📄 আল্লাহর অস্তিত্ব
বস্তুত কুরআন আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে খুব সংক্ষেপে আলোচনা করেছে। প্রমাণের জন্যে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়াস নেই তাতে। কারণ আল্লাহর অস্তিত্বের ধারণাটি মানুষের ভেতরে ব্যাপক হয়ে আছে। পৃথিবীর ভেতরে এমন কোন সুস্থ ও স্বাভাবিক দেশ বা জাতি নেই, যেখানে আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়।
অবশ্য আল্লাহর গুণাবলীর প্রশ্নটি চিন্তা ভাবনা ও সাধনা ব্যতিরেকে সহজে বুঝে ফেলার নয়। সত্য বলতে কি, তার তত্ত্ববুঝ ও বুঝানো উভয়ই অসম্ভব। কিন্তু সব চাইতে মুশকিলের ব্যাপার হল এই, যদি আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কে কোনই ধারণা না নেয়া যায়, তাহলে পরিচয় লাভও সম্ভবপর নয়। অথচ সভ্যতা ও আত্মিক মার্জনা সৃষ্টির জন্যে সেই পরিচয়ই একমাত্র পথ। তাই আল্লাহ্র অপার লীলা সেই কঠিন পথটির এভাবে সমাধান ঘটিয়েছে যে, মানুষের গুণাবলীর ভেতরে এমন কতগুলো গুণ বেছে নিয়েছে যেগুলো সব মানুষেরই জানা আছে। সেই গুণগুলোকে খোদার সূক্ষ্ম ও দুর্বোধ্য গুণাবলীর স্থলে এমনভাবে পেশ করা হয়েছে, যাতে করে অক্ষম মানুষ সে সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা নিতে পারে। অথচ সংগে সংগে বলে দেওয়া হয়েছে, "এসবের কোন তুলনা নেই।"
কারণ সীমাবদ্ধ গুণের মানুষ যেন আল্লাহর গুণকে অনুরূপ ভাবতে গিয়ে ভুল ধারণা ও মুর্খতার শিকারে পরিণত না হয়।
এমন কতগুলো মানবীয় গুণও রয়েছে, তা যে শুধু আল্লাহর মর্যাদার অনুপযোগী তাই নয়; উপরন্তু সে সব যদি আল্লাহ্র সাথে সংযুক্ত করা হয় তা হলে মানুষ ভ্রান্ত ধারণা ও বিশ্বাসের শিকার হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, সন্তান জন্ম নেয়া, কান্নাকাটি করা, শোকে অধীর হওয়া ইত্যাদি। তাই এসব মানবীয় গুণকে আল্লাহ্র সাথে সংযুক্ত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অবশ্য যে সব গুণের সংযোজন মৌল বিশ্বাসে বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তি না ঘটায়, আর যে সব গুণের সংযোজন ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি করে, এ দুয়ের ভেতর পার্থক্য সৃষ্টি করা এমন সূক্ষ্ম ও কঠিন ব্যাপার, যেখানে মানবীয় চিন্তা ও জ্ঞান পৌঁছুতে ব্যর্থ হয়। এ ক্ষেত্রটি অবশ্যই চুপ থাকার ও বিরত থাকার। সুতরাং এ প্রশ্নে নিজ খেয়ালখুশির মতামত পেশ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
📄 আল্লাহর নিদর্শন সমূহ
তেমনি আল্লাহ্ কুদরতের নিশানা ও তাঁর অবদানের ভেতর সেগুলোই নির্বাচিত করা হয়েছে, যেগুলো শহুরে কিংবা গেঁয়ো, আরব কিংবা অনারব সবাই সমানভাবে বুঝতে পারে। এ কারনেই যে সব আধ্যাত্মিক অবদান শুধু আলেম ও ওলী-দরবেশের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে আছে, সে সবের উল্লেখ করা হয়নি। আর যে সব দুর্লভ অবদান শুধু রাজা বাদশাহর জন্যে নির্দিষ্ট রয়েছে, সেগুলোরও উল্লেখ করা হয়নি। ফলে আলোচনার জন্যে যে গুলো বাছাই করা হয়েছে, তার ভিতরে আসমান যমীনের সৃষ্টি লীলা, মেঘের বারিবর্ষণ ও নদী-নালা হয়ে তা মাটির বুকে প্রবাহিত হওয়া, তা থেকে নানা ধরনের ফুল-ফল জন্ম নেয়া কিংবা মানুষকে প্রয়োজনীয় কারিগরী শিক্ষা প্রদান ইত্যাদি ব্যাপারকে অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে।
