📘 কিয়ামতের বর্ণনা > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


“তাদের মাঝে যথাযথ ভাবে ফায়সালা করা হয়েছে”

সূর্য এক মাইল দূরত্বে থাকবে, পৃথিবী আগুনের ন্যায় জ্বলতে থাকবে, মানুষ উলঙ্গ হয়ে উপস্থিত হবে। আর ঘোষণা হবেঃ
(وَامْتَازُوا الْيَوْمَ أَيُّهَا الْمُجْرِمُونَ) (سورة يس : ٥٩)
অর্থঃ “আর হে অপরাধীরা! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও।” (সূরা ইয়াসীন-৫৯)

অতঃপর দলে দলে বিভক্ত করে দেয়া হবে, ঈমানদারদের দল (আলেমগণের দল, ওলীগণের দল, শান্তি স্থাপনকারীদের দল, শহীদদের দল)।
অপর দিকে কাফের, মুশরেক, মুরতাদ, মুনাফেক, ফাসেক, ফাজেরদের দল, ইত্যাদি।
* আদালত স্থাপিত হবে, আল্লাহ্ ফেরেস্তাদের বেষ্টনীতে অবতরণ করবেন।
* আদালতের চতুর্পাশে ফেরেস্তাগণ দলবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে।
* ফেরেস্তা, নবীগণ, ওলীগণ, শহীদগণ...কে সাক্ষী হিসেবে ডাকা হবে।

প্রথম পাপীর সাথে কথপোকথন
আল্লাহ্ঃ আমি কি তোমাকে চিন্তা ভাবনা করার জন্য মন মস্তিষ্ক দেয়নি, শোনার জন্য কান এবং দেখার জন্য চোখ দেইনি?
আদম সন্তানঃ হে আল্লাহ্ সব কিছু দিয়ে ছিলে।
আল্লাহ্ঃ তাহলে তুমি কেন শিরক করলে? আমার নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে কেন মিথ্যায় প্রতিপন্ন করলে? আমার নাযিল কৃত পথ কোরআ'ন মাজীদ অনুযায়ী কেন চললে না?
আদম সন্তান ডান দিকে তাকিয়ে আগুন দেখতে পাবে, বাম দিকে তাকালেও আগুন দেখতে পাবে, তখন সে বলবেঃ হে আল্লাহ্! আমি মূলত যালেম ছিলাম, আমাকে শুধু এক বার পৃথিবীতে পাঠাও আমি একত্ববাদে বিশ্বাসী হয়ে আসব।

দ্বিতীয় পাপী
আল্লাহ্: আমি কি তোমাকে সম্পদ, রাষ্ট্র, সম্মান, পরিবার পরিজন, আরো অন্যান্য নে'মতসমূহ দেইনি?
আদম সন্তানঃ হে আল্লাহ্ সব কিছুই দিয়ে ছিলে।
আল্লাহ্: তাহলে তুমি আমার জন্য কি করে ছিলা?
আদম সন্তানঃ হে আল্লাহ্! আমি তোমার জন্য নামায আদায় করেছি, রোযা রেখেছি, দান খয়রাত করেছি, কোরআ'ন তেলওয়াত করেছি, আরো অনেক সৎ কাজ করেছি।
আল্লাহ্ঃ হে ফেরেস্তারা এ আদম সন্তানের মুখ বন্ধ করে দাও।
ফেরেপ্তা: হে আল্লাহ্ আমরা আপনার নির্দেশ পালনে সদা প্রস্তুত।
আল্লাহ্: হে আদম সন্তানের অঙ্গ পত্যঙ্গ সাক্ষী দাও।
বাম রানঃহে আল্লাহ্! এ লোক নামায, রোযা, দান-খয়রাত, ইত্যাদি তো শুধু মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত থাকার জন্য করেছে, কিন্তু মন থেকে কাফেরদের সংস্কৃতি, ও তাদের ব্যবস্থাপনাকে সে পছন্দ করত।
আদম সন্তান ডান দিকে তাকিয়ে আগুন দেখতে পাবে, বাম দিকে তাকালেও আগুন দেখতে পাবে, তখন সে বলবেঃ হে আল্লাহ্! আমি মূলত যালেম ছিলাম, আমাকে শুধু এক বার পৃথিবীতে পাঠাও আমি একত্ববাদে বিশ্বাসী হয়ে আসব।

তৃতীয় পাপী
আল্লাহ্ঃ আমি কি তোমাকে উচ্চ পদ, ইজ্জত, স্ত্রী-সন্তান, আরামদায়ক ঘর, ঠান্ডা পানি, সু স্বাদু খাবার দেই নি?
আদম সন্তানঃ হে আল্লাহ! সব কিছু দিয়ে ছিলা।
আল্লাহ্ঃ তুমি আমার পছন্দনীয় দিন থেকে কেন পিছপা হলে?
আদম সন্তানঃ হে আল্লাহ্! কাফেরের শক্তি ও বিজয় দেখে ভীত হয়ে।
আল্লাহ্ঃ আমি কি সবচেয়ে বেশি হকদার ছিলামনা যে তুমি আমাকে ভয় করবে?
আদম সন্তানঃ হ্যাঁ, হে আল্লাহ্! কিন্তু তুমি আমাকে কেন অন্ধ করে পুনরুত্থিত করলে আমি তো অন্ধ ছিলাম না?
আল্লাহ্: যে ভাবে পৃথিবীতে তুমি আমার বিধি বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ছিলা, এভাবে আমিও আজ তোমার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি।
আদম সন্তান ডান দিকে তাকিয়ে আগুন দেখতে পাবে, বাম দিকে তাকালেও আগুন দেখতে পাবে, তখন সে বলবেঃ হে আল্লাহ্! আমি মূলত যালেম ছিলাম, আমাকে শুধু এক বার পৃথিবীতে পাঠাও আমি তোমার ও তোমার রাসূলের অনুসরণ করব।

চতুর্থ পাপী
আল্লাহ্: আমি কি তোমাকে দুনিয়াতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, শক্তি, স্বাধীনতা দেইনি?
আদম সন্তানঃ হে আল্লাহ্! দিয়ে ছিলা।
আল্লাহ্: তুমি যথাযথ ভাবে কেন নামায আদায় কর নাই, নিয়ম মত যাকাত কেন আদায় কর নাই, তুমি ইসলামের পুত পবিত্র বিধি-বিধান কেন কার্যকর কর নাই, ইসলামী আইন কেন কার্যকর কর নাই, আমার দ্বীনের পথে কেন চল নাই?
আদম সন্তান ডান দিকে তাকিয়ে আগুন দেখতে পাবে, বাম দিকে তাকালেও আগুন দেখতে পাবে, তখন সে বলবেঃ হে আল্লাহ্! আমি মূলত যালেম ছিলাম, আমাকে শুধু এক বার পৃথিবীতে পাঠাও আমি তোমার দ্বীনের সাহায্যকারী হব।

পঞ্চম পাপী
আল্লাহ্ঃ আমি কি তোমাকে প্রশস্ত জমি দেইনি? নেতৃত্ব দেইনি? বে-হিসাব ধন-সম্পদ, সম্মান দেইনি?
আদম সন্তানঃ হ্যাঁ! হে আল্লাহ্ সব কিছু দিয়েছিলা।
আল্লাহ্ঃ মদও মাতলামীর আড্ডা জমানোর জন্য, এতীম, বিধাব, গরীব, মিসকীনদের ইজ্জত লুণ্ঠনের জন্য তা দিয়ে ছিলাম? চুরী, ডাকাতি, হত্যা ও অরাজকতা সৃষ্টির জন্য তা দিয়েছিলাম?
আদম সন্তান ডান দিকে তাকিয়ে আগুন দেখতে পাবে, বাম দিকে তাকালেও আগুন দেখতে পাবে, তখন সে বলবেঃ হে আল্লাহ্! আমি মূলত যালেম ছিলাম, আমাকে শুধু এক বার পৃথিবীতে পাঠাও আমি সৎ লোক হয়ে আসব।
আল্লাহ্: ফেরেস্তাদেরকে লক্ষ্য করে বলবেনঃ ফায়সালা ঘোষণা কর।
ফেরেস্তাঃ (أَلَا لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الظَّالِمِينَ) (سورة هود : ۱۸)
অর্থঃ “শুনে রাখ! যালেমদের ওপর আল্লাহ্র লা'নত।” (সূরা হুদঃ ১৮)

অতপর সব কিছু আলোহীন করে অন্ধকার করে দেয়া হবে, চুলের চেয়ে চিকন, তরাবারীর চেয়েও তীক্ষ্ণ, পুলসিরাতের ওপর দিয়ে অতিক্রম করার জন্য নির্দেশ দেয়া হবে।
* কিছু কিছু লোক পুলসিরাত অতিক্রম করে সুসজ্জিত জান্নাতে পৌঁছে যাবে। আর কিছু লোক রাস্তাই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।

এরপর পরবর্তী ঘোষণা হবেঃ
"হে জান্নাত ও জাহান্নামের অধিবাসীরা! এখানেই তোমাদের চিরস্থায়ী জীবন যাপন হবে, আর কোন মৃত্যু নেই।” (তিরমিযী)
* অতএব হে আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী!
* হে চক্ষুস্মান লোকেরা!
* হে জ্ঞানবানরা! সময় শেষ হওয়ার আগে আগে জিবরীলের ঘোষণাকে মনযোগসহকারে শোনঃ
(يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ) (سورة آل عمران : ১০২)
অর্থঃ “হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমরা প্রকৃত ভীতি সহকারে আল্লাহ্ কে ভয় কর এবং তোমরা মুসলিম হওয়া ব্যতীত মৃত্যুবরণ করনা"। (সূরা আল ইমরানঃ ১০২)
অতঃপর কে আছে আল্লাহ্ কে ভয় করবে আর কে আছে মৃত্যু পর্যন্ত ইসলামের উপর অটল থাকবে।

بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على رسوله الامين والعاقبة للمتقين اما بعد !
মৃত্যুর পর মানুষ যে সমস্ত স্তরসমূহের সম্মুক্ষীণ হবে তার মধ্যে বারযাখ, সিঙ্গায় ফুঁ, পুনরুত্থান, হাশর, হিসাব, মিযান, পুলসিরাত, ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। আর এই স্তরসমূহ কতটা কঠিন ও সমস্যাময় হবে তার অনুমান নিন্মোক্ত আয়াতসমূহ থেকে কারা যায়।

আল্লাহ্র বাণী
১। কিয়ামতের দিন বাচ্চাকে বৃদ্ধ করে দেয়া হবে। (সূরা মুয্যাম্মিল-১৭)
২। মানুষের অন্তর মুখে চলে আসবে, তারা চিন্তায় বিভোর থাকবে; কিন্তু তাদের চিন্তা দূর এবং সুপারিশ করার মত কেউ থাকবে না।
৩। ঐ দিনের শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য মোজরেম স্বীয় সন্তান, স্ত্রী, স্বীয় ভাই, জাতি-গোষ্ঠি যারা তাকে আশ্রয় দিত, এমনকি পৃথিবীর সবকিছুর বিনিময়ে হলেও তা থেকে বাঁচতে চাইবে কিন্তু তা সম্ভব হবে না। (সূরা আল মায়ারেজ-১১-১৫)
৪। ঐ দিন চক্ষু স্থির হয়ে যাবে, চন্দ্র হয়ে যাবে আলোহীন, চন্দ্র ও সূর্যকে একত্রিত করা হবে, মানুষ বলবে আজ পালানোর স্থান কোথায়, কিন্তু কোন আশ্রয় স্থল থাকবে না। (সূরা কিয়ামাহ্- ৬-১১)
৫। যালেম ব্যক্তি সেদিন স্বীয় হাত দংশন করতে করতে বলবেঃ হায়! আমি যদি রাসূলের নির্দেশিত পথ অবলম্বন করতাম, হায়! দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধু রূপে গ্রহণ না করতাম। (সূরা ফোরকান-২৭-২৯)

কিছু হাদীসের উদ্ধৃতি
১। মানুষের জন্ম থেকে নিয়ে তার মৃত্যু পর্যন্ত যত দুঃখ কষ্ট হয়, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হবে মৃত্যুর কষ্ট, আর মৃত্যুর পর আগত সমস্ত স্তর সমূহের কষ্ট, মৃত্যুর কষ্ট থেকে অনেক বেশি হবে। (ত্বাবারানী)
২। লোকেরা স্বীয় কবর থেকে উলঙ্গ ও খাতনাহীন হয়ে উঠবে, আয়শা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) পশ্ন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লোকেরা একে অপরের প্রতি তাকাবে না? তিনি বললেনঃ ঐ দিনের বিপদ এত কঠিন হবে যে, কেউ কারো দিকে তাকানোর কথা মনেই পড়বে না। (মুসলিম)
৩। হাশরের মাঠে যেখানে মানুষ উলঙ্গ অবস্থায় উঠবে সেখানে সূর্য এক মাইল দূরে থাকবে, লোকেরা স্বীয় আমল অনুপাতে ঘামের মধ্যে নিমজ্জিত থাকবে, কারো টাখনা পর্যন্ত, কারো হাটু পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত, আবার কারো মুখ পর্যন্ত। (মুসলিম)
৪। হাশরের দিনটি পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হবে। (মুসলিম) হাশরের মাঠে মানুষের এত কষ্ট হবে যে, সে তা সহ্য করতে পারবে না (বোখারী) কোন ব্যক্তির মুখ পর্যন্ত ঘাম হবে, আর সে দূয়া করবে হে আমার প্রভূ! এ মুসিবত থেকে আমাকে মুক্তি দিন। যদিও জাহান্নামেই পাঠানো হোক না কেন? (ত্বাবারানী)
৫। যখন পুলসিরাত জাহান্নামের উপর রাখা হবে, তখন সর্ব দিক অন্ধকার হয়ে যাবে, এমতাবস্থায় লোকদেরকে পুলসিরাত অতিক্রম করার জন্য বলা হবে, যা চুলের চেয়েও হালকা হবে এবং তরবারীর চেয়েও তীক্ষ্ণ হবে। এসময় সমস্ত নবীগণও আল্লাহ্র নিকট নিজের জন্য ক্ষামা চাইতে থাকবে। (মুসলিম)

এ সমস্ত আয়াত ও হাদীস থেকে এ অনুমান করা কষ্টকর নয় যে, মৃত্যুর পর আগত স্তরসমূহ এত কষ্টকর হবে যে তা না, লেখে শেষ করা যাবে আর না, বলে শেষ করা যাবে। কিয়ামতের শুরু হবে সিঙ্গায় ফুঁ দেয়া থেকে, যে ব্যাপারে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ইস্রাফিল (আঃ) সিংঙ্গায় মুখ দিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছেন, আল্লাহ্ নির্দেশ দেয়া মাত্র সিঙ্গায় ফুঁ দিবে এবং কিয়ামত শুরু হয়ে যাবে।
সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী এঘটনা শুক্রবারে ঘটবে। মনুষ নিজ নিজ কাজে মগ্ন থাকবে, আর হঠাৎ করে পূর্ব পশ্চিমের সমস্ত লোক একটি লম্বা আওয়াজ শুনবে, যা আস্তে আস্তে উঁচু হতে থাকবে, এ অস্পষ্ট আওয়াজে ভয়ে ভীত হয়ে মানুষ কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে যাবে, যখন এ আওয়াজ আকাশের গর্জনের ন্যায় বিকট হতে থাকবে তখন মানুষ মরতে শুরু করবে। যে ব্যক্তি যেখনে আছে সে সেখানেই পড়ে যাবে, ইস্রাফিলের সিঙ্গার আওয়াজ যত বিকট হতে থাকবে পৃথিবীর অবস্থা তত পরিবর্তন হতে থাকবে, পৃথিবী ধুলাবালীর সাথে একাকার হয়ে যাওয়া ফানুসের ন্যায় হয়ে, কম্পন শুরু করবে। পাহাড় ধুলাবালী হয়ে উড়তে শুরু করবে, সমুদ্রে আগুন জ্বলতে থাকবে, আকাশ ফেটে যাবে, চন্দ্র-সূর্য, তারকারাজী, আলোহীন হয়ে যাবে। সমস্ত জীব, মানুষ, জ্বিন, ফেরেস্তা, শেষ হয়ে যাবে। এমনকি মালাকুল মাওত ও মৃত্যুবরণ করবে। সমস্ত জীব জন্তু শেষ হয়ে যাবে, শুধু এক মাত্র মহিমাময় মহানুভব আল্লাহই বাকী থাকবেন। আর আল্লাহ্র এ বাণী বাস্তবে রূপ নিবে।
﴿ كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ، وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ ﴾ (سورة الرحمن: ٢٦-٢٧)
অর্থঃ" ভূ-পৃষ্ঠে যা কিছু আছে সমস্তই নশ্বর, অবিনশ্বর শুধু তোমার প্রতিপালকের চেহারা (সত্বা) যিনি মহিমাময় ও মহানুভব।"' (সূরা আর রহমানঃ ২৬-২৭)

যখন সব কিছু শেষ হয়ে যাবে তখন আল্লাহ্ ঘোষণা করবেনঃ اين الجبارون ؟ اين المتكبرون ؟ لمن الملك اليوم ؟
অর্থঃ "কোথায় আধিপত্য বিস্তার কারীরা? কোথায় অহংকার কারীরা? আজকের দিনে কার বাদশাহি?
দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকার পর আল্লাহ্ স্বয়ং উত্তর দিবেন, ﴿ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ ﴾ (سورة غافر : ١٦)
অর্থঃ "এক পরাক্রমশালী আল্লাহ্রই।” (সূরা মুমিনঃ ১৬)
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে- (( انا الملك اين الجبارون المتكبرون ))
অর্থঃ "আমি বাদশা, আধিপত্য বিস্তারকারীরা ও অহংকারকারীরা কোথায়?"

