📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 ইবনুল আরাবীর ব্যাখ্যা

📄 ইবনুল আরাবীর ব্যাখ্যা


নীচে ইনূল আরবীর ব্যাখ্যার একটি অংশ সমালোচনাসহ তুলে দেয়া হল।
(১) ইবনে আরাবীর মতে সূরা বাকারার নিম্নের আয়াতটি মনসুখ হয়েছে।
(۱) كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِنْ تَرَكَ خَيْراً الْوَصِيَّة ... الخ "আল্লাহ তাআলা তোমাদের মৃত্যুপথ যাত্রীদের জন্যে ওসীয়াতের বিধান করবেন।” (সূরা বাকারা-১৮০)

একটি অভিমতের আলোকে মীরাসের আয়াত এসে এটা মনসুখ করেছে। আরেকটি মতে বলা হয়েছে, ওয়ারিসের জন্যে ওসীয়াত সম্পর্কিত হাদীসই একে মনসুখ করেছে। তৃতীয় অভিমত এই, ইজমা (সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত) অনুসারে হয়েছে। আমার মতে নিম্নের আয়াত উক্ত আয়াতটির নাসিখ (বিলোপকারী)"
يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ ... الخ "আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ভেতরে ওসীয়তের বিধান প্রবর্তন করলেন।"

আরেক কথা, ওসীয়াতের হাদীস সেটাকে বিলোপ না করে বরং সুস্পষ্ট করে দিয়েছে।

২। সূরা বাকারার আরেকটি আয়াত-
(۲) وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينِ .. الخ "যাদের রোযা রাখার ক্ষমতা আছে, তারাও রোযার বদলে মিসকীন খাওয়াতে পারে....।" (সূরা বাকারা ১৮৪)

একটি মত এই, নিম্নের আয়াত উপরোক্ত আয়াতটির নাসিখ:
فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرُ فَلْيَصُمُهُ "তোমাদের যার সামনেই রোযার মাস হাযির হবে, সেই রোযা রাখবে।" (সূরা বাকারা ১৮৫)

কিন্তু আরেকটি মতে আছে, এটি 'মুহকাম' আয়াত।

আমার মতে এর আরেকটি দিক রয়েছে। তা হচ্ছে এই, এ আয়াত অনুসারে যারা খানা খাওয়াবার ক্ষমতা রাখে, তাদের ওপরে 'ফিদিয়াহ্' দান ওয়াজিব। 'ফিদিয়াহ্' দ্বারা এখানে মিস্কীন খাওয়াবার অর্থ নেয়া হয়েছে। এখানে 'মারজার (নাম) আগে যমীর (সর্বনাম) এ জন্যে নেয়া হয়েছে যে, মর্তবার দিক থেকে অগ্রগণ্য বুঝাবে। আর যমীর পুংবাচক নেয়ার কারণ হল যে, 'ফিদিয়াহ্' শব্দ দ্বারা এখানে 'তাআম' অর্থ নেয়া হয়েছে। এবং 'তাআম' দ্বারা সদকায়ে ফিত্র বুঝানো হয়েছে। কারণ রোযার হুকুমের সংগে সংগেই সদকায়ে ফিতরের হুকুম দেয়া হল। যেরূপ এর পরক্ষণেই আরেক আয়াতে (ওয়ালিতুকাব্বেরুল্লাহা আলা'মা হাদাকুম) ঈদের নামাযের তাকবীরের উল্লেখ রয়েছে, এও ঠিক তেমনি ব্যাপার।

৩। সূরা বাকারার তৃতীয় আয়াত:
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ .. الخ "পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপরে যেভাবে রোযা ফরয করা হয়েছিল, তোমাদের ওপরেও সেভাবে রোযা ফরয করা হল।" (সূরা বাকারা ১৮৩)

এ আয়াত মানসুখ হল নিম্নের আয়াতের দ্বারা :
(২) أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ .. الخ “রমযানের রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী সংগম বৈধ করা হল ...... ” (সূরা বাকারা ১৮৭)