তেমনি অনেক জায়গায় মানুষের আত্মিক ও চরিত্রিক ত্রুটি-বিচ্যুতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে এবং সতর্ক করা হয়েছে। আত্মিক বিচ্যুতি তাদের এই যে, সুখে ও দুঃখে তাদের কাজ ও স্বভাব একরূপ থাকে না। যখন তাদের বিপদ দেখা দেয়, তখন তারা একভাবে চলে, আর যখন বিপদ দূর হয়, তখন অন্যরূপ হয়ে যায়।
📄 তায়করীরি- আইযাযমিয়াহ
এভাবে অনুগত বান্দাদের পুরুষ্কার ও বিদ্রোহী বান্দাদের শাস্তিদানের ব্যাপারে আল্লাহর তরফ থেকে যা কিছু দেখা দিয়েছিল, সেগুলোর ভেতরেও কুরআনে এমন সব ঘটনা বেছে নেয়া হয়েছে, যেগুলো মানুষ শুনতে অভ্যস্ত ছিল। মোটামুটিভাবে সেগুলো আগে থেকেই তারা শুনে আসছিল। যেমন, নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায় ও আদ সামুদ সম্প্রদায়ের কাহিনী তারা পুরুষানুক্রমেই শুনে আসছিল। তেমনি হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও বনী ইস্রাঈলী নবীদের কাহিনীগুলি আরবরা ইয়াহুদীদের সংস্পর্শে থেকে যুগ যুগ ধরে শুনছিল। বস্তুত কুরআনে সে সব ঘটনাই বারংবার বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে যেসব ঘটনা আরববাসী কমই শুনেছে কিংবা ইরান বা ভারতের যে সব ঐতিহাসিক কাহিনীর সাথে তাদের কোনই সংশ্রব ছিল না, সেগুলোর উল্লেখ তাতে নেই।
📄 কুরআনের ঘটনা বিন্যাস
কুরআনে যেভাবে কোন নতুন ও অদ্ভুত ঘটনার সমাবেশ ঘটানো হয়নি, তেমনি সমগ্র ঘটনার চুলচেরা আলোচনাও পরিহার করা হয়েছে। বরং ঘটনাটির শুধু সে অংশটুকু নির্বাচন করা হয়েছে, উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যেটুকুর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনাবলীর ভেতরে কৌশল ও কল্যাণধর্মিতা হল এই যে, জনসাধারণ যখনই কোন নয়া ও অদ্ভুত কাহিনী শোনে কিংবা তাদের সামনে সবিস্তারে কাহিনীটি তুলে ধরা হয়, তখনই তারা কাহিনীর ভেতরে নিজেদের হারিয়ে ফেলে এবং কাহিনীটি বর্ণনার মূল উদ্দেশ্য বিলোপ হয়।
বিখ্যাত এক তাপস বলেছেন, যেদিন থেকে মানুষ কুরআনের 'তাজবীদ' (উচ্চারণ তত্ত্ব) শিখল, সেদিন থেকেই নামাযের ভেতরে তন্ময়তা হারিয়ে বসল। আর যখন থেকে কুরআনের ব্যাখ্যাদাতারা কুরআন ব্যাখ্যার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তত্ত্ব ও দূর-দূরান্তের সম্ভাবনার আলোচনা শুরু করল, ইলমে তাফসীর তখন থেকেই প্রায় লোপ পেল। কুরআনে কাহিনী বিন্যাসের ক্ষেত্রে এ সত্যটিই সামনে রাখা হয়েছে। কারণ যখনই মানুষ কাহিনী শোনার আনন্দে গা ভাসিয়ে দেয়, তখন তার মূল লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়। নিম্নের এরূপ ঘটনাবলী ও কাহিনীগুলো কুরআনে বারংবার বিভিন্ন পন্থায় উল্লেখ করা হয়েছে।