দীর্ঘ সময় চুপ থাকা অবস্থায় পার হয়ে যাবে, যার পরিমাণ সম্পর্কে আল্লাহই ভাল জানেন। অতপর আল্লাহ্ আকাশ, পৃথিবী, ফেরেশতা তৈরী করবেন, নুতন পৃথিবীতে গাছ-পালা, পাহাড়, সমুদ্রের কোন নিদর্শনই থাকবে না; বরং তা পরিষ্কার হবে, উন্মুক্ত ময়দান হবে। যা স্বীয় রবের আলোতে যথেষ্ট আলোকিত হবে। মানুষকে দ্বিতীয় বার সৃষ্টি করার জন্য আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হবে। যার ফলে সমস্ত মানুষ তার মেরু দন্ডের হাড্ডি থেকে পুনরায় সৃষ্টি হবে এবং সেখানে হাড্ডি মাংস লেগে যাবে। এমতাবস্থায় ইস্রাফিলকে দ্বিতীয় বার সিংঙ্গায় ফুঁ দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হবে। আর সমস্ত মানুষ উলঙ্গ হয়ে, খাতনাহীন হয়ে উঠবে। যেমন মায়ের পেট থেকে জন্ম নিয়ে ছিল। আর তখন আল্লাহর এ বাণীর বাস্তবায়ন হবে।
﴿ وَلَقَدْ جِئْتُمُونَا فُرَادَى كَمَا خَلَقْنَاكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ ﴾ (سورة الأنعام : ٩٤)
অর্থঃ "আর তোমরা আমার নিকট এককভাবে এসেছ, যেভাবে আমি তোমাদেরকে প্রথম সৃষ্টি করেছিলাম।” (সূরা আনআ'মঃ ৯৪)
সর্বপ্রথম রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বীয় কবর থেকে উঠবেন। এরপর ঈসা (আঃ) এবং অন্যান্য নবীগণ, শহীদগণ, সৎ, ভাল, ঈমানদ্বারগণ উঠবে। এরপর ফাসেক, ফাজের, এরপর কাফের মুশরেকরা উঠবে। (এব্যাপারে আল্লাহ ই ভাল জানেন)।
কবর থেকে কাফের, মুশরেক, ফাসেক এবং ফাজের লোকেরা নিজ নিজ আমল মোতাবেক উঠবে, কেউ অন্ধ, কেউ মুক, কেউ ল্যাংড়া, কেউ পিপীলিকার আকৃতিতে, কেউ উপুড় হয়ে উপস্থিত হবে, কাফের এ কল্পনাতীত জীবনের অবস্থা দেখে অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত থকবে। চোখ ঘোলা হয়ে যাবে, মন কম্পমান হবে, কলিজা বের হতে চাইবে, কিন্তু কোন সাহায্যকারী থাকবে না। না কেউ কারো দিকে তাকাবে, মনযোগ দিবে।
ঈমানদ্বাররাও স্বীয় আমল অনুযায়ী কবর থেকে উঠবে, শহীদ তার শাহাদাতের তাজা রক্ত নিয়ে উঠবে, ইহরাম পরা অবস্থায় মৃত হাজী তালবীয়া পড়তে পড়তে উঠবে, ঈমানদ্বারদের জন্য পুনরুত্থান অজানা কোন বিষয় নয়, তাই তারা এতে ভীত সন্ত্রস্ত হবে না যেমনটি কাফের ও মুশরেকদের হবে।
কবর থেকে উঠা মাত্র প্রত্যেক মানুষের জন্য দু'জন করে ফেরেস্তা নিয়োগ করা হবে, যারা তাদেরকে হাশরের ময়দান পর্যন্ত পৌছিয়ে দিবে।
উল্লেখ্য সিরিয়া হাশরের ময়দান হবে। লোকেরা স্বীয় কবর থেকে উঠে ওখানে গিয়ে পৌঁছবে। কাফেরদের মধ্যে যারা অন্ধ হয়ে কবর থেকে উঠবে, তারা হোঁচট খেতে খেতে ওখানে গিয়ে পৌঁছবে। যারা পিপিলিকার আকৃতিতে কবর থেকে উঠবে, তারা মানুষের পায়ে পিষ্ট হতে হতে বর্ণনাতীত লাঞ্ছিত হয়ে এ সফর পূর্ণ করবে। কোন কোন কাফেরকে আগুন হাশরের ময়দানে হাকিয়ে নিয়ে আসবে। কাফের ক্লান্ত হয়ে যেখানে থেমে যাবে, আগুনও সেখানে থেমে যাবে, আর যখন চলতে শুরু করবে তখন আগুনও চলতে শুরু করবে।
ঈমানদাররাও স্বীয় বিশ্বাস ও আক্বীদা মোতাবেক হাশরের ময়দানে এসে পৌঁছবে, কোন কোন লোক পায়ে হেঁটে সেখানে উপস্থিত হবে, কেউ উটের ওপর আরোহণ করে, আবার কোন কোন উটের ওপর এক জন, কোনটার ওপর দু'জন, কোনটার ওপর চার জন, এমনকি একটি উটের ওপর দশ জন পর্যন্ত আরোহন করবে। সমস্ত মানুষ নিশ্চুপ অবস্থায় একই লক্ষ্য পানে রওয়ানা হবে। কেউ লম্বা শ্বাস ফেলার সুযোগ পাবে না। প্রত্যেকেই বুঝতে পারবে যে আজ পরীক্ষিত জীবনের রেজাল্ট মিলবে। যখন সমস্ত মানুষ হাশরের ময়দানে এসে উপস্থিত হবে তখন ঘোষণা হবে
وَامْتَازُوا الْيَوْمَ أَيُّهَا الْمُجْرِمُونَ (سورة يس : ٥٩)
অর্থঃ "আর হে অপরাধীরা! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও।” (সূরা ইয়াসীনঃ ৫৯)

সূর্যের পূজাকারী, তারকাপূজারী, অগ্নিপূজক, মূর্তি পূজক, কবর পূজারী, মুনাফেক, মোরতাদদের দল এক দিকে থাকবে, অপর দিকে ঈমানদারদের তাদের আক্বীদা ও আমল অনুযায়ী পৃথক পৃথক দল হবে, আলেম, ওলামাগণের সাথে, সৎ, সৎ লোকদের সাথে, আবেদ, আবেদদের সাথে, মোত্তাকী, মোত্তাকীনদের সাথে, বিনয়ী, বিনয়ীদের সাথে, শহীদ, শহীদদের সাথে, মুজাহিদ, মুজাহিদগণের সাথে, হাফেয, হাফেযদের সাথে, ক্বারী, ক্বারীদের সাথে, দানশীল, দানশীলদের সাথে, ন্যায়বিচারক, ন্যায়বিচারকদের সাথে। দয়ালু, দয়ালুদের সাথে থাকবে। এমনিভাবে ফাসেক ফাজেরদেরও আলাদা আলাদা দল থাকবে। বে-নামাযী, বে-নামাযীর সাথে, বে-রোযা, বে-রোযাদারের সাথে। যাকাত আদায় নাকারী, যাকাত আদায় নাকারীদের সাথে। মাতা-পিতার অবাধ্য, মাতা- পিতার অবাধ্যদের সাথে। হত্যাকারী, হত্যাকারীদের সাথে, ডাকাত, ডাকাতদের সাথে, মদ পানকারী, মদ পানকারীদের সাথে, ব্যভীচারী, ব্যভীচারীদের সাথে, সুদ খোর, সুদ খোরদের সাথে, ঘুষ খোর, ঘুষ খোরদের সাথে, যালেম, যালেমদের সাথে, ছিনতাইকারী, ছিনতাইকারীদের সাথে, খিয়ানত কারী, খিয়ানত কারীদের সাথে, কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা কারী, কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষাকারীদের সাথে, কাফেরদের সাদৃশ্যতা অবলম্ভন কারী, কাফেরদের সাদৃশ্যতা অবলম্ভন কারীদের সাথে।
মূল কথা হাশরের ময়দানে ঈমানদারদের অবস্থান স্থল আলাদা হবে, আর কাফের মুশরেক মুনাফেক, ফাসেক ফাজেরদের অবস্থান স্থল আলাদা হবে। হাশরের ময়দানে মানুষ উলঙ্গ শরীরে থাকবে। সূর্য এক মাইল দূরত্বে থেকে তাপ দিতে থাকবে। পৃথিবী উত্তপ্ত হয়ে থাকবে, শরীর সূর্যের তাপে জ্বলতে থাকবে, যমিনে পা রাখা কঠিন হয়ে যাবে, দূর দুরান্তে কোথাও ছায়া চোখে পড়বে না। লোকেরা স্ব স্ব আক্বীদা ও আমল মোতাবেক ঘামে নিমজ্জিত থাকবে। কারো টাখনা পর্যন্ত, কারো পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত, কারো হাটু পর্যন্ত, কারো রান পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত ঘামে নিমজ্জিত থাকবে। কেউ কেউ বুক ও গদান পর্যন্ত ঘামে নিমজ্জিত থাকবে। কাফেররা মুখ পর্যন্ত ঘামে নিমজ্জিত থাকবে। আবার কেউ কেউ ঘামে হাবুডুবু খেতে থাকবে। ক্ষুধা ও পিপাশায় লোকেরা মারাত্বক অবস্থায় নিপতিত হবে। ক্ষুধা, পিপাশা এবং কঠিন গরমে লোকেরা ৫০ হাজার বছর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকবে এবং ক্লান্ত হয়ে আল্লাহর নিকট দুয়া করবে হে আল্লাহ্! আমাদেরকে এ মুসিবত থেকে মুক্ত কর। যদিও জাহান্নামেই পাঠনো হোকনা কেন। (ত্বাবারানী)
উল্লেখ্য বর্তমানে সূর্য পৃথিবী থেকে ৯ কোট ৩০ লক্ষ মাইল দূরে, এরপরও জুন জুলাই মাসে পৃথিবী এত গরম হয় যে, এক মিনিটের জন্য তাতে খালী পায়ে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে যায়। চিন্তা করুন! ঐ দিন কি অবস্থা হবে যে দিন পৃথিবীর তাপমাত্র আজকের চেয়ে ৯ কোটি গুণ বৃদ্ধি পাবে। নিরূপায় হয়ে লোকেরা আদম (আঃ) এর নিকট গিয়ে উপস্থিত হবে, আর বলবেঃ আল্লাহ্ আপনাকে স্বীয় হাতে তৈরী করেছেন, রূহ দান করেছেন, ফেরেস্তাদের মাধ্যমে সেজদা করিয়েছেন, জান্নাতে স্থান দিয়েছেন, আজ আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন, যেন তিনি হিসাব কিতাব শুরু করে আমাদেরকে হাশরের মাঠের কষ্ট থেকে মুক্তি দেন। আদম (আঃ) বলবেনঃ আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়ে আছেন যে, ইতি পূর্বে আর কখনো তিনি এত রাগ করেন নি, আর না ভবিষ্যতে কখনো এধরণের রাগ করবেন। আমি জান্নাতে আল্লাহ্ নাফরমানী করেছিলাম, তাই আজ আমি নিজের চিন্তায় ব্যস্ত আছি, আজ আমি তোমাদের জন্য সুপারিশ করতে পারব না। তোমরা নূহ (আঃ) এর নিকট যাও। লোকেরা নূহ (আঃ) এর নিকট উপস্থিত হয়ে নিজেদের সমস্যার কথা পেশ করবে, তিনিও তাই বলবেনঃ আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়ে আছেন যে, ইতি পূর্বে আর কখনো তিনি এত রাগ করেন নি, আর না ভবিষ্যতে কখনো এধরণের রাগ করবেন। আমি দুনিয়াতে আমারা কাউমের জন্য বদ দূয়া করেছিলাম, যার ফলে তারা ধ্বংস হয়ে গিয়ে ছিল, আজ আমি আমার নিজের চিন্তাই ব্যস্ত আছি। আমি তোমাদের জন্য সুপারিশ করতে পারব না। তোমরা ইবরাহিম (আঃ) এর নিকট যাও, সে তোমাদের জন্য সুপারিশ করবে, তারা ইবরাহিম (আঃ) এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলবে: আপনি আল্লাহর নবী ও তাঁর খলীল (বন্ধু) অতএব আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুপারিশ করুন।
ইবরাহিম (আঃ) ও ঐ কথাই বলবেন যা আদম ও নূহ (আঃ) বলে ছিলেন। যে আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়ে আছেন যে, ইতি পূর্বে আর কখনো তিনি এত রাগ করেন নি, আর না ভবিষ্যতে কখনো এধরণের রাগ করবেন। আমি দুনিয়াতে তিনটি মিথ্যা কথা বলেছিলাম, যে কারণে আজ আমি নিজের চিন্তায় ব্যস্ত আছি। নাজানি আল্লাহ্ এজন্য আমাকে জিজ্ঞেস করেন।
অতএব তোমরা মূসা (আঃ) এর নিকট যাও, তারা মূসা (আঃ) এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলবেঃ আল্লাহ্ আপনার সাথে কথা বলে সমস্ত লোকদের ওপর আপনাকে মর্যাদাবান করেছেন, আজ আমাদের কি অবস্থা তা আপনি দেখছেন, অতএব আপনি আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন, মূসা (আঃ) বলবেনঃ আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়ে আছেন যে, ইতি পূর্বে আর কখনো তিনি এত রাগ করেন নি, আর না ভবিষ্যতে কখনো এধরণের রাগ করবেন। আমি পৃথিবীতে এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলাম, যার ফলে আজ আমি আমার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত আছি। তাই তোমাদের জন্য কোন সুপারিশ করতে পারব না। তোমরা ঈসা (আঃ) এর নিকট যাও।
তারা ঈসা (আঃ) এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলবেঃ আপনি আল্লাহর রাসূল ও তাঁর রূহ। আজ আমাদের কি অবস্থা তা আপনি দেখছেন, অতএব আপনি আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপরিশ করুন। ঈসা (আঃ) ও ঐ কথাই বলবেন যে, আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়ে আছেন যে, ইতি পূর্বে আর কখনো তিনি এত রাগ করেন নি, আর না ভবিষ্যতে কখনো এধরণের রাগ করবেন।
তোমরা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট যাও, সে তোমাদের জন্য সুপারিশ করবে। লোকেরা নবীগণের সর্দার, রহমাতুল লিল আলামীন, শাফিউল মযনাবিন এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলবে: আপনি আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী, আল্লাহ্ আপনার আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দিয়ে ছেন, আপনি আমাদের কি অবস্থা তা দেখছেন, অতএব আপনি আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। যেন তিনি আমাদের হিসাব কিতাব শুরু করেন।
রহমতের রাসূল বলবেনঃ হাঁ আজকে সুপারিশের উপযুক্ত আমিই, তাই নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে হাশরের মাঠে সুপারিশের সম্মান জনক স্থান "মাকামে মাহমুদে” পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। যা জান্নাতে আল্লাহ্র আরশের নিচে থাকবে, ওখানে পৌঁছে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বীয় রবের নিকট সেজদায় পড়ে যাবেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও সানা পড়বেন, এর পর যখন আল্লাহ্ রাগ কমে আসবে তখন আল্লাহ্ বলবেনঃ হে মুহাম্মদ মাথা উঠাও, চাও দেয়া হবে। সুপারিশ কর কবুল করা হবে। এটিই হবে শাফায়াত কোবরা (বড় সুপারিশ) বড় সুপারিশ কবুল হওয়ার পর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাকামে মাহমুদ থেকে হাশরের মাঠে ফিরে আসবেন।
এর পর আল্লাহ্ ফেরেস্তাদের বেষ্টনীতে হাশরের মাঠে অবতরণ করবেন। ফেরেস্তারা হাশরের মাঠেত্ম আসে পাশে কাতার বন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। আট জন ফেরেস্তা আল্লাহর আরশ ধরে থাকবে। আল্লাহ্র আদালত স্থাপন করা হবে। ফেরেস্তা, নবী, ওলী, সৎ লোকদেরকে সাক্ষী হিসেবে ডাকা হবে। ফেরেস্তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হবে, তারা যেন লোকদের মাঝে তাদের আমল নামা বন্টন করে, ঈমানদার দেরকে তাদের আমলনামা তাদের সামনের দিক দিয়ে দেয়া হবে, কাফেরদেরকে তাদের আমলনামা পিছনের দিক দিয়ে বাম হাতে দেয়া হবে, আমলনামার মধ্যে দৃষ্টি পড়া মাত্রই মানুষের স্মৃতি ভেসে উঠবে, ভুলে যাওয়া অতীতের সব কিছু তরতাজা হয়ে উঠবে। ঈমানদারদের উজ্জল চেহারা আরো উজ্জল হবে, তারা খুশি মনে অন্যদেরকে নিজেদের আমলনামা দেখিয়ে বলবেঃ
﴿هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهْ﴾ (سورة الحاقة : ١٩)
অর্থঃ “নাও আমার আমল নামা পড়ে দেখ।" (সূরা হাক্কাঃ ১৯)
কাফের মুশরেকদের কাল চেহারা আরো কাল হবে, তাদের চেহারায় লাঞ্ছনার ছাপ স্পষ্ট হবে। লাঞ্ছিত অপমানিত হয়ে তারা তাদের হাত কামড়াতে থাকবে আর বলবেঃ হায়! আমাকে যদি আমার আমলনামা না দেয়া হত।
﴿يَا لَيْتَنِي لَمْ أُوتَ كِتَابِيَهْ﴾ (سورة الحاقة : ٢٥)
অর্থঃ "হায়! আমাকে যদি আমার আমলনামা না দেয়া হত।” (সূরা হাক্কাঃ ২৫)
﴿وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهْ﴾ (سورة الحاقة : ٢٦)
অর্থঃ "আর আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব।" (সূরা হাক্কাঃ ২৬)
কাফের মুশরেকরা বার বার তাদের আমলনামা দেখতে থাকবে, আর আশ্চার্য হয়ে বলতে থাকবে, কি আজব আমল নামা। যাতে সমস্ত বড় ছোট আমল লিখিত রয়েছে।
﴿يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا ﴾ (سورة الكهف: ٤٩)
অর্থঃ "হায় দুর্ভোগ আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! ওটাতো ছোট বড় কিছুই বাদ দেয় না, বরং ওটা সমস্ত হিসাব রেখেছে।" (সূরা কাহাফঃ ৪৯)

