📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 বাক্যাংশের পরিবর্তন

📄 বাক্যাংশের পরিবর্তন


বাগধারার চাহিদা অনুসারে কখনও শর্তমূলক ও প্রতিজ্ঞাবাচক বাক্যের শর্ত ভাগ ও প্রতিজ্ঞা ভাগ এবং জবাবের অংশ যথাযথই থাকা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রেও একটি অংশ স্বতন্ত্র বাক্য করে নেয়া হয়। কারণ এ পরিবর্তন মর্মের সাথে সংযোগ রেখেই করা হয়। অবশ্য তাতে এরূপ কোন চিহ্ন থাকা চাই, যা কোন না কোনভাবে সে পরিবর্তনের ইংগিত দান করে। যেমন:

১। আয়াত: وَالنَّازِعَاتِ غَرْقاً وَالنَّاشِطَاتِ نَشْطًا وَالسَّابِحَاتِ سَبْحاً فَالسَّابِقَاتِ سَبْعًا فَالْمُدَبِّرَاتِ أَمْراً يَوْمَ تَرْجُفُ الرَّاجِفَةُ 'কঠোরভাবে গ্রেফতারকারী সেই ফিরিশতাদের শপথ! যারা প্রাণকে বাঁধন মুক্ত করে ও তা নিয়ে বায়ু পথে সবার আগে দ্রুত চলে এবং বিভিন্ন কাজের তত্ত্বাবধান করে। যেদিন কাঁপন-সৃষ্টিকারী কাঁপিয়ে তুলবে।' (সূরা নাযিআত-১-৬)
এ আয়াতে আগা-গোড়া শপথ নেয়া হয়েছে। অথচ শপথোত্তর বক্তব্যের উল্লেখ নেই। তা হচ্ছে 'হাশর-নশর' সত্য। কিন্তু তার বদলে বলা হল, 'ইয়াওমা তারজুফুর রাজিফাহ্' এবং এ বাক্যটিই মূল বক্তব্য ব্যক্ত করেছে।

২। আয়াত: وَالسَّمَاءِ ذَاتِ الْبُرُوجِ وَالْيَوْمِ الْمَوْعُودِ وَشَاهِدٍ وَمَشْهُودٍ قُتِلَ أَصْحَابُ الْأُخْدُودِ 'কক্ষ পথবিশিষ্ট আকাশের শপথ! অংগীকৃত দিনের শপথ! দর্শক ও দৃষ্টদের শপথ! অগ্নিকুন্ডের মালিকরা নিহত হয়েছে।' (সূরা বুরুজ-১-৪)
এ আয়াতেরও শপথোত্তর বক্তব্য নেই। তা হচ্ছে, কর্মফল সত্য।

৩। আয়াত: إِذَا السَّمَاءُ انْشَقَّتْ وَأَذِنَتْ لِرَبِّهَا وَحُقَّتْ وَإِذَا الْأَرْضُ مُدَّتْ وَالْقَتْ مَا فِيهَا وَتَخَلَّتْ وَأَذِنَتْ لِرَبِّهَا وَحُقَّتْ يَا أَيُّهَا الإِنْسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ 'যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে তার প্রভুর আদেশে এবং এটাই তার হবার। যখন পৃথিবী সমতল ভূমি করা হবে ও তার ভেতরের সবকিছু বেরিয়ে আসবে তার প্রভুর আদেশে এবং এটাই তার হবার। হে মানব! নিশ্চয়ই তুমি কঠোর সাধনা করবে।' (সূরা ইনশিকাক-১-৬)
এ আয়াতের মর্ম হচ্ছে যে, কর্মফল দান ও হিসাব নিকাশ গ্রহণ সত্য। এখানেও শুধু শর্ত বলে যাওয়া হয়েছে। তার উত্তরে কিছু বলা হয়নি।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 বর্ণনা রীতি বদল

📄 বর্ণনা রীতি বদল


কখনও বাক্যের বর্ণনারীতির বদল হয়ে থাকে। বাক্য হয়ত চায় মধ্যম পুরুষে বক্তব্য পেশ হওয়া। সেখানে হয়ত তৃতীয় পুরুষে বক্তব্য পেশ করা হয়। যেমন : আয়াত: حَتَّى إِذَا كُنْتُمْ فِي الْفُلْكِ وَجَرَيْنَ بِهِمْ بِرِيحِ طَيِّبَةٍ 'এমনকি তোমরা যখন কিশতীতে থাক এবং সেগুলো মৃদু মলয়ের সাহায্যে ভেসে চলে।' (সূরা ইউনুস-২২)
এখানে کنتم -এ মধ্যম পুরুষে বহুবচন। সে চায় পূর্ণ বাক্য এ ঢঙে হবে। কিন্তু রীতি বদল হল। তৃতীয় পুরুষ করে جرین শব্দ ব্যবহার করা হল।

