📄 ফিয়াহারা ফিয়া বদল
এ রীতিটা খুবই ব্যাপক। এর উদ্দেশ্য অনেক ও বিভিন্ন। কিন্তু সে সব এ বইয়ের আলোচনা নয়। কুরআনে এর ব্যবহারের উদাহরণ হচ্ছে এইঃ
১। আয়াত: أَهَذَا الَّذِي يَذْكُرُ الهَتَكُمْ .. الخ "এ ব্যক্তিই কি তোমাদের প্রভুদের স্মরণ করত?" (সূরা আম্বিয়া-৩৬)
এখানে يُذْكُرُ 'ক্রিয়াটি আদপে ছিল يَسُبُّ কিন্তু 'গালি দেয়া ক্রিয়াটি মার্জিত নয় বলে স্মরণ করা' ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে。
এ ধরনের বর্ণনারীতি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অহরহ ঘটে। যেমন, কারুর শরীর খারাপ হলে বলে, 'অমুকের শরীর ভাল নয়।' আবার বলে 'হযরতের আগমনে আমরা ধন্য' ও 'জনাবে ওয়ালা সব খবর রাখেন'- এ থেকে অর্থ নেয়া হয়, 'আপনি এসেছেন' ও 'আপনি তো সব জানেন।' কুরআনেও এ ধরনের বর্ণনারীতি অনুসৃত হয়েছে। যেমন:
২। আয়াত: وَلَاهُمُ مِنَّا يُصْحَبُونَ ... الخ 'আমার থেকে সাহায্য প্রাপ্ত হবে না।" (সূরা আম্বিয়া-৪৩)
এখানে "لا يصحبون" ব্যবহৃত হয়েছে। "لا ينصرون" - এর জায়গায়। যেহেতু সাহায্যের জন্যে সাহচর্য অপরিহার্য। তাই 'সাহচর্য' দিয়ে 'সাহায্য' শব্দ বদলে দেয়া হয়েছে।
৩। আয়াত: ثقلت في السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ .. الخ "আসমান- যমীনে যা কিছু নিহিত আছে।" (সূরা আ'রাফ-১৮৭)
এখানে- خفیت শব্দের বদলে ثقلت ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ যে বস্তু জ্ঞান অপরিজ্ঞাত আসমান-যমীনের বাসিন্দার কাছে তা দুর্বহ বোধ হয়। তাই এ পরিবর্তন ঘটল। এটা এমনি পরিবর্তন যার ভিতরে মূল শব্দের ইংগিত বিদ্যমান।
৪। আয়াত: فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْ مِنْهُ نَفْسًا 'তোমাদের প্রবৃত্তির যদি কোন বস্তু অনুকূল হয়ে থাকে।' (সূরা নিসা-৪)
আসলে ছিল: عفون لكم عن شَيْءٍ مِنْ طَيِّبَةِ انْفُسِهِنَّ
কখনও বিশেষ্যকে বিশেষ্য দিয়ে বদলানো হয়। যেমন:
১। আয়াত: فظلت اعناقهم لَهَا خَاضِعِينَ .. الخ 'ভয়ে তার সামনে তাদের মাথা নূয়ে যাবে।" (সূরা শুয়া'রা-৪)
এখানে خاضعين ব্যবহৃত হয়েছে خاضعة এর স্থলে।
২। আয়াত: وَكَانَتْ مِنَ الْقَانِتِينَ “এবং তারা ছিল ঈমান-আক্বীদায় পোক্ত।” (সূরা তাহরীম-১২)
মূলত এখানে স্ত্রীলিঙ্গ কর্তা ক্বানিতাত বিধায় হত।
৩। আয়াত: وَمَا لَهُمْ مِنْ نَاصِرِينَ ‘অনন্তর তাদের সহায়ক কেউ নেই।” (সূরা আল ইমরান-২২)
এ আয়াতে এক বচন নাসের হত।
৪। আয়াত: فَمَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ عَنْهُ حَاجِزِينَ ‘অতঃপর তোমাদের সে পথে কেউ অন্তরায় নয়।’ (সূরা হাক্কা-৪৭)
এ আয়াতেও একবচন “হাজিজ” হত।
৫। আয়াত: وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ ‘আসরের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত।” (সূরা আছর-১/২)
এ আয়াতে গোটা আদম জাতির জন্যে একবচন ইনসান ব্যবহৃত হয়েছে। আর তা জাতিবাচক বলেই হয়েছে।
৬। আয়াত: يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلَى رَبِّكَ كَدْحًا “হে মানুষ! তুমি তোমার প্রভুর দিকে প্রাণপণে এগোবার চেষ্টা করবে।” (সূরা ইনশিকাক-৬)