আমলনামা বন্টনের পর প্রশ্ন উত্তর পর্ব শুরু হবে।
আল্লাহ্ যার যার সাথে চাইবেন তার সাথে সরাসরি কথা বলবেন, সর্ব প্রথম মুশরেকদেরকে জিজ্ঞেস করবেন যে, তারা কেন শিরক করেছিল, মুশরিকরা অস্বীকার করে আল্লাহ্র কসম করে বলবেঃ আমরাতো কখনো শিরক করি নাই।
﴿وَاللَّهِ رَبِّنَا مَا كُنَّا مُشْرِكِينَ﴾ (سورة الأنعام : ٢٣)
অর্থঃ "আল্লাহ্র কসম! হে আমাদের প্রতিপালক আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (সূরা আনআমঃ ২৩)
আল্লাহ্ কিরামান কাতেবীনদেরকে সাক্ষী দেয়ার জন্য ডাকবেন, তারা মুশরিকদের শিরকের সাক্ষী দিবে; কিন্তু মুশরিকরা তখনও তা অস্বীকার করবে। শিরকে ভরপুর তাদের আমল নামা তাদের সামনে পেশ করা হবে, কিন্তু তারা তাও অস্বীকার করবে।
অতঃপর ঐ যুগের নবী, ওলামাগণকে সাক্ষী হিসেবে ডাকা হবে, তারাও তাদের শিরকের ব্যাপারে সাক্ষী দিবে; কিন্তু তারা তাদের সাক্ষীকে অস্বীকার করবে। তখন কবর বা মাযারের ঐ স্থান যেখানে শিরক করা হত, তা সাক্ষি দেয়ার জন্য আনা হবে; কিন্তু মুশরিকরা তাও অস্বীকার করবে। এমন কি আল্লাহকে সম্বোধন করে বলবেঃ হে আল্লাহ্! তুমি কি তোমার বান্দাদেরকে যুলুম থেকে বাঁচাও নি? আল্লাহ্ বলবেনঃ হাঁ। আমি আমার বান্দাদেরকে যুলুম থেকে রক্ষা করেছি। মুশরিকরা বলবেঃ আজ আমারা আমাদের অঙ্গ পতঙ্গের সাক্ষী ব্যতীত আর কারো সাক্ষী মানব না। অতএব আল্লাহ্ তাদের মুখ বন্ধ করে দিবেন। আর তাদের অঙ্গ পতঙ্গকে সাক্ষী দিতে বলবেন। তখন মুশরিকদের অঙ্গ পতঙ্গ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবে যে, হাঁ তারা বাস্তবেই শিরক করত। তখন তাদের ওপর জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে যাবে। মুশরিকরা তাদের অঙ্গ পতঙ্গকে অভিশাপ দিতে থাকবে যে, আমরাতো তোমাদেরকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করতে ছিলাম। উত্তরে অঙ্গ পতঙ্গ বলবেঃ যে আল্লাহ্ তোমাদেরকে কথা বলার শক্তি দিয়ে ছিল, তিনিই আমাদেরকে কথা বলার নির্দেশ দিয়ে ছিলেন, অতএব আমরা কি করে তা অস্বীকার করব?
এক মুনাফেককে আল্লাহ্ জিজ্ঞেস করবেন আমি কি তোমাকে দুনিয়াতে সম্মান, ক্ষমতা, পরিবার পরিজন, ধন-সম্পদ দেই নি? সে বলবেঃ কেন নয় হে আল্লাহ্! সবকিছুই দিয়ে ছিলে। আল্লাহ্ আবার জিজ্ঞেস করবেনঃ তোমার কি ধারণা ছিল যে, কিয়ামত হবে? এবং আল্লাহর সামনে জওয়াবদেহি করতে হবে? মুনাফেক বলবেঃ হাঁ হে আমার রব। আমার পূর্ণ ধারণা ছিল, আমি তোমার কালিমা পড়েছি, তোমার কিতাবের প্রতি ঈমান এনেছি, তোমার রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি, নামায আদায় করেছি, রোযা রেখেছি, যাকাত দিয়েছি। মুনাফেক স্বীয় প্রশংসায় সারা দিন শেষ করে দিবে, আল্লাহ্ বলবেনঃ আচ্ছা একটু থাম আমি আরো কিছু সাক্ষী নেই। মুনাফেক নিজে নিজে চিন্তা করবে আমিতো মুসলমানদের সাথে থেকে নামায রোযা করতাম, আজ আমার বিরুদ্ধে কে সাক্ষী দিবে? আল্লাহ্ তার মুখ বন্ধ করে দিবেন, আর তার রানকে কথা বলার সুযোগ দিবেন, তখন তার রান, তার শরীরের মাংস, তার শরীরের হাড্ডি, এমনকি তার শরীরের রন্দ্র রন্দ্র তার মুনাফেকীর সাক্ষী দিবে। যে সে তো এক দিকে নামায রোযা করত, কিন্তু অন্য দিকে কাফেরদের সাথে বন্ধুত্বে সন্তুষ্ট ছিল। তাদের উপকার করার চেষ্টা করত, মুসলমানদেরকে ধোঁকা দিত, তাদের সাথে গাদ্দারী করত, আল্লাহ্ তার প্রতি অত্যন্ত রাগান্বিত হবেন এবং তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে যাবে।
ঈমানদারদের সাথে প্রশ্ন উত্তরের ধরণ সম্পূর্ণ আলাদা হবে। এক জন মুমেন ব্যক্তিকে আল্লাহ্র কাছে ডেকে, তাকে স্বীয় রহমত দিয়ে ঢেকে দিবেন। আর জিজ্ঞেস করবেন, তুমি ওমুক গোনাহ করে ছিলা? মুমেন বলবেঃ হাঁ হে আল্লাহ্। আল্লাহ্ তাকে প্রত্যেক পাপের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন, আর সে স্বীকার করতে থাকবে এবং চিন্তা করতে থাকবে যে, এখন তো তার ধ্বংস নিশ্চিত, শেষে আল্লাহ্ বলবেনঃ আমি দুনিয়াতেও তোমার গোনাহ ঢেকে রেখেছিলাম, আজও ঢেকে রাখলাম এবং তাকে জান্নাতে পাঠিয়ে দেয়া হবে।
এমনি ভাবে নবী রাসূলগণকে মিথ্যায় প্রতিপন্ন কারীদেরকেও প্রশ্ন করা হবে। নূহ (আঃ) এর কাউমকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমরা নবীকে কেন মিথ্যায় প্রতিপন্ন করেছিলা? তারা নূহ (আঃ) ও তাঁর দাওয়াতকে অস্বীকার করবে। আল্লাহ্ নূহ (আঃ) কে জিজ্ঞেস করবেন, নূহ তুমি তোমার স্ব পক্ষে কোন সাক্ষী আন। নূহ (আঃ) বলবেনঃ আমার সাক্ষী উম্মতে মুহাম্মদী। তখন উম্মতে মুহাম্মদীর ওলামা, ওলী, সৎ লোকদেরকে উপস্থিত করা হবে, আর তারা সাক্ষী দিবে যে, হাঁ নূহ (আঃ) নবী হিসেবে প্রেরিত হয়ে ছিল এবং তিনি ৯৫০ বছর পর্যন্ত রিসালাতের দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করেছেন। নূহ (আঃ) কাউম বলবেঃ তোমরাতো আমাদের যুগে ছিলোনা, তোমরা এ সাক্ষী কি করে দিচ্ছ? তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আনা হবে, তিনি তাঁর উম্মতের সত্যতার সাক্ষী দিবেন যে, আমার উম্মত, কোরআ'ন মাজীদের আলোকে সম্পূর্ণ সত্য সাক্ষী দিয়েছে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এ সাক্ষীর পর কাউমে নূহ লা-জাওয়াব হয়ে যাবে এবং মোজরেম হিসেবে চিহ্নিত হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। এমনি অবস্থা হবে হুদ, সালেহ, শুআইব, লুত (আঃ) সহ অন্যান্য নবীদের উম্মতদেরও। মোজরেম প্রমাণিত হওয়ার পর কাফের আল্লাহ্র নিকট আবেদন করবে যে, হে আমাদের রব! আমরা সব কিছু দেখেছি এবং শুনেছি, শুধু এক বার আমাদেরকে দুনিয়াতে পাঠিয়ে দাও, তখন আমরা অবশ্যই সৎ কাজ করব। বলা হবে, এটা সম্ভব নয়, এখনতো তোমাদেরকে তোমাদের কৃত কর্মের জন্য সর্বদা শাস্তি ভোগ করতে হবে।
কাফেররা আবার আবেদন করবে যে, হে আল্লাহ্ আমাদের পথভ্রষ্টতার দায়িত্বশীল আমাদের নেতারা, তাদেরকে আমাদের তুলনায় দ্বিগুণ শাস্তি দিন। বলা হবে, তোমাদের এ প্রস্তাবও গ্রহণ যোগ্য নয়। পথভ্রষ্টদেরকে পথভ্রষ্টতার শাস্তি দেয়া হবে, আর পথভ্রষ্ট কারীদেরকে পথভ্রষ্ট করার শাস্তি দেয়া হবে। স্ব স্ব স্থানে তোমরা উভয়েই মোজরেম অতএব তোমাদের প্রত্যেকেরই স্ব স্ব শাস্তি ভোগ করতে হবে।
হাশরের মাঠে এধরণের প্রশ্ন উত্তর ছাড়াও অন্যান্য অমলেরও হিসাব কিতাব হবে। আল্লাহর হকের মধ্যে নামাযের হিসাব সর্ব প্রথম হবে, যে ব্যক্তি নামাযের হিসাবে সফলকাম হবে ইনশাআল্লাহ্ অন্যান্য আমলসমূহের ব্যাপারেও সে কামিয়াব হবে। আর যে ব্যক্তি নামাযের হিসাবে সফল না হবে, সে অন্যান্য আমলের হিসাবের সময়ও সফল হতে পারবে না। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ "নামায জান্নাতের চাবি।
বান্দার হকের মধ্যে সর্ব প্রথম কতলের হিসাব নেয়া হবে। এর পর অন্যান্য আমলের হিসাব। নিহতকে হত্যাকারীর পক্ষ থেকে, অত্যাচারীতকে অত্যাচারীর পক্ষ থেকে, অত্বসাত কৃতকে আত্মসাতকারীর পক্ষ থেকে, যবরদস্তি কৃতকে যবরদস্তি কারীর পক্ষ থেকে, প্রজাকে রাজার পক্ষ থেকে, হক আদায় করা হবে। আল্লাহ্ বলবেনঃ আমি বাদশা এবং হক আদায়কারী। আজ কোন জাহান্নামী ততক্ষণ পর্যন্ত জাহান্নামে যেতে পারবে না যতক্ষণ না কোন জান্নাতীকে তার হক আদায় না করে দিব। আর কোন জান্নাতী ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে যেতে পারবে না যতক্ষণ না কোন জাহান্নামীকে তার হক আদায় করে না দিব"। (ত্বাবারানী)
সাধারণ যুলুম, সাধারণ অতিরিক্ততার হকও আল্লাহ্ হকদারকে আদায় করে দিবেন। যদি কেউ একটি ডাল বরাবরও কারো কোন হক নষ্ট করে থাকে, বা কাউকে অপমান করে থাকে, তাহলে আল্লাহ্ এর বদলাও নিবেন। এমনকি কেউ যদি কোন জন্তুর প্রতিও যুলুম করে থাকে তাহলে ঐ প্রাণীর বদলাও আল্লাহ্ নিবেন এবং কোন জন্তু যদি অন্য কোন জন্তুর প্রতি যুলুম করে থাকে, তাহলে তাদের জন্যও একের হক অপরের কাছ থেকে আদায় করার জন্য তাদেরকে জিবীত করা হবে এবং মাযলুম জন্তুদেরকে যালেম জন্তুদের পক্ষ থেকে হক আদায় করে দেয়া হবে। এর পর তাদেরকে পুনরায় মৃতবরণের জন্য হুকুম দেয়া হবে।
বদলা বা হক আদায় হবে নেকীর বিনিময়ে, যালেম মাষলুমের ওপর যতটুকু যুলুম করেছে, ঐ পরিমাণ তার নেকী নিয়ে মাযলুমকে দেয়া হবে। আর যদি যালেমের আমল নামায় কোন নেকী না থাকে, তাহলে মাযলুমের গোনাহ যালেমকে চাপিয়ে দেয়া হবে।
হক আদান প্রদানের পর সমস্ত মানুষের আমল নামা শেষ বারের ন্যায় ওযন করার প্রস্তুতি নেয়া হবে, আর প্রমাণিত করার জন্য মিযান স্থাপন করা হবে। মিযানে যাদের নেকীর পাল্লা ভারী হবে সে সফল হবে এবং জান্নাতে যাবে। আর যাদের পাপের পাল্লা ভারী হবে তারা জাহান্নামে যাবে। পাল্লায় কোন কোন লোকের একটি নেকী কম বা বেশি হওয়ার কারণে, তাকে জান্নাতী বা জাহান্নামী হওয়ার ফায়সালা হবে। প্রত্যেক ব্যক্তির আমল ওজন করার সময় এক ফেরেস্তা ঘোষণা করবে যে, ওমুকের ছেলে ওমুক কামিয়াব হয়েছে। বা ওমুকের ছেলে ওমুক সফলকাম হতে পারে নাই। (এব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন)
মানুষের আমলনামার ওজন তার ঈমান ও আক্বীদা অনুযায়ী হবে। কাফের, মুশরেক, মোরতাদ, এবং মুনাফেকদের অসংখ্য নেক আমল বিন্দু পরিমাণ ওজন হবে না। অথচ এক জন মোমেন ব্যক্তির আমল নামা হাজারো পাপে পরিপূর্ণ থাকবে, আর আল্লাহর প্রশ্নের উত্তরে সে তার পাপের কথা মেনে নেয়ার কারণে, আল্লাহ্র নির্দেশে তার আমল মিজানে উঠানো হবে, আর নেকীর পাল্লায় ছোট একটি কাগজ রেখে দেয়া হবে, যেখানে কালিমায়ে তাওহীদ লিখে দেয়া হবে, আর ঐ কালিমায়ে তাওহীদ তার হাজারো পাপের চেয়ে ভারী হবে। সে তখন জান্নাতে চলে যাবে।
মিযান ঐ তিনটি স্থানের একটি, যা সম্পর্কে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) বলেছেনঃ যে ওখানে কোন ব্যক্তি অন্য কোন ব্যক্তির কথা স্মরণ করতে পারবে না, আর না কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারবে, না কেউ কারো কোন উপকারে আসবে। যদি মিযানে কারো একটি নেকী কম হয়, তাহলে সমগ্র হাশরের মাঠে কোন এক ব্যক্তি তাকে একটি নেকী দিবে না, না পিতা, না ছেলে, না মেয়ে, না স্ত্রী, না কোন বন্ধু, বরং সবাই একে অপরের কাছ থেকে দূরে থাকবে।
সবচেয়ে বিপদজনক পর্যায় হবে পুলসিরাত, প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ওপর দিয়ে অতিক্রম করে জান্নাতে যেতে হবে। পুল সিরাত চুলের চেয়ে পাতলা এবং তলওয়ারের চেয়ে ধারাল হবে। যা জাহান্নামের ওপর স্থাপন করা হবে এবং লোকদেরকে তার ওপর দিয়ে অতিক্রম করার জন্য বলা হবে। তা অতিক্রম করার আগে সমগ্র হাশরের ময়দান অন্ধকার করে দেয়া হবে।
পুলসিরাত অতিক্রম করার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আমল ও আক্বীদা মোতাবেক আলো দেয়া হবে। ঈমানদারদেরকে দু'টি ঈমানের মশাল দেয়া হবে। আবার কাউকে একটি মশাল দেয়া হবে, কাউকে মিট মিট করে জ্বলে এধরণের চেরাগের আলো দেয়া হবে, আর সবচেয়ে কম ঐ ব্যক্তির হবে, যার পায়ের আংটির মধ্যে আলো থাকবে। ঈমানদাররা পুলসিরাত পার হওয়ার সময় আল্লাহর নিকট দূয়া করবে:
(أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ) (سورة التحريم : ٨)
অর্থঃ "হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জ্যোতিকে পূর্ণতা দান করুন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন, আপনি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান।” (সূরা তাহরীমঃ ৮)

কোন কোন ঈমানদার বিজলীর গতীতে পুলসিরাত পার হবে, আবার কেউ কেউ বাতাসের গর্তীতে, আবার কেউ কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতীতে, আবার কেউ কেউ দ্রুতগামী উটের গর্তীতে, কেউ কেউ দৌড়াতে দৌড়াতে, আবার কেউ কেউ স্বাভাবিকভাবে চলতে চলতে, আবার কেউ কেউ এক বার পড়ে যাবে, আবার উঠে দাঁড়াবে এভাবে তা অতিক্রম করবে, কেউ যখম হয়ে অতিক্রম করবে, পুলসিরাতের উভয় পার্শ্বে হুক বসানো থাকবে, যা আল্লাহ্র নির্দেশে কোন কোন লোককে চলার পথে শুধু বাধা দিবে, আবার কাউকে পুলের ওপরই বার বার ফেলে দিবে, আবার কোন কোন লোককে শুধু যখম করবে, আর কাউকে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।
কিছু কিছু লোক সামান্য চলার পরই তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে দেয়া হবে। আবার কিছু লোক কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। কেউ কেউ পুলসিরাত পার হওয়ার সামান্য বাকী থাকতে তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। মানুষের সৎ আমল শুধু পুলসিরাতে আলোই যোগাবে না বরং মানুষকে হেফাযতও করবে। পুলসিরাত পার হওয়ার দৃশ্য এত ভয়ানক হবে যে, কারো মুখ দিয়ে কোন কথা বের হবে না। শুধু নবীগণের মুখ দিয়ে এ আওয়াজ বের হতে থাকবে যে, "হে আল্লাহ্ বাঁচাও হে আল্লাহ্ বাঁচাও”। সর্বপ্রথম পুল সিরাত পার হবে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং তাঁর উম্মতগণ এর পর অন্যান্য নবীগণ ও তাদের উম্মতগণ। (আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন)
পুলসিরাত পার হওয়ার পর সমস্ত ঈমানদারদেরকে 'কান্তারা' পুলসিরাতের সর্বশেষ প্রান্তে থামিয়ে দেয়া হবে, যে সমস্ত মুসলমানদের মাঝে কোন ভুল বুঝা বুঝি ছিল, তাদেরকে দূরে সরিয়ে দেয়া হবে, যখন সমস্ত ঈমানদার পরিপূর্ণভাবে পবিত্র হয়ে যাবে তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জান্নাতের দরজায় এসে উপস্থিত হবেন, তখন দরজা খোলা হবে, তিনি তাঁর উম্মতসহ জান্নাতে পদার্পন করবেন। জান্নাতে প্রবেশের পর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্বীয় উম্মতের কথা চিন্তা করবেন, তিনি তাঁর উম্মতের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন, যখন তিনি জানতে পারবেন যে, তাঁর অসংখ্য উম্মত জাহান্নামে রয়ে গেছে তখন তিনি আল্লাহ্র নিকট সিজদায় পড়ে যাবেন, আল্লাহ্র প্রশংসা করার পর সুপারিশের অনুমতি চাইবেন, দীর্ঘক্ষণ সেজদায় থাকার পর হুকুম হবে যে, হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যাও তোমার উম্মতের মধ্যে যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ ঈমান আছে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাও। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ফেরেস্তাদেরকে নিয়ে গিয়ে, স্বীয় উম্মতের বাছাইকৃত লোকদেরকে সাথে নিয়ে জাহান্নামের পার্শ্বে গিয়ে বলবেনঃ নিজ নিজ আত্মীয় স্বজন, নিজ নিজ পরিচিত লোকদের নিদর্শন কি বল, যাতে ফেরেস্তারা তাদেরকে বের করে নিয়ে আসতে পারে। তখন যাদের অন্ত রে বিন্দু পরিমাণ ঈমান ছিল, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। তখন জান্নাতের এক চতুর্থাংশ লোক রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উম্মত হবে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সুপারিশ দেখে অন্যান্য নবীগণও তাদের উম্মতদের জন্য সুপারিশ করবে। উম্মতে মুহাম্মাদীর শহীদ, ওলামা, ওলী এবং সৎ লোকদেরকের সুপরিশের অনুমতি দেয়া হবে। আর তারাও তাদের আত্মীয় স্বজন, পরিচিত জনদেরকে সুপারিশ করে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে নিয়ে আসবে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জান্নাতে ফিরে এসে আবার স্বীয় উম্মত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। এখন আমার উম্মতের মধ্যে কি পরিমাণ জাহান্নামে বাকী রয়েছে? বলা হবে এখনো অসংখ্য পরিমাণ জাহান্নামে রয়ে গেছে। তখন তিনি সুপারিশের অনুমতির জন্য সেজদায় পড়ে যাবেন, আল্লাহ্র হামদ ও সানা করবেন, তখন তাঁকে আবার সুপারিশের অনুমতি দেয়া হবে, যে যাদের অন্তরে পিপড়ার ন্যায় বা বিন্দুর চেয়েও কম পরিমাণ ঈমান আছে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। সুপারিশের অনুমতি পাওয়ার পর তিনি আবার ফেরেস্তাদের সাথে স্বীয় উম্মতের ওলামা, নেককার, ওলীদেরকে সাথে নিয়ে, জাহান্নামের পাশে গিয়ে পৌঁছবেন এবং উম্মতের ঐ সমস্ত ব্যক্তিদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করবেন, যাদের অন্তরে বিন্দুর চেয়েও কম পরিমাণ ঈমান ছিল, তখন তাঁর উম্মত জান্নাত বাসীদের অর্ধেক হবে। চতুর্থ বার আবার রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঐ সমস্ত লোকদের জন্য সুপারিশ কামনা করবেন যারা, সারা জীবনে এক বার লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ পড়েছে। তখন আল্লাহ্ বলবেন আমার ইজ্জত, মর্যাদা ও গৌরবের কসম! যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে তাদেরকে আমি স্বয়ং জাহান্নাম থেকে বের করব। অতপর সব শেষে স্বয়ং আল্লাহ্ ঐ সমস্ত লোকদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। যারা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ পড়েছে। জান্নাতীরা ঐ সর্বশেষে জাহান্নাম থেকে মুক্তি প্রাপ্তদেরকে 'ওতাকা উর রহমান' আল্লাহ্ আযাদ কৃত বলে ডাকবে'।
সুপারিশের ধারাবাহিকতা শেষ হওয়ার পর এবং সমস্ত জান্নাত বাসী জান্নাতে প্রবেশ করার পর জান্নাতীদের স্বীয় আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশীদের সাথে সাক্ষাতের আগ্রহ পয়দা হবে। আর তারা তাদেরকে দেখার এবং মিলিত হওয়ার আবেদন জানাবে। তখন আল্লাহ্ বলবেনঃ সন্তানদেরকে তাদের পিতা-মাতার সাথে মিলিত করে দাও। তখন সমস্ত জান্নাতীদের পরিবার-পরিজনকে একত্রিত করে দেয়া হবে। জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশের পর, আর জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশের পর, সবাইকে ঘোষণা করা হবে যে, হে জান্নাতীরা! জান্নাতের কিনারে আস। হে জাহান্নামীরা জাহান্নামের কিনারে আস। অধিবাসীদ্বয় নির্বাক্যে আহ্বানকারীর প্রতি কান পেতে থাকবে, একটি বকরী আনা হবে, যার সম্পর্কে জান্নাত ও জাহান্নামের অধিবসীদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে যে, তোমরা কি তাকে চিন? উভয় আধিবাসী বলবে যে হাঁ আমরা তাকে চিনি সে মৃত্যু। এর পর আল্লাহ্ ঐ বকরীকে যবেহ করে দেয়ার নির্দেশ দিবেন, এর পর ঘোষণা করা হবে যে, হে জান্নাতীরা তোমরা চিরকাল জান্নাতে থাকবে। তোমাদের কখনো মৃত্যু হবে না। আর হে জাহান্নামীরা তোমরা চির কাল জাহান্নামে থাকবে, তোমাদেরও কখনো মৃত্যু হবে না। একথা শুনে জান্নাতীরা এত খুশি হবে যে, যদি খুশিতে মারা যাওয়া সম্ভব হত, তাহলে জান্নাতীরা খুশিতে মরে যেত। জাহান্নামীরা এ ঘোষণা শুনে এত ব্যাথীত হবে যে যদি কষ্টের কারণে মৃত্যু সম্ভব হত, তাহলে তারা কষ্টে মরে যেত।
সিংঙ্গায় ফুঁ দেয়া থেকে নিয়ে জান্নাত বা জাহান্নামে পৌঁছা পর্যন্ত এ গুলো ঐ সমস্ত স্তর, যা সমস্ত মানুষকে অতিক্রম করতে হবে। ঐ বিস্তারিত বর্ণনা সম্পর্কে আমরা পাঠকদেরকে একটি গুরুত্ব পূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি পাত করাতে চাই যে, উল্লেখিত বর্ণনা থেকে নিম্নক্ত দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়।
১। পরকালের দুঃখ্য কষ্টের তুলনায় দুনিয়ার দুঃখ্য কষ্ট অনেক কম।
২। পরকালের অশেষ নে'মতের তুলনায় দুনিয়ার নে'মতসমূহ একেবারেই নগণ্য।
অতএব জ্ঞানীদের উচিত যে তারা দুনিয়ার দুঃখ্যে কষ্টে পড়ে যেন আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী না করে, আর না দুনিয়ার রং তামাশায় মেতে গিয়ে, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অসন্তুষ্ট করে, বরং উভয় অবস্থায় তাদের দৃষ্টি যেন পরকালে আগত স্তর গুলোর প্রতি থাকে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে জিজ্ঞেস করা হল ইয়া রাসূলাল্লাহ্! মোমেনদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞনী কে? তিনি বললেনঃ যে বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করে এবং মৃত্যুর পর আগত স্তর গুলোর জন্য প্রস্তুতি নেয়, সে সবচেয়ে বেশি জ্ঞনী। (ইবনু মাযা)
পরিশেষে আমরা একথা স্পষ্ট করা জরুরী বলে মনে করছি যে, প্রথম সিঙ্গায় ফুঁ থেকে নিয়ে, জান্নাত বা জাহান্নামে পৌঁছা পর্যন্ত সমস্ত ঘটনাবলীর ধারা বাহিক হুবহু বিন্যাস শুধু মুশকিলই নয় বরং কোন কোন স্থানে ঘটনাবলীর হুবহু বিন্যাসে শূন্যতাও অনুভব হয়, ঘটনাবলীর ধারাবাহিক বিন্যাসে যতটুকু শূন্যতা মনে হবে তা আমি আমার পক্ষ থেকে পূর্ণ করি নাই, বরং যেভাবে বা যতটুক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে ততটুকু বর্ণনাই আমি করেছি। এমনিভাবে ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতায়ও আমি আমার পক্ষ থেকে সাজাই নাই বরং শাহ রফিউদ্দীন (রাহিমাহুল্লাহর) “কিয়ামত নামাহ” নামক গ্রন্থ থেকে নিয়েছি। যদি এ ধারাবাহিকতা সঠিক হয় তাহলে এজন্য আল্লাহর উপর আশা করছি। আর যদি কোথাও কম বেশি হয় তাহলে এজন্য তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। নিঃসন্দেহে তিনিই আমাদের গোনাহসমূহের ক্ষমাকারী এবং আমাদের প্রতি রহমকারী।

আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস আমল সংশোধনের উত্তম পদ্ধতি
মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বার জীবিত হয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হয়ে, স্বীয় আমলের জবাবদেহী করার আকীদা এমন এক ব্যতিক্রমধর্মী আকীদা যে ব্যক্তি সত্য অনুকরণে, আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস করে, তার জীবনে তা বিরাট পরিবর্তন আনবে। কোরআনে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনাবলী এ সত্যের সাক্ষী দেয়, যে ব্যক্তি বা জাতি পরকালে অবিশ্বাস করত তারা দুনিয়াতে যালেম, অপহরন, নাফরমানী এবং অবাধ্য হয়ে জীবন যাপন করত। পৃথিবীতে ফেতনা ফাসাদ সৃষ্টি করেছে। রক্তপাত করেছে, ক্ষতি বাড়ী বরবাদ করেছে। কিন্তু যে ব্যক্তি বা জাতি আখেরাতে বিশ্বাসী হয়েছে তাদের জীবন দিন দিন পরিবর্তন হয়েছে, যারা আগে যালেম, অপহরনকারী ছিল, সে শান্তি ও নিরাপত্তার ধারক বাহক হয়ে গেছে। যারা আগে একে অপরের রক্তপাতের প্রতি কাঙ্ক্ষিত ছিল, তারা একে অপরের সংরক্ষক হয়ে গেছে। যে আগে চুরী ডাকাতি করত, সে মোত্তাকী পরহেজগার হয়ে গেছে। যে প্রথমে ধিয়ানতকারী ও মিথ্যাুক ছিল, সে বিশ্বাসী ও সত্যবাদী হয়ে গেছে।
এর হাকীকতও এই যে, পরকালে বিশ্বাসী হওয়া, মানুষের মধ্যে এমন এক পাহাড়াদার নিযুক্ত করে যে, তাকে কদমে কদমে প্রত্যেক ছোট বড় গোনাহ থেকে বাঁধা দেয়। তাকে যালেম, অপহরন, নাফরমানী করতে দেয় না। সর্বদা চাই একাকী হোক আর জনসম্মুখে, দিনের আলোতে হোক আর রাতের অন্ধকারে, আল্লাহর নিকট জবাবদেহিতার ভয় তাকে ভীত সন্ত্রস্ত করে রাখে।

সাহাবাগণের জীবনে পরকাল বিশ্বাসের কিছু দৃষ্টান্ত
ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর শাসনামলে বাহরাইন থেকে কিছু গনীমতের মাল আসল, আর এর মধ্যে কিছু মেশক আম্বর ও ছিল, তা বন্টনের জন্য লোক খোঁজা হচ্ছিল, তখন আমীরুল মুমেনীন ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর স্ত্রী বললঃ আমি এ খিদমতে আঞ্জাম দিতে পারব। ওমর বললঃ আমার ভয় হয় যে, মেশক আম্বর তোমার আঙ্গুলে লেগে যাবে, যা তুমি তোমার শরীরে মাখবে, আর একারণে কিয়ামতের দিন তোমাকে এর জওয়াবদেহী করতে হবে। এ সর্তকতা সত্বেও ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর মধ্যে এত আল্লাহ ভীতি ছিল যে, নামাযে এ আয়াতে পৌঁছলে :
إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعٌ ، مَا لَهُ مِن دَافِعٍ (سورة الطور : ۷،۸)
অর্থঃ "তোমার প্রতিপালকের শাস্তি অবশ্যম্ভাবী, এর নিবারণকারী কেউ নেই।” (সূরা তুরঃ ৭-৮)
কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলে গেল।

মদ হারাম হওয়া সম্পর্কে যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হল "হে লোকেরা যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছ! মদ, জুয়া, মূর্তি পূজা, লটারীর তীর শয়তানী কাজ, এ থেকে দূরে থাক, যাতে মুক্তি পেতে পার।” (সূরা মায়েদাঃ ৯০)
ঐ সময়ে কিছু লোক ত্বালহা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর ঘরে, মদ পান করতে ছিল, আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মদ পান করাইতে ছিল, আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক আহ্বান কারীকে মদীনায় ঘোষণা করার জন্য পাঠালেন, লোকেরা যখন আহ্বান কারীর আওয়াজ পেল, তখনই প্রত্যেক ব্যক্তি মদ থেকে হাত তুলে নিল, পাতিল থেকে মদ নিক্ষেপ করতে লাগল, মদের মটকা ভাংতে লাগল। সাহাবাগণ বলেনঃ মদীনার অলি গলিতে এত মদ প্রবাহিত হল যে, নিম্ন এলাকায় মদ জমে গেল, কোন কোন সাহাবী তৈরী কৃত মদ বিক্রি করার অনুমতি চাইলে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তা হারাম। তখন তা সাথে সাথে নষ্ট করে দেয়া হল। এক ব্যক্তি বললঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার নিকট বিক্রির উপযোগী মদ আছে, এতে এতীমের পয়শা বিনিয়োগ করা হয়েছে। উত্তরে তিনি বললেনঃ এতীমের পয়শা আমি আদায় করে দিব। তুমি মদ নষ্ট করে দাও। তখন ঐ সাহাবী সমস্ত মদ নষ্ট করে দিল।
মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়ে ছিলেন, তাদের মধ্যে ইকরেমা বিন আবু জাহেলও ছিল। ইকরেমার অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী উম্মে হাকীম রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করল এবং বললঃ ইকরেমা ভয়ে পালিয়ে গিয়ে ছিল, দয়া করে তাকে নিরাপত্বা দিন, আল্লাহ্ আপনার প্রতি রহম করবেন। তিনি বললেনঃআজ থেকে ইকরেমা নিরাপদে। উম্মে হাকীম স্বীয় স্বামীর তালাশে বের হল এবং তোহামা পাহাড়ের পাদদেশে সমুদ্রের তীরে তাকে পেল এবং বললঃ রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাকে নিরাপত্বা দিয়েছে ফিরে চল। পথিমধ্যে এক স্থানে স্বামী-স্ত্রী রাত্রি যাপন করল, ইকরেমা স্ত্রী সহবাসে আগ্রহী হলে, উম্মে হাকীম দ্রুত দূরে সরে গেল, আর বললঃ আমার শরীরে হাত দিবে না, তুমি মুশরেক আর আমি মুসলমান। যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি মুসলমান না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমার জন্য হারাম। একথা শুনে ইকরেমা আশ্চার্য হল আর বলতে লাগল, যদি তাই হয়, তাহলে তো আমার ও তোমার মাঝে বিশাল উপসাগরের দূরত্ব তৈরী হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট উপস্থিত হয়ে ইকরেমা কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেল।
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট উপস্থিত হয়ে আবেদন করলা ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার কিছু ক্রীতদাস আছে যারা আমার সাথে মিথ্যা কথা বলে, খিয়ানত করে, আমার অবাধ্য থাকে। তখন আমি তাদের সাথে খারাপ আচরণ করি এবং মারধরও করি। কিয়ামতের দিন তাদের সাথে আমার হিসাব নিকাশ কেমন হবে? তোমার ক্রীতদাসদের খিয়ানত, অবাধ্যতা, মিথ্যার বিচার করা হবে। সাথে সাথে তাদেরকে তোমার দেয়া শান্তিরও হিসেব করা হবে, যদি তোমার দেয়া শাস্তি তাদের অন্যায়ের তুলনায় কম হয়ে থাকে তাহলে তুমি সোয়াবের অধিকারী হবে। আর যদি তোমার দেয়া শাস্তি তাদের অন্যায়ের সমতুল্য হয়, তাহলে তোমার কোন সমস্যা নেই। কিন্তু যদি তোমার দেয়া শাস্তি তাদের অন্যায়ের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে অতিরিক্ত শাস্তির বদলা তোমার কাছ থেকে নেয়া হবে। এ ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সামনে উচ্চ স্বরে কাঁদতে লাগল, তিনি তাকে বললেনঃ তুমি কি কুরআ'ন মাজীদের এ আয়াত পাঠ কর নাই? " আর কিয়ামতের দিন আমি কায়েম করব ন্যায় বিচারের মানদন্ড। সুতরাং কারো প্রতি কোন অবিচার করা হবে না। তার কর্ম যদি তিল পরিমাণ ওজনের হয় তবুও তা আমি উপস্থিত করব। হিসেব গ্রহণ কারী রূপে আমিই যথেষ্ট”। (সূরা আম্বীয়া-৪৭)
একথা শুনে ঐ ব্যক্তি বললঃ হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমি এর চেয়ে উত্তম আর কিছু দেখছি না যে, আমি তাদেরকে আযাদ করে দেই, আর কিয়ামতের দিন আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়ে যাই, আমি আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি যে, তারা সবাই আযাদ"। (আহমদ, তিরমিযী)
ঐ সমাজ যেখানে জিনা এবং মদ পান জীবনের অপরিহার্য অংশ বলে বিবেচনা করা হত, মহিলাদের সাথে অবৈধ সম্পর্ক বেশি বেশি থাকাকে গৌরবের বিষয় বলে বিবেচনা করা হত, তাদেরকে দ্বীন ইসলামের দাওয়াত দেয়ার পর, যখন তাদেরকে পরকালে বিশ্বাসের প্রতি দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তখন ঐ সমাজের লোকেরা এতটা মোত্তাকী পরহেযগার, পবিত্র হয়ে গেছে যে, যদি কারো সাথে কোন অন্যায় হয়ে গেছে, তাহলে সে স্বয়ং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট উপস্থিত হয়ে, শুধু একথা স্বীকারই করে নাই যে, সে অন্যায় করেছে, বরং এব্যাপারে জেদ ধরেছে যে, তাকে দুনিয়াতেই তা থেকে পরিষ্কার করা হোক। যাতে আখেরাতের শাস্তি থেকে বাঁচতে পারে। গামেদী বংশের এক মহিলা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট উপস্থিত হয়ে আবেদন করল যে, "ইয়া রাসূলাল্লাহ্ আমাকে পাক করুন। তিনি বললেনঃ পাগলী যাও এবং আল্লাহর নিকট তাওবা কর। সে বললঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি কি আমাকে মায়েয আসলামীর ন্যায় দূরে রাখতে চান? আমি তো ব্যভিচার করে গর্ভধারণ করে ফেলেছি? তখন তিনি বললেনঃ আচ্ছা যাও বাচ্চা প্রসবের পর আসবে। বাচ্চা প্রসবের পর ঐ মহিলা আবার আসল এবং বললঃ এখন আমাকে পবিত্র করুন। তিনি বললেনঃএখন চলে যাও বাচ্চাকে দুধ পান করাও, বাচ্চা দুধ ছাড়লে আসবে। মহিলা চলে গেল এবং বাচ্চা দুধ ছাড়ার পর আবার আসল। বাচ্চাকে সাথে করে এমনভাবে নিয়ে আসল যে, তার হাতে এক টুকর রুটিও ছিল, তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে আবেদন করল ইয়া রাসূলাল্লাহ্! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই আমার বাচ্চা, দুধ ছেড়েছে, এবং রুটি খেতে পারে। এখন আমাকে পবিত্র করুন। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে পাথর মেরে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন"। (মুসলিম)
উল্লেখ্য: মায়েয আসলামীও এ পাপ করে ছিল, সেও স্বয়ং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট এসে ছিল। তিনি তাকে খুব যাচাই করলেন, যাতে যদি তার পাপ ব্যভিচারের চেয়ে কম হয়, তাহলে সে শাস্তি থেকে বেঁচে যাবে। কিন্তু রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন আশ্বস্ত হলেন যে, আসলেই সে ব্যভিচার করেছে, তখন তিনি তাকেও পাথর মেরে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন।¹³
সরকারী উচ্চ পদ ও নেতৃত্বের জন্য সবসময়ই মানুষ অভিলাস রাখে, কিন্তু পরকালে বিশ্বাস, লোকদের মাঝে এমন এক চিন্তা সৃষ্টি করে যে, প্রথমেই মানুষ সরকারী উচ্চ পদ ও নেতৃত্ব থেকে দূরে থাকে।
দ্বিতীয়ঃ আর যদি কেউ তা কামনাও করে তবুও আখেরাতের স্মরণ সাথে সাথেই এ ইচ্ছা মিটিয়ে দেয়।
"ওবাদা বিন সামেত (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাকাত আদায়ের দায়িত্ব প্রদান করলেন এবং সাথে সাথে এ উপদেশও দিলেন যে, হে আবু ওয়ালীদ, আল্লাহকে ভয় কর, কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় আসবে না যে, তুমি তোমার কাঁধে উট বহন করছ, আর তা আওয়াজ করতেছে। স্বীয় কাঁধে গাভী বহন করছ, আর তা আওয়জ করছে, স্বীয় কাঁধে বকরী বহন করছ, আর তা আওয়াজ করছে, আর আমাকে সুপারিশ করার জন্য বলছ। ওবাদা বিন সামেত বললঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাকাতের মালে খিয়ানত করার কারণে এ পরিণতি হবে? তিনি বললেনঃ হাঁ ঐ সত্বার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ। ওবাদা বিন সামেত বললঃ ঐ সত্বার কসম! যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছে, আমি কখনো যাকাত আদায়ের দায়িত্ব পালন করব না"। (ত্বাবারানী)
ওমার বিন আবদুল আযীয খেলাফতের দায়িত্ব প্রাপ্ত হওয়ার আগে যুবরাজের ন্যায় জীবন যাপন করতেন, আর খেলাফতের দায়িত্ব প্রাপ্ত হওয়ার পর, সারা দিন রাষ্ট্রিয় দায়িত্ব পালন করতেন, আর রাত হলে বসে বসে কান্না কাটি করতেন, স্ত্রী এব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে, বললেনঃ আমার রাষ্ট্রে যত গরীব, মিসকীন, এতীম, মুসাফীর, পথহারা, মাজলুম, বন্দী আছে তাদেরও সবার দায়িত্ব আমার ওপর, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ আমাকে তাদের সকলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন, যদি আল্লাহর নিকট আমি এব্যাপারে জওয়াবদেহি না করতে পারি, তাহলে আমার পরিণতি কি হবে? যখন আমি এবিষয়ে চিন্তা করি তখন আমি দুর্বল হয়ে যাই, অন্তর সংকুচিত হয়ে আসে, চোখ অশ্রুসজল হয়ে যায়।
একবার স্বীয় স্ত্রীকে বললঃ ঘরে কি এক দিরহাম আছে? আঙ্গুর খেতে মন চায়। স্ত্রী বললঃ মুসলমানদের খলীফা হয়ে তোমার কি এক দিরহাম খরচ করার মত সাধ্য নেই? বললঃ হাঁ জাহান্নামের হাতকড়া পরার চেয়ে এ অভাবী জীবন আমার জন্য অনেক ভাল।
এসমস্ত উদাহরণ থেকে একথা অনুমান করা কষ্টকর নয় যে, পরকালে বিশ্বাস, মানুষকে লাভ ক্ষতির হিসেবকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দেয়। মানুষের মূল লক্ষ্য এ ক্ষণস্থায়ী জীবনের আড়ালে চিরস্থায়ী জীবনের প্রতি থাকে। পরকালে বিশ্বাস অনুধাবন করার পর মানুষ দুনিয়ার বড় বড় ক্ষতি মেনে নিতে পারে, কিন্তু পরকালের ক্ষতিকে মোটেও মেনে নিতে পারে না। দুনিয়ার বড় বড় বিপদ-আপদ মেনে নিতে পারে, কিন্তু আখেরাতের আযাবকে মেনে নেয়ার কল্পনাও করে না। দুনিয়ার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে, কিন্তু আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সাথের সম্পর্ক ছিন্ন করার চিন্তাও করে না। দুনিয়ার সার্বিক সুখ-শান্তি, আরাম আয়েশ ত্যাগ করতে পারে, কিন্তু আখেরাতের চিরস্থায়ী নে'মত থেকে বঞ্চিত হওয়া সহ্য করে না।
পরিশেষে আমি প্রিয় পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যে, যদি আখেরাতের বিশ্বাস মানুষের চিন্তা চেতনার মাঝে এধরণের পরিবর্তন আনতে পারে তাহলে আমাদের জীবন এ পরিবর্তন থেকে বঞ্চিত কেন?
আমরা আখেরাতের প্রতি ঈমানও রাখি আবার বাস্তব জীবনে মিথ্যা, ধোঁকা, চক্রান্ত, ওয়াদা ভঙ্গ, হিংসা, শত্রুতা, গীবত, ইত্যাদি নিশ্চিন্তে করে যাচ্ছি, পারিবারিক জীবনে পিতা-মাতার অবাধ্যতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন, জুয়া, মদ পান, ব্যভীচার, চুরী, ডাকাতি, অরাজকতা সৃষ্টি, সুদ-ঘুষ, জুলম, ছিন্তাই, যবর দখল, সরকারী সম্পদ লুন্ঠন, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণ ইত্যাদি সুন্দর ভাষার অন্তড়ালে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল, এ সব কিছুই করছি আর এ দাবীও করি যে, আমাদের আখেরাতের প্রতি ঈমান আছে।
এ প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ্ কোরআ'ন মাজীদে এরশাদ করেনঃ
﴿وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللهِ وَبِالْيَوْمِ الآخِرِ وَمَا هُم بِمُؤْمِنِينَ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنفُسَهُم وَمَا يَشْعُرُونَ) (سورة البقرة : ٨-٩)
অর্থঃ "কিছু কিছু লোক এমন যারা বলে যে, আমরা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখি, অথচ তারা ঈমান আনে নাই। তারা আল্লাহ্ এবং ঈমানদারদেরকে ধোঁকা দেয়। মূলত তারা নিজেরা নিজেদেরকে ধোঁকা দেয়।” (সূরা বাক্বারাঃ ৮,৯)
আমাদের প্রত্যেকের এবিষয়ে নিজে নিজে চিন্তা করা উচিত যে, আল্লাহ্র এবাণী কোন না কোন ভাবে আমার ওপর প্রজোয্য হচ্ছে কি?
আর আজ যদি আমার ওপর তা প্রযোজ্য না হয়, তাহলে আর কোন দিনও যেন তা আমার ব্যাপারে প্রযোজ্য না হয়, যাতে করে আমি আমার আমলের উপযুক্ত প্রতিদান পেতে পারি।
আল্লাহ্ স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহে আমাদেরকে নিফাকী থেকে রক্ষা করুন, আর মৃত্যুর পূর্বে স্বীয় আমাল সংশোধনের তাওফীক দান করেন। আমীন!

