📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 মুহাদ্দিসদের ধারা

📄 মুহাদ্দিসদের ধারা


মুহাদ্দিসরা কুরআনের আয়াতের আলোচনা প্রসংগে এরূপ বহু কিছু ব্যাপার বর্ণনা করেন, যা শানে নুযুলের ভেতরে শামিল নয়। যেমন, কোন কোন সময়ে সাহাবারা পারস্পরিক বাদানুবাদ প্রমাণ হিসেবে কুরআনের আয়াত পেশ করতেন। কখনও তাঁরা উদাহরণ স্বরূপ কোন আয়াতের উল্লেখ করতেন। কিংবা নিজ দাবী প্রমাণের জন্যে রসূল (সঃ) এরূপ বিশেষ ক্ষেত্রে যে আয়াত পাঠ করেছিলেন, তা উল্লেখ করতেন। কখনও সে আয়াত সংশ্লিষ্ট কোন হাদীসের সাথে উল্লেখ করতেন। মুহাদ্দিসরা এ সবকিছুই সে আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে বর্ণনা করে থাকেন। আর তার পেছনে কখনও নাযিলের স্থান বলা হয়, কখনও অনিদিষ্টভাবে তাদের দিকে ইংগিত করা হয়, যাদের ব্যাপারে আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। আবার কখনও কুরআনের শব্দগুলোর বিশুদ্ধ উচ্চারণ বের করা হয়, কোন সময়ে সূরা ও আয়াতের ভেতরে সম্পর্ক স্থাপন করা হয়, আবার কখনও কুরআনের কোন হুকুমের ব্যাপারে রসুল (সঃ) কিভাবে কাজ নিতেন, তা বলে দেয়াই উদ্দেশ্য থাকত।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 তাফসীরকারদের দায়িত্ব

📄 তাফসীরকারদের দায়িত্ব


মুহাদ্দিসরা কোন আয়াত সম্পর্কে যা কিছু বর্ণনা করেন, তা একে তো শানে নুযূলের সাথে কোন সম্পর্ক রাখে না, তদুপরি তাফসীরকারদের জন্যে তা আলোচনা করা জরুরীও নয়। তাফসীরকারদের জন্যে শুধু দু'টি ব্যাপারে জ্ঞান থাকা দরকার একটি হল, আয়াত যে ঘটনার দিকে ইংগিত দেয়, তা জানা। কারণ তা না জেনে আয়াতের সঠিক অর্থ অনুধাবন সম্ভব নয়। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, যে ঘটনার জন্যে কোন সাধারন হুকুম বিশেষ রূপ নিয়েছে, সেটি জানা। অর্থাৎ যে ঘটনার কারণে আয়াতের বাহ্যিক অর্থ ঘুরে অন্য অর্থ প্রকাশ পায়, তা না জেনে আয়াতের সঠিক মর্ম নির্ণয় করা অসম্ভব। এ দু'ধরনের ঘটনা ছাড়া আর সব ব্যাপার জানা তাফসীরকারের জন্যে প্রয়োজনীয় নয়।

এ প্রসংঙ্গে অতীতের নবীদের কাহিনী ও ঘটনাবলী এসে যায়। কারণ অধিকাংশ কাহিনী অস্পষ্ট ও অনাবশ্যক। এ জন্যে তাঁদের কাহিনী হাদীসেও কম বর্ণিত হয়েছে। তাফসীরকারগন তাঁদের যে লম্বা-চওড়া কাহিনী বর্ণনা করেন, তা হাদীসের বদলে আহলে কিতাব আলেমদের থেকে পেয়ে থাকেন। এগুলো সম্পর্কে সহীহ্ বুখারীর এক রেওয়াতে আমাদের উপদেশ দেয়া হয়েছেঃ আমরা সেগুলো সত্য বা মিথ্যা কিছুই বলবনা। এতে পরিষ্কার বুঝায়, সেগুলোর উপরে আমাদের গুরুত্ব না দেয়াই উচিত।

