📄 বাক্যের মধ্যে অতিরিক্ত শব্দের কারণে
কখনও বাগধারা বা বাক্য- বিন্যাসের ব্যতিক্রম ছাড়া আরও কয়েকটি কারণে আয়াতের দুর্বোধ্যতা দেখা দেয়। যেমন :
১। (ছিফাত) বিশেষণ ব্যবহারের ফলে-
(ক) আয়াত : وَلَا طَائِرٍ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ: আর এমন পাখী নেই যা দু'ডানায় ভর দিয়ে উড়ে না। (সূরা আনআম-৩৮)
(খ) আয়াত: إِنَّ الْإِنْسَانَ خُلِقَ هَلُوعًا إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوعًا وَإِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ مَنُوعًا "নিশ্চয়ই মানুষকে কোমলমতি গড়া হয়েছে। দুর্বিপাকে পড়লে তারা ভেংগে পড়ে ও সুখে থাকলে তারা মেতে ওঠে।" (সূরা মাআরিজ-১৯-২১)
২। কোন বাক্যাংশের (বদল) পুনরুক্তির ফলে-
لِلَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِمَنْ آمَنَ مِنْهُمْ তাদের জন্যে যাদের দুর্বল ভাবা হল, তাদের জন্যে যারা ঈমান আনল। (সূরা আ'রাফ-৭৫)
৩। কখনও আতফে তফসিরী যৌগিক বাক্যের একটি অপরটির ব্যাখ্যা হলেঃ
حَتَّى إِذَا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَبَلَغَ أَرْبَعِينَ سَنَةً এমনকি যখন পূর্ণবয়স্ক হল এবং চল্লিশ বছরে পৌছল। (সূরা আহকাফ-১৫)
৪। কোন অক্ষর তাকরার বা শব্দের পুনরুল্লেখ ঘটলে-
(ক) আয়াত: وَمَا يَتَّبِعُ الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ شُرَكَاءَ إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ যারা অনুসরণ করে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য অংশীদার, তারা যা অনুসরণ করে, তা অনুমান ছাড়া আর কিছুরই অনুসরণ নয়। (সূরা ইউনুস-৬৬)
বাক্যের মূলরূপ এই: وَمَا يَتَّبِعُ الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ شُرَكَاءَ إِلَّا الظَّنَّ
(খ) আয়াত: وَلَمَّا جَانَّهُمْ كِتَابٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقُ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَ هُمُ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ
“এবং যখন তাদের কাছে তাদের গ্রন্থকে স্বীকৃতিদানকারী গ্রন্থ এল, অথচ এর আগে তারা কাফিরদের ওপরে তার সাহায্যেই প্রাধান্য বিস্তার করত, আর সেটাই যখন এল, তখন চিনতে পারল না এবং তা অস্বীকার করে বসল।" (সূরা বাকারা ৮৯)
এ আআতে جاء। এর পুনরাবৃত্তি ঘটায় অর্থ দুর্বোধ্য হয়েছে।
(গ) আয়াত: وَلْيَخْشَ الَّذِينَ لَو تَرَكُو مِنْ خَلْفِهِمْ ذُرِّيَّةً ضِعَافًا خَافُوا . عَلَيْهِمْ فَلْيَتَّقُوا اللَّهَ
'এবং তাদের ভয় করা উচিত আল্লহর্কে যারা ভয় পায় নাবালেগ সন্তানদের ছেড়ে মরতে এই ভেবে যে, তাদের পরে কি উপায় হবে? অতএব তাদের আল্লাহকেই ভয় করা উচিত। (সূরা নিসা-৯)
এখানেও 'আল্লাহ্-ভীতি' দুবার উল্লেখ করারয় মর্ম অস্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৫। আয়াত: يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَهِلَّةِ قُلْ هِيَ مَوَاقِيْتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ তোমাকে নব চাঁদ সম্পর্কে প্রশ্ন করছে? বলে দাও, তা হচ্ছে মানুষের জন্যে সময় নির্ধারক ও হজ্জের সময়- নির্দেশক। (সূরা বাকারা ১৮৯)
