📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 বাক্যের মধ্যে হরফে যর বাড়ানোর কারণে

📄 বাক্যের মধ্যে হরফে যর বাড়ানোর কারণে


কুরআন কোথাও কর্তা বা কর্মের সাথে যেরদায়ক হরফ ব্যবহার করে তাকে ক্রিয়া- প্রভাবক করে নিয়েছে। তাতে সংযোগ ও অনুসরণ অর্থ জোরদার হয়েছে। যেমন :

১! আয়াত : يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا আদতে হত : تحمى هي
২। আয়াত : وَقَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِعِيسَى بْنِ مَرْيَمَ ‘এবং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণের জন্যে আমি ঈসা ইবনে মরিয়মকে পেছনে পাঠিয়েছি।’ (সূরা মায়েদা-৪৬)
আদতে হত : قفينا هم بعيسى بن مريم ‘তাদের পরে আমি ঈসাকে পাঠিয়েছ।’

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 “ওয়ায়ে” এততেসাল অতিরিক্ত হওয়ার কারণে

📄 “ওয়ায়ে” এততেসাল অতিরিক্ত হওয়ার কারণে


এখানে আরেকটি রহস্য খুলে ধরা প্রয়োজন। তা এই "ও" অক্ষরটি সাধারণত দুবাক্যে সংযোগ সাধনের কাজ দেয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অনুসরণকে জোরদার করার কাজেও লাগে। যেমন :

(ক) আয়াত : إِذَا وَقَعَتِ الْوَاقِعَةٌ
(খ) আয়াত : وَكُنْتُمْ أَزْوَاجًا ثَلَاثَةٌ পর্যন্ত
(গ) আয়াত : حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا وَفُتِحَتْ أَبْوَابُهَا
(ঘ) আয়াত : وَلِيُمَحِّصَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 “ফা”-এ এততেসাল” বাড়ার কারণে

📄 “ফা”-এ এততেসাল” বাড়ার কারণে


এভাবে কোথাও 'ফা' ব্যবহৃত হয়। তার স্বতন্ত্র অর্থ থাকে না। কেবল বাক্যের সৌন্দর্য বাড়ায়।

আল্লামা কুস্তালানী কিতাবুল হজ্জের ব্যাখ্যায় যেখানে এ নিয়ে আলোচনা করেছেন যে, উমরার নিয়্যত বেঁধে যদি উমরা সেরে মক্কা ছেড়ে চলে, তখন বিদায়ী তাওয়াফ জরুরী কী না, সেখানে প্রসংগত লিখেছেন "যদি সিফাত ও মওসূফের মধ্যকার সম্পর্ক জোরদার করা উদ্দেশ্য হয়, তা হলে এদুয়ের মাঝে সংযোজক অব্যয় ব্যবহার বৈধ। যেমনঃ

আয়াতঃ إِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ যখন মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ আছে তারা বলে। (সূরা আনফাল ৪৯)

এখানে মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ আছে, একই মানুষ-সিফাত ও মওসূফ। শুধু বাক্যে জোর সৃষ্টি করার জন্যে "ও" ব্যবহার করা হয়েছে।

বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ সিওয়াই এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসংগে লিখেছে, এ আয়াত ঠিক নিম্নের বাক্যটির মত:
مررت بزيد وصا حبك 'আমি যায়েদ ও তোমার বন্ধুর সাথে গিয়াছিলাম।' যদি এখানে তোমার বন্ধু বলতে যায়েদ হয়, তা হলে 'যায়েদ' মওসূফ 'সাহেবেকা' সিফাত হবে। অথচ দুয়ের মাঝে রয়েছে সংযোজক অব্যয়।

আল্লামা যমশরী নিম্নের আয়াত সম্পর্কে বলেনঃ
وَمَا أَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍ إِلَّا وَلَهَا كِتَابٌ مَعْلُومٍ 'এমন কোন জনপদ আমি ধ্বংস করিনি, যার বাসিন্দাদের বিশেষ গ্রন্থ ছিল না।' (সূরা হিজর-৪)
এখানে معلوم وكتاب ولها সিফাত এবং قرية মওসূফ দুয়ের মাঝে সংযোজক অব্যায় শুধু সিফাতে জোর সৃষ্টির জন্যে এসেছে। নীচের আয়াতে ঠিক এ রীতিই অনুসৃত হয়েছে।

وَمَا أَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍ إِلَّا لَهَا مُنْذِرُونَ - 'এমন কোন জনপদ ধ্বংস করিনি, যার জন্যে সতর্ককারী ছিল না।' (সূরা শু'আরা-২০৮)
এখানে অব্যয়টি সিফাত ও মওসূফের মাঝে সম্পর্ক স্থাপনের জন্যে এসেছে। এখানেও সিফাতে জোর দেয়া উদ্দেশ্য। এ আয়াতটি নীচের বাক্যটির মতই:

جاءني زيد وعليه ثوب 'যায়েদ এসেছে এবং তার দেহে পোশাক।' বাক্যের দুটি অংশের ভেতরে সংযোজক অব্যয় নাম মাত্র রয়েছে। অর্থে কোন পার্থক্য সৃষ্টি করেনি। এখানে অব্যয় ছাড়াই চলত।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 বিভক্তি সর্বনাম