এছাড়া সাহাবা ও তাবেঈনদের সময়কার মুর্শিক ও ইয়াহুদীদের ধর্মবিশ্বাস ও মুর্খতাজনিত রীতি-নীতি তুলে ধরার জন্যে অনেক ছোট-খাট ঘটনাও তাঁরা বলে গেছেন। সে সব ঘটনা বলতে গিয়েও তাঁরা 'নূযিলাত ফী কাযা' বাক্যাংশ ব্যবহার করেছেন। অথচ তা বলার উদ্দেশ্য ছিল, এ ধরনেরই এক ব্যাপারে এ আয়াত নাযিল হয়েছিল।

সাহাবা ও তাবেঈনরা মুর্শিক ও ইয়াহুদীদের বিশ্বাস ও রীতিনীতির যে সব ঘটনা উল্লেখ করতেন, তা শুধু কাহিনীর অবতারণার জন্যে নয়; বরং আয়াতটি কিরূপ ঘটনা উপলক্ষে নাযিল হয়েছিল, তার সঠিক চিত্র তুলে ধরার জন্যেই করতেন। এজন্যে তাদের বর্ণনায় স্ব-বিরোধ ও মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়। প্রত্যেকটি বক্তব্য আলাদা পথের ইঙ্গিত দেয়। মূলত সবগুলোর উদ্দেশ্য ছিল এক। বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি একই আয়াত বিভিন্ন ব্যাপারে না লাগাতে পারে, সে ফকীহ্ হতে পারে না। এখানেও তিনি উপরে বর্ণিত রহস্যের দিকেই ইংগীত করেছেন।

কুরআনে এ ধরণের এমন বহু স্থান রয়েছে, যা থেকে একই সময় বিভিন্ন অবস্থা প্রকাশ পায়। এক অবস্থা তো পূণ্য ও সৌভাগ্যের, আরেকটি পাপ ও দুর্ভাগ্যের। সৌভাগ্যবানের অবস্থার সাথে কিছু সৌভাগ্যমূলক গুণের সমাবেশ থাকে, আর হতভাগ্যের অবস্থার সাথে কিছু দুভাগ্যপূর্ণ দোষগুলো বর্ণিত হয়। কিন্তু এ উভয় অবস্থায়ই ব্যক্তি বিশেষের প্রতি ইঙ্গিত থাকে না। বরং এ ধরনের কার্য ও দোষগুণ সম্পর্কিত বিধান বর্ণনাই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। যেমনঃ
وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ إِحْسَانًا نَاحَمَلَتْهُ أُمُّهُ كُرْهَا- وَوَضَعَتْهُ كُرْهَا-
"মানুষকে বাপ মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহারের উপদেশ দিলাম, যারা কষ্ট করে তাদের জন্ম দিয়েছে আর লালন-পালন করেছে।" (সূরা আহকাফ-১৫)

এ আয়াতের পরে ভাল ও মন্দ দু'দলের অবস্থাই বর্ণনা করা হয়েছে। যেমনঃ
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ مَاذَا اَنْزَلَ رَبُّكُمْ قَالُوا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ
"যখন তাদের কাছে তোমাদের প্রভুর থেকে অবতীর্ণ বানী শোনানো হত তখন তারা বলত, সব তো সেকেলে আর পচা কাহিনী।" (সূরা নাহল-২৪)

وَقِيلَ لِلَّذِينَ اتَّقَوْا مَاذَا اَنْزَلَ رَبُّكُمْ قَالُوا خَيْراً -
"যারা আল্লাহভীরু তাদের কাছে যখন তোমাদের প্রভু থেকে অবতীর্ণ বাণী বলা হয়, তারা বলত, উত্তম বাণী।” (সূরা নাহাল-৩০)

এ আয়াতের পরেও পূণ্যবান ও পাপী দু'দলেরই অবস্থার উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্নের আয়াতগুলোকে এ ধরনের আয়াতের অন্তর্ভূক্ত করা চাই।
ضَرَبَ اللهُ مَثَلاً قَرْيَةً كَانَتْ أَمِنَةً مُطْمَئِنَّةً
"আল্লাহ্ পাক পল্লীল উদাহরণ দিলেন, যেটা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত।” (সূরা নাহাল ১১২)

(۱) هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا ... الخ
"সেই মহান প্রভুই তোমাদের একটি মাত্র সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে স্ত্রীও পয়দা করেছেন যেন তা নিয়ে তৃপ্ত থাকতে পারে... ইত্যাদি।

(۲) قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ
"অবশ্যই ঈমানদাররা সফলকাম হয়েছে-তারাই সশঙ্ক চিত্তে নামাযে নিরত হয়।" (সূরা মুমিন ১/২).

