📄 ইলমুল আহকাম সংবিধান পর্যালোচনা মূলতত্ত্ব
সংবিধান (আহকাম) নিয়ে আলোচনা সর্ব প্রথম তত্ত্ব হল এই, আমাদের হযরত (সঃ) হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ভেতরে প্রেরিত হয়েছিলেন বলে তিনি ইব্রাহীম (আঃ)-এর সংবিধানকেই যথাসম্ভব রক্ষা করেছেন। প্রয়োজনে কোথাও হয়তো ব্যাপককে বিশেষ কিংবা নির্বিশেষকে সবিশেষ এবং কোথাও বাড়ানো বা কমানো হয়েছে।
দ্বিতীয় তত্ত্ব হল এই, আল্লাহ্ হযরত (সঃ)-এর সাহায্যে আরববাসীকে পবিত্র করতে চেয়েছিলেন এবং তাদের সাহায্যে অন্যান্য সব রাষ্ট্রের সংস্কার চেয়েছেন। সুতরাং ইসলামী সংবিধানের ভিত্তি আরববাসীর রীতি-নীতি ও অভ্যাসের ওপরে প্রতিষ্ঠিত করা অপরিহার্য ছিল।
📄 বিকৃত মিল্লাতে ইবরাহীমীর সংস্কার
বস্তুত যদি ইব্রাহীমী ধর্মের সংবিধান ও আরববাসীর রীতি-নীতি সামনে রেখে ইসলামী সংবিধান অধ্যয়ন করা হয়, তাহলে আমাদের রাসূল (সঃ) ইব্রাহীমী ধর্মানুসারী আরববাসীদের ধর্মের যে সংস্কার ও রদবদলের জন্যে এসেছিলেন, তাঁর প্রতিটি বিধানের কারণ এবং প্রত্যেক বিধি নিষেধের কল্যাণ ধর্মিতা সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেবে।
সারকথা ইবাদাত অর্থাৎ পবিত্রতা, নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ্জ, যিকির পালনে বড়ধরনের বিপর্যয় ঘটেছিল। আর এই বিপর্যয়ের কারণও ছিল কয়েকটি। (১) ইবাদত পালনে অলসতা ও অমনোযোগ, (২) অজ্ঞতার কারনে ইবাদাতের পদ্ধতি নিয়ে পরস্পর বিবাদ। (৩) জাহেলী যুগের বিকৃতির অনুপ্রবেশ। এই সমস্ত কারণে মিল্লাতে ইব্রাহীমীর মধ্যে যে সকল ত্রুটির সৃষ্টি হয়েছিল, কুরআন শরীফ সে গুলোর সংশোধন ও সংস্কার করল এবং সহজ-সরল ও দৃঢ় করল। ফলে মিল্লাতে ইব্রাহীমীর আদর্শ গুলো সঠিক ও সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা লাভ করল।
ঠিক এভাবেই পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও নানা ধরনের কুসংস্কার, অন্যায় অনাচার জন্ম নিয়েছিল। তাই কুরআন তাদের সংশোধনের জন্য নীতিমালা দান করল ও বিধি-নিষেধ আরোপ করল এবং ছগিরা কবীরা গুনাহের সংজ্ঞা দিল, যাতে মানুষ ঐ সমস্ত পাপাচার থেকে নিজেদের কে দূরে রাখে।
কুরআনে নামাযের প্রশ্নটিও সংক্ষেপে সেরে দিয়েছে। শুধু 'ইকামতে সালাত'-এর নির্দেশ জারী করেছে। আমাদের হযরত (সঃ) মোটামুটি সেই নির্দেশের আলোকে মসজিদ গড়লেন, জামাআতে নামায ও নামাযের ওয়াক্ত ইত্যাদি নিয়ম প্রবর্তন করলেন। তেমনি যাকাতের বিধানটিও সংক্ষেপে বলা হল। আমাদের রাসূল (সঃ) তার ব্যাখ্যা দিলেন।