কারণ, এ আয়াতে তামছীল (উদাহরণ) রয়েছে। আর তা চাচ্ছে যে, পূর্বেকার ফরয বর্তমান শরীয়ত অনুসারেও ফরয হবার সংগে সংগে এর নিয়ম নীতিও সেরূপ হয়ে গেছে। সুতরাং যে সব কাজ রোযার রাতে পূর্ব-শরীয়াতে হারাম ছিল যথা, ঘুমিয়ে উঠে খাওয়া বা স্ত্রী সহবাস, তা এখনও হারাম ছিল। কিন্তু সে হুকুমের বিলোপকারী হল উপরোক্ত আয়াত。

এ হল ইবনুল আরাবীর উদ্ধৃতি। ইবনুল আরাবী আরেকটি মতও উল্লেখ করেছেন। তা এই, উক্ত আয়াতের মর্ম মূলের অনূসৃত কার্য সুন্নাত দ্বারা বাতিল প্রমাণিত হয়েছে।

অবশ্য, আমার মত তা নয়। কারণ আয়াতে রোযা ফরয হবার ব্যাপারে অতীতের শরীয়াতকে যে উদাহরণ পেশ করা হয়েছে, তার সম্পর্ক শুধু ফরয হবার ব্যাপারেই। তাই এর দ্বারা আরবে শরীয়াত নাযিল হবার আগে যে প্রচলন ছিল, সেটাই বদলে দেয়া উদ্দেশ্য ছিল। আমি বহু খুজেও এমন দলীল পেলাম না যাতে প্রমাণ হতে পারে যে, রাসূল (সঃ) আগে এরূপ কোন হুকুম দিয়েছিলেন। আর সেরূপ যদি কোন হুকুম তিনি দিয়েও থেকে থাকেন, সেটাকেও বেশী বললে সুন্নাত পর্যন্ত বলা যেতে পারে।

৪। সূরা বাকারার আরেকটি আয়াত:
يَسْتَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيهِ قُلْ قِتَالُ فِيهِ كَبِيرٌ .. الخ “তারা তোমাকে মর্যাদার মাসগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন করছে। বলে দাও, সে সব মাসে রক্তারক্তি মহাপাপ.... ইত্যাদি।” (সূরা বাকারা ২১৭)

নিম্নের আয়াতটি এসে এ আয়াতটিকে বিলোপ করেছে :
وَقَاتِلُو الْمُشْرِكِينَ كَافَّةً .. الخ “মুশরিকদের যখন যেখানে পাও, হত্যা কর ..... ইত্যাদি।” (সূরা তওবা ৩৬)

কিন্তু, আমার মতে আয়াতটি হত্যাকে হারাম করার বদলে জায়েযের প্রমাণ দেয়। এটার ভঙ্গিটি ঠিক তেমনি, যেমন কোন একটি কারণকে স্বীকার করে নিয়ে সেটাকে গ্রহণ করায় যে, অসুবিধা দেখা দিতে পারে, সেটা তৎসংগে বলে দেয়া। সুতরাং আয়াতটির অর্থ দাঁড়াবে এইঃ নিষিদ্ধ মাসগুলোয় হত্যা ও রক্তপাত অত্যন্ত বড় পাপের কাজ বটে। কিন্তু তার চাইতেও মারাত্মক পাপ হচ্ছে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করা। সুতরাং ফিতনা-ফাসাদ বন্ধ করার জন্যে প্রয়োজনে নিষিদ্ধ মাসেও হত্যা কার্য চলতে পারে। আয়াতের বর্ণনাভঙ্গি এরূপ মর্ম বুঝা যায়।

৫। সূরা বাকারার অপর একটি আয়াত:
وَالَّذِيْنَ يُتَوَفَّوْنَ مِنْكُمْ وَيَذَرُوْنَ أَزْوَاجًا وَصِيَّةً لِّأَزْوَاجِهِمْ مَّتَاعًا إِلَى الْحَوْلِ
"তোমাদের যারা মৃত্যুপথগামী, তারা স্ত্রীদের এক বছরের ভরণপোষণের জন্যে ওসীয়াত করে যাবে।" (সূরা বাকারা ২৪০)

