📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 সারকথা

📄 সারকথা


ওপরের সব আলোচনার সার, হল এই, আয়াত কখনো অস্পষ্ট মনে হয় এবং তার বাহ্যিক অর্থ যা প্রমাণ করতে চায়, তা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কখনো আবার আয়াতের মাঝে এরূপ অসংলগ্নতা দেখা যায় যাতে করে এক নবীশের পক্ষে তার অর্থ বুঝাই দায় হয়ে থাকে। কিংবা আয়াতের কোন বিশেষত্ব বা শর্ত তার মাথায় খেলে না। তাফসীরকার যখন সে সব স্থান আলোচনা করবে, সব জটিলতা দূর করবে। এটাকেই বলা হয় তাওজীহ্ (বিশ্লেষণ)। যেমন এ আয়াতটিঃ

يَا أُخْتَ هَارُونَ مَا كَانَ أَبُوكِ امْرَأَ سَوْءٍ وَمَا كَانَتْ أُمَّكِ بَغِيًّا .. الخ
“হে হারুণ-ভগ্নি, তোমার পিতা পাপী ছিলো না এবং তোমার মাতাও আল্লাহ্ দ্রোহী না.... ইত্যাদি।”

এখানে 'হে হারুন-ভগ্নি 'সম্বোধন দ্বারা ফিলিস্তিনবাসী, হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্মের পরে হযরত মরিয়ম (রাঃ)-কে ডেকেছে। এখানে স্বভাবতই প্রশ্ন তোলা হয়েছে, হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত মুসা (আঃ)-এর ভেতরে তো কয়েক হাজার বছরের ব্যবধান রয়েছে। সেক্ষেত্রে কি করে হারুন মরিয়মের ভাই হলেন?

এ বিভ্রান্তির কারণ হচ্ছে, হযরত মূসা (আঃ)-এর ভাই হারুনকেই মরিয়মের ভাই ভাবা। হযরত (সঃ) এ প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, এ আরেক হারুন যিনি মরিয়মের ভাই এবং হযরত হারুন (আঃ)-এর নামের বরকতের জন্যে তাঁর এ নাম রাখা হয়েছিল। বনী ইসরাঈলীদের রীতিই ছিল বুযুর্গদের নামে নাম রাখা।

এভাবে একটি আয়াত সম্পর্কে হযরত (সঃ) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। কিয়ামতের দিন মানুষ পা শুন্যে তুলে ভয় করে চলবে কি করে? তিনি জবাব দিলেন, যে পবিত্র সত্তা মানুষকে দুনিয়ায় পায়ে ভর করে চলার ক্ষমতা দিয়েছিলেন, তিনিই তাদের সেখানে মাথায় ভর করে চলার শক্তি দেবেন।

একবার আদি ব্যাখ্যাবিদ হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে দু'আয়াতের ভেতরে বাহ্যদৃষ্ট বিরোধ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হল যে, এক. আয়াতে বলা হয়েছে, "একে অপরকে কোন প্রশ্ন করবে না" এবং দ্বিতীয় আয়াতে রয়েছে, "পরস্পর বাদানুবাদ হবে'- এ দুয়ের সমন্বয় কি করে সম্ভব?

তিনি জবাবে বললেন- পয়লা আয়াতে বিচার দিনের এবং দ্বিতীয়টিতে জান্নাতের কথা বলা হয়েছে। বিচার দিনে কারুর কিছু বলার হুঁশ থাকবে না এবং জান্নাতে পৌঁছে তবে আলাপের অবসর মিলবে। তখনই বাদানুবাদ চালাবে।

হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে একদিন প্রশ্ন করা হল, সাফা-মারওয়ায় দৌড়াদৌড়ি যদি ওয়াজিব হয়, তা হলে কুরআনে কেন 'লা-জুনাহ' (ক্ষতি নেই) বলা হল। তিনি জবাব দিলেন- ওয়াজিব হওয়া সত্ত্বেও একদল লোক এড়িয়ে চলত। তাদের লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে- হজ্জই যখন করছ, তখন এ ওয়াজিবটি পালন করলে কোন ক্ষতি নেই।

হযরত উমর (রাঃ) একবার হযরত (সঃ)-কে প্রশ্ন করলেন, সদকার হুকুমের সাথে 'ইন খিফতুম (যদি তোমরা ভয় পাও) শর্ত টি কেন লাগল? হযরত (সঃ) জবাব দিলেন- দাতারা তো দানে কষ্ট পায় না; বরং আনন্দ পায়। সুতরাং এখানে আল্লাহ্ এ শর্তটি বিশেষ উদ্দেশ্যে লাগান নি, এমনিই বলে দিয়েছেন।

মোদ্দাকথা, তাওজীহ্ সম্পর্কিত উপমা- উদাহরণ খুঁজলে অসংখ্য মিলবে। এখানে আমার উদ্দেশ্য হল কেবল তাওজীহ্ সম্পর্কে সঠিক ধারণা জানানো।

এ প্রসংগে বুখারী, তিরমিযী ও হাকাম শানে নুযূল ও তাওজীহ্ সম্পর্কে যা কিছু লিখেছে, আমি পঞ্চম অধ্যায়ে সংক্ষেপে সেগুলো হযরত (সঃ) কিংবা সাহাবা পর্যন্ত সংযোগ রক্ষা করে বলে দেয়া ভাল মনে করি। এতে দুধরনের উপকার হবে। এক তো এতটুকু জানা সব তাফসীরকারের জন্যে অপরিহার্য। যেমন অপরিহার্য কুরআনের কঠিন স্থানগুলো ব্যাখ্যার জন্যে আমি যে সবের উল্লেখ করেছি, সেগুলো জানা। দ্বিতীয়, এর ফলে এটা পরিস্কার হবে যে, অধিকাংশ আয়াত বুঝার জন্যে শানে নুযূল দরকার হয় না। বস্তুত সে জন্যে কম ঘটনাই উল্লেখ করতে হয়।

এ কারণে তাফসীর শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য ও বিশুত্রতম গ্রন্থদ্বয়ের ভেতরে ঘটনার সমাবেশ কম রয়েছে। পক্ষান্তরে মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক, ওয়াকিদী ও কালবী এ ব্যপারে বড় বেশী উদার হয়েছেন। প্রত্যেক আয়াত প্রসংগে কোন না কোন কাহিনী বলে দিয়েছেন। তার অধিকাংশই মুহাদ্দিসদের কাছে অশুদ্ধ বিবেচিত হয়েছে। কিংবা তার সূত্র সন্দেহপূর্ণ। এ ধরনের সন্দেহপূর্ণ ও ভুল কাহিনী তাফসীর গ্রন্থের শর্ত করে নেয়া নির্ভেজাল ভ্রান্তি বটে। এ ধরনের ঘটনাগুলোকে কুরআন বুঝার ভিত্তি করে নেয়া আদতে নিজকে কুরআনের জ্ঞান থেকে বঞ্চিত রাখা বৈ আর কিছু নয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px