📄 “আযুনার পর ‘যার’ উহা রাখার রীতি ব্যাপক
আরবরা সাধারণত ان ধাতুর আগে 'যের দায়ক' অব্যয়কে উহ্য করে لان এর অর্থে ব্যবহার করত। কুরআন শরীফেও কোন কোন স্থানে এ রীতিটি অনুসরণ করা হয়েছে।
📄 ‘লাও’ শর্তিয়ার জাবব উহা রাখার রীতি ও ব্যাপক
কুরআনে কখনো কখনো শর্তমূলক বাক্যের শর্তোত্তর ভাগ উহ্য থাকে যেমন:
(১) وَلَوْ تَرَى إِذِ الظَّالِمُونَ فِي غَمَرَاتِ الْمُوتِ .. الخ "এবং তুমি যদি দেখতে যখন জালিমরা মরণের কোলে ঢলে পড়বে... ইত্যদি।"
(২) وَلَوْ يَرَى الَّذِينَ ظَلَمُوا إِذْيَرُونَ الْعَذَابَ .. الخ "যদি জালিমরা জুলুমের শাস্তি দেখতে পেত!.... ইত্যাদি।"
এ ধরনের আয়াতে শর্তোত্তর অংশ উহ্য থাকে। কিন্তু এ বাগধারাটি মূল অর্থে প্রকাশ না পেয়ে "বিস্ময়' প্রকাশার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং এখানেও উহ্য অংশ তালাশের প্রয়োজন থাকে না।
📄 এবদাল
এবদাল অর্থ হচ্ছে এক শব্দের স্থলে অন্য শব্দ বসানো। কুরআনে এর ব্যবহার প্রচুর। অবশ্য তার ধরন বিভিন্ন। কখনও ক্রিয়া দিয়ে ক্রিয়া, বিশেষ্য দিয়ে বিশেষ্য, অব্যয় দিয়ে অব্যয়, পূর্ণ বাক্য দিয়ে পূর্ণ বাক্য বদল করা হয়। তাছাড়া নির্দিষ্টকে অনির্দিষ্ট, পুলিংগকে স্ত্রীলিংগ, এক বচনকে বহুবচন দিয়েও পরিবর্তন করা হয়। নীচে বিস্তারিত আলোচনা দেয়া হল।
📄 ফিয়াহারা ফিয়া বদল
এ রীতিটা খুবই ব্যাপক। এর উদ্দেশ্য অনেক ও বিভিন্ন। কিন্তু সে সব এ বইয়ের আলোচনা নয়। কুরআনে এর ব্যবহারের উদাহরণ হচ্ছে এইঃ
১। আয়াত: أَهَذَا الَّذِي يَذْكُرُ الهَتَكُمْ .. الخ "এ ব্যক্তিই কি তোমাদের প্রভুদের স্মরণ করত?" (সূরা আম্বিয়া-৩৬)
এখানে يُذْكُرُ 'ক্রিয়াটি আদপে ছিল يَسُبُّ কিন্তু 'গালি দেয়া ক্রিয়াটি মার্জিত নয় বলে স্মরণ করা' ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে。
এ ধরনের বর্ণনারীতি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অহরহ ঘটে। যেমন, কারুর শরীর খারাপ হলে বলে, 'অমুকের শরীর ভাল নয়।' আবার বলে 'হযরতের আগমনে আমরা ধন্য' ও 'জনাবে ওয়ালা সব খবর রাখেন'- এ থেকে অর্থ নেয়া হয়, 'আপনি এসেছেন' ও 'আপনি তো সব জানেন।' কুরআনেও এ ধরনের বর্ণনারীতি অনুসৃত হয়েছে। যেমন:
২। আয়াত: وَلَاهُمُ مِنَّا يُصْحَبُونَ ... الخ 'আমার থেকে সাহায্য প্রাপ্ত হবে না।" (সূরা আম্বিয়া-৪৩)
এখানে "لا يصحبون" ব্যবহৃত হয়েছে। "لا ينصرون" - এর জায়গায়। যেহেতু সাহায্যের জন্যে সাহচর্য অপরিহার্য। তাই 'সাহচর্য' দিয়ে 'সাহায্য' শব্দ বদলে দেয়া হয়েছে।
৩। আয়াত: ثقلت في السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ .. الخ "আসমান- যমীনে যা কিছু নিহিত আছে।" (সূরা আ'রাফ-১৮৭)
এখানে- خفیت শব্দের বদলে ثقلت ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ যে বস্তু জ্ঞান অপরিজ্ঞাত আসমান-যমীনের বাসিন্দার কাছে তা দুর্বহ বোধ হয়। তাই এ পরিবর্তন ঘটল। এটা এমনি পরিবর্তন যার ভিতরে মূল শব্দের ইংগিত বিদ্যমান।
৪। আয়াত: فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْ مِنْهُ نَفْسًا 'তোমাদের প্রবৃত্তির যদি কোন বস্তু অনুকূল হয়ে থাকে।' (সূরা নিসা-৪)
আসলে ছিল: عفون لكم عن شَيْءٍ مِنْ طَيِّبَةِ انْفُسِهِنَّ
কখনও বিশেষ্যকে বিশেষ্য দিয়ে বদলানো হয়। যেমন:
১। আয়াত: فظلت اعناقهم لَهَا خَاضِعِينَ .. الخ 'ভয়ে তার সামনে তাদের মাথা নূয়ে যাবে।" (সূরা শুয়া'রা-৪)
এখানে خاضعين ব্যবহৃত হয়েছে خاضعة এর স্থলে।
২। আয়াত: وَكَانَتْ مِنَ الْقَانِتِينَ “এবং তারা ছিল ঈমান-আক্বীদায় পোক্ত।” (সূরা তাহরীম-১২)