হাশরের মাঠে লাঞ্ছনাকারী আমল
ইসরাফীলের সিঙ্গায় ফুঁ দেয়ার সাথে সাথে যখন লোকেরা কবর থেকে উঠবে, তখন কিছু লোকের চেহারা ধীর স্থির, আনন্দময়, শান্ত, আলোকিত থাকবে, অথচ তখন কিছু কিছু লোকের চেহারা মলিন, কাল, ভীত চিন্তিতি থাকবে। আর যখন তারা নিজের সামনে কিছু লোককে ধীর স্থির, আনন্দিত, আলোকিত দেখবে তখন নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে স্বীয় লাঞ্ছনা ও অপমানের অনুভূতি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।
মানুষ স্বীয় কবর থেকে পোশাকহীনভাবে উঠবে, সর্বপ্রথম ইবরাহীম (আঃ) কে পোশাক পরানো হবে, এর পর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং অন্যান্য নবীগণকে পোশাক পরানো হবে। এর পর ওলী, সৎ লোক, শহীদ ও ঈমানদারদেরকে পোশাক পরানো হবে। কিন্তু কাফের, মুশরেক, মুনাফেক, ফাসেক, ফাজের, পোশাকহীন থাকবে। পোশাকাহীন লোকেরা তাদের সামনে পোশাক বিশিষ্টি লোক দেখে লাঞ্ছনা ও অপমান বোধ করবে।
লোকেরা স্বীয় কবর থেকে ক্ষুধার্ত, পিপাশিত, অবস্থায় উঠবে, কিন্তু ঈমানদারদেরকে আম্বীয়াগণ নিজ নিজ হাউজ থেকে পানি পান করাবেন। কাফের, মুশরেক, বিদআ'তীরাও পানি পান করার জন্য অগ্রসর হবে, কিন্তু তাদেরকে সাথে সাথে ধিক্কার দেয়া হবে। নিঃসন্দেহে ঐ সময় তা তাদের লাঞ্ছনা ও অপমানের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি করে দিবে।
কিছু কিছু লোক হাশরের মাঠে এমনভাবে দাঁড়াবে যে, সূর্য তাদের থেকে এক মাইল দূরত্বে থাকবে।
উলঙ্গ থাকবে, ক্ষুধায় ও পিপাশায় কাতর থাকবে। ঘামতে থাকবে, যখন সে তার সামনে কিছু লোককে আলীশান আলোকময় আসনসমূহে ছায়াময় স্থানে আরামরত দেখবে তখন তাদের লাঞ্ছনা ও অপমান আরো বৃদ্ধি পাবে।
হাশরের মাঠে এ লাঞ্ছনা ও অপমান ঐ সমস্ত লোকদের হবে যারা কাফের, মুশরেক, মুনাফেক, ফাসেক, ফাজের, তাদের সাধারণ গোনাহ সমূহের ফল সরূপ তারা তা ভোগ করবে। কিন্তু কিছু কিছু পাপ সম্পর্কে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিশেষ শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। নিচে আমরা ঐ সমস্ত পাপের কথা উল্লেখ করব। প্রত্যেক সুভাগ্যবান, সুস্থ আত্মা সম্পন্ন, ব্যক্তি হাশরের দিন এ সমস্ত লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য সর্বাত্বক চেষ্টা করবে। আর ঐ সমস্ত আমলসমূহ নিম্নরূপঃ
১। নামায পরিত্যাগ করাঃ আল্লাহর বাণীঃ
يَوْمَ يُكْشَفُ عَن سَاقٍ وَيُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ فَلَا يَسْتَطِيعُونَ ، خَاشِعَةً أَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ وَقَدْ كَانُوا يُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ وَهُمْ سَالِمُونَ ) ( سورة القلم: ٤٢ - ٤٣)
অর্থঃ "স্মরণ কর, সেই দিনের কথা, যে দিন পায়ের পিন্ডলী উন্মোচিত করা হবে এবং তাদেরকে আহ্বান করা হবে সিজদা করার জন্য, কিন্তু তারা তা করতে সক্ষম হবে না। তাদের দৃষ্টি অবনত, হীনতা তাদেরকে আচ্ছন্ন করবে, অথচ যখন তারা নিরাপদ ছিল তখন তো তাদেরকে আহ্বান করা হয়ে ছিল সিজদা করতে।
কিয়ামতের দিন হাশরের মাঠে লোকদেরকে আল্লাহ্র নিকট সিজদা করার হুকুম করা হবে, যারা দুনিয়াতে যথা নিয়মে নামায আদায় করেছে তাদেরকে আল্লাহ্ তাওফীক দিবেন তারা তাঁর সামনে সিজদা দিবে। বে-নামাযীও সেজদা করতে চাইবে কিন্তু আল্লাহ্ তার থেকে সেজদা করার শক্তি ছিনিয়ে নিবেন, তখন সমস্ত মানুষের সামনে বে-নামাযী লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। মুসলিম এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় এও বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ স্বীয় পিন্ডলী খুলবেন, সমস্ত ঈমানদার তখন সেজদায় পতিত হবে, দেখানোর জন্য বা নিজেকে বাঁচানোর জন্য, যারা দুনিয়াতে নামায পড়ত না, তারাও সেজদা করার চেষ্টা করবে, কিন্তু আল্লাহ্ তাদের পিঠকে কাঠ করে দিবেন তখন তারা সেজদা করতে পারবে না। আর তারা তখন হাশরের মাঠে বে-নামাযী ও মুনাফেক সমস্ত সৃষ্টির সামনে লজ্জিত হবে।

২। যাকাত আদায় না করাঃ "রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি সোনা চাঁদির যাকাত আদায় করে না, কিয়ামতের দিন ঐ সমস্ত সোনা চাঁদি কাঠ করে দেয়া হবে। অতপর তা জাহান্নামের আগুনে গরম করা হবে, আর তা দিয়ে যাকাত আদায় না কারীদের কপাল, রান, পিঠে দাগ দেয়া হবে। পঞ্চাশ হাজার বছর পর্যন্ত তারা এ শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। যে ব্যক্তি উট, গাভী, বকরী, ইত্যাদির যাকাত আদায় করবে না তাকে কিয়ামতের মাঠে অন্ধ মুখে উঠানো হবে, ঐ গাভী, বকরী, তরু তাজা হয়ে এসে স্বীয় মালিককে পদদলিত করতে থাকবে, আর পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত তাদের ওপর এ শাস্তি চলতে থাকবে"। (মুসলিম)
৩। সুদঃ আল্লাহ্ বাণীঃ
(الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِ) (سورة البقرة : ٢٧٥)
অর্থঃ "যারা সুদ খায় তারা (কবরে) শয়তানের স্পর্শে মোহবিষ্ট ব্যক্তির দন্ডয়মান হওয়া ব্যতীত দন্ডয়মান হবে না।” (সূরা বাক্বারাঃ ২৭৫)
এমন পাগলামী অবস্থায় সুদ খোর হাশরের মাঠে উপস্থিত হবে এবং পঞ্চাশ হাজার বছর পর্যন্ত পাগলের ন্যায় এদিক সেদিক ঘুরতে থাকবে।

৪। কতলঃ “নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ "হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি হাশরের মাঠে এমনভাবে উপস্থিত হবে যে, নিহত ব্যক্তির হাতে হত্যাকারীর মাথা ও কপাল থাকবে। নিহত ব্যক্তির রগ দিয়ে তাজা রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে। আর সে আল্লাহর নিকট আবেদন করবে যে, হে আমার রব সে আমাকে হত্যা করেছে, এমন কি নিহত ব্যক্তি হত্যাকারীকে হেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে আল্লাহর আরশের নিকট নিয়ে যাবে"। (তিরমিযী)
৫। যবর দখলঃ “নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি অন্যায় ভাবে কারো কাছ থেকে কোন যমিন ছিনিয়ে নেয়, কিয়ামতের দিন সাত তবক জমিন তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে"। (বোখারী)
৬। রাষ্ট্রীয় সম্পদদ লুণ্ঠনঃ "রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সা'দ বিন ওবাদাকে নির্দেশ দিলেন, যাও ওমুক বংশের যাকাত উঠিয়ে নিয়ে আস, সাথে সাথে একথাও বললেনঃ কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় আসবে না যে, তুমি তোমার কাঁধে উট বহন করছ আর তা আওয়াজ করতেছে। স্বীয় কাঁধে গাভী বহন করছ আর তা আওয়াজ করছে, স্বীয় কাঁধে বকরী বহন করছ আর তা আওয়াজ করছে, সাহাবী আবেদন করল ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে এ দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিন। তখন রাসূলাল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে দায়িত্ব মুক্ত করলেন।” (ত্বাবারানী)
লুষ্ঠিত রাষ্ট্রিয় সম্পদ প্রমাণ সরূপ লুন্ঠনকারীদের কাঁধে চাপবে। যা সমস্ত মানুষ কিয়ামতের দিন দেখতে পাবে। আর তা লুণ্ঠনকারীর জন্য লাঞ্ছনা ও অপমানের কারণ হবে।

৭। জুলমঃ “রাসূলুল্লা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ জুলম কিয়ামতের দিন জুলুমকারীর জন্য অন্ধকার হয়ে উপস্থিত হবে"। (বোখারী)
জালেম হাশরের মাঠে অন্ধকারে ঘুরে বেড়াবে কোন সাহায্যকারী বা তার ডাকে সাড়া দেয়ার মত কাউকে পাবে না"।
৮। অহংকারঃ “রাসূলুল্লা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ কিয়ামতের দিন অহংকারকারীকে পিপিলিকার ন্যায় করে মানব আকৃতিতে উঠানো হবে। ফলে সর্বদিক থেকে তাকে লাঞ্ছনা চেপে ধরবে"। (তিরমিযী)
৯। অঙ্গীকার ভংঙ্গ করাঃ “রাসূলুল্লা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ ওয়াদা ভংঙ্গকারী কিয়ামতের দিন এমনভাবে আসবে যে, তার পিঠে পতাকা লাগানো থাকবে"। (মুসলিম)
প্রত্যেক কে দেখে বুঝা যাবে যে কে কিধরণের ওয়াদা ভংঙ্গ করেছে।

১০। বিনা প্রয়োজনে চাওয়াঃ "রাসূলুল্লা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে মানুষের নিকট চাইবে, কিয়ামতের দিন সে এমনভাবে আসবে যে, তার চাওয়া তার মুখের সামনে ঝুলন্ত নিদর্শন সরূপ থাকবে"। (আবুদাউদ)
১১। লোক দেখানো কাজঃ "রাসূলুল্লা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ লোক দেখানো কাজকারীদের সাথে আল্লাহ্ কিয়ামতের দিন খুবই রিয়া করবেন"। (আবুদাউদ)
১২। একাধীক স্ত্রী থাকলে তাদের সাথে ন্যায় আচরণ না করাঃ "রাসূলুল্লা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তির দু'জন স্ত্রী ছিল, আর সে তাদের কোন একজনের প্রতি বেশি সম্পর্ক রাখত, তাহলে কিয়ামতের দিন সে এমনভাবে উপস্থিত হবে যে, তার অর্ধশরীর অকেজু থাকবে"। (আবুদাউদ)

কিছু কিছু কাজ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে, এদের প্রতি আল্লাহ্ কিয়ামতের দিন দৃষ্টিপাত করবেন না। আর ঐ সমস্ত কাজ গুলো নিন্ম রূপঃ
১৩। পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, (নাসায়ী)
১৪। দাইউস হওয়া। (নাসায়ী)
১৫। মহিলাদের ছেলেদের সাদৃশ্য অবলম্ভন করা। (নাসায়ী)
নোটঃ কাপড়, চাল চলন, আচার আচরণ, প্রত্যেক বিষয়ে তাদের সাদৃশ্যতা অবলম্ভন করা।
১৬। বৃদ্ধ বয়সে যিনা (ব্যভীচার) করা। (মুসলিম)
১৭। শাসকদের স্বীয় অধিনস্তদের সাথে মিথ্যা বলা। (মুসলিম)
১৮। অভাবী অবস্থায় গৌরব করা। (মুসলিম)
১৯। বন-জঙ্গলে বা অন্য কোন স্থানে পানি না পাওয়া গেলে মুসাফিরকে পানি না দেয়া। (মুসলিম)
২০। মিথ্যা কথা বলে মাল বিক্রি করা। (মুসলিম)
২১। দুনিয়ার সম্পদের জন্য শাসকদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। (মুসলিম)
এগুলো ঐ সমস্ত আমল যে কারণে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ লোকদের প্রতি দৃষ্টি দিবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না। হাশরের মাঠে মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় অপমান ও লাঞ্ছনা আর কি হতে পারে, যিনি অত্যন্ত দয়ালু আল্লাহ্ সে দিন তাদেরকে তিনি স্বীয় রহমত থেকে বঞ্চিত করবেন। আল্লাহ্ দয়া করে আমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করুন নিশ্চয়ই দিনি দয়ালু ও ক্ষামাশীল।
মনোযোগসহ চিন্তা করুন, পৃথিবীতে মানুষের ইজ্জত তার নিকট কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মানুষ এমন সর্ব প্রকার ভুল ভ্রান্তি থেকে বাঁচার জন্য চেষ্টা করে, যে কারণে তার সম্মানে স্পট পড়তে পারে। আর যদি কখনো এমন কোন ভুল হয়েই যায়, তাহলে তা ঢাকতে চেষ্টা করে। যাতে অন্যদের সামনে অপমানিত না হতে হয়। কোন কোন সময় মান হানির বিষয় গুলো আদালত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আর মানুষ তার সম্মান রক্ষারর্থে লক্ষ কোটি প্রমাণ পেশ করে।
চিন্তা করুন! পরকালে আমরা নিজেদেরকে অপমান ও লঞ্ছনা থেকে বাঁচানোর জন্য কতটুকু চিন্তা করি? যেখানে না কোন ভুল গোপন করা যাবে, আর না কোথাও কোন মান হানির মামলা পেশ করা যাবে। যদি আমাদের পরকালের প্রতি ঈমানের দাবী সত্য হয়, তাহলে আমাদের পৃথিবীর অপমান ও লঞ্ছনা থেকে বাঁচার জন্য একটু অধিক চিন্তা করা উচিত। যদি অলসাতা বা অজ্ঞতা বশত কেউ এমন কোন পাপ করে যা আখেরাতে লঞ্ছনা ও অপমানের কারণ হবে, তখন সাথে সাথে তাকে ঐ কাজ ত্যাগ করা উচিত। আর ভবিষ্যতে আর কখনো ঐ পাপের নিকটবর্তী না হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয়ী হতে হবে। পূর্বের পাপের জন্য লজ্জিত হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ্র নিকট তাওবা করতে হবে। তা হলে আশা করা যায় যে, দয়াময় ও ক্ষমাশীল আল্লাহ্ আমাদের অতীত পাপসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। আর পরবর্তীর জন্য আমাদের আমল সমূহকে সংশোধন করে দিবেন। কিন্তু যদি কেউ এ সব কিছু জানার পরও উল্লেখিত পাপ ত্যাগ না করে, তাহলে তারাই ঐ সমস্ত লোকের অর্ন্তভুক্ত হবে, যারা কিয়ামতের দিন নিজেই স্বীকার করবে যে,
لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحَابِ السَّعِيرِ) (سورة الملك: ١٠)
অর্থঃ "যদি আমরা শুনতাম বা বিবেক বুদ্ধি প্রয়োগ করতাম তাহলে আমরা জাহান্নামবাসী হতাম না"। (সূরা মুলকঃ ১০)
আল্লাহ্ সমস্ত মুসলমানদেরকে এ নিকৃষ্ট পরিণতি থেকে রক্ষা করুন, আর হাশরের মাঠে লাঞ্ছনামূলক আমল থেকে বাঁচার তাওফীক দিন। আমীন!

