্রুকে কাবুতে পেয়ে মহাবীর কিছু করছে আর কি। হয়ত সে বেচারা না এরূপ করেছে, না বলেছে। কখনও বলে, 'অমুক আমার গলা টিপে ধরেছে।' কখনও বলে, 'অমুকে আমার গলায় আংগুল দিযে লোকমা বের করে নিয়েছে।'

এটা স্পষ্ট ব্যাপার যে, এ ধরনের কথা দিয়ে সাধারণ অর্থ বোঝানো হয় না। আমাদের ভাষা ও বাগধারায়ও এরূপ অনেক কথা প্রচলিত আছে।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 তা’রীজ

📄 তা’রীজ


তা'রীজ অর্থ হচ্ছে পরোক্ষ আলোচনা। মানে, কথাটা সাধারণভাবেই বলে বিশেষ ব্যক্তিকেই ইংগিত করা। সে জন্যে তার দু' এটকা বৈশিষ্ট্য মাত্র বলে শ্রোতাকে আভাসে বুঝানো।

কুরআনে যখন এ ধরনের বর্ণনারীতি দেখা দেয়, তখন তা বুঝার জন্যে সংশ্লিষ্ট কাহিনী বা ঘটনাটি জানা থাকা দরকার হয়।

আমাদের হযরত (সঃ) যখন কারুর ব্যপারে বিরক্ত প্রকাশ করতেন, তখন তার নাম না নিয়ে বলতেন: مَا بَالُ أَقْوَامٍ يَفْعَلُونَ كَذَا وَكَذَا - হল কি তাদের? এ সব করছে কেন?

কিংবা কুরআনে আছে: وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمراً .. الخ 'আল্লাহ্ ও তাঁর রসুলের কোন মীমাংসার পরে ঈমানদার নর-নারীর কিছুই বলার অধিকার থাকে না। (সূরা আহযাব-৩৬)

এখানে সাধারণভাবে মুমিন ও মুমিনাতদের কথা বলে মূলত বুঝানো হয়েছে হযরত যায়নব (রাঃ) ও তাঁর ভাইকে। আর: وَلَا يَا تَلِ أُولُوا الفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ এ আয়াতে মর্যাদা ও অবদান প্রাপ্তদের উল্লেখ করে কুরআন মূলত হযরত আবুবকর (রাঃ)-কে বুঝিয়েছে। (সূরা নূর-২২)

এ সব অবস্থায় মূল ঘটনা জানা না থাকলে মর্মোদ্ধার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 মাজাযে আকলী

📄 মাজাযে আকলী


মাজাযে আকলী অর্থাৎ ক্রিয়াকে মূলকর্তা ছেড়ে অন্য এক কর্তার সাথে জুড়ে দেয়া কিংবা মূলকর্ম ছেড়ে অন্য কিছুকে সেটার কর্ম বলে দেয়া।

এটা তো করা হয় যখন সেই ক্রিয়া ও তার কৃত্রিম কর্তার ও কর্মের ভেতরে কোথাও সাদৃশ্য থাকে, কিংবা বক্তা যার ব্যাপারে এরূপ বলে সেও মূলকর্তা বা কর্মের কেউ নয়, কিংবা তার সাথে যোগ রাখে। যেমন, সাধারণত বলা হয় :
بَنِى الْأَمِيرُ قَصْراً আমীর দালান গড়েছে।
অথচ আমীর তো আর নিজে গড়েনি। তেমনি বলা হয় :
أَنْبَتَ الرَّبِيعُ الْبَقْلَ বসন্ত তরি-তরকারী জন্ম দিয়েছে
এখানে বসন্ত তো আর তা জন্মায় না।

এ ধরনের বর্ণনারীতি কুরআনের অধিকাংশ স্থানে মেলে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px