📄 বিভক্তি সর্বনাম


কখনও সর্বনাম নির্দিষ্ট করার অসুবিধার জন্যে আয়াত দূর্বোধ্য হয়। কখনও একই শব্দ দুটি অর্থ প্রকাশ করায়ও অসুবিধা দেখা দেয়। যেমন:

১। আয়াত: وَإِنَّهُمْ لَيَصُدَّنَهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ مُهْتَدُونَ 'এবং নিশ্চয়ই তারা তাদের সঠিক পথ থেকে বিরত রাখে, আর তারা ভাবে যে, তারাই সুপথপ্রাপ্ত। (সূরা যুখরুফ-৩৭)

এ আয়াতে তিন সর্বনাম ব্যবহৃত হয়েছে। তিনটিই অনির্দিষ্ট। তাই সরল পথ থেকে কারা ফিরায়, আর ভ্রান্ত পথে চলেও কারা নিজদের সঠিক ভাবছে, তা বুঝা যায় না। যদি সর্বনাম নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়, তাহলে আয়াত এরূপ দাঁড়ায়:
إِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيَصُدُّونَ النَّاسَ عَنِ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُ النَّاسُ أَنَّهُمْ مُهْتَدُونَ 'নিশ্চয়ই শয়তানরা মানুষকে সুপথ থেকে ফিরায় এবং মানুষ ভাবে যে, তারা অবশ্যই সঠিক পথে চলেছে।'

এবং قَالَ قَرِينُهُ এ এক স্থানে অর্থ হচ্ছে শয়তান, অন্যখানে অর্থ হচ্ছে ফেরেস্তা।

২। আয়াত: يَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ قُلْ مَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ خَيْرٍ 'তারা কাকে দান করবে তা তোমাকে প্রশ্ন করছে? বল, যা দান করবে তাই ভাল।' (সূরা বাকারা-২১৫)
১। আয়াত: يَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ قُلِ الْعَفْوَ 'তারা কি দান করবে তা তোমাকে প্রশ্ন করছে? বল, যা বেশী, তাই দান করবে।' (সূরা বাকারা ২১৯)

পয়লা আয়াতে জবাব এ জন্যে সঠিক হয়েছে যে, তারা দানের পাত্র খুজেছে। তাই বলা হল 'দান যেখানে যা-ই করুক উত্তম।' অথচ দ্বিতীয় আয়াতে জবাবের ধরনে বুঝা যায়, দানের পরিমাণ জানতে চেয়েছে। সুতরাং তাদের জন্যে এ জবাবেই সঠিক হল যে, 'উদ্বৃত্ত সম্পদ দান করবে।'

এভাবে কখনও "جعل" এবং "شى" এই জাতীয় বিভিন্ন শব্দের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আলাদা আলাদা অর্থ প্রকাশের ফলেও আয়াত দুর্বোধ্য হয়। যেমন:

(ক) جعل শব্দেকে خلق অর্থে ব্যবহার করা হয়। যেমন- جَعَلَ الظُّلُمَاتِ وَالنُّورَ আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, আঁধার ও আলো। (সূরা আনয়াম-১)
(খ) কখনও তা عتقد। অর্থাৎ আকীদা অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন: وَجَعَلُوا لِلَّهِ مِمَّا ذَرَاءَ 'আল্লাহ্ সম্পর্কে তাদের আকীদা এই যে, তিনিও তাদের দেখা কোন বস্তুর মতই কিছু।' (সূরা আনয়াম-১৩৬)

'এভাবে شئ শব্দকে কখনও কর্তা, কখনও কর্ম ইত্যাদি রূপে ব্যবহার করা হয়। যেমন:

১। আয়াত: أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْي অর্থাৎ তারা কি কোন কিছু ছাড়া এমনিই সৃষ্টি হয়েছে? (সূরা তুর-৩৫)
এখানে شئ দ্বারা خالق অর্থাৎ স্রষ্টা অর্থ নেয়া হয়ছে।

২। আয়াত: فَلَا تَسْتَلْنِي عَنْ شَيْي 'এরূপ কোন ব্যাপারে তোমরা আমাকে প্রশ্ন করো না। (সূরা কাহাফ-৭০)
এখানে شَيْئٌ দ্বারা সাধ্যাতীত বস্তু বুঝানো হয়েছে।

কখনও 'খবর' (বিধেয়) বলে তার থেকে 'খবর' সংশ্লিষ্ট ঘটনা বুঝানো হয়। যেমন : نَبَاءُ عَظِيمٌ (বিরাট খবর) এখানে عَظِيمٌ বলতে সেই ভয়াবহ সংশ্লিষ্ট ঘটনা বুঝানো হয়েছে, যার জন্যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়。

এভাবে خیر وشر বা তার সমার্থক শব্দ দ্বারা বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ নেয়া হয়। তাই অন্যান্য গুলোর মত এখানেও কখন কোন্ অর্থ হবে তা নির্ণয় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px