📄 অনির্দিষ্ট শব্দকে নির্দিষ্ট শব্দ দ্বারা পরিবর্তন
কখনও বাগধারা চায় যে, অনির্দিষ্ট শব্দকে নির্দিষ্ট করে ব্যবহার করা হোক। সেক্ষেত্রে নির্দিষ্টতার চিহ্ন ও রীতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মর্ম অনির্দিষ্টই থাকে যেমন:
وَقِيلِهِ يَارَبِّ এখানে قِيلَ له قيله আসলে ১। এ পরিবর্তনে বাক্যের সংকোচন ঘটেছে।
حَقُّ الْيَقِينُ আসলে حق. يقين "ল" যোগ করা হয়েছে, শুধু উচ্চারণের সুবিধার জন্যে।
📄 লিঙ্গ ও বচনের পরিবর্তন
কখনও বাগধারার স্বাভাবিক চাহিদা মোতাবেক সর্বনাম স্ত্রীলিঙ্গ, কখনও বা পুংলিঙ্গ করা হয়। কখনও তাতে একবচন ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দেয়, কখনও আবার এক বচনের স্থলে বহুবচন ব্যবহার দরকার হয়। এ পরিবর্তনের মূলে রয়েছে বাক্যে মূল অর্থের সংগতি বিধান। যেমন :
১। আয়াত: فَلَمَّا رَأَى الشَّمْسَ بَازِغَةً قَالَ هُذَا رَبِّي هُذَا أَكْبَرُ - 'যখন সূর্যকে চমকাতে দেখল, বলল এই আমার সেই শ্রেষ্ঠ প্রভু।' (সূরা আনয়াম-৭৮)
এ আয়াতে 'শামস্' পুংলিঙ্গের স্থলে 'বাযিগাতান' এ সর্বনাম স্ত্রীলিঙ্গ ব্যবহৃত হয়েছে।
২। আয়াত: مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ الَّذِي اسْتَوْ قَدَنَارًا فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ 'তাদের উপমা এই, যেন একদল আগুন জ্বালাল আর যখনই চারিদিক আলোকিত হল, আল্লাহ্ তাদের দৃষ্টিশক্তি হরণ করলেন।' (সূরা বাকারা-১৭)
এ আয়াতে 'আদাআত' এ সর্বনাম বহুবচনের স্থলে এক বচন ব্যবহৃত হয়েছে।
এভাবে কখনও দ্বিবচনের জায়গায় একবচন ব্যবহৃত হয়েছে। যথাঃ
১। আয়াত: وَمَا نَقَمُوا إِلَّا أَنْ أَغْنُهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ مِنْ فَضْلِهِ
এ আয়াতে غنی। ক্রিয়াটি একবচন। অথচ তার কর্তা আল্লাহ্ ও রসূল দু'জন। ঠিক فضله এর সর্বনামের ও সেই অবস্থা যেহেতু আল্লাহ্ ও রসূলের একই করণীয় ব্যাপার, তাই দ্বিবচনের জায়গায় একবচন নেয়া হয়েছে।
২। আয়াতঃ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِنْ رَبِّي وَآثَانِي رَحْمَةً مِنْ عِنْدِهِ فَعُمِّيَتْ عَلَيْكُمْ 'যদি আমি আমার প্রভুর থেকে প্রাপ্ত নিদর্শন পেয়ে থাকি এবং তাঁর থেকে রহমতও লাভ করি.... ইত্যাদি।' (সূরা হুদ-২৮)
এখানে عمیت এর সম্পর্ক رحمة ও بينة দুটোরই সাথে। সুতরাং দ্বিবচনের عميتا হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দুটোরই অবস্থা এক বলে একবচন ব্যবহৃত হয়েছে।
📄 বাক্যাংশের পরিবর্তন
বাগধারার চাহিদা অনুসারে কখনও শর্তমূলক ও প্রতিজ্ঞাবাচক বাক্যের শর্ত ভাগ ও প্রতিজ্ঞা ভাগ এবং জবাবের অংশ যথাযথই থাকা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রেও একটি অংশ স্বতন্ত্র বাক্য করে নেয়া হয়। কারণ এ পরিবর্তন মর্মের সাথে সংযোগ রেখেই করা হয়। অবশ্য তাতে এরূপ কোন চিহ্ন থাকা চাই, যা কোন না কোনভাবে সে পরিবর্তনের ইংগিত দান করে। যেমন:
১। আয়াত: وَالنَّازِعَاتِ غَرْقاً وَالنَّاشِطَاتِ نَشْطًا وَالسَّابِحَاتِ سَبْحاً فَالسَّابِقَاتِ سَبْعًا فَالْمُدَبِّرَاتِ أَمْراً يَوْمَ تَرْجُفُ الرَّاجِفَةُ 'কঠোরভাবে গ্রেফতারকারী সেই ফিরিশতাদের শপথ! যারা প্রাণকে বাঁধন মুক্ত করে ও তা নিয়ে বায়ু পথে সবার আগে দ্রুত চলে এবং বিভিন্ন কাজের তত্ত্বাবধান করে। যেদিন কাঁপন-সৃষ্টিকারী কাঁপিয়ে তুলবে।' (সূরা নাযিআত-১-৬)
এ আয়াতে আগা-গোড়া শপথ নেয়া হয়েছে। অথচ শপথোত্তর বক্তব্যের উল্লেখ নেই। তা হচ্ছে 'হাশর-নশর' সত্য। কিন্তু তার বদলে বলা হল, 'ইয়াওমা তারজুফুর রাজিফাহ্' এবং এ বাক্যটিই মূল বক্তব্য ব্যক্ত করেছে।