এ আয়াতটি মনসুখ হয়েছে পরবর্তী চার মাস দশদিন ইদ্দত ধার্যকারী আয়াত দ্বারা এবং ওসীয়াতের হুকুম মনসুখ হয়েছে মীরাসের হুকুম দ্বারা। অবশ্য সুন্না (থাকার ব্যবস্থা) সম্পর্কিত হুকুম একদলের নিকট মনসুখ হয়নি। অপর দলের নিকটে 'লা-সুকনা হাদীস এসে মনসুখ করেছে। যেহেতু সব মুফাস্সির এ আয়াতের মনসুখ হবার ব্যাপারে একমত, তাই আমিও মনসূখ মনে করি। কিন্তু এও বলা যেতে পারে যে, আয়াতটি মূমূর্ষের জন্যে ওসীয়াত জায়েয ও মুস্তাহাব বলে প্রমাণ করছে। এবং নারীর জন্যে এ আয়াত অনুসরণের কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এ অভিমত হচ্ছে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর। আয়াতটিতেও এ ব্যাখ্যার সমর্থন সুস্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়।

৬। সূরা বাকারার অন্য এক আয়াত:
وَإِنْ تُبْدُوا مَا فِي أَنْفُسِكُمْ أَوْ تُخْفُوهُ يُحَاسِبُكُمْ بِهِ اللَّهُ
"এবং তোমাদের মনে যা আছে তা প্রকাশ কর আর গোপনই কর, আল্লাহ্র কাছে তারও হিসাব দিতে হবে।" (সূরা বাকারা ২৮৪)

নীচের আয়াতটিকে এ আয়াতের (মর্ম) বিলোপকারী বলা হয়েছে:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
"কাউকে তার ক্ষমতার বাইরে কোন কিছুর জন্য দায়ী করা হবে না।" (সূরা বাকারা ২৮৬)

কিন্তু আমার কাছে প্রথম আয়াতটি দ্বারা সাধারণ হুকুম দেবার পরে দ্বিতীয় আয়াতটি দ্বারা সেটার একটি বিশেষ দিক বুঝানো হয়েছে। কারণ প্রথম আয়াতে 'মাফী আনফুসিকুম দ্বারা অন্তরের সারল্য বা কুটিলতা বুঝায়। আর তা অন্তরের বিশেষ অবস্থা বৈ নয়। এ থেকে অন্তরে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে যে সব ভাব জেগে ওঠে, সেগুলো বুঝায় না। কারণ যে ব্যাপারে মানুষের কোন হাতই নেই, সে ব্যাপারে তাকে দায়ী করার কোন প্রশ্নই ওঠে না।

[দুই] সূরা আল-ইমরান
৭। সূরা আল-ইমরানের নিম্নের আয়াতটি :
اِتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ ... الخ “আল্লাহকে যতখানি ভয় করা উচিত ঠিক ততখানিই ভয় কর ইত্যাদি।”
নীচের আয়াতটি এসে মনসূখ করেছে বলে বলা হয়ঃ (সূরা আল ইমরান ১০২)
فَاتَّقُو اللَّهَ مَا سُتَطَعْتُمْ ... الخ “অতঃপর আল্লাহকে তোমার সাধ্যমত ভয় কর।” (সূরা তাগবুন-১৬)
আরেকটি মত এও বলেছে যে, আয়াতটি মনসূখ নয়, মুহকাম।

এটা অন্য কথা যে, গোটা সূরা আল ইমরানে যদি কোন আয়াতকে মনসূখ বলা যায়, তা এটাই। আমার ধারণা, পয়লা আয়াতে ‘হাক্কা তুকাতিহী’ দ্বারা শিরক্, কুফর এবং এ ধরনের ভ্রান্ত বিশ্বাসগুলো (থেকে, বিমুক্তি) বুঝানো হয়েছে। মর্ম এই, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এ সবের কোনই ঠাই নেই। আর দ্বিতীয় আয়াতে যে ‘মা-স্তাতা’তুম বলেছে, তার সম্পর্ক কাজের সাথে, বিশ্বাসের বেলায় নয়, কাজের বেলায়। যেমন, ওযু করার সামর্থ্য যে রাখে না, সে তায়াম্মুম করে নিবে। দাঁড়িয়ে যে নামায পড়তে অক্ষম, সে বসে পড়ুক। এ ধরনের ব্যাখ্যার সমর্থনে নীচের আয়াতটি দেখতে পাইঃ
وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ (কিছুতেই অমুসলিম হয়ে মরণ বরণ করো না।)

সুতরাং দু'টো আয়াতই যার যার জায়গায় বিশিষ্ট রূপ নিয়ে আছে। কেউ নাসিখও নয়, মনসূখও নয়।