(۲) وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَّهِينٍ ... الخ
"কথায় কথায় শপথকারী লাঞ্ছনাদাতাদের আদৌ অনুসরণ করো না...ইত্যাদি।" (সূরা কলম-১০)

এ সব অবস্থায় এটা প্রয়োজন নয় যে, আয়াতে যে সব বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করা হয়েছে, তা যথাযথভাবে ব্যক্তি বিশেষের ভেতরে মিলবে। যেমন নিম্নের আয়াতে রয়েছেঃ
كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِائَةً حَبَّةٍ
"দানের উপমা হচ্ছে যেন একটি দানা থেকে সাতটি ছড়া ও প্রতি ছড়া থেকে শত দানা বের হল।" (সূরা বাকারা ২৬০)

এ আয়াতে উদাহরণের জন্যে এমন একটা বীজের কথা বলা হয়েছে, যা থেকে সাতটি ছড়া এবং প্রতি ছড়া থেকে শত দানা বের হয়। কিন্তু তার অর্থ এ নয়, এরূপ দানাই মিলবে। এখানে শুধু বিনিময় ও সওয়াবের আধিক্যের চিত্র তুলে ধরাই উদ্দশ্য। এ ধরনের স্থানে সব বৈশিষ্ট্য কিংবা তার অধিকাংশ বর্তমান থাকা নেহায়াৎই অপ্রয়োজনীয় শর্ত।

কুরআনে কোথাও আরও এক ধরনের বর্ণনারীতি লক্ষ্যনীয়। অর্থাৎ আহ্হ্বাম সম্পর্কে বর্ণনায় যদি এমন কোন স্থান এসে যায় যা সন্দেহের উদ্রেক করতে পারে, সেখানে তা দূরও করা হয়েছে। অথবা বর্ণিত বিধান সম্পর্কে যদি কোন স্বতঃস্ফূর্ত প্রশ্ন দেখা যায়, আলোচনা প্রসংগে তার জবাবও দেয়া হয়েছে। এ ধরনের বর্ণনার উদ্দেশ্য শুধু এটাই হয়ে থাকে যে, বলে আসা কথাটি সুপ্রমাণিত করা। এ নয় যে, এরূপ আয়াত শুনে সত্যিই কেউ প্রশ্ন তুলেছিল। কিংবা আদতেই কেউ কোন সন্দেহ প্রকাশ করেছিল।

কিন্তু সাহাবাদের অভ্যাস ছিল এই, যখনই তাঁরা এ ধরনের আয়াত নিয়ে বাদানুবাদ চালাতেন, আগে প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে নিতেন। তাঁরা প্রশ্নোত্তরের ধারায় আয়াতের মর্ম বলে যেতেন। বস্তুত এসব স্থানগুলো যদি তলিয়ে দেখা হয়, তাহলে জানা যায়, গোটা বাক্য একটি পূর্ণ বাক্য মাত্র। সেখানে নাযিলের ধারাবা- হিকতা রেখে কোন অংশকে আগ-পিছু করার ফাঁক নেই। একটি সুবিন্যস্ত বাক্য; এর স্থান বদল কিংবা বাক্যের গাঁথুনি ভেংগে নেয়া রীতি বিরূদ্ধ বটে।

সাহাবাদের এও রীতি ছিল যে, কুরআনের আয়াতের মর্ম বর্ণনা করতে গিয়ে তাঁরা আয়াতের আগ্‌-পিছু করতেও ছাড়তেন না। তার অর্থ এ নয় যে, নাযিলের সেটাই ধারাবাহিক রূপ বলে তাঁরা বিশ্বাস করতেন। এরূপ সাজানোর ক্ষেত্রে তাঁরা আয়াতের গুরুত্ব বিচার করতেন।

وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ.. الخ
“যারা সোনা-রূপা জমা করে...ইত্যাদি।” (সূরা তাওবা - ৩৪)

আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর (রাঃ) উপরোউক্ত আয়াত সম্পর্কে বলেছেন, যাকাতের আয়াতের আগে এটা নাযিল হয়েছিল। এ পর্যন্ত সোনা, রূপা জমা করা নিষিদ্ধ ছিল।
যাকাতের আয়াতে সম্পদের শুদ্ধিকরণ ব্যবস্থা হয়ে গেল। এর পর থেকে তা জমানো বৈধ হল।

অথচ সবাই জানে যে সূরা বারাআত সবচেয়ে পরে অবতীর্ণ হয়েছে। এ আয়াতটি তারই অন্তর্ভূক্ত। পক্ষান্তরে যাকাতের আয়াত তার অনেক আগে এসেছে। কিন্তু ইবনে উমর (রাঃ) এখানে যে আগ-পিছু দাবী করেছেন, তা সাধারণ হুকুমের উপরে বিশেষ হুকুমের ভিত্তিতে।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 সারকথা

📄 সারকথা


ওপরের সব আলোচনার সার, হল এই, আয়াত কখনো অস্পষ্ট মনে হয় এবং তার বাহ্যিক অর্থ যা প্রমাণ করতে চায়, তা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কখনো আবার আয়াতের মাঝে এরূপ অসংলগ্নতা দেখা যায় যাতে করে এক নবীশের পক্ষে তার অর্থ বুঝাই দায় হয়ে থাকে। কিংবা আয়াতের কোন বিশেষত্ব বা শর্ত তার মাথায় খেলে না। তাফসীরকার যখন সে সব স্থান আলোচনা করবে, সব জটিলতা দূর করবে। এটাকেই বলা হয় তাওজীহ্ (বিশ্লেষণ)। যেমন এ আয়াতটিঃ

يَا أُخْتَ هَارُونَ مَا كَانَ أَبُوكِ امْرَأَ سَوْءٍ وَمَا كَانَتْ أُمَّكِ بَغِيًّا .. الخ
“হে হারুণ-ভগ্নি, তোমার পিতা পাপী ছিলো না এবং তোমার মাতাও আল্লাহ্ দ্রোহী না.... ইত্যাদি।”

এখানে 'হে হারুন-ভগ্নি 'সম্বোধন দ্বারা ফিলিস্তিনবাসী, হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্মের পরে হযরত মরিয়ম (রাঃ)-কে ডেকেছে। এখানে স্বভাবতই প্রশ্ন তোলা হয়েছে, হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত মুসা (আঃ)-এর ভেতরে তো কয়েক হাজার বছরের ব্যবধান রয়েছে। সেক্ষেত্রে কি করে হারুন মরিয়মের ভাই হলেন?

এ বিভ্রান্তির কারণ হচ্ছে, হযরত মূসা (আঃ)-এর ভাই হারুনকেই মরিয়মের ভাই ভাবা। হযরত (সঃ) এ প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, এ আরেক হারুন যিনি মরিয়মের ভাই এবং হযরত হারুন (আঃ)-এর নামের বরকতের জন্যে তাঁর এ নাম রাখা হয়েছিল। বনী ইসরাঈলীদের রীতিই ছিল বুযুর্গদের নামে নাম রাখা।

এভাবে একটি আয়াত সম্পর্কে হযরত (সঃ) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। কিয়ামতের দিন মানুষ পা শুন্যে তুলে ভয় করে চলবে কি করে? তিনি জবাব দিলেন, যে পবিত্র সত্তা মানুষকে দুনিয়ায় পায়ে ভর করে চলার ক্ষমতা দিয়েছিলেন, তিনিই তাদের সেখানে মাথায় ভর করে চলার শক্তি দেবেন।

একবার আদি ব্যাখ্যাবিদ হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে দু'আয়াতের ভেতরে বাহ্যদৃষ্ট বিরোধ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হল যে, এক. আয়াতে বলা হয়েছে, "একে অপরকে কোন প্রশ্ন করবে না" এবং দ্বিতীয় আয়াতে রয়েছে, "পরস্পর বাদানুবাদ হবে'- এ দুয়ের সমন্বয় কি করে সম্ভব?