হাশরের মাঠে সম্মানজনক কর্মসমূহ
পরকালে বিশ্বাসী, সৎ লোকদের আচরণ কবর থেকে উঠার পর পরই কাফের, মুশরেক, ফাসেক, ফাজেরদের থেকে ভিন্ন হবে। ঈমানদ্বারদের ওপর ঐ ধরণের ভয় ভীতি হবে না যা অন্যদের হবে। হাশরের মাঠে যাওয়ার সময়ও তাদের জন্য যানবাহন প্রস্তুত করে রাখা হবে। আর তারা আল্লাহ্র রহমত ও জান্নাতের প্রতি কামনা নিয়ে হাশরের মাঠে উপস্থিত হবে। হাশরের মাঠেও আল্লাহ্ তাদেরকে স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহে ঐ দিনের চিন্তা ও কঠিন মুসিবত ও কষ্ট থেকে রক্ষা করবেন। হাশরের মাঠের পঞ্চাশ হাজার বছরের দীর্ঘ এক দিন তাদের নিকট জোহর ও আসরের মধ্যবর্তী সময়ের মত মনে হবে। (হাকেম)
কাফেরদের ওপর যখন হশেরের মাঠে মৃত্যুদায়ক কষ্ট শুরু হবে তখন তা ঈমানদারদের জন্য শর্দির ন্যায় কষ্ট বলে মনে হবে। (আহমদ)
সাধারণত ঈমানসহ সমস্ত নেক আমল মানুষকে হাশরের মাঠের সর্ব প্রকার ভয়-ভীতি, চিন্তা থেকে হেফাজত করবে। আল্লহর বাণীঃ
مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ خَيْرٌ مِّنْهَا وَهُم مِّن فَزَعِ يَوْمَئِذٍ آمِنُونَ (سورة النمل: ۸۹)
অর্থঃ "যে কেউ সৎকর্ম নিয়ে আসবে, সে এর চেয়ে উৎকৃষ্টতর প্রতিফল পাবে এবং সেদিন তারা আশংকা থেকে নিরাপদে থাকবে।” (সূরা নামলঃ ৮৯)
তাই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে এমন কিছু আমলের কথা বলেছেন যা ঈমানদারদেরকে হাশরের মাঠে শুধু ঐ দিনের ভয় ভীতি থেকেই রক্ষা করবে না বরং বিশেষ সম্মানেরও কারণ হবে। আবার কিছু কিছু আমল ঈমানদারদেরকে আল্লাহ্র আরশের নিচে স্থান করে দিবে।
পৃথিবীর সম্মান পরকালের সম্মানের সাথে মোটেও তুলনা যোগ্য নয়। কিন্তু ভাল করে চিন্তা করে দেখুন, যদি কোন ছাত্র পরীক্ষায় পাস করে স্বর্ণ পদক পায়, কোন ব্যক্তি কোন বড় ধরণের খেদমতের কারণে সরকারের পক্ষ থেকে কোন সম্মান লাভ করে, বা যুদ্ধের ময়দানে কোন অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শনের কারণে কোন সৈন্য কোন পুরস্কার লাভ করে, তাহলে তার আনন্দের কোন শেষ থাকে না। সে ঐ সম্মানকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান বলে মনে করে। মানুষকে দেখানো বা বলতে আনন্দ পায়। মানুষ ঐ ব্যক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়। সরকার তাকে একটি সম্মানের কারণে বিভিন্ন দিক থেকে তাকে বিভিন্ন ধরণের সুযোগ সুবিধা করে দেয়। যে ব্যক্তি হাশরের মাঠে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কার পাবে তার কি ধরণের আনন্দ ও খুশি হবে? কোন মুসলমান আছে যে এটা কামনা করে না।
এমনিভাবে হাশরের মাঠে আল্লাহর আরশের ছায়াতলে স্থান পাওয়ার ব্যাপারে হয়ত আজকে আমরা পরিপূর্ণ অনুমান করতে পারব না, যে তার সম্মান কত পরিমাণে হবে, কিন্তু দুনিয়ার অনুমানে এতটুকু চিন্তা করা যায় যে, কোন বাদশা বা প্রধান মন্ত্রী কাউকে যদি তার বাড়ীতে দাওয়াত করে তাহলে তার জন্য এ দাওয়াতকেই বিরাট কিছু মনে করা হবে। আর দাওয়াতের স্থলে যে ব্যক্তির প্রধান মন্ত্রীর যত নিকটে স্থান মিলবে সে তত বেশি ঐ স্থানে খুশি হবে এবং অন্যদের ওপর গৌরব বোধ করবে যে প্রধান মন্ত্রীর সাথে তার কত গভীর সম্পর্ক এবং প্রধান মন্ত্রীর নিকট তার কত সম্মান। আল্লাহর কোন তুলনা নেই। তিনি অতুলনীয়, তিনি সর্ব শ্রেষ্ট, তিনি চিরস্থায়ী, চিরঞ্জীব, তিনি পাক ও পবিত্র, হাশরের মাঠে যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয় হবে, বা যে আরশের ছায়া তলে স্থান পাবে, তার আনন্দ কত বেশি হবে? হে আল্লাহ্ তুমি তোমার দয়ায় ও অনুগ্রহে আমাদেরকে তাদের অর্ন্তভুক্ত কর।
নিচে আমরা কিছু সৎ আমলের কথা উল্লেখ করব যে কারণে হাশরের মাঠে বিশেষ সম্মান হাসিল হবে।
১। আযানঃ “নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীঃ " আযান দাতা কিয়ামতের দিন উঁচু গর্দান বিশিষ্ট হবে"। (ইবনে মাযা)
২। ইনসাফঃ “নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীঃ "যারা ন্যায় বিচার করে, তারা হাশরের মাঠে আল্লাহ্র ডান হাতে নূরের মিম্বরে স্থান পাবে। আর আল্লাহ্র উভয় হাতই ডান হাত। তারা হবে ঐ সমস্ত লোক যারা ন্যায় পরায়নতার সাথে নির্দেশ দেয়। স্বীয় পরিবারের মধ্যে ন্যায় পরায়নতা পূর্ণ আচরণ করে, আর যে কাজের দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পন করে তাতেও তারা ন্যায় পরায়নতা সহ কাজ করে." (মুসলিম)
৩। নম্রতাঃ "নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীঃ "যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নম্রতা প্রকাশ করল এবং এত দামী পোশাক পরল না যা পরার ক্ষমতা সে রাখে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তাকে সমস্ত সৃষ্টির সামনে ডেকে তাকে উত্তম পোশাক বাছায়ের এখতিয়ার দিবেন এবং সে তা পরিধান করবে"। (তিরমিযী)
৪। ওজুঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীঃ " হাউজে কাওসারের নিকট আমি তোমাদেরকে তোমাদের ওজুর নিদর্শনের মাধ্যমে চিনেতে পারব। তোমাদের কপাল ও হাত-পা চমকাতে থাকবে। আর এগুণ তোমাদের (উম্মতে মোহাম্মাদীর নামাযীদের) ব্যতীত অন্য আর কোন উম্মতের মধ্যে থাকবে না"। (ইবনু মাযা)
৫। ক্ষমতা থাকা সত্বেও প্রতিশোধ না নেয়াঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীঃ "যে ব্যক্তি প্রতিশোধ নেয়ার মত পূর্ণ ক্ষমতা রাখে, কিন্তু প্রতিশোধ নেয় না, বরং রাগ নিয়ন্ত্রণ করে, আল্লাহ্ তাকে সমস্ত সৃষ্টির সামনে ডেকে তাকে ইচ্ছামত হুরে ঈন বাছায়ের সুযোগ দিবেন, যাকে খুশি তাকে সে বিয়ে করবে." (আহমদ)

ঐ সমস্ত আমল যে কারণে সুভাগ্যবানরা আল্লাহ্র আরশের ছায়া পাবে
১। ন্যায় পরায়ণ বাদশা।
২। ঐ যুবক যে তার যৌবনকালকে ইবাদতে মগ্ন রাখে।
৩। যে ব্যক্তি মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলেও তার অন্তর মসজিদের সাথে সমপৃক্ত থাকে।
৪। এমন দু'জন লোক যারা আল্লাহ্র জন্য পরস্পর পরস্পরকে ভালবাসে।
৫। এমন ব্যক্তি যাকে কোন অভিজাত পরিবারের সুন্দরী মহিলা কোন অপকর্মের জন্য ডাকলে সে বলে আমি আল্লাহকে ভয় করি।
৬। এমন ব্যক্তি যে এত গোপনে দান করে, যে তার ডান হাত কি দান করে, তার বাম হাত তা জানে না।
৭। যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার দুচোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে। (বোখারী)
৮। ঋণ গ্রহিতাকে সুযোগ দেয়া বা তাকে ক্ষমা করে দেয়াঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাণীঃ "যে ব্যক্তি কোন দুর্বলকে সুযোগ দেয়, বা তার ঋণ ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ্ তাকে কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়া তলে স্থান দিবেন, যে দিন তাঁর আরশের ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া থাকবে না." (মুসলিম)
হাশরের ময়দান সম্পর্কে অবগত এবং এ সম্পর্কে পাঠকারী এমন কোন মোমেন আছে যে, এ বিষয়ে দূয়া বা কামনা করে না যে, আল্লাহ্ হাশরের মাঠে তাকে শুধু ঐ দিনের চিন্তা ও ভয় থেকেই নিরাপদে রাখবে না, বরং স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহে তাকে ঐ সুভাগ্যবানদের অর্ন্তভুক্ত করবে, যারা ঐ দিন বিশেষ সম্মানে সম্মানিত হবে। বা যাদেরকে আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া হাসিল হবে? অতএব আমাদের মধ্যে প্রত্যেক মুসলমানের এ চেষ্টা করা দরকার যে, উল্লেখিত আটটি আমলের মধ্যে সব গুলো সম্ভব না হলেও কোন একটির ওপর আমল করে, নিজে নিজেকে আল্লাহর দয়ার অন্তর্ভুক্ত করবে। আর ঐ দয়াময় আল্লাহ্র নিকট বিনয়ের সাথে এ দূয়া করবে যে, তিনি আমাদেরকে স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহে ঐ সুভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করবে, যারা হাশরের মাঠে বিশেষ সম্মান লাভ করবে এবং যারা আল্লাহ্র আরশের ছায়া লাভ করবে। আর তা আল্লাহর জন্য মোটেও কঠিন নয়।

বান্দার হকের গুরুত্ব
ইসলাম মুসলমানদেরকে এ শিক্ষা দেয় যে, তারা যেন পরস্পরে মিলে মিশে থাকে এবং একে অপরের ওপর কোন জুলুম অত্যাচার না করে। কেউ কাউকে কষ্ট না দেয়, কেউ কাউকে কোন ক্ষতির মধ্যে না ফেলে। কেউ কারো সাথে হিংসা বিদ্বেষ না করে। কেউ কারো সাথে শত্রুতা না রাখে, বরং যত দূর সম্ভব একে অপরের কল্যাণকামী, সমবেদনাময়, ভাল, অনুগ্ৰহ এবং ভালবাসা পূর্ণ আচরণ করে। এ উদ্দেশ্যে ইসলাম প্রত্যেক ব্যক্তির হক ও পাওনা নির্ধারণ করেছে, যেমনঃ পিতা-মাতা ও সন্তানদের হক, স্বামী-স্ত্রীর হক, অন্যান্য আত্মীয় স্বজনের হক, প্রতিবেশির হক, এতীম বিধবাদের হক, গরীব মিসকীনের হক, বড়-ছোটর হক, মেহমানের হক, মেযবানের হক, মুসাফির ও মুকীমের হক, ক্রেতা- বিক্রেতার হক, মালিক ও অধিনস্তের হক, জমিদার ও কৃষকের হক, শাসক ও শাসিতের হক, অমুসলিম ও যিম্মির হক, বন্দী ও যুদ্ধে অযোগ্যদের হক, এমন কি ঈমানদারদের পরস্পরের মধ্যে হক নির্ধারণ করা হয়েছে। ইসলামের পরিভাষায় তাকে বান্দার হক বলা হয়। ইসলাম এ হকের ওপর শুধু আমল করার জন্য উৎসাহিতই করেনি, বরং প্রত্যেক মুসলমানকে এ নিয়মের অনুকরণে বাধ্য করা হয়েছে। যে ব্যক্তি এ হক আদায় করে সে দুনিয়াতে নিজের ইজ্জত, শান্তি, আরাম, নিরাপদ জীবন যাপন করে, আবার অন্যদের জন্যও এক কল্যাণ ময় সমবেদনা পরায়ন হয়ে, সমাজের উপকার করে, এর পর পরকালে আল্লাহর রহমত এবং বিশেষ পুরস্কারের হকদার হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি বান্দার হক আদায় না করে, বা অন্যের হক নষ্ট করে সে নিজেও দুনিয়ায় কষ্ট, অশান্তি ময় জীবন যাপন করে। সাথে সাথে সমাজের অন্যান্য লোকদেরকেও কষ্ট দিয়ে সমস্ত সমাজকে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, মানুষের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় ও লাঞ্ছিত মানুষে পরিণত হয়, আবার পরকালেও তার সাথে বান্দার হক সম্পর্কে এত কঠিন জেরা করা হবে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে অপরের হক আদায় না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাত বা জাহান্নামে যেতে পারবে না।

বান্দার হক সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর কতিপয় হাদীস
১। হাশরের মাঠে লোকদেরকে একত্রিত করার পর আল্লাহ্ ঘোষণা করবেন যে, আমি বাদশা, প্রতিফল দাতা, যদি কোন জাহান্নামীর ওপর কোন জান্নাতীর কোন হক থেকে থাকে, তাহলে সে ততক্ষণ পর্যন্ত জাহান্নামে যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতীকে জাহান্নামীর কাছ থেকে তার হক আদায় না করে দিব। আবার যদি কোন জান্নাতীর ওপর কোন জাহান্নামীর কোন হক থাকে, তাহলে জান্নাতী ততক্ষণ জান্নাতে যাবেনা, যতক্ষণ পর্যন্ত জাহান্নামীকে জান্নাতীর কাছ থেকে তার হক আদায় না করে দিব। যদিও তা সামান্য কিছুই হোকনা কেন। (আহমদ)
২। একদা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সাহাবাগণকে বললঃ যে ব্যক্তি কসম করে কোন মুসলমানের কোন হক নষ্ট করল, আল্লাহ্ তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব করে। দেন। এক সাহাবী বললঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! তা যদি অল্প জিনিষও হয়? তিনি বললেনঃযদিও রানের একটি হাড্ডিই হোকনা কেন।
৩। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাণীঃ কিয়ামতের দিন তোমাদের একে অপরের হক অবশ্যই আদায় করতে হবে, উল্লেখ্যঃ হক আদায়ের জন্য এক বার সমস্ত প্রাণীকে জীবিত করা হবে, আর ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জালেম জানোয়ারদের কাছ থেকে মাজলুম জানোয়ারদের হক আদায় করে দেয়া হবে। তাহলে একথা কি করে বিশ্বাস করা যায় যে, আল্লাহ্ জালেম মানুষের কাছ থেকে মাজলুমের হক আদায় করবেন না?
কিয়ামতের দিন বদলার নেয় হবে নেকীর মাধ্যমে। তাই হক আদায়ও নেকীর মাধ্যমেই হবে, কত দুর্ভাগ্যবান এমন হবে যে, নেকীর পাহাড় নিয়ে যাবে এবং অত্যন্ত খুশি থাকবে, কিন্তু যখন হিসাব শুরু হবে, তখন তার সমস্ত নেকী অন্যদের মাঝে বন্টন করে দেয়া হবে, আর নিজে খালী হাত হয়ে যাবে, জান্নাতের পরিবর্তে জাহান্নাম তার ঠিকানা হবে। একদা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাগণকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি জান গরীব কে? তারা বললঃ গরীবতো সেই যার নিকট টাকা-পয়সা নেই, দুনিয়ার কোন অর্থ সম্পদ নেই। তিনি বললেনঃ আমার উম্মতের মধ্যে গরীব সে, যে কিয়ামতের দিন নামায, রোযা, যাকাত, ইত্যাদি আমল নিয়ে আসবে, কিন্তু সে হয়ত কাউকে গালী দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারো সম্পদ লুট করেছে, কাউকে হত্যা করেছে, কাউকে মেরেছে, তখন তার নেকী সমূহ ঐ সমস্ত হকদারদের মাঝে বন্টন করে দেয়া হেব। এর পরও যদি কারো হক বাকী থাকে, তাহলে তাদের গোনাহ সমূহ তাকে দেয়া হবে, পরিশেষে সে জাহান্নামী হবে। (মুসলিম)
প্রিয় পাঠক! চিন্তা করুন ঐ ব্যক্তি কত দুর্ভাগ্যবান হবে যে, শুধু মৌখিক রসিকতার জন্য অপরের গীবত করেছে, আর কিয়ামতের দিন একারণে স্বীয় নেকী থেকে বঞ্চিত হবে। বা যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কারো বোন বা মেয়েকে অপবাদ দিয়ে আনন্দ করে, আর কিয়ামতের দিন পাথেয় শুন্য হয়ে যাবে, বা ঐ ব্যক্তি যে চুরী, ডাকাতী বা সুদ খেয়ে সম্পদ অর্জন করে, দুনিয়াতে কিছু দিন আরাম করে নিল, এর পর কিন্তু পরকালে স্বীয় নেকী থেকে বঞ্চিত হয়ে জাহান্নামী হল। বা ঐ ব্যক্তি যে, দুনিয়াতে অপরের জমি জবর দখল করে কিছু দিনের জন্য তা দিয়ে উপকৃত হল, অতপর কিয়ামতের দিন নিজের সমস্ত নেকী ঐ জমীর মালিককে দিয়ে দিয়ে নিজে জাহান্নামী হয়ে গেল? নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কত স্পষ্ট ভাষায় স্বীয় উম্মতকে উপদেশ দিয়েছেন।
হে লোকেরা! যে তার ভাইকে অপমান করেছে, বা তার প্রতি কোনভাবে জুলুম করেছে, তাহলে তার উচিত তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া, ঐ দিন আসার পূর্বে যেদিন, না দীনার থাকবে, না দিরহাম। অবশ্য যদি তার ঐ পরিমাণ নেক আমল থাকে তাহলে সে যাকে অপমান করেছে, বা যার প্রতি জুলুম করেছে, তাকে ঐ জুলুম বা অপমান সম পরিমাণ নেকী নিয়ে দেয়া হবে, আর যদি তার নিকট ঐ পরিমাণ নেকী না থাকে, তাহলে মাজলুমের পাপ জালেমকে দেয়া হবে। (বোখারী)
হক আদায় সম্পর্কে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একথাও বলেছেন, যখন লোকদেরকে পুলসিরাত অতিক্রম করতে হুকুম দেয়া হবে, তখন সর্ব দিক অন্ধকার হয়ে যাবে, অন্ধকার হওয়া সত্ত্বেও মাজলুম জালেমকে পুলসিরাত পার হওয়ার সময় চিনে নিবে, আর যতক্ষণ পর্যন্ত জালেমের কাছ থেকে নিজের হক আদায় না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে পুলসিরাত পার হতে দিবে না।
পুলসিরাত অতিক্রমকারী সুভাগ্যবান ঈমানদারদের সম্পর্কে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন তাদের জান্নাতে প্রবেশের পূর্বে "কান্তারা" নামক স্থানে তাদেরকে থামিয়ে দেয়া হবে, আর যাদের অন্তরে একে অপরের ব্যাপারে কোন অভিযোগ, অসন্তুষ্টি, রাগ ছিল তাদেরকে থামিয়ে দেয়া হেব, যখন ঈমানদারগণ পরিপূর্ণভাবে পরিষ্কার হয়ে যাবে, তখন তারা জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি পাবে।
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাণী থেকে একথা অনুমান করা মোটেও কষ্ট কর নয় যে, আল্লাহ্র নিকট বান্দার হকের গুরুত্ব কত বেশি, যদি কেউ স্বীয় মুখে বা হাতে বা অন্য কোনভাবে কোন মুসলমানকে কষ্ট দিয়ে থাকে, বা কোন ক্ষতি করে থাকে, বা কোন জুলুম করে থাকে, বা কোন যবরদস্তি করে থাকে যদিও তা সামান্য পরিমাণেই হোক না কেন, তাহলে কিয়ামতের দিন তাকে তার ক্ষতি পূরণ দিতে হবে।
অতএব যে ভাল মনে করে সে যেন দুনিয়াতে নিজের আমিত্বকে কোরবানী দিয়ে, তা ক্ষমা করিয়ে নেয়, আর যে চায় যে, কিয়ামতের দিন স্বীয় নেকী দিয়ে তার ক্ষতিপূরণ দিবে সে যেন তা করে।