মূলত এখানে স্ত্রীলিঙ্গ কর্তা ক্বানিতাত বিধায় হত।
৩। আয়াত: وَمَا لَهُمْ مِنْ نَاصِرِينَ ‘অনন্তর তাদের সহায়ক কেউ নেই।” (সূরা আল ইমরান-২২)
এ আয়াতে এক বচন নাসের হত।
৪। আয়াত: فَمَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ عَنْهُ حَاجِزِينَ ‘অতঃপর তোমাদের সে পথে কেউ অন্তরায় নয়।’ (সূরা হাক্কা-৪৭)
এ আয়াতেও একবচন “হাজিজ” হত।
৫। আয়াত: وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ ‘আসরের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত।” (সূরা আছর-১/২)
এ আয়াতে গোটা আদম জাতির জন্যে একবচন ইনসান ব্যবহৃত হয়েছে। আর তা জাতিবাচক বলেই হয়েছে।
৬। আয়াত: يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلَى رَبِّكَ كَدْحًا “হে মানুষ! তুমি তোমার প্রভুর দিকে প্রাণপণে এগোবার চেষ্টা করবে।” (সূরা ইনশিকাক-৬)
এ আয়াতেও একই কারণে সমগ্র বনী আদমের স্থলে ‘ইনসান’ একবচনের ব্যবহার করা হয়েছে。
৭। আয়াত: حَمَلَهَا الْإِنْسَانُ ... الخ ‘এবং মানুষ তা ধারণ করল।’ (সূরা আহযাব-৭২)
এ আয়াতেও সেই কারণে বনী আদমের সবাইকে ‘ইনসান দ্বারা বুঝানো হয়েছে।
৮। আয়াত : كَذَّبَتْ قَوْمٌ نُوحٍ نِ الْمُرْسَلِينَ 'নূহের সম্প্রদায় নবীদের মিথ্যা ঘোষণা করল।' (সূরা শুয়ারা-১০৫)
এখানে "الْمُرْسَلِينَ" ব্যবহৃত হয়েছে। "نُوحًاً" এর স্থলে। কারণ সমগ্র নবীদের উল্লেখ থাকলেও উদ্দেশ্যনং শুধু হযরত নূহ (আঃ)।
৯। আয়াত: إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ নিশ্চয় আমিই তোমাকে বিজয় দান করেছি। (সূরা ফাতাহ-১)
এখানে ফাতাহতু এক বচন উচিত ছিল। অথচ বহুবচন ব্যাবহারিত হয়েছে।
১০। আয়াতঃ إِنَّا لَقَادِرُونَ 'নিশ্চয়ই আমি ক্ষমতাবান। (সূরা মায়ারিজ-৪০)
এখানে "إِنِّي لَقَادِرٌ"-একবচনের স্থলে বহুবচন ব্যাবহারিত হয়েছে।
১১। আয়াত: وَلَكِنَّ اللَّهَ يُسَلِّطُ رُسُلَهُ এবং আল্লাহ্ তাঁর রসূলদের জয়ী করেন।' (সূরা হাশর-৬)
এখানেও বহুবচণে 'রসূলগণ' ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ মর্ম নেয়া হয়েছে শুধু হযরত মুহাম্মদ (সঃ)।
১২। আয়াত: الَّذِينَ قَالَ لَهُم النَّاس - 'যাদের উদ্দেশ্যে সবাই বলল।' (সূরা আল ইমরান-১৭৩)
এখানে "الناس" শব্দটি 'উরুয়াহ সাকাফী'র বদলে ব্যবহৃত হয়েছে।
১৩। আয়াত: فَإِذَا قَهَا اللَّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ 'তাই আল্লাহ্ তাকে ক্ষুধার পোশাকের মজা দেখালেন।' (সূরা নাহল-১১২)
এ আয়াতেও "لباس" আসলে "طعام" শব্দের বদলে এসেছে। এর কারণ হচ্ছে, দুটোর ভেতরে বিশেষ ধরনের ঐক্য রয়েছে। অর্থাৎ ক্ষুধাও দেহকে দুর্বল করে সারা দেহে পোশাকের মত জড়িয়ে থাকে।
১৪। আয়াত: صِبْغَةَ اللَّهِ 'আল্লাহ্র রঙ'। (সূরা বাকারা-১৩৮)
এখানে 'দীন'-এর স্থলে 'সিবগাহ্' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর একটি কারণ রয়েছে তা এই, কাপড়ে যেরূপ রং লাগে, তেমনি অন্তরে ধর্মের রং লাগে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, ঈসায়ীদের বিশেষ পরিভাষার সাথে সংযোগ স্থাপন।
১৫। আয়াত: وَطُورِ سِينِينَ এখানে سينا একবচনের স্থলে সীনীন বহুবচন ব্যাবহার হয়েছে।
১৬। আয়াত: سَلَامٌ عَلَى إِلْيَا سِينَ এই আয়াতে ইলিয়াস-এর স্থলে 'ইলয়াসীন' ব্যবহৃত হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে 'মুবাদ্দাল ও মুবাদ্দাল মিনহু"-এর ভেতরে সামঞ্জস্য বিধান। দ্বিতীয়ত, এর ফলে বর্ণনায় গতির সৃষ্টি হয়েছে।