[তিন] সূরা নিসা
৮. সূরা ‘নিসা’র নিম্নের আয়াতঃ
وَالَّذِينَ عَقَدَتْ أَيْمَانُكُمْ فَأْتُوهُمْ نَصِيبَهُمْ
"যারা তোমাদের দাসত্বের অধীনে আছে, তাদেরকে সম্পদে অংশীদার কর।" (সূরা নিসা ৩৩)

মনসুখ হয়েছে সূরা আনফালের নীচের আয়াত দ্বারাঃ
وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ
"সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে বংশধরই বিবেচ্য। তাদের একদল আরেক দলের উপরে স্থান পায়।" (সূরা আন ফাল ৭৫)

আমার মতে, আয়াতের বাহ্যিক অর্থ অনুসারে 'মীরাস' কেবল হাকিকী মাওয়ালীর জন্য-প্রতিশ্রুত। মাওয়ালী মীরাসের বদলে বখশিশ ও দানদক্ষিণার অধিকারী। সুতরাং এখানে বিলোপের প্রশ্নই আসে না।

৯। এ সূরার আরেকটি আয়াত:
وَإِذَا حَضَرَ الْقِسْمَةَ أُولُو الْقُرْبَى وَالْيَتَمَى وَالْمَسَاكِينَ .. الخ
"যখন বন্টনের ব্যাপার আসে.......ইত্যাদি।” (সূরা নিসা - ৮)

এ আয়াত সম্পর্কে একটি মত তো মনসূখের। অপরটি না মনসূখের। তাদের মতে মানুষ এ কাজে অবহেলা দেখাচ্ছে মাত্র। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ এ আয়াত মনসূখ তো নয়। তবে ওয়াজিবের স্থলে মুস্তাহাবের প্রমাণ দেয়। আমার কাছে ইবনে আব্বাস (রাঃ-এর মতটিই ঠিক মনে হয়।

১০. এ সূরারই অন্য আয়াতঃ
وَالآتِي يَاتِينَ الْفَاحِشَةَ ... الخ
"যে সব নারী ব্যভিচারে লিপ্ত হয়.... ইত্যাদি।" (সূরা নিসা-১৫)

বলা হয়, ওপরে এ আয়াতটি সূরা নূরের আয়াত দ্বারা বাতিল হয়েছে। কিন্তু আমার মতে এ আয়াতও বাতিল হয়নি। বরং তাতে বিশেষ একটা সীমা পর্যন্ত ঢিল দেয়া হয়েছে। যখনই সে সীমায় পৌছে গেল, তখনই রসূল (সঃ) মূল হুকুমটি ব্যাখ্যা করে দিলেন। সুতরাং একে তানসীখ (বাতিলকরণ) বলা যেতে পারে না।

[চার] সূরা মায়েদাঃ
১১. এ সূরার নিম্নের আয়াতঃ
وَلَا الشَّهْرَ الْحَرَامَ وَلَا الْهُدَى وَلَا الْقَلَائِدَ وَلَا أُمِّينَ الْبَيْتَ الْحَرَامَ .. الخ
"মর্যাদার মাসগুলোর রক্তারক্তি হালাল করো না... ইত্যাদি।" (সূরা মায়েদা-২)
বলা হয়, যে আয়াতে মার্যাদার মাসগুলোতে হত্যাকার্যের অনুমোদন দেয়া হয়েছে, সে আয়াত এসে এ আয়াত বাতিল করেছে। কিন্তু আমার মতে কুরআন মজীদে এমন কোন আয়াত নেই, যার দ্বারা এ আয়াত বাতিল হতে পারে। এমনকি সহীহ্ হাদীস, বা সুন্নাতে রসুল দ্বারাও এর অন্য ব্যখ্যা দান করা হয়নি। সুতরাং এ আয়াতের অর্থ এই হবে, 'যে হত্যকার্য নিষিদ্ধ, যদি তা মর্যাদার মাসে ঘটে, তার জঘন্যতার মাত্রা বৃদ্ধি পায়।' যেমন হযরত (সঃ)-ও এক বক্তৃতায় বলেছেন, 'তোমাদের ধন ও শোনিত যতখানি মর্যাদার, ততখানি মর্যাদা রয়েছে এ মর্যাদার মাসের, এ মর্যাদার দেশের।'