এভাবে কখনো বাক্য রীতি পরিবর্তিত করে 'ইনশা'কে খবর ও খবরকে ইনশা করা হয়। তেমনি ক্রিয়া দ্বারা আবদ্ধ বাক্য ইন্‌শা বাক্যে ও ইনশা- বাক্য ক্রিয়াভিত্তিক বাক্যে পরিবর্তিত করা হয়। যেমন:

১। আয়াত: فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا এখানে নির্দেশক পদ যা ইনশা বাক্যের অন্তর্ভুক্ত। অথচ মর্মের দিক থেকে এটা ছিল ক্রিয়া আরদ্ধ বাক্য। উক্ত পদের রূপ ছিল। "لتمشوا" যা ঘটমান ক্রিয়া ছিল। (সূরা মুলক-১৫)

২। আয়াত: إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ 'যদি তোমরা ঈমানদার হও।' (সূরা বাকারা ৯৩) এখানে শর্তসূচক শব্দ দিয়ে বাক্য শুরু হওয়ায় এটাও ইনশা-বাক্য হল। অথচ মূল বাক্য খবর বাক্য বা ক্রিয়া-আরব্ধ বাক্য। তা হচ্ছেঃ إِيْمَانُكُمْ يَقْتَضِى هذا - অর্থাৎঃ তোমাদের ঈমানের এটাই চাহিদা।

৩। আয়াত: مِنْ أَجْلِ ذَالِكَ كَتَبْنَا عَلَى بَنِي إِسْرًا ئِيلَ 'এই কারণেই আমি বনী ইসরাঈলের ওপরে ফরয করেছি।' (সূরা মায়েদা-৩২) বাক্যটি ছিল এই, 'বনী আদমের অবস্থার ওপরে ভিত্তি করে কিংবা সেই উদাহরণ অনুসারে আমি বনী ইসরাঈলের ওপরে এটা ফরয করেছি।' অথচ 'বনী আদমের অবস্থার ওপরে ভিত্তি করে কিংবা বনী আদমের অবস্থার উদাহরণ অনুসারে'-এ বাক্যাংশটি 'এই কারণে' (মিন্ আজালে যালিক) বাক্যাংশ দ্বারা পরিবর্তন করা হল। সাধারণত কিয়াস কোন কারণকে ভিত্তি করেই হয়ে থাকে। বললে কেবল বিশ্লেষণ দেয়া হয় মাত্র। তা থেকে বেঁচে বাক্য সংকোচনের জন্যে এরূপ করা হয়েছে।

৪। اَرَيْتَ এটা প্রশ্নসূচক পদ। 'দেখা শব্দ থেকে গড়া হয়েছে। কিন্তু এখানে সতর্ক করার জন্যে প্রশ্নসূচক পদে রূপান্তরিত করা হয়েছে। পরবর্তী বাক্যের প্রতি মন আকর্ষণ করার জন্যে এরূপ করা হয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এরূপ বলে থাকি। যেমন: আপনি দেখেছেন কি? শুনেছেন কি?

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 বাক্যাংশের আপু পিছ করা

📄 বাক্যাংশের আপু পিছ করা


কখনও বাক্যের গাঁথুনীতে বাক্যাংশের আগের অংশ পেছনে ও পেছনের অংশ আগে আনা-নেয়া করা হয়। ফলে মূল অর্থ বুঝা দায় হয়। নীচের বিখ্যাত দুটা আরবী চরণ থেকে তা বুঝা যা যাবে:
بُثَيْنَةٌ شَأْنُهَا سَلبتُ فُوَادِي بِلَا جُرُمِ آتِيتُ بِهِ سَلاماً

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 দূর অন্বায়

📄 দূর অন্বায়


কখনও শব্দের সম্পর্ক দূরবর্তী কোন শব্দ কিংবা ভাবের সাথে সংযুক্ত হয়। সে কারণেও বাক্যটি দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে।

এ ধরনের আরও অবস্থা রয়েছে অনেক। যার ফলে আয়াতের মর্ম বুঝা কঠিন হয়ে থাকে। যেমন ধারাবাহিক 'ইল্লা' (ব্যতীত) ব্যবহার।

১। আয়াত: إِلَّا الَ لُوطٍ إِنَّا لَمُنَجُوهُمْ أَجْمَعِينَ إِلَّا امْرَأَتَهُ 'দূত পরিবার ব্যতীত আমরা সবাইকে মুক্তি দিয়েছি, তাঁর স্ত্রী ব্যতীত।' (সূরা হিজর-৫৯)
এখানে এস্তেসনার পর আর এক এস্তেসনা প্রবেশের কারণে অর্থ দুবদ্ধ হয়েছে।