এখানে সংক্ষেপে হত: هي مواقيت للناس في الحج
"নব চাঁদ মানুষে জন্যে তাদের হজ্জের সময় নির্দেশক।" কিন্তু والحج বলায় একটু বাড়লেও লাভ হয়েছে বেশী। মানে, 'চাঁদ তো শুধু হজ্জের সময় নির্দেশের জন্যেই নয়; মানুষের পঞ্জিকা ঠিক করার জন্যে।'
৬। আয়াত: لِتُنْذِرَامَّ الْقُرَى وَمَنْ حَوْلَهَا وَتُنْذِرَ يَوْمَ الْجَمْعِ
"মক্কাবাসী ও তার পার্শ্ব বর্তীদের যেন সতর্ক কর এবং সতর্ক কর কিয়ামতের দিন সম্পর্কে।" (সূরা শূরা-৭)
تنذرام القرى يوم الجمع মূলরুপ হবে : এখানে দু'বার تنذر এসে গোলমাল বাধিয়েছে。
৭। আয়াত: تَرَى الْجِبَالَ تَحْسَبُهَا جَامِدَةً "তুমি পাহাড় দেখবে তো সুসংবদ্ধ বলেই মনে করবে।" (সূরা নামাল - ৮৮) এখানে تحسبها অতিরিক্ত। ترى এর বিভিন্ন মর্মের ভেতরে এখানে حسبان বুঝাবার জন্যে এসেছে। আর তার ফলে বাক্য জটিল হয়েছে。
৮। আয়াত: كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ وَانْزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَاتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ فَهَدَى اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا لِمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ وَاللَّهُ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
"মানুষ এক জাতিই ছিল। তারপর আল্লাহ্ তাদের সুসংবাদ ও দুঃসংবাদ দানের জন্যে নবীদের পাঠালেন এবং তাদের সাথে সত্য গ্রন্থ পাঠালেন যেন তা দিয়ে মানুষের পারস্পরিক বিরোধ মীমাংসা করা হয়। এর বিরুদ্ধে কেউ আপন্তি তোলেনি। শুধু পূর্ব গ্রন্থানুসারীরা, তাও নতুন গ্রন্থ অবতীর্ণ হবার পরে কেবল জিদের বশবর্তী হয়ে বিরোধী সেজেছে। আল্লাহ্ যাদের চান সরল পথ দেখিয়ে দেন।" (সূরা বাকারা-২১৩)
ওপরের আয়াতটির প্রতিটি বাক্য সুবিন্যাস্ত ও সুসংবদ্ধ। তথাপি মাঝখানে وَمَا أَخْتَلَفَ فِيهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُو বাক্যাংশটি জুড়ে দেয়া হয়েছে এ জন্য যে فِيمَا اخْتَلَفُوفِيهِ অংশটির সর্বনামটি সুস্পষ্ট হোক। অর্থাৎ এ কথাটা পরিষ্কার হোক যে, পূর্বের ঐশীগ্রন্থ প্রাপ্তদের ভেতরকার যে অনৈক্য ও মতভেদের কথা বলা হয়েছে, গ্রন্থ হাতে পেয়েই তারা এসব মতবিরোধ সৃষ্টি করেছে। তারা গ্রন্থের কিছু হুকুম মেনেছে, আর কিছু অস্বীকার করেছে।
📄 বাক্যের মধ্যে হরফে যর বাড়ানোর কারণে
কুরআন কোথাও কর্তা বা কর্মের সাথে যেরদায়ক হরফ ব্যবহার করে তাকে ক্রিয়া- প্রভাবক করে নিয়েছে। তাতে সংযোগ ও অনুসরণ অর্থ জোরদার হয়েছে। যেমন :
১! আয়াত : يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا আদতে হত : تحمى هي
২। আয়াত : وَقَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِعِيسَى بْنِ مَرْيَمَ ‘এবং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণের জন্যে আমি ঈসা ইবনে মরিয়মকে পেছনে পাঠিয়েছি।’ (সূরা মায়েদা-৪৬)