এর অর্থ এ নয় যে, অন্য মাসের অন্য দিনে কোথাও মুসলমানদের জানমাল কোন মর্যাদা রাখে না। এর মর্ম হল এই, সর্ব অবস্থায়ই তা পবিত্র। তবে এসব মাসের দিনগুলোতে তার মর্যাদার মাত্রা আরও বেশী।

১২. আয়াতঃ
فَإِنْ جَاؤُكَ فَا حُكُمْ بَيْنَهُمْ أَوْ أَعْرِضْ عَنْهُمْ .. الخ "তোমার কাছে এলে হয় তাদের বিচার কর, নতুবা বিরত থাক... ইত্যাদি। (সূরা মায়েদা ৪২)

মনসুখ হয়েছে নীচের আয়াত দ্বারা"
وَأَنِ احْكُمُ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ .. الخ "তাহাদের শাসন কর আল্লাহ্র বিধান অনুসারে... ইত্যাদি।” (সূরা মায়েদা ৪৯)
কিন্তু আমার কাছে দ্বিতীয় আয়াতটির মর্ম এই 'যখন আপনি যিম্মীদের কোন ব্যাপারে ফয়সালা করার মনস্থ করেন, তখন আপনার জন্যে প্রয়োজন হল ঐশীগ্রন্থ অনুসারে ফয়সালা করা। তারা কি চায়, সে পরোয়া আপনি করবেন না। মোট কথা, অমুসলিমদের ব্যাপার হলে আমরা তাদের নেতাদের ওপরে ছেড়ে দেব, যেন তারা তাদের বিধান অনুসারে মীমাংসা করে, নতুবা যদি আমরাই মীমাংসা করি, তা হলে আল্লাহর বিধান অনুসারেই করব সুতরাং কোন আয়াতই বাতিল নয়। বরং দুটোই দু'ধরনের হুকুম নিয়ে এসেছে।

১৩. আয়াতঃ
أَوْ آخَرَانِ مِنْ غَيْرِكُمْ... الخ "অথবা তোমাদের ছাড়া আর দু'জন...ইত্যাদি।" (সূরা মায়েদা ১০৬)
মনসূখ হয়েছে এ আয়াত দ্বারাঃ
وَأَشْهِدُوا ذَوَى عَدُلٍ مِنكُمْ... الخ "তোমাদেরই দু'জন বিশ্বস্ত লোক সাক্ষী পেশ করবে--ইত্যাদি।" (সূরা তালাক-২)

আমার মতে, মূল সত্য হল এই, ইমাম আহমদ শুধু আয়াতের বাহ্যিক শব্দার্থ দেখে যা কিছু বলেছেন। কারণ তাঁর এ মতের সমর্থন করেননি কেউ। অন্যদের কাছে আয়াত দু'টো পরস্পরের ব্যাখ্যা স্বরূপ এসেছে। পয়লা আয়াতটির মর্ম হল এই, 'এমন দু'জন লোক হওয়া চাই যারা তোমাদের আত্মীয় নয়।' সুতরাং অন্য যে কোন দু'জন মুসলিম হলেও হল। আর দ্বিতীয় আয়াতে 'মিনকুম' দ্বারা গোটা মুসলিম জাতি বুঝিয়েছে। সুতরাং দুটো আয়াতে মোটেও বিরোধ নেই। তাই এখানে নাসিখ-মনসূখের প্রশ্নই ওঠে না।।

[পাঁচ] সূরা আনফালঃ
১৪. আয়াতঃ
إِنْ يَكُنْ مِنْكُمْ عِشْرُونَ صَابِرُونَ يَغْلِبُوا مِانَ الخ "যদি তোমাদের মধ্যে বিশজন ধৈর্যশীল হয়, তাহলে দু'শ জনের ওপরে জয়ী হবে... ইত্যাদি।" (সুরা আনফাল-৬৫)

আয়াতটি তার পরবর্তী আয়াত দ্বারা মনসুখ হয়েছে। এ আয়াত সম্পর্কে তাঁরা যা বলেছেন, আমারও বক্তব্য তাই।

[ছয়] সূরা বারাআত :
১৫. আয়াতঃ
انْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ... الخ "সংখ্যা শক্তিতে হালকা হও বা ভারী হও, জান-মাল দিয়ে আল্লাহর পথে সবাই জিহাদে নাম... ইতাদি।" (সূরা বারায়াত-৪১)