একটি ভ্রান্তির অপনোদন
বান্দার হক সম্পর্কে কোন কোন লোক মনে করে আল্লাহ্র হকের চেয়ে বান্দার হকের গুরুত্ব বেশি, আল্লাহ্ নিজের হক ক্ষমা করে দিবেন, কিন্তু বান্দার হক বান্দা যতক্ষণ পর্যন্ত ক্ষমা না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্ ক্ষমা করবেন না। একথা ঠিক নয়, বরং সঠিক হল, বান্দার হক তার সর্বপ্রকার গুরুত্ব থাকা সত্বেও আল্লাহ্ হকের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পূর্ণ নয়। যার প্রমাণ নিম্নরূপঃ
১। আল্লাহর হক সমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ হল আল্লাহ্ তাওহীদ বা একত্ব বাদে বিশ্বাসী হওয়া। যে ব্যক্তি আল্লাহ্র এ হক আদায় করবে না, সে ইসলামের গন্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। অথচ বান্দার হক আদায় না করার কারণে ঐ ব্যক্তি সাগীরা বা কাবীরা গোনায় লিপ্ত হয় বটে, কিন্তু ইসলামের গন্ডি থেকে বের হয় না।
২। একথা ঠিক যে বান্দার হক বান্দার কাছ থেকেই ক্ষমা করিয়ে নিতে হবে, কিন্তু আল্লাহ্ সব কিছু করতে সক্ষম, তিনি তাঁর নির্দেশিত নিয়ম মানতে বাধ্য নন। যখন তিনি কোন জালেমকে ক্ষমা করে দিতে চাইবেন, তখন মাজলুমের কাছ থেকে তার হক ক্ষমা করিয়ে নেয়া আল্লাহ্ জন্য অসম্ভব নয়। বিদায় হজ্বের সময় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরাফার ময়দানে স্বীয় উম্মতের ক্ষমার জন্য দূয়া করলেন, তখন আল্লাহ্ বললেনঃ আমি জালেমের কাছ থেকে মাজলুমের হক অবশ্যই আদায় করিয়ে দিব। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ হে আল্লাহ্ যদি তুমি চাও তাহলে তুমি মাজলুমকে জান্নাত দিয়ে খুশি করতে পার আর জালেমকে ক্ষমা করতে পার, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এ দোয়া আরাফার ময়দানে কবুল হয় নাই, কিন্তু মোযদালেফায় যখন দ্বিতীয়বার এ দোয়া করলেন তখন আল্লাহ্ তা কবুল করলেন। (ইবনু মাযা)
এর অর্থ এই যে আল্লাহ্ যদি চান, তাহলে বান্দার হকের মধ্য কারো হক যদি ক্ষমা করিয়ে দিতে চান, তাহলে আল্লাহর জন্য এটা অসম্ভব নয়। আর মুসলিমের এ হাদীস তো প্রসিদ্ধ যে, আল্লাহ্ দু'ব্যক্তিকে দেখে হাসেন, তাদের একজন হত্যাকারী, আর অপরজন নিহত, এরা উভয়েই জান্নাতী, সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ এটা কিভাবে? তিনি বললেনঃ একজন আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে শহিদ হয়েছে, আর অপর জন মুসলমান হয়ে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে সেও শহিদ হয়েছে এবং উভয়েই আল্লাহর রহমতে জান্নাতী হয়েছে।
৩। একটি বাস্তব সত্য কথা হল এই যে, অনুগ্রহকারীর যত বেশি অনুগহ হবে, তার হকও তত বেশি হবে, তার স্পষ্ট উদহারণ হল পিতা-মাতা, সৃষ্টিজীবের মধ্যে মানুষের প্রতি সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহ পিতা-মাতা করে থাকে। তাই আল্লাহ্ মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি হক পিতা-মাতার জন্য রেখে ছেন। পিতা-মাতার পর অন্যান্য লোকদের যেধরণের অনুগ্রহ হবে, তেমনি মানুষের ওপর তার প্রতি হকও অনুভব করবে। আল্লাহ্ ঐ মহান সত্বা যার অনুগ্রহ স্বীয় বান্দাদের প্রতি এত বেশি যা গুনে শেষ করা যাবে না। আল্লাহর বাণীঃ
(وَإِن تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا) (سورة النحل : ١٨)
অর্থঃ "তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না।” (সূরা নাহাল-১৮)
এ বাস্তব সত্বের আলোকেও আল্লাহর হক মানুষের হকের চেয়ে অধিক গুরুত্ব পূর্ণ।
মূলতঃ বান্দার হক আল্লাহ্র হকের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার ব্যাপারে কোরআ'ন ও হাদীসের কোন প্রমাণ নেই। বরং সূফীবাদীদের নিজেদের তৈরী করা আক্বীদা মাত্র। যার কিছু উদহারণ নিন্ম রূপঃ
১। একটি মন রক্ষা করা হজ্জের সমান, হাজার কা'বার চেয়ে একটি মন রক্ষা করা বেশি মূল্য বান।
২। মসজিদ ভেঙ্গে দাও, মন্দীর ভেঙ্গে দাও, যা খুশি তা কর; কিন্তু কোন মানুষের মনে ব্যাথা দিবে না, কেননা মানুষের অন্তরে আল্লাহ থাকে।
৩। মানুষের অন্তর কা'বা থেকে এজন্য উত্তম যে কা'বা তো শুধু আযরের ছেলে ইবরাহিমের বিচরণ স্থান, আর মানুষের মন সবচেয়ে বড় সত্বা আল্লাহ্র অবস্থান স্থল।
এ সমস্ত দর্শন ও আক্বীদা পোষণকারীদের নিকট বান্দার হকের মোকাবেলায় আল্লাহ্ হকের কি গুরুত্ব থাকতে পারে, সূফীবাদের আক্বীদা ও দর্শন সম্পর্কে আলোচনা করা আমাদের মূল বিষয় নয়, তাই আমরা আমাদের মূল বিষয়ে ফিরতে গিয়ে বলতে চাই যে, এতে কোন সন্দেহ নেই যে আল্লাহ্ তাঁর হক স্বীয় ইচ্ছায় যাকে চান তাকে মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু আল্লাহ্ যেভাবে বান্দার হকের ব্যাপারে এ নিয়ম নির্ধারণ করেছেন যে, তা বান্দার কাছ থেকেই ক্ষমা করিয়ে নিতে হবে। এভাবে তাঁর হকের ব্যাপারেও তিনি কিছু শর্ত আরোপ করেছেন। যে ব্যক্তি এ শর্তসমূহ পূর্ণ করবে তাকে আল্লাহ্ অবশ্যই ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি ঐ সমস্ত শর্ত পূর্ণ করবে না তাকে আল্লাহ্ ক্ষমা করবেন না।
আল্লাহ্ বাণীঃ وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِّمَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى ) (سورة طه : ۸۲)
অর্থঃ "আর আমি অবশ্যই ক্ষমাশীল, তার প্রতি যে তাওবা করে, ঈমান আনে, সৎকর্ম করে ও সৎ পথে চলে।” (সূরা ত্ব-হাঃ ৮২)
এ আয়াতে আল্লাহ্ ক্ষমা করার জন্য চারটি শর্ত নির্ধারণ করেছেন। (১) তাওবা (২) সত্য ঈমান (৩) নেক আমল ও (৪) সত্বের ওপর অটল থাকা।
যে ব্যক্তি এসমস্ত শর্তসমূহ পূর্ণ করবে আল্লাহ্ তাকে অবশ্যই ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি তাওবা করে না, যথাযথ ভাবে ঈমান আনে না, নামায রোযা করে না, দান খয়রাত করে না, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিধান মত চলে না, দ্বীনের পথে চলার ব্যাপারে কোন পরীক্ষায় পতিত হলে, সেখানে সুদৃঢ় থাকে না, আর মনে করতে থাকে যে আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, তাই তিনি নিজেই সব কিছু ক্ষমা করে দিবেন। তাহলে তা হবে সরাসরি ধোঁকা ও ভ্রান্তি।
মূলকথা এই যে, যেভাবে বান্দার হক আদায় করা ব্যতীত কোন উপায় নেই, বান্দার হকের ব্যাপারে যতক্ষণ মানুষ পরিষ্কার না হবে ততক্ষণ মানুষ জান্নাতে যেতে পারবে না। এমনিভাবে আল্লাহ্র হকের গুরুত্বও অনেক। আল্লাহ্র হক আদায় করা ব্যতীতও কোন উপায় নেই। আল্লাহর হক আদায় ব্যতীত কোন ব্যক্তি জান্নাতে যেতে পারবে না। উভয় হক স্ব স্ব স্থানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন এ উভয়কে সামনা সামনি করা হবে, তখন আমরা নির্দিধায় বলব যে, আল্লাহ্ হক বান্দার হকের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

হাউজে কাওসার থেকে বঞ্চিত চার ব্যক্তি
হাশরের মাঠে আল্লাহ্ তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে হাউজে কাওসার দান করবেন। যার পানি দুধের চেয়ে সাদা হবে, মধুর চেয়ে মিষ্টি হবে, বরফের চেয়ে ঠান্ডা হবে। হাউজে কাওসারের নিকট রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ব হস্তে ঈমানদারদেরকে পানি পান করাবেন।
(আল্লাহ্ আমাদেরকে তাওফীক দিন, তাঁর রাসূলের হাতে যেন আমরা হাউজে কাওসারের পানি পান করতে পারি)
যে মুসলমান এক বার রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাত থেকে পানি পান করবে, এর পর তার আর কখনো পানির পিপাশা লাগবে না। আল্লাহ্ ভাল জানেন যে, এটা হাউজে কাওসারের পানির প্রতিক্রিয়া হবে না রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাতের মো'জেজা?
হাশরের মাঠে মানুষ অত্যন্ত পিপাশিত থাকবে, এক ফোটা পানির জন্য কাতর হয়ে যাবে, ঐ সময় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট পানি পান করার জন্য পাঁচ প্রকার লোক আসবে, এর মধ্যে চার প্রকার তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করা থেকে বঞ্চিত হবে, আর এক প্রকার তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারবে।
১। উদ্দেশ্য হাসিলকারী সুভাগ্যবানরাঃ ঐ সমস্ত লোকেরা যাদের ঈমানের মধ্যে কোন প্রকার ধোঁকা ছিল না। যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের পরিপূর্ণ অনুসারী ছিল, তারা হাউজে কাওসারের নিকট আসলে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ব হস্তে তাদেরকে পানি পান করাবেন।
২। মোরতাদঃ "মোরতাদ পানি পান করার জন্য আসবে কিন্তু ফেরেশ্তা তাদেরকে সেখান থেকে হটিয়ে দিবে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফেরেস্তা উত্তরে বলবেঃ তারা আপনার মৃত্যুর পর আপনার পথ থেকে পিছ পা ছিল।” (বোখারী)
৩। কাফের, মুশরেক, মুনাফেকঃ তারা পানি পান করার জন্য হাউজে কাওসারের নিকট আসবে, কিন্তু রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদেরকে সেখান থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিবেন। ইবনে মাযায় বর্ণিত হয়েছে যে, "আমি তাদেরকে (কাফের, মুশরেক, মুনাফেক) হাউজে কাওসার থেকে এমনভাবে সরিয়ে দিবে, যেমন উটের মালিক তার হাউজ থেকে অন্যের উটকে সরিয়ে দেয়”।
৪। বিদআতীঃ বিদআতীরাও পানি পান করার জন্য হাউজে কাওসারের নিকট আসবে, কিন্তু ফেরেস্তা তাদেরকে সেখান থেকে দূরে সরিয়ে দিবে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে ফেরেস্তাগণ উত্তরে বলবেঃ "আপনি জানেন না যে, আপনার মৃত্যুর পর তারা আপনার নামে কি কি আবিষ্কার করে ছিল"। (বোখারী)

মুরতাদ, মুশরেক, মুনাফেক অন্যান্য কাফেরদের বিষয়ে আলোচনা করা আমাদের এখানকার বিষয় নয়। তাদের আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়া, জাহান্নামে যাওয়া নিশ্চিত কথা। কিন্তু বিদআতীদের বিষয়টিই একটু কঠিন যে, বাহ্যিক ভাবে তারা ইসলাম প্রকাশ করে, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমানও প্রকাশ করে, সমস্ত রাসূল, ফেরেস্তা ও আসমানী কিতাবের প্রতি ঈমান ও রাখে, পরকাল ও ভাগ্যের প্রতিও বিশ্বাস রাখে, এ সব কিছুর প্রতি ঈমান রাখা সত্বেও তারা রাসূলের প্রতি ঈমানের দাবী পরিপূর্ণভাবে রক্ষা করে না, তাই তারা কিয়ামতের দিন ঐ লাঞ্ছনাময় ও বেদনাদায়ক শাস্তির শিকার হবে। মুসলমানের কল্যাণ কামনা করা দ্বীনের একটি অংশ, তাই আমরা এখানে বিদ'আত সম্পর্কে কিছু আলোচনা করতে চাই।
বিদআ'তের সংজ্ঞাঃ
সর্বপ্রথম একথা জানা জরুরী যে, বিদআ'ত কি? এর সংজ্ঞা স্বয়ং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দিয়েছেন, তিনি বলেনঃ (کل محدثة بدعة) (দ্বীনের মধ্যে) "প্রত্যেক নুতন আবিষ্কারই বিদআ'ত"। (নাসায়ী)
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, (من احدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد)
অর্থঃ "যে ব্যক্তি দ্বীনের মধ্যে এমন কোন কিছু আবিষ্কার করল যা দ্বীনের মধ্যে নেই তা প্রত্যাক্ষাত।” (বোখারী ও মুসলিম)
এ উভয় হাদীস থেকে যে কথা স্পষ্ট হয় যে, প্রত্যেক ঐ কাজ যা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর জীবিত অবস্থাায় নিজে করেন নি, বা এর নির্দেশ দেন নি, আর না কোন সাহাবাকে তা তিনি করতে দেখে চুপ থেকেছেন, তাই বিদআ'ত। যেমনঃ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বয়ং সাহাবাগণকে আযানের পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন, যা আল্লাহু আকবার দিয়ে শুরু, যদি কেউ আল্লাহু আকবারের পূর্বে দরূদ পড়তে চায়, তাহলে তা দ্বীনের মধ্যে নুতন আবিষ্কার, তাই তাকে বিদআ'ত বলা হয়। এমনিভাবে মৃত ব্যক্তির কবরে সওয়াব পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে কিছু কিছু বিষয় সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত যেমনঃ মৃত ব্যক্তির নামে দান করা, কোরবানী করা, হজ্জ ও ওমরা করা, এগুলো রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত, তাই এগুলো বিদআ'ত নয়। কিন্তু কোরআ'নখানী, চল্লিশা, সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত নয়। এগুলো না রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) করেছেন, না তিনি তা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন, আর না এর ওপর তিনি আমল করেছেন, না সাহাবাগণের মধ্যে কেউ তা করেছেন যার সমর্থন তিনি করেছেন, তাই এসব কিছুই বিদআ'ত।
একথা স্মরণ রাখুন যে, নুতন কিছু বলতে দ্বীনের মধ্যে সোয়াবের আশায় করা হয় এমন কিছু। এর উদ্দেশ্য দুনিয়ার নুতন নুতন আবিষ্কার সমূহ নয়। রেল গাড়ী, কার, জাহাজ, ইত্যাদি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগে ছিল না, নিঃসন্দেহে পরবর্তীতে তা আবিষ্কৃত হয়েছে, কিন্তু এগুলোর সোয়াব ও পাপের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। যদি কোন ব্যক্তি জীবনভর কোন জাহাজে না চড়ে তাতে কোন পাপ নেই। আর যদি কোন ব্যক্তি প্রতি দিন জাহাজে আরোহন করে তাতেও কোন সোয়াব নেই। তাই পার্থিব আবিষ্কার সমূহ বিদআ'তের আওতা মুক্ত।