এ আয়াতেও একই কারণে সমগ্র বনী আদমের স্থলে ‘ইনসান’ একবচনের ব্যবহার করা হয়েছে。
৭। আয়াত: حَمَلَهَا الْإِنْسَانُ ... الخ ‘এবং মানুষ তা ধারণ করল।’ (সূরা আহযাব-৭২)
এ আয়াতেও সেই কারণে বনী আদমের সবাইকে ‘ইনসান দ্বারা বুঝানো হয়েছে।
৮। আয়াত : كَذَّبَتْ قَوْمٌ نُوحٍ نِ الْمُرْسَلِينَ 'নূহের সম্প্রদায় নবীদের মিথ্যা ঘোষণা করল।' (সূরা শুয়ারা-১০৫)
এখানে "الْمُرْسَلِينَ" ব্যবহৃত হয়েছে। "نُوحًاً" এর স্থলে। কারণ সমগ্র নবীদের উল্লেখ থাকলেও উদ্দেশ্যনং শুধু হযরত নূহ (আঃ)।
৯। আয়াত: إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ নিশ্চয় আমিই তোমাকে বিজয় দান করেছি। (সূরা ফাতাহ-১)
এখানে ফাতাহতু এক বচন উচিত ছিল। অথচ বহুবচন ব্যাবহারিত হয়েছে।
১০। আয়াতঃ إِنَّا لَقَادِرُونَ 'নিশ্চয়ই আমি ক্ষমতাবান। (সূরা মায়ারিজ-৪০)
এখানে "إِنِّي لَقَادِرٌ"-একবচনের স্থলে বহুবচন ব্যাবহারিত হয়েছে।
১১। আয়াত: وَلَكِنَّ اللَّهَ يُسَلِّطُ رُسُلَهُ এবং আল্লাহ্ তাঁর রসূলদের জয়ী করেন।' (সূরা হাশর-৬)
এখানেও বহুবচণে 'রসূলগণ' ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ মর্ম নেয়া হয়েছে শুধু হযরত মুহাম্মদ (সঃ)।
১২। আয়াত: الَّذِينَ قَالَ لَهُم النَّاس - 'যাদের উদ্দেশ্যে সবাই বলল।' (সূরা আল ইমরান-১৭৩)
এখানে "الناس" শব্দটি 'উরুয়াহ সাকাফী'র বদলে ব্যবহৃত হয়েছে।
১৩। আয়াত: فَإِذَا قَهَا اللَّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ 'তাই আল্লাহ্ তাকে ক্ষুধার পোশাকের মজা দেখালেন।' (সূরা নাহল-১১২)
এ আয়াতেও "لباس" আসলে "طعام" শব্দের বদলে এসেছে। এর কারণ হচ্ছে, দুটোর ভেতরে বিশেষ ধরনের ঐক্য রয়েছে। অর্থাৎ ক্ষুধাও দেহকে দুর্বল করে সারা দেহে পোশাকের মত জড়িয়ে থাকে।
১৪। আয়াত: صِبْغَةَ اللَّهِ 'আল্লাহ্র রঙ'। (সূরা বাকারা-১৩৮)
এখানে 'দীন'-এর স্থলে 'সিবগাহ্' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর একটি কারণ রয়েছে তা এই, কাপড়ে যেরূপ রং লাগে, তেমনি অন্তরে ধর্মের রং লাগে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, ঈসায়ীদের বিশেষ পরিভাষার সাথে সংযোগ স্থাপন।
১৫। আয়াত: وَطُورِ سِينِينَ এখানে سينا একবচনের স্থলে সীনীন বহুবচন ব্যাবহার হয়েছে।
১৬। আয়াত: سَلَامٌ عَلَى إِلْيَا سِينَ এই আয়াতে ইলিয়াস-এর স্থলে 'ইলয়াসীন' ব্যবহৃত হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে 'মুবাদ্দাল ও মুবাদ্দাল মিনহু"-এর ভেতরে সামঞ্জস্য বিধান। দ্বিতীয়ত, এর ফলে বর্ণনায় গতির সৃষ্টি হয়েছে।
📄 অবায় দ্বারা অবায় বদল
যেমন:
১। আয়াত: فَلَمَّا تَجَلَّى رَبُّهُ لِلْجَبَلِ - 'তারপর যখন তার প্রভূ পাহাড়টি আলোকোজ্জ্বল করলেন।" (সূরা আ'রাফ-১৪৩)
এ আয়াত "جبل" এর সংগে (ل) যেদায়ক অব্যয় এসেছে। আর তা على অব্যয়ের পরিবর্তে এসেছে। অর্থাৎ যেভাবে প্রথম গাছের ওপরে জ্যোতির বিকাশ ঘটেছিল।
২। আয়াত: هم لها سَابِقُونَ 'তারা সেদিকে এগিয়ে গেল।' (সূরা মুমিনূন-৬১)
এ আয়াত এসেছে اليها এর বদলে।