এর নাসিখ আয়াত হল এইঃ
(۱) لَيْسَ عَلَى الْأَعْمَى حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ ... الخ
(ب) لَيْسَ عَلَى الضُّعَفَاءِ ... الخ
অর্থাৎ তোমাদের দুর্বল, রুগ্ন অন্ধ ইত্যাদি জিহাদে অংশ গ্রহণ না করলে কোন অন্যায় নেই। (সূরা ফাতাহ-৭) (সূরা তাওবা - ৯১)
সুতরাং এ দু'আয়াত বিশেষ কারণে অক্ষম ব্যক্তিদের অব্যাহিত দিয়েছে। তাই ওপরের আয়াতটি মানসুখ হল।

কিন্তু আমার মতে এ আয়াতকে মনসূখ মনে করা ঠিক নয়। কারণ, এর সম্পর্ক হল জিহাদের উপকরণের সাথে, ব্যক্তির সাথে নয়। বস্তুত 'খিফাফান' শব্দের অর্থ হল ন্যূনতম জিহাদের উপকরণ। তা সামান্য যানবাহনই হোক কিংবা সেবক-সেবিকা হোক অথবা কোনরূপ সমরোপকরণ হোক। আর 'ছিকালান' বলতে জিহাদের সর্বাধিক সৈন্য ও যানবাহন বুঝায়। এবং যে দু'আয়াতকে এর নাসিখ বলা হয়, সে দু'টোর সম্পর্ক হল অক্ষম লোকের সাথে। সুতরাং এ দু'টো পয়লা আয়াটির নাসিখ হতে পারে না। কমপক্ষে এটা বলা চলে যে, এখানে নাসিখ সুনিদিষ্ট নয়।

[সাত] সূরা নূর
১৬। আয়াতঃ
الزَّانِي لَا يَنْكِحُ إِلَّا زَانِيَةً ... الخ "ব্যভিচারী ব্যভিচারিণী ছাড়া বিয়ে করবে না।... ইত্যাদি।" (সূরা নূর-৩)
ইবনে আরাবীর মতে নিম্নের আয়াত দ্বারা মনসূখ হয়েছেঃ
وَانْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِ كُمْ وَإِمَائِكُمْ ... الخ
আমার মতে, এখানেও ইমাম আহমদ (রঃ) শুধু আয়াতের বাহ্যিক অর্থের ওপরে নির্ভর করেছেন। অন্যদের কাছে এ আয়াত মনসুখ নয়। কারণ এ কথা সর্ববাদীসম্মত যে, কবীরা গুনাহ্ যে করে, সে-ই কেবল যেনাকারিণীর 'কুফু' (সমপর্যায়ের) হতে পারে। কিংবা তার জন্যেই যেনাকারিণী বিয়ে করা চলে।
অপর যে আয়াতে হারাম বলা হয়েছে, তার সম্পর্কে যেনা ও শিরক্ দুটোর সাথেই। সুতরাং এ আয়াতও নাসিখ হতে পারে না। তাছাড়া যে আয়াতকে নাসিখ ধরা হয়, তার সম্পর্ক রয়েছে সাধারণ হুকুমের সাথে। এবং কোন সাধারণ হুকুম বিশেষ ধরনের হুকুম দ্বারা বাতিল হতে পারে না। এ হিসেবেও নসখ ঠিক নয়।

১৭. আয়াতঃ সূরা নূর
لِيَسْتَأْذِنْكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ .. الخ "এটা এ জন্যে যে, তোমাদের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে তোমাদের অধীনদের ব্যাপারে...ইত্যাদি।" (সূরা নুর- ৫৮)

এ আয়াত সম্পর্কে মতানৈক্য রয়েছে অনেক। কিছু লোক এটাকে 'মনসূখ' মনে করে। কিছু লোক আবার তা মনে করে না। বরং মুসলমানরা এটা কার্যকরী করার ব্যাপারে ঔদাসীন্য দেখাচ্ছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতকে মনসূখ মনে করেন না বরং তাঁর বক্তব্যই সবচাইতে সঠিক। কারণ তাঁর সমর্থনে জোরালো যুক্তি ও কারণ বর্তমান রয়েছে। সুতরাং এ মতটির ওপরে নির্ভর করা যেতে পারে।