তিনি জবাবে বললেন- পয়লা আয়াতে বিচার দিনের এবং দ্বিতীয়টিতে জান্নাতের কথা বলা হয়েছে। বিচার দিনে কারুর কিছু বলার হুঁশ থাকবে না এবং জান্নাতে পৌঁছে তবে আলাপের অবসর মিলবে। তখনই বাদানুবাদ চালাবে।

হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে একদিন প্রশ্ন করা হল, সাফা-মারওয়ায় দৌড়াদৌড়ি যদি ওয়াজিব হয়, তা হলে কুরআনে কেন 'লা-জুনাহ' (ক্ষতি নেই) বলা হল। তিনি জবাব দিলেন- ওয়াজিব হওয়া সত্ত্বেও একদল লোক এড়িয়ে চলত। তাদের লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে- হজ্জই যখন করছ, তখন এ ওয়াজিবটি পালন করলে কোন ক্ষতি নেই।

হযরত উমর (রাঃ) একবার হযরত (সঃ)-কে প্রশ্ন করলেন, সদকার হুকুমের সাথে 'ইন খিফতুম (যদি তোমরা ভয় পাও) শর্ত টি কেন লাগল? হযরত (সঃ) জবাব দিলেন- দাতারা তো দানে কষ্ট পায় না; বরং আনন্দ পায়। সুতরাং এখানে আল্লাহ্ এ শর্তটি বিশেষ উদ্দেশ্যে লাগান নি, এমনিই বলে দিয়েছেন।

মোদ্দাকথা, তাওজীহ্ সম্পর্কিত উপমা- উদাহরণ খুঁজলে অসংখ্য মিলবে। এখানে আমার উদ্দেশ্য হল কেবল তাওজীহ্ সম্পর্কে সঠিক ধারণা জানানো।

এ প্রসংগে বুখারী, তিরমিযী ও হাকাম শানে নুযূল ও তাওজীহ্ সম্পর্কে যা কিছু লিখেছে, আমি পঞ্চম অধ্যায়ে সংক্ষেপে সেগুলো হযরত (সঃ) কিংবা সাহাবা পর্যন্ত সংযোগ রক্ষা করে বলে দেয়া ভাল মনে করি। এতে দুধরনের উপকার হবে। এক তো এতটুকু জানা সব তাফসীরকারের জন্যে অপরিহার্য। যেমন অপরিহার্য কুরআনের কঠিন স্থানগুলো ব্যাখ্যার জন্যে আমি যে সবের উল্লেখ করেছি, সেগুলো জানা। দ্বিতীয়, এর ফলে এটা পরিস্কার হবে যে, অধিকাংশ আয়াত বুঝার জন্যে শানে নুযূল দরকার হয় না। বস্তুত সে জন্যে কম ঘটনাই উল্লেখ করতে হয়।

এ কারণে তাফসীর শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য ও বিশুত্রতম গ্রন্থদ্বয়ের ভেতরে ঘটনার সমাবেশ কম রয়েছে। পক্ষান্তরে মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক, ওয়াকিদী ও কালবী এ ব্যপারে বড় বেশী উদার হয়েছেন। প্রত্যেক আয়াত প্রসংগে কোন না কোন কাহিনী বলে দিয়েছেন। তার অধিকাংশই মুহাদ্দিসদের কাছে অশুদ্ধ বিবেচিত হয়েছে। কিংবা তার সূত্র সন্দেহপূর্ণ। এ ধরনের সন্দেহপূর্ণ ও ভুল কাহিনী তাফসীর গ্রন্থের শর্ত করে নেয়া নির্ভেজাল ভ্রান্তি বটে। এ ধরনের ঘটনাগুলোকে কুরআন বুঝার ভিত্তি করে নেয়া আদতে নিজকে কুরআনের জ্ঞান থেকে বঞ্চিত রাখা বৈ আর কিছু নয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px