আদতে হত : قفينا هم بعيسى بن مريم ‘তাদের পরে আমি ঈসাকে পাঠিয়েছ।’
📄 “ওয়ায়ে” এততেসাল অতিরিক্ত হওয়ার কারণে
এখানে আরেকটি রহস্য খুলে ধরা প্রয়োজন। তা এই "ও" অক্ষরটি সাধারণত দুবাক্যে সংযোগ সাধনের কাজ দেয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অনুসরণকে জোরদার করার কাজেও লাগে। যেমন :
(ক) আয়াত : إِذَا وَقَعَتِ الْوَاقِعَةٌ
(খ) আয়াত : وَكُنْتُمْ أَزْوَاجًا ثَلَاثَةٌ পর্যন্ত
(গ) আয়াত : حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا وَفُتِحَتْ أَبْوَابُهَا
(ঘ) আয়াত : وَلِيُمَحِّصَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا
📄 “ফা”-এ এততেসাল” বাড়ার কারণে
এভাবে কোথাও 'ফা' ব্যবহৃত হয়। তার স্বতন্ত্র অর্থ থাকে না। কেবল বাক্যের সৌন্দর্য বাড়ায়।
আল্লামা কুস্তালানী কিতাবুল হজ্জের ব্যাখ্যায় যেখানে এ নিয়ে আলোচনা করেছেন যে, উমরার নিয়্যত বেঁধে যদি উমরা সেরে মক্কা ছেড়ে চলে, তখন বিদায়ী তাওয়াফ জরুরী কী না, সেখানে প্রসংগত লিখেছেন "যদি সিফাত ও মওসূফের মধ্যকার সম্পর্ক জোরদার করা উদ্দেশ্য হয়, তা হলে এদুয়ের মাঝে সংযোজক অব্যয় ব্যবহার বৈধ। যেমনঃ
আয়াতঃ إِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ যখন মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ আছে তারা বলে। (সূরা আনফাল ৪৯)
এখানে মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ আছে, একই মানুষ-সিফাত ও মওসূফ। শুধু বাক্যে জোর সৃষ্টি করার জন্যে "ও" ব্যবহার করা হয়েছে।
বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ সিওয়াই এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসংগে লিখেছে, এ আয়াত ঠিক নিম্নের বাক্যটির মত:
مررت بزيد وصا حبك 'আমি যায়েদ ও তোমার বন্ধুর সাথে গিয়াছিলাম।' যদি এখানে তোমার বন্ধু বলতে যায়েদ হয়, তা হলে 'যায়েদ' মওসূফ 'সাহেবেকা' সিফাত হবে। অথচ দুয়ের মাঝে রয়েছে সংযোজক অব্যয়।
আল্লামা যমশরী নিম্নের আয়াত সম্পর্কে বলেনঃ
وَمَا أَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍ إِلَّا وَلَهَا كِتَابٌ مَعْلُومٍ 'এমন কোন জনপদ আমি ধ্বংস করিনি, যার বাসিন্দাদের বিশেষ গ্রন্থ ছিল না।' (সূরা হিজর-৪)
এখানে معلوم وكتاب ولها সিফাত এবং قرية মওসূফ দুয়ের মাঝে সংযোজক অব্যায় শুধু সিফাতে জোর সৃষ্টির জন্যে এসেছে। নীচের আয়াতে ঠিক এ রীতিই অনুসৃত হয়েছে।
وَمَا أَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍ إِلَّا لَهَا مُنْذِرُونَ - 'এমন কোন জনপদ ধ্বংস করিনি, যার জন্যে সতর্ককারী ছিল না।' (সূরা শু'আরা-২০৮)
এখানে অব্যয়টি সিফাত ও মওসূফের মাঝে সম্পর্ক স্থাপনের জন্যে এসেছে। এখানেও সিফাতে জোর দেয়া উদ্দেশ্য। এ আয়াতটি নীচের বাক্যটির মতই:
جاءني زيد وعليه ثوب 'যায়েদ এসেছে এবং তার দেহে পোশাক।' বাক্যের দুটি অংশের ভেতরে সংযোজক অব্যয় নাম মাত্র রয়েছে। অর্থে কোন পার্থক্য সৃষ্টি করেনি। এখানে অব্যয় ছাড়াই চলত।