[আট] সূরা আহযাব
لَا يَحِلُّ لَكَ النِّسَاءُ مِنْ بَعْدُ .. الخ :১৮. আয়াত "তোমার জন্যে এর পরে সেই নারী বৈধ নয়... ইত্যাদি।" (আহযাব ৫২)
এ আয়াত নীচের আয়াত দ্বারা মানসুখ হয়েছে।
إِنَّا أَحْلَلْنَا لَكَ أَزْوَاجَكَ اللَّتِي .. الخ "নিশ্চয়ই আমি বৈধ করেছি তোমার স্ত্রীদের... ইত্যাদি।" (সূরা আহখাব ৫০)
আমার মতে আলোচ্য আয়াতটির তিলাওয়াতই মনসুখ হয়ে গেছে। এটাই সত্য ও সঠিক কথা।

[নয়] সূরা মুজাদালা
إِذَا نَاجَيْتُمُ الرَّسُولَ فَقَدِّمُوا ... الخ :১৯. আয়াত "যখন তোমরা রসূলের সাথে বিশেষ পরামর্শ করবে, আগে নজরানা দিবে... ইত্যাদি।" (সূরা মুজাদালা-১২)

ইবনে আরাবী (রাঃ)-এর মতে এর পরবর্তী আয়াতটি এটাকে বাতিল করে দিয়েছে। এখানে আমিও ইবনে আরাবীর মত সমর্থন করি।

[দশ] সূরা মুমতাহিনা
২০. আয়াতঃ
فَاتُو الَّذِينَ ذَهَبَتْ أَزْوَاجُهُمْ مِثْلَ مَا أَنْفَقُوا .. الخ "ঈমান ও কুফরীর ব্যবধানের জন্য যাদের স্ত্রী বিচ্ছিন্ন হল, তাদের খরচ আদায় কর... ইত্যাদি।" (সূরা মুমতাহিন-১১)

একটি মত অনুসারে এ আয়াত 'সায়িফ'-এর আয়াত দ্বারা মানসুখ করা হয়েছে। আরেকটি মতে এ আয়াত মানসুখ করা হয়েছে গনীমতের আয়াত দ্বারা। তৃতীয় দলের মত হচ্ছে, এ আয়াত আদৌ মানসুখ হয়নি। এটি মুহকাম আয়াত। আমার কাছে আয়াতটি তো মুহকাম, কিন্তু এর হুকুম সাধারণ (আম) নয়। এর সম্পর্ক হল মুসলমানদের দুর্বল অবস্থার সাথে সংযুক্ত কাফিররা যখন সবল ও শক্তিশালী ছিল, সে সময়ের জন্যে এ আয়াত।

[এগার] সূরা মুয্যাম্মিল
২১. আয়াতঃ
قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلاً ... الخ 'প্রায় রাতই জেগে কাটাও... ইত্যাদি।'

এ আয়াতকে এ সূরার শেষের আয়াত দ্বারা মানসুখ করা হয়েছে। মানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের হুকুম এসে একে মানসুখ করেছে। কিন্তু আমার মতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের হুকুম দিয়ে একে মানসুখ করা ঠিক নয়। মূল সত্য হল এই, সূরার শুরুতে রাত জাগার যে হুকুম রয়েছে, তা মুস্তাহাবে মুআক্কাদা ছিল। পরের আয়াত এসে তাকীদ বাতিল করে শুধু মুস্তাহাব বাকী রেখেছে।

আল্লামা সূয়ূতীও ইবনে আরাবীর অনুসৃত অভিমত সমর্থন করতে গিয়ে বলেছেন, কেবল উপরের আয়াতটুকুই মনসুখ হয়েছে। যদিও তার ভেতরে কিছু কিছু আয়াতের তানসীখ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে, কিন্তু এসব আয়াত ছাড়া আর কোন আয়াতের তানসীখ দাবী করা একবারেই ভিত্তিহীন। বেশী খাটি কথা তো সেগুলোও মনসুখ নয়। এ হিসেবে মনসুখ আয়াতের সংখ্যা আরও কমে যায়。

উপরের আলোচনায় সুস্পষ্ট হয়েছে যে, আমার কাছে পাঁচটি আয়াতের বেশী মানসুখ নয়। তাই কেবল সেই পাঁচটি; আলোচ্য আয়াতের তানসীখই দাবী করা যেতে পারে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px