২। আয়াত: فَمَا يُكَذِّبُكَ بَعْدُ بِالدِّينِ 'এর পরেও কোন বস্তু তোমাকে পরকালে অবিশ্বাসী করেছে? (সূরা ত্বীন-৭)
এ আয়াতের একেবারেই সংলগ্ন রয়েছে। لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ 'নিশ্চয়ই আল্লাহ্ মানুষকে সুন্দর কাঠামোতে গড়েছেন।' (সূরা তীন-৪) অথচ এ দু'আয়াতের অর্থে বাহ্যত কোনই মিল নেই। তাই দুর্বোধ্য হয়েছে।

৩। আয়াত : يَدْعُوا لَمَنْ ضَرَّهُ أَقْرَبُ مِنْ نَفْعِهِ অর্থ দাঁড়াল, তার জন্যে ডাকছে যার ক্ষতিটা কল্যাণের চাইতে কাছাকাছি হয়েছে। আদতে মর্ম এই তাকেই ডাকছে, যার মংগলের চাইতে অমংগলটাই নিকটবর্তী। এখানে من শব্দের বদলে لمن আসায় মর্মোদ্ধারে অসুবিধে দেখা দিয়েছে। (সূরা হজ্জ-১৩)

৪। আয়াত : لَتَنُوءُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ আয়াতের মূলরূপ ছিল : لتنؤ العصبة بها কিন্তু বর্ণনাভংগী বদলে যাওয়ায় শব্দেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, এ কারণেই অর্থ দুর্বোধ্য হয়েছে। (সূরা কাছাছ-২৬)

৫। আয়াত : وَامْسَحُوا بِرُءُ وَسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ 'এবং তোমাদের মাথা মুছ ও তোমাদের চরণগুলো .....। এর শেষভাগে হবার ছিলঃ واغسلوا ارجلكم এখানে দূর- অব্যয় ঘটিত দুর্বোধ্যতা দেখা দিয়েছে। (সূরা মায়েদা-৬)

৬। আয়াত: لَو لَا كَلِمَةٌ سَبَقَتْ مِنْ رَّبِّكَ لَكَانَ لِزَامَا وَأَجَلٌ مسمى "যদি তোমাদের ভাগ্য আগে নির্ধারিত না হত ও নির্দিষ্ট মুহূর্ত, তা হলে পাকড়াও হতে।" (সূরা ত্বহা-১২৯)
এখানে হওয়া প্রয়োজন ছিল: ولولا كلمة سبقت واجل مسمى لكان لزاما বাক-বিন্যাসের ব্যতিক্রমে এ দুর্বোধ্যতা এল।

৭। আয়াত: "তা না করলে তোমরা বিপদে পড়বে।" এর সংগেই- الا تَفْعَلُوهُ تَكُنْ فِتْنَةٌ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ - (সূরা আনফাল-৭৩)
"অতঃপর তোমাদের ওপরে সাহায্য অপরিহার্য।" (সূরা আনফাল-৭২)
আসায় পারস্পরিক সম্পর্কের অভাবে দুর্বোধ্যতা দেখা দিয়েছে।

৮। আয়াত : إِلَّا قَوْلَ إِبْرَاهِيمَ - "ইব্রাহীমের বাক্য ছাড়া।" (সূরা মুমতাহিনা-৪)
এই আয়াতটির সংশ্লিষ্ট আয়াত হল : لَقَدْ كَانَتْ لَكُمُ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ "ইব্রাহীমের ভেতরে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে।" এ দুয়ের ঐক্য অস্পষ্ট বলেই দুর্বোধ্যতা দেখা দিয়েছে।

৯। আয়াত : يَسْأَلُونَكَ كَانَّكَ حَفِيٌّ عَنْهَا - (সূরা আ'রাফ-১৮৭)
এ আয়াতে বাক-বিন্যাসের ব্যতিক্রমের জন্যে দুর্বোধ্যতা এসেছে। আয়াতে 'আনহা' -এর স্থান ছিল 'য়‍্যাসয়ালূনাকা'-এর পরেই। কিন্তু বাক্যে عنها 'হাফিয়ান' -এর পরে আসায় শব্দের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে অসুবিধে হয়েছে বলেই এ দুর্বোধ্যতা দেখা দিল।" আয়াতটির রূপ হত এই : يَسْأَلُونَكَ عَنْهَا كَانَّكَ حَفِيٌّ

ফন্ট সাইজ
15px
17px