📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 বাক্যের বদলে বাক্য ব্যবহার

📄 বাক্যের বদলে বাক্য ব্যবহার


কখনও পূর্ণ একটা বাক্য অনুল্লেখ রেখে তার বদলে আরেকটি বাক্য ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় বাক্য যদি পয়লা বাক্যের মর্ম ব্যক্ত করে ও তার অস্তিত্বের আভাস দেয়, তা হলেই এরূপ করা হয়। এতে মর্ম তো যথাযথ থাকে, কিন্তু বাক্যের কাঠামো সংক্ষেপ করে। যেমন:

১। আয়াত: وَإِنْ تُخَالِطُوهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ (সূরা বাকারা-২২০) 'তোমরা যদি তাদের সাথে মিশ, তাহলে তারা তোমাদের ভাই হয়ে যাবে।
আদতে বাক্যটি ছিল এই: نْ تُخَالِطُوهُمْ لَبَأْسَ بِذَلِكَ لِأَنَّهُمْ إِخْوَانُكُمْ وَشَانُ الْآخِ أَنْ يُخَالِطُ أَخَاهُ .

২। আয়াত: لَمَثُوبَةٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ خَيْر ... الخ "আল্লাহ্ থেকে প্রাপ্ত পুরস্কার অবশ্যই এর চেয়ে উত্তম।" (সূরা বাকার-১০৩)
বাক্যটি এরূপ হত:- لَوَجَدُوا ثَوَابًا وَمَثُوبَةً عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٍ

৩। আয়াত: إِنْ يَسْرِقُ فَقَدْ سَرَقَ أَنَّ لَهُ مِنْ قَبْلُ : 'যদি সে চুরি করে থাকে, তাহলে এর আগে তার ভাইও চুরি করেছে।' (সূরা ইউসুফ-৭৭)
বাক্যটি এরূপ ছিল: إِنْ سَرَقَ فَلَا عَجَبَ ، لِأَنَّهُ قَدْ سَرَقَ أَنَّ لَهُ مِنْ قَبْلُ ، لأَنَّهُ قَدْ 'সে যদি চুরি করে থাকে, অবাক হবার কিছু নেই। কারণ তার ভাইও চোর।'

৪। আয়াত: مَنْ كَانَ عَدُ وَالجِبْرِ يُلَ فَإِنَّهُ نَزَّ لَهُ عَلَي قَلْبِكَ بِإِذْنِ اللَّهِ 'যদি কেউ জিবরাঈলকে দুশমন ভাবে, তার মনে রাখা উচিত, আল্লাহ্ই তাকে তোমার অন্তরে অবতীর্ণ করেছেন।' (সূরা বাকারা -৯৭)
বাক্যটির মূল রূপ : مَنْ كَانَ عَدُ وَالجِبْرِيلَ فَإِنَّ اللَّهَ عَدُوٌّ لَهُ، فَإِنَّهُ نَزَّلَهُ عَلَى قَلْبِكَ بِإِذْنِهِ فَعَدُوهُ يَسْتَحِقُّ أَنْ يُعَادِ بِهِ اللَّهُ تَعَالَى - 'যে ব্যক্তি জিব্রাঈলের শত্রু, সে আল্লাহর শত্রু। কারণ তিনিই তাকে তোমার কাছে পাঠিয়েছেন। সুতরাং তার সাথে যে শত্রুতা করে সে আল্লাহ্ শত্রুতাই কামনা করে।'

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 অনির্দিষ্ট শব্দকে নির্দিষ্ট শব্দ দ্বারা পরিবর্তন

📄 অনির্দিষ্ট শব্দকে নির্দিষ্ট শব্দ দ্বারা পরিবর্তন


কখনও বাগধারা চায় যে, অনির্দিষ্ট শব্দকে নির্দিষ্ট করে ব্যবহার করা হোক। সেক্ষেত্রে নির্দিষ্টতার চিহ্ন ও রীতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মর্ম অনির্দিষ্টই থাকে যেমন:

وَقِيلِهِ يَارَبِّ এখানে قِيلَ له قيله আসলে ১। এ পরিবর্তনে বাক্যের সংকোচন ঘটেছে।
حَقُّ الْيَقِينُ আসলে حق. يقين "ল" যোগ করা হয়েছে, শুধু উচ্চারণের সুবিধার জন্যে।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 লিঙ্গ ও বচনের পরিবর্তন

📄 লিঙ্গ ও বচনের পরিবর্তন


কখনও বাগধারার স্বাভাবিক চাহিদা মোতাবেক সর্বনাম স্ত্রীলিঙ্গ, কখনও বা পুংলিঙ্গ করা হয়। কখনও তাতে একবচন ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দেয়, কখনও আবার এক বচনের স্থলে বহুবচন ব্যবহার দরকার হয়। এ পরিবর্তনের মূলে রয়েছে বাক্যে মূল অর্থের সংগতি বিধান। যেমন :

১। আয়াত: فَلَمَّا رَأَى الشَّمْسَ بَازِغَةً قَالَ هُذَا رَبِّي هُذَا أَكْبَرُ - 'যখন সূর্যকে চমকাতে দেখল, বলল এই আমার সেই শ্রেষ্ঠ প্রভু।' (সূরা আনয়াম-৭৮)
এ আয়াতে 'শামস্' পুংলিঙ্গের স্থলে 'বাযিগাতান' এ সর্বনাম স্ত্রীলিঙ্গ ব্যবহৃত হয়েছে।