৩। আয়াত : لا يَخَافُ لَدَى الْمُرْسَلُونَ الأَمَنَ ظَلَمَ 'আমার কাছে রসূলদের কোন ভয় নেই-একমাত্র আত্মপীড়ক ছাড়া।' (সূরা নমল ১০/১১)
এ আয়াতে اِلَّا এসেছে। لَكِنَّ -এর পরিবর্তে।
৪। আয়াত : لَا صَلِّبَنَّكُمْ فِي جُزُوعِ النَّخْلِ 'আমি অবশ্যই তোমাদের খেজুর শাখায় ফাঁসি দেব।' (সূরা ত্ব'হা-৭১)
আয়াতে عَلَى এর স্থলে فِي ব্যবহৃত হয়েছে।
৫। আয়াত : أَمْ لَهُمْ سُلَّمْ يَسْتَمِعُونَ فِيهِ - 'তাদের কাছে কি সিঁড়ি আছে যাতে চড়ে তারা শুনতে পায়?' (সূরা তুর-৩৮)
এ আয়াতে "عليه" এর স্থলে "فيه" ব্যবহৃত হয়েছে।
৬। আয়াত : السَّمَاء مُنْفَطِرٌ بِهِ- 'আকাশ তার ফলে বিদীর্ণ হবে।' (সূরা মুজ্জামিল -১৮)
এ আয়াতে فِيهِ এর স্থলে بِه ব্যবহৃত হয়েছে।
৭। আয়াত : مُسْتَكْبِرِينَ بِهِ .... الخ 'তা নিয়ে অহংকার করে।' (সূরা মুমিনুন-৬৭)
এ আয়াতে عَنْهُ এর স্থলে بِه ব্যবহৃত হয়েছে।
৮। আয়াত : أَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالاثْمِ - 'মর্যাদাবোধই তাদের পাপে লিপ্ত করল।' (সূরা বাকারা ২০৬)
এখানে حَمَلَتْهُ স্থলে أَخَذَتْهُ এবং عَلَى এর স্থলে بِ ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থ হবে, মর্যাদা ও ক্ষমতা তাকে পাপের দিকে উদ্বুদ্ধ করেছে।
৯। আয়াত : فَاسْئَلُ بِهِ خَبِيراً . এ ব্যাপারে কোন পরিজ্ঞাত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা কর।' (সূরা ফুরকান-৫৯)
এখানেও عَنْهُ এর স্থলে بِه এসেছে।
১০। আয়াত : وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَهُمْ إِلَى أَمْوَالِكُمْ 'নিজের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদ খেয়ে বসবে না।' (সূরা নিসা-২)
এখানে ও مَعَ এর স্থলে إِلَى এসেছে। مَعَ الْمَرَافِقِ : إِلَى الْمَرَا فِي : অর্থ দাঁড়াবে, কনুইসহ।
১২। আয়াত: يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ (সূরা দাহার-৬) আল্লাহ্র বান্দা তা থেকে পানি পান করে।'
মূলত হতঃ يَشْرَبُ مِنْهَا عِبَادُ اللَّهِ 'আল্লাহ্ বান্দা তা থেকে পানি পান করে।'
১৩। আয়াত: مَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ إِذْ قَالُوا مَا انْزَلَ اللَّهُ عَلَى بَشَرٍ مِنْ شَيْءٍ - 'যখন তারা বলে, আল্লাহ্ মানুষের কাছে কিছুই অবতীর্ণ করেন নি; তখন (সূরা আনাম-৯১) তারা আল্লাহ্ যথাযোগ্য মর্যাদা দেয় না।'
এ আয়াতে أَنْ এসেছে أَن অব্যয়ের বদলে।
📄 বাক্যের বদলে বাক্য ব্যবহার
কখনও পূর্ণ একটা বাক্য অনুল্লেখ রেখে তার বদলে আরেকটি বাক্য ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় বাক্য যদি পয়লা বাক্যের মর্ম ব্যক্ত করে ও তার অস্তিত্বের আভাস দেয়, তা হলেই এরূপ করা হয়। এতে মর্ম তো যথাযথ থাকে, কিন্তু বাক্যের কাঠামো সংক্ষেপ করে। যেমন:
১। আয়াত: وَإِنْ تُخَالِطُوهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ (সূরা বাকারা-২২০) 'তোমরা যদি তাদের সাথে মিশ, তাহলে তারা তোমাদের ভাই হয়ে যাবে।
আদতে বাক্যটি ছিল এই: نْ تُخَالِطُوهُمْ لَبَأْسَ بِذَلِكَ لِأَنَّهُمْ إِخْوَانُكُمْ وَشَانُ الْآخِ أَنْ يُخَالِطُ أَخَاهُ .