২। আয়াত: وَالسَّمَاءِ ذَاتِ الْبُرُوجِ وَالْيَوْمِ الْمَوْعُودِ وَشَاهِدٍ وَمَشْهُودٍ قُتِلَ أَصْحَابُ الْأُخْدُودِ 'কক্ষ পথবিশিষ্ট আকাশের শপথ! অংগীকৃত দিনের শপথ! দর্শক ও দৃষ্টদের শপথ! অগ্নিকুন্ডের মালিকরা নিহত হয়েছে।' (সূরা বুরুজ-১-৪)
এ আয়াতেরও শপথোত্তর বক্তব্য নেই। তা হচ্ছে, কর্মফল সত্য।
৩। আয়াত: إِذَا السَّمَاءُ انْشَقَّتْ وَأَذِنَتْ لِرَبِّهَا وَحُقَّتْ وَإِذَا الْأَرْضُ مُدَّتْ وَالْقَتْ مَا فِيهَا وَتَخَلَّتْ وَأَذِنَتْ لِرَبِّهَا وَحُقَّتْ يَا أَيُّهَا الإِنْسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ 'যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে তার প্রভুর আদেশে এবং এটাই তার হবার। যখন পৃথিবী সমতল ভূমি করা হবে ও তার ভেতরের সবকিছু বেরিয়ে আসবে তার প্রভুর আদেশে এবং এটাই তার হবার। হে মানব! নিশ্চয়ই তুমি কঠোর সাধনা করবে।' (সূরা ইনশিকাক-১-৬)
এ আয়াতের মর্ম হচ্ছে যে, কর্মফল দান ও হিসাব নিকাশ গ্রহণ সত্য। এখানেও শুধু শর্ত বলে যাওয়া হয়েছে। তার উত্তরে কিছু বলা হয়নি।
📄 বর্ণনা রীতি বদল
কখনও বাক্যের বর্ণনারীতির বদল হয়ে থাকে। বাক্য হয়ত চায় মধ্যম পুরুষে বক্তব্য পেশ হওয়া। সেখানে হয়ত তৃতীয় পুরুষে বক্তব্য পেশ করা হয়। যেমন : আয়াত: حَتَّى إِذَا كُنْتُمْ فِي الْفُلْكِ وَجَرَيْنَ بِهِمْ بِرِيحِ طَيِّبَةٍ 'এমনকি তোমরা যখন কিশতীতে থাক এবং সেগুলো মৃদু মলয়ের সাহায্যে ভেসে চলে।' (সূরা ইউনুস-২২)
এখানে کنتم -এ মধ্যম পুরুষে বহুবচন। সে চায় পূর্ণ বাক্য এ ঢঙে হবে। কিন্তু রীতি বদল হল। তৃতীয় পুরুষ করে جرین শব্দ ব্যবহার করা হল।
এভাবে কখনো বাক্য রীতি পরিবর্তিত করে 'ইনশা'কে খবর ও খবরকে ইনশা করা হয়। তেমনি ক্রিয়া দ্বারা আবদ্ধ বাক্য ইন্শা বাক্যে ও ইনশা- বাক্য ক্রিয়াভিত্তিক বাক্যে পরিবর্তিত করা হয়। যেমন:
১। আয়াত: فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا এখানে নির্দেশক পদ যা ইনশা বাক্যের অন্তর্ভুক্ত। অথচ মর্মের দিক থেকে এটা ছিল ক্রিয়া আরদ্ধ বাক্য। উক্ত পদের রূপ ছিল। "لتمشوا" যা ঘটমান ক্রিয়া ছিল। (সূরা মুলক-১৫)
২। আয়াত: إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ 'যদি তোমরা ঈমানদার হও।' (সূরা বাকারা ৯৩) এখানে শর্তসূচক শব্দ দিয়ে বাক্য শুরু হওয়ায় এটাও ইনশা-বাক্য হল। অথচ মূল বাক্য খবর বাক্য বা ক্রিয়া-আরব্ধ বাক্য। তা হচ্ছেঃ إِيْمَانُكُمْ يَقْتَضِى هذا - অর্থাৎঃ তোমাদের ঈমানের এটাই চাহিদা।
৩। আয়াত: مِنْ أَجْلِ ذَالِكَ كَتَبْنَا عَلَى بَنِي إِسْرًا ئِيلَ 'এই কারণেই আমি বনী ইসরাঈলের ওপরে ফরয করেছি।' (সূরা মায়েদা-৩২) বাক্যটি ছিল এই, 'বনী আদমের অবস্থার ওপরে ভিত্তি করে কিংবা সেই উদাহরণ অনুসারে আমি বনী ইসরাঈলের ওপরে এটা ফরয করেছি।' অথচ 'বনী আদমের অবস্থার ওপরে ভিত্তি করে কিংবা বনী আদমের অবস্থার উদাহরণ অনুসারে'-এ বাক্যাংশটি 'এই কারণে' (মিন্ আজালে যালিক) বাক্যাংশ দ্বারা পরিবর্তন করা হল। সাধারণত কিয়াস কোন কারণকে ভিত্তি করেই হয়ে থাকে। বললে কেবল বিশ্লেষণ দেয়া হয় মাত্র। তা থেকে বেঁচে বাক্য সংকোচনের জন্যে এরূপ করা হয়েছে।
৪। اَرَيْتَ এটা প্রশ্নসূচক পদ। 'দেখা শব্দ থেকে গড়া হয়েছে। কিন্তু এখানে সতর্ক করার জন্যে প্রশ্নসূচক পদে রূপান্তরিত করা হয়েছে। পরবর্তী বাক্যের প্রতি মন আকর্ষণ করার জন্যে এরূপ করা হয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এরূপ বলে থাকি। যেমন: আপনি দেখেছেন কি? শুনেছেন কি?