১। হযরত আদমকে (আঃ) মাটি দিয়ে সৃষ্টি করা, ফেরেস্তাদের সিজদা দান ও শয়তানের অহমিকাপূর্ণ অস্বীকার এবং তার মালউন (অভিশপ্ত) খেতাব লাভ ও আদমকে বিভ্রান্ত করার জন্য তার প্রয়াসের কাহিনী এসব এক ধরনের ঘটনাবলী।
২। হযরত নূহ (আঃ) হযরত হূদ (আঃ), হযরত ছালিহ্ (আঃ), হযরত লূত (আঃ) ও হযরত শুআয়ব (আঃ)-এর আল্লাহর একত্ববাদ প্রচার ও সত্যের নির্দেশ ও অসত্যের প্রতিবাদের ব্যাপারে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সাথে বিতর্ক ও বিরোধের ঘটনাবলী, সে সব সম্প্রদায়ের নানা ধরনের অমূলক সন্দেহের সৃষ্টি ও সত্যকে অস্বীকার করার কাহিনী, নবীদের পক্ষ থেকে তাদের সব সন্দেহের জবাব দানের বিবরণ, সে সব হতভাগাদের উপরে আল্লাহর গযব নাযিলের ইতিবৃত্ত এবং আল্লাহ্ তরফ থেকে নবী ও তাঁদের অনুসারীদের সাহায্য ও সহায়তা লাভের কিস্সা - এসব বিশেষ এক ধরনের কাহিনী।
৩। হযরত মূসা (আঃ) এবং ফিরআউন ও তার সাথীদের ভেতরে অনুষ্ঠিত ঘটনাবলী, হযরত মূসা (আঃ) ও বনী ইস্রাঈলের ভেতরকার ব্যাপারগুলো, হযরত মূসা (আঃ) -এর সাথে সে সম্প্রদায়ের বাড়াবাড়ি ও জবরদস্তি, সে হতভাগাদের ওপর আল্লাহ্র গযব নাযিল হবার সম্ভাবনা এবং হযরত মূসা (আঃ)-এর কয়েকবার বিভিন্ন সময়ে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা এ সব বিশেষ এক ধরনের কাহিনী।
৪। হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলায়মান (আঃ)-এর ইতিবৃত্ত, তাঁদের মর্তবা ও নিদর্শনের উল্লেখ, হযরত আইয়ুব (আঃ) ও হযরত ইউনুস (আঃ)-এর বিপদ ও পরে তাঁদের ওপরে আল্লাহ্র অনুগ্রহ, হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর দোয়া আল্লাহ্র দরবারে কবুল হবার বিবরণ, হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্মলাভের বিস্ময়কর ঘটনা ও তাঁর বাপ ছাড়া পয়দা হওয়ার ব্যাপার, মাতৃক্রোড়েই তাঁর কথাবার্তা বলা এবং তাঁর থেকে নানা ধরনের আলৌকিক ব্যাপারের প্রকাশ এক ধরনের কাহিনী। সেগুলোকে অবস্থাভেদে কখনও মোটামুটিভাবে, কখনও কিছুটা বিশদভাবে বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
নীচের কিস্সাগুলো কুরআনে কেবল দু-একবার বলেই শেষ করা হয়েছে:
১। হযরত ইদরীস (আঃ) কে আকাশে তুলে নেয়ার ঘটনা。
২। নমরূদের সাথে হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর বিতর্ক, হত্যার পরে পাখিদের আবার জীবিত করার ঘটনা ও ইসমাঈল (আঃ)-এর আত্মদানের ইতিবৃত্ত।
৩। হযরত ইউসূফ (আঃ)-এর কিস্সা।
৪। হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্ম লাভ, তাঁকে নীল নদীতে ভাসিয়ে দেয়া, তাঁর একজন কিবতীকে হত্যা করা, তাঁর মাদায়েন সফর ও মাদায়েনে বিবাহ করা, গাছের উপরে আগুনের শিখা দেখা, সে আগুন থেকে কথা শুনতে পাওয়া, গাভী যবেহ করার বৃত্তান্ত।
৫। বিলকীসের কিস্সা, যুল-কারনায়নের কিস্সা, আসহাবের কাহাফের কিস্সা, পরস্পর কথোপকথনে লিপ্ত দুব্যক্তির কিস্সা, জান্নাতবাসীদের কিস্সা এবং আসহাবে ফীলের (গজারোহীদল) কিস্সা।