এভাবে কুরআনের বিভিন্ন সূরায় ভিন্ন ভিন্ন ব্যাপারে আলাদা আলাদা বিধান এসেছে। যেমন, সূরা বাকারায় রোযা ও হজ্জের, সূরা বাকারা, আনফাল ও অন্য কয়েকখানে জিহাদের, সূরা মায়েদা ও সূরা নূরে দন্ডবিধি, সূরা নিসায় মিরাসের (উত্তরাধিকার-সত্ত্ব) ও সূরা বাকারা, সূরা নিসা ও সূরা তালাকে বিবাহ বিচ্ছেদের বিধি-নিষেধগুলো এসেছে।
📄 ইশারা-ইস্তিবাহি আয়াতের ব্যাখ্যা দান
এসব তো সার্বজনীন কল্যাণকর গোটা জাতির জন্যে প্রদত্ত বিধান। এর থেকে আরেকটু এগিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে হযরত (সঃ)-কে প্রশ্ন করায় যে সব জবাব এসেছিল তাও বিদ্যমান। কিংবা মুমিনরা জান-মাল লুটিয়ে যে সব ত্যাগ দেখিয়েছে, মুনাফিকরা সে ক্ষেত্রে যেরূপ স্বার্থপরতা ও কার্পণ্যের পরিচয় দিয়েছে, তার বর্ণনা রয়েছে। এ প্রসংগে আল্লাহ্ মুমিনদের প্রশংসা ও মুনাফিকদের ভৎর্সনা করেছেন। হযরত (সঃ)-এর জীবদ্দশায় আল্লাহ্ তাআলা যে শত্রুদের হাত থেকে মুসলমানদের রক্ষা করেছিলেন, তাও দেখা যায়। আল্লাহ্ পাক এ সব ব্যাপারের উল্লেখ করতে গিয়ে মুসলমানদের ওপরে তাঁর ইহসান ও অবদানের কথা প্রকাশ করেছেন। এরূপও দেখা গেছে যে, মুসলমানদের ধমক দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে, কিংবা ইঙ্গিতে-ইশারায় কিছু বলে দেয়া হয়েছে। কোথাও বিশেষ ব্যাপারে বাধা-নিষেধের প্রয়োজন দেখা দেওয়ায় তৎক্ষণাত আয়াত এসে গেছে। তাফসীরকারদের কর্তব্য হচ্ছে এই, এরূপ ক্ষেত্রে আয়াতের সংশ্লিষ্ট সেই বিশেষ ঘটনাটি ও সংক্ষেপে বলে দেওয়া। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে সংঘটিত বিশেষ যুদ্ধগুলোরও উল্লেখ কুরআনে আছে। সূরা আনফালে বদরের যুদ্ধ, সূরা আল্-ইমরানে ওহুদের যুদ্ধ, সূরা আহযাবে খন্দকের যুদ্ধ, সূরা ফাহে হুদায়বিয়ার সন্ধি, সূরা হাশরে বনূ নযীরের যুদ্ধ ও সূরা বারাআতে মক্কা বিজয় ও তবুকের যুদ্ধের উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী যেমন বিদায় হজ্জের উল্লেখ রয়েছে সূরা মায়েদায়, যয়নবের বিবাহের কাহিনী রয়েছে সূরা আহযাব ও সূরা তাহরীমে, মিথ্যা অপবাদের (হযরত আয়েশা (রাঃ) সম্পর্কিত) কাহিনী রয়েছে সূরা নূরে, জিনের সাথে রাসুলের (সঃ) সম্পর্কের কথা রয়েছে সূরা জিন ও আহ্কাফে, মসজিদে যেরারের (বিভেদমূলক) কথা রয়েছে সূরা বারাআতে এবং মিরাজের বর্ণনা মিলে সূরা বনী ইসরাঈলে।
এসব আয়াত মূলত 'আইয়্যামিল্লাহর অন্তর্ভূক্ত। কিন্তু যেহেতু এগুলোর তাৎপর্য বুঝা সংশ্লিষ্ট কাহিনীর ওপরে নির্ভর করে, তাই এগুলোকে ভিন্ন একটা শ্রেণী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাফসীরকাররা যেন এ ধরনের আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি অবশ্যই উল্লেখ করেন।