২। আয়াত: مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ الَّذِي اسْتَوْ قَدَنَارًا فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ 'তাদের উপমা এই, যেন একদল আগুন জ্বালাল আর যখনই চারিদিক আলোকিত হল, আল্লাহ্ তাদের দৃষ্টিশক্তি হরণ করলেন।' (সূরা বাকারা-১৭)
এ আয়াতে 'আদাআত' এ সর্বনাম বহুবচনের স্থলে এক বচন ব্যবহৃত হয়েছে।

এভাবে কখনও দ্বিবচনের জায়গায় একবচন ব্যবহৃত হয়েছে। যথাঃ
১। আয়াত: وَمَا نَقَمُوا إِلَّا أَنْ أَغْنُهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ مِنْ فَضْلِهِ
এ আয়াতে غنی। ক্রিয়াটি একবচন। অথচ তার কর্তা আল্লাহ্ ও রসূল দু'জন। ঠিক فضله এর সর্বনামের ও সেই অবস্থা যেহেতু আল্লাহ্ ও রসূলের একই করণীয় ব্যাপার, তাই দ্বিবচনের জায়গায় একবচন নেয়া হয়েছে।

২। আয়াতঃ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِنْ رَبِّي وَآثَانِي رَحْمَةً مِنْ عِنْدِهِ فَعُمِّيَتْ عَلَيْكُمْ 'যদি আমি আমার প্রভুর থেকে প্রাপ্ত নিদর্শন পেয়ে থাকি এবং তাঁর থেকে রহমতও লাভ করি.... ইত্যাদি।' (সূরা হুদ-২৮)
এখানে عمیت এর সম্পর্ক رحمة ও بينة দুটোরই সাথে। সুতরাং দ্বিবচনের عميتا হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দুটোরই অবস্থা এক বলে একবচন ব্যবহৃত হয়েছে।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 বাক্যাংশের পরিবর্তন

📄 বাক্যাংশের পরিবর্তন


বাগধারার চাহিদা অনুসারে কখনও শর্তমূলক ও প্রতিজ্ঞাবাচক বাক্যের শর্ত ভাগ ও প্রতিজ্ঞা ভাগ এবং জবাবের অংশ যথাযথই থাকা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রেও একটি অংশ স্বতন্ত্র বাক্য করে নেয়া হয়। কারণ এ পরিবর্তন মর্মের সাথে সংযোগ রেখেই করা হয়। অবশ্য তাতে এরূপ কোন চিহ্ন থাকা চাই, যা কোন না কোনভাবে সে পরিবর্তনের ইংগিত দান করে। যেমন:

১। আয়াত: وَالنَّازِعَاتِ غَرْقاً وَالنَّاشِطَاتِ نَشْطًا وَالسَّابِحَاتِ سَبْحاً فَالسَّابِقَاتِ سَبْعًا فَالْمُدَبِّرَاتِ أَمْراً يَوْمَ تَرْجُفُ الرَّاجِفَةُ 'কঠোরভাবে গ্রেফতারকারী সেই ফিরিশতাদের শপথ! যারা প্রাণকে বাঁধন মুক্ত করে ও তা নিয়ে বায়ু পথে সবার আগে দ্রুত চলে এবং বিভিন্ন কাজের তত্ত্বাবধান করে। যেদিন কাঁপন-সৃষ্টিকারী কাঁপিয়ে তুলবে।' (সূরা নাযিআত-১-৬)
এ আয়াতে আগা-গোড়া শপথ নেয়া হয়েছে। অথচ শপথোত্তর বক্তব্যের উল্লেখ নেই। তা হচ্ছে 'হাশর-নশর' সত্য। কিন্তু তার বদলে বলা হল, 'ইয়াওমা তারজুফুর রাজিফাহ্' এবং এ বাক্যটিই মূল বক্তব্য ব্যক্ত করেছে।

২। আয়াত: وَالسَّمَاءِ ذَاتِ الْبُرُوجِ وَالْيَوْمِ الْمَوْعُودِ وَشَاهِدٍ وَمَشْهُودٍ قُتِلَ أَصْحَابُ الْأُخْدُودِ 'কক্ষ পথবিশিষ্ট আকাশের শপথ! অংগীকৃত দিনের শপথ! দর্শক ও দৃষ্টদের শপথ! অগ্নিকুন্ডের মালিকরা নিহত হয়েছে।' (সূরা বুরুজ-১-৪)
এ আয়াতেরও শপথোত্তর বক্তব্য নেই। তা হচ্ছে, কর্মফল সত্য।

৩। আয়াত: إِذَا السَّمَاءُ انْشَقَّتْ وَأَذِنَتْ لِرَبِّهَا وَحُقَّتْ وَإِذَا الْأَرْضُ مُدَّتْ وَالْقَتْ مَا فِيهَا وَتَخَلَّتْ وَأَذِنَتْ لِرَبِّهَا وَحُقَّتْ يَا أَيُّهَا الإِنْسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ 'যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে তার প্রভুর আদেশে এবং এটাই তার হবার। যখন পৃথিবী সমতল ভূমি করা হবে ও তার ভেতরের সবকিছু বেরিয়ে আসবে তার প্রভুর আদেশে এবং এটাই তার হবার। হে মানব! নিশ্চয়ই তুমি কঠোর সাধনা করবে।' (সূরা ইনশিকাক-১-৬)
এ আয়াতের মর্ম হচ্ছে যে, কর্মফল দান ও হিসাব নিকাশ গ্রহণ সত্য। এখানেও শুধু শর্ত বলে যাওয়া হয়েছে। তার উত্তরে কিছু বলা হয়নি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px