২। আয়াত: لَمَثُوبَةٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ خَيْر ... الخ "আল্লাহ্ থেকে প্রাপ্ত পুরস্কার অবশ্যই এর চেয়ে উত্তম।" (সূরা বাকার-১০৩)
বাক্যটি এরূপ হত:- لَوَجَدُوا ثَوَابًا وَمَثُوبَةً عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٍ
৩। আয়াত: إِنْ يَسْرِقُ فَقَدْ سَرَقَ أَنَّ لَهُ مِنْ قَبْلُ : 'যদি সে চুরি করে থাকে, তাহলে এর আগে তার ভাইও চুরি করেছে।' (সূরা ইউসুফ-৭৭)
বাক্যটি এরূপ ছিল: إِنْ سَرَقَ فَلَا عَجَبَ ، لِأَنَّهُ قَدْ سَرَقَ أَنَّ لَهُ مِنْ قَبْلُ ، لأَنَّهُ قَدْ 'সে যদি চুরি করে থাকে, অবাক হবার কিছু নেই। কারণ তার ভাইও চোর।'
৪। আয়াত: مَنْ كَانَ عَدُ وَالجِبْرِ يُلَ فَإِنَّهُ نَزَّ لَهُ عَلَي قَلْبِكَ بِإِذْنِ اللَّهِ 'যদি কেউ জিবরাঈলকে দুশমন ভাবে, তার মনে রাখা উচিত, আল্লাহ্ই তাকে তোমার অন্তরে অবতীর্ণ করেছেন।' (সূরা বাকারা -৯৭)
বাক্যটির মূল রূপ : مَنْ كَانَ عَدُ وَالجِبْرِيلَ فَإِنَّ اللَّهَ عَدُوٌّ لَهُ، فَإِنَّهُ نَزَّلَهُ عَلَى قَلْبِكَ بِإِذْنِهِ فَعَدُوهُ يَسْتَحِقُّ أَنْ يُعَادِ بِهِ اللَّهُ تَعَالَى - 'যে ব্যক্তি জিব্রাঈলের শত্রু, সে আল্লাহর শত্রু। কারণ তিনিই তাকে তোমার কাছে পাঠিয়েছেন। সুতরাং তার সাথে যে শত্রুতা করে সে আল্লাহ্ শত্রুতাই কামনা করে।'
📄 অনির্দিষ্ট শব্দকে নির্দিষ্ট শব্দ দ্বারা পরিবর্তন
কখনও বাগধারা চায় যে, অনির্দিষ্ট শব্দকে নির্দিষ্ট করে ব্যবহার করা হোক। সেক্ষেত্রে নির্দিষ্টতার চিহ্ন ও রীতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মর্ম অনির্দিষ্টই থাকে যেমন:
وَقِيلِهِ يَارَبِّ এখানে قِيلَ له قيله আসলে ১। এ পরিবর্তনে বাক্যের সংকোচন ঘটেছে।
حَقُّ الْيَقِينُ আসলে حق. يقين "ল" যোগ করা হয়েছে, শুধু উচ্চারণের সুবিধার জন্যে।