বিদআ'তের কুফলঃ
বিদআ'তের কুফল সম্পর্কে যদি আর কোন হাদীস নাও বর্ণিত হত, শুধু হাউজে কাওসার থেকে বঞ্চিত হওয়াই বিদআ'তের ভয়াবহতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট হত। কিন্তু বিদআ'ত যেহেতু মুসলমানের বহুত বড় ধ্বংসের কারণ, তাই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা থেকে স্বীয় উম্মতকে শতর্ক করেছেন।
এ বিষয়ে কিছু হাদীস নিম্ন রূপঃ
১। "প্রত্যেক বিদআ'তের পরিণাম পথ ভ্রষ্টতা, আর প্রত্যেক পথ ভ্রষ্টতার পরিণতি জাহান্নাম।" (নাসায়ী)
২। "বিদআ'তীর তাওবা ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল হবে না, যতক্ষণ না সে বিদআ'ত ত্যাগ করবে।" (ত্বাবারানী)
৩। "তাদের জন্য ধ্বংস, তাদের জন্য ধ্বংস, যারা আমার পর দ্বীনের মধ্যে পরিবর্তন এনেছে।" (বোখারী ও মুসলিম)
৪। "বিদআ'তীদের প্রতি সমর্থনকারীদের ওপর আল্লাহর লা'নত"। (মুসলিম)
৫। "মদীনায় বিদআ'ত বিস্তার কারীর প্রতি আল্লাহ্, তার ফেরেস্তা, ও সমস্ত মানুষের পক্ষ থেকে লা'নত"। (বোখারী ও মুসলিম)
বিদআ'তের কুফল সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর, এমন কোন মুসলমান থাকতে পারে না যে, জেনে বুঝে বিদআ'ত করবে এবং নিজে নিজেকে আল্লাহ, তাঁর রাসূল, ও সমস্ত মানুষের লা'নতের হকদার বানাবে এবং পরকালে নিজের ধ্বংসের পথ বেছে নিবে।

বিদআ'থেকে বাঁচার রাস্তাঃ
বিদআ'ত থেকে বাঁচার রাস্তা ঐটিই যা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন। কোরআ'ন মাজীদের নিন্মোক্ত দু'টি আয়াতের প্রতি যদি কোন মুসলমান আমল করে তাহলে কখনো কোন বিদআ'তে লিপ্ত হবে না।
প্রথম আয়াতঃ (وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ) (سورة الحشر : ٧)
অর্থঃ “রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর, এবং যা থেকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাক। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তিনি শাস্তি দানে কঠোর." (সূরা হাশরঃ ৭)
এ আয়াতে আল্লাহ্ মুসলমানদেরকে প্রত্যেক ঐ কাজ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন, যা করার জন্য রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আর ঐ সমস্ত কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য বলেছেন যা থেকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিরত থাকতে বলেছেন।
দ্বিতীয় আয়াতঃ (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ) (سورة الحجرات : ١)
অর্থঃ “হে মুমিনগণ! আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল এর সামনে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হয়ো না। আর আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্ব শ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (সূরা হুজুরাতঃ ১)
এ আয়াতের অর্থ হল যেকাজ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো করেন নাই, সে কাজ নিজে করে, তাঁর চেয়ে অগ্রসর হবে না।
যদি কোন ব্যক্তি এ উভয় আয়াতের অর্থ বুঝে ঠিকভাবে এর ওপর আমল করে, তাহলে কোন ব্যক্তি কোন বিদআ'তে লিপ্ত হওয়ার কোন কারণ নেই।
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিদআ'ত থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে এক হাদীসে বিলকুল এ শিক্ষাই দিয়েছেন। "আমি তোমাদের মাঝে এমন দু'টি জিনিস রেখে গেলাম, যা তোমরা মযবুতভাবে ধরে থাকলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না, আর তা হল আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাত"। (হাকেম)
বিদআ'ত থেকে সতর্ক থাকার জন্য রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এ হাদীসটিও স্মরণে রাখা উচিত।
"হালাল ও হারাম উভয়ই স্পষ্ট, আর এউভয়ের মাঝে আছে কিছু অস্পষ্ট বিষয়, যে ব্যক্তি ঐ সমস্ত অস্পষ্ট বিষয় গুলো ছেড়ে দিল, সে পাপ থেকে নিজেকে বিরত রাখল, কিন্তু যে অস্পষ্ট বিষয় গুলোর ওপর আমল করার জন্য চেষ্টা করল, সে পাপে লিপ্ত হল। স্মরণ রাখ পাপ আল্লাহর নির্ধারিত সীমা, যে ঐ সীমার আসে পাশে থাকবে সে সীমালঙ্ঘন করবে”। (বোখারী)
অতএব কোন আমল যদি এমন হয় যা বিদআ'ত হওয়া বা না হওয়ার বাপারে উলামাগণের মধ্যে মতভেদ আছে, তাহলে তা থেকেও সতর্ক থাকতে হবে, ঐ আমল থেকে দূরে থাকতে হবে। অল্প আমল যা সুন্নাত মোতাবেক এবং হাউজে কাওসারের পানি পান করতে কোন বাধা হবে না, তা ঐ অধিক আমল থেকে উত্তম, যা সুন্নাত পরিপন্থী এবং হাউজে কাওসারের পানি পান করা থেকে বঞ্চিত করবে।
আল্লাহ্র বাণীঃ
قُل لَّا يَسْتَوِي الْخَبِيثُ وَالطَّيِّبُ وَلَوْ أَعْجَبَكَ كَثْرَةُ الْخَبِيثِ فَاتَّقُوا اللَّهَ يَا أُوْلِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ) (سورة المائدة: ١٠٠)
অর্থঃ "তুমি বলে দাও পবিত্র ও অপবিত্র সমান নয়, যদিও অপবিত্রের আধিক্য তোমাকে বিস্মিত করে, অতএব হে জ্ঞানীগণ! আল্লাহকে ভয় করতে থাক। যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (সূরা মায়েদাঃ ১০০)
এ চার প্রকার লোক ঐ সমস্ত লোক যারা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাউজে কাওসার পর্যন্ত পৌঁছবে, যাদের একটি দল উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারবে, আর তিনটি দল উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারবে না।
হাদীসে একটি পঞ্চম দলের কথাও পাওয়া যায়, যাদের পক্ষে হাউজে কাওসার পর্যন্ত পৌঁছাই সম্ভব হবে না। ফেরেস্তা তাদেরকে আগে থেকেই তাদের নিকৃষ্ট পরিণতিতে নিক্ষেপ করবে।
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ "আমার পরে কিছু শাসক আসবে তোমরা তাদের মিথ্যাকে বিশ্বাস করবে, আর তাদের জুলুমের ব্যাপারে তাদেরকে সহযোগীতা করবে, তারা হাউজে কাওসারের নিকট আসতে পারবে না"। (ত্বাবারানী, ইবনে হিব্বان)
মিথ্যা আমাদের সমাজে এত পরিমাণে বিস্তার লাভ করেছে যে, ওপর থেকে নিয়ে নিচ পর্যন্ত , ছোট থেকে বড় পর্যন্ত, সাধারণ থেকে বিশেষ পর্যন্ত, এত বেশি পরিমাণে মিথ্যা বলে যে, সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করা অসম্ভব হয়ে যায়।
আমাদের দেশে ট্রাফিক সপ্তাহ পালিত হয়, বৃক্ষ রোপন সপ্তাহ পালিত হয়, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সপ্তাহ পালিত হয়, আমার প্রস্তাব যে বর্তমান সরকার মিথ্যা না বলার জন্য এক সপ্তাহ পালন করুক। এসপ্তাহটি সরকারের জন্য অন্যরকম মনে হতে পারে, কিন্তু আমরা এটাকে আমাদের দেশের সমগ্র ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে বিবেচনা করব।
যারা মিথ্যার অপকারিতা সম্পর্কে সামান্য ধারণা রাখে তারাও একথা বুঝে যে, মিথ্যা সেটাই যা দিয়ে বড় ধরণের কোন ফেতনা সৃষ্টি হবে, যদিও কেউ কেউ মনে করে যে, যে মিথ্যায় কারো কোন ক্ষতি হবে না এধরণের মিথ্যা বলায় কোন সমস্যা নেই, অথচ শরিয়তে সামান্য মিথ্যা থেকেও হুশিয়ার করা হয়েছে, অল্প বয়সী সাহাবী আবদুল্লাহ্ বিন আমের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেনঃ "এক বার আমার মা আমাকে এবলে নিজের নিকট ডাকল যে, আমার নিকট আস আমি তোমাকে একটি জিনিস দিব। ঐ সময় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের ঘরে এসে ছিলেন। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার মাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তাকে কি দিতে চাও? মা বললঃ আমি তাকে খেজুর দিব। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ যদি তুমি তাকে কিছু না দিতে, তাহলে একথাটি তোমার আমল নামায় মিথ্যা হিসেবে লিখা হত।” (আবুদাউদ)
মিথ্যা চাই বড় হোক আর ছোট তাকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবীরা গোনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
মিথ্যার ভয়ানক পরিণতি সম্পর্কে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কতিপয় বাণীঃ
১- রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাদেরক লক্ষ্য করে বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে কবীরা গোনাহ সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় কবীরা গোনাহর কথা বলব না?
(ক) আল্লাহ্র সাথে শরীক করা। (খ) পিতা-মাতার নাফরমানী করা। (গ) মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে মিথ্যা বলা।
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হেলান দিয়ে বসে ছিলেন, তিনি সোজা হয়ে বসে বার বার বলতে থাকলেন, মিথ্যা সাক্ষী দেয়া বা মিথ্যা বলা, এমনকি আমরা চাচ্ছিলাম যে যদি রাসূল চুপ করতেন। (তিনি আর যেন রাগ না করেন) (মুসলিম)
২ - "রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ সত্য নেকীর পথে নিয়ে যায়, নেকীর মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়, ঈমান জান্নাতে নিয়ে যায়। অথচ মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ কুফরীর দিকে নিয়ে যায়, কুফরী জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়”। (মোসনাদ আহমদ)
৩ - "রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ যখন মানুষ মিথ্যা বলে, তখন ফেরেস্তা মিথ্যার দুর গন্ধে এক মাইল দূরে সরে যায়"। (তিরমিযী)
এ সমস্ত হাদীসের মূল কথা হল এই যে, মিথ্যা বাদী দুনিয়াতে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে, আর পরকালেও তার জন্য থাকবে জাহান্নামের শাস্তি। শুধু মিথ্যা বলাই কবীরা গোনা নয়, বরং জেনে বুঝে কারো মিথ্যাকে বিশ্বাস করাও বড় গোনা। শাসকদের ব্যাপার গুলো যেহেতু সাধারণ মানুষের তুলনায় ভিন্ন তাই তাদের ভালর প্রতিক্রিয়াও সমস্ত জাতির ওপর পড়ে, আবার তাদের - মিথ্যার পরিণতিও সবার ওপর পড়ে। তাই তাদের মিথ্যাকে বিশ্বাস করা ও তাদের জুলুমে সহযোগীতা করার শাস্তিও বিরাট। কিয়ামতের দিন সে হাউজে কাউসারের নিকট আসতে পারবে না এবং কঠিন পিপাশা নিয়ে জাহান্নামে পবেশ করবে।
জুলুম সম্পর্কে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ "জুলুম থেকে বিরত থাক, কিয়ামতের দিন তা অন্ধকারে পরিণত হবে"। (মুসলিম)
অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, "মাজলুমের বদ দূয়া থেকে দূরে থাক কেননা তার দূয়ার মধ্যে এবং আল্লাহ্ মাঝে কোন পর্দা নেই"। (বোখারী)
কিয়ামতের দিন জালেমের সমস্ত নেকী ছিনিয়ে নিয়ে নেয়া হবে, আর সে অন্যের পাপ নিয়ে জাহান্নামে যাবে। জালেমের সাথে সহযোগীতা কারীকে কিয়ামতের দিন এ শাস্তি দেয়া হবে যে, সে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাতে হাউজে কাওসারের পানি পান করতে পারবে না।
মিথ্যা ও জুলুমের জন্য এ কঠিন হুশিয়ারীরর কারণে আমাদের সালফে সালেহীনগণ সরকারী পদ গ্রহণে ও তাদের উপহার উপঢৌকন গ্রহণে সর্তকতা অবলম্ভন করতেন, এমনকি তাদের নিকট উপস্থিত হওয়া থেকেও বেঁচে থাকার চেষ্টা করতেন, যাতে করে তাদের মিথ্যা ও জুলুমে কোনভাবে জড়িয়ে না যায়। এখানে আমরা একটি উদাহরণ দিয়েই শেষ করব।
১ - আব্বাসী খলীফা আবুজা'ফর মানসুর সুফিয়ান সাওরীকে পুরাতন সম্পর্কের কারণে তার সাথে সাক্ষাতের জন্য ডেকে পাঠালেন, তখন সুফিয়ান সাওরী উত্তরে নিম্ন লিখিত চিঠি লিখে পাঠালেনঃ
বিসমিল্লা হির রহমানির রাহীম আল্লাহর বান্দা সুফিয়ান সাওরীর পক্ষ থেকে আবুজা'ফর মানসুরের প্রতি, যে কামনার চক্রান্তে বন্দী হয়ে আছে। ঈমানের স্বাদ ও কোরআ'ন তেলওয়াত থেকে বঞ্চিত হয়ে আছে। হে মানসুর তুমি মুসলমানদের বাইতুল মাল থেকে বে-হিসাব খরচ করছ, তোমার হাত নিয়ন্ত্রন কর, জালেমরা তোমার আসে পাশে ঘুরে বেড়ায়, তারা জুলুম করে চলছে, কিন্তু কেউ তাদেরকে জিজ্ঞাসা করার মত নেই। সরকারী লোকেরা মদপানকারীর ওপর শাস্তি আরোপ করে, কিন্তু তারা নিজেরা নিবিঘ্নে মদ পান করে চলছে, ব্যভিচারীকে শাস্তি দিচ্ছে, কিন্তু তারা নিজেরা ব্যভিচার করে চলছে, চোরের হাত কাটতেছে, কিন্তু নিজেরা চুরী করতেছে, অথচ তুমি এব্যাপারে মোটেও চিন্তিত নও। অবশ্য যে নিজেকে তা থেকে বাঁচিয়ে রাখতে চাচ্ছে তাকে এ পাপে পাপি করতে চাচ্ছ। আমার তোমার অনুদানের কোন প্রয়োজন নেই, আর না আমি তোমার সাথে কোন প্রকার সম্পর্ক রাখতে চাই।
খলীফা মানসুরের পর তার ছেলে মাহদীও সুফিয়ান সাওরীকে সরকারী পদ দিতে চেয়ে ছিল, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন। উপহার উপঢৌকন পাঠালে তিনি তা ফেরত পাঠিয়েছেন।
২ - বনী ওমাইয়্যা যুগে ইরাকের গর্ভণর ইয়াযিদ বিন ওমার হুবাইরা ইমাম আবুহানীফাকে ডাকল, আর বলল যে আমি আপনার নিকট আমার সীলমহর দিচ্ছি, কোন নির্দেশ ততক্ষণ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে না, যতক্ষণ না আপনি তাতে সীল মহর লাগাবেন। ইমাম সাহেব তা নিতে অস্বীকার করলে, গর্ভণর তাকে জেলের ভয় দেখাল, তাতেও তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। অন্যান্য আলেমরা বুঝাতে চাইল তিনি বললেনঃ সে চায় যে, সে কোন ব্যক্তির হত্যার নির্দেশ লিখে পাঠাবে আর আমি তাতে সীল দিব, আল্লাহ্র কসম! আমি এ কাজে কখনো অংশগ্রহণ করব না। তার শাস্তি ভোগ করা আমার জন্য পরকালের শাস্তিকে ভোগ করা থেকে সহজ। গর্ভণর ইমাম আবুহানীফাকে বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দিল, তিনি বেত্রাঘাত সহ্য করতে লাগলেন, কিন্তু পদ গ্রহণ করলেন না।
৩ - উমাইয়্যা খলীফা ওলীদ বিন আবদুল মালেক মদীনায় আসলে সাহাবী সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেবকে তার সাথে সাক্ষাতের জন্য ডাকা হল, সে দূতকে বলে পাঠাল যে, ওলীদের আমার কি দরকার পড়ল? সে হয়ত অন্য কাউকে ডেকেছে। দূত গিয়ে এ খবর দিলে তখন ওলীদ রেগে গেল এবং বললঃ তাকে জোর করে নিয়ে আস। তখন তার পরামর্শদাতারা বললঃ সাঈদ মদীনার বিজ্ঞ আলেম এবং কোরাইশদের সর্দার, সে আপনার পিতার সামনে আসতেও অস্বীকার করছিল, ওলীদ চুপ হয়ে গেল। এক বার আরাম করতে চাইল, আবার বাইতুল মাল থেকে ত্রিশ হাজার দিরহামের উপহার দিয়ে পাঠাল, সাঈদ এ বলে উপহার ফেরত পাঠাল যে, আমার এমন সম্পদের কোন দরকার নেই, যা মানুষের হক নষ্ট করে সংগ্রহ করা হয়েছে।
সালফে সালেহীনদের শাসকদের সাথে এ আচরণ শুধু এজন্যই ছিল যে, আমরা যদি শাসকদের জুলুমে সমানভাবে অংশীদার হই, তাহলে কিয়ামতের দিন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাতে হাউজে কাওসারের পানি পান করা থেকে বঞ্চিত হতে হবে।
অতএব হে ঈমানদারগণ! মিথ্যুক শাসকদের মিথ্যা বিশ্বাস করা থেকে দূরে থাকবে, জালেম শাসকদের জুলুমে সহযোগিতা করা থেকে দূরে থাকবে। যাতে এমন না হয় যে, মিথ্যুক ও জালেম শাসকদের সাথে সহযোগিতা করার কারণে কিয়ামতের দিন স্বীয় হাত চিবিয়ে চিবিয়ে এ কামনা না করতে হয় যে,
يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا ، يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا ) (سورة الفرقان : ۲۷-۲۸)
অর্থঃ "হায় দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম। আমাকেতো সে বিভ্রান্ত করে ছিল।” (সূরা ফুরকানঃ ২৮-২৯)
পরিশেষে আমরা পাঠকদেরকে দু'টি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, যেখানে মিথ্যুক শাসকদের মিথ্যাকে বিশ্বাসকারী এবং তাদের সাথে সহযোগিতা কারী হাউজে কাওসারের পানি পান করা থেকে বঞ্চিত হবে, সেখানে স্বয়ং মিথ্যুক শাসক ও জালেমদের কি অবস্থা হবে? হাউজে কাওসারের পানি পান করা থেকে বঞ্চিত হওয়া তো তাদের ব্যাপারে আরো অধিক অগ্রগণ্য, সাথে সাথে এসমস্ত মিথ্যুক শাসক ঐ দিন দুর্ভাগাদের অর্ন্তভুক্ত হবে যাদের সাথে আল্লাহ্ কিয়ামতের দিন কোন কথা বলবে না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না, আর তাদেরকে কঠিন আযাব দিবেন। (মুসলিম)
দ্বিতীয়ত আমাদের দেশে শাসক পরিবর্তনের ব্যাপারে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চালু আছে, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি তার সঠিক রায় ব্যক্ত করার জন্য ভোট দিয়ে থাকে, ভোটও কোন সত্যবাদীর সত্যকে বিশ্বাস করা ও কোন মিথ্যুকের মিথ্যাকে সত্যায়ন করারই অর্ন্তভুক্ত। বা কোন ন্যায়পরায়ন ব্যক্তির ন্যায়ে বা কোন মিথ্যুকের মিথ্যায় সহযোগীতারই অপর নাম। অতএব যে ব্যক্তি জেনে শুনে কোন মিথ্যুক বা জালেমকে ভোট দিবে, সে মূলত তার মিথ্যাকে সত্যায়ন করল এবং তার যুলুমে সহযোগিতা করল, ভোট প্রার্থীরাতো পৃথিবীতে কোন না কোন ভাবে উপকৃত হবেই, যদি মন্ত্রীত্ব নাও হাসিল হয়, অন্তত সংসদ সদস্য তো সে হবেই। কিন্তু ভোট দাতা কি পাবে? আল্লাহ্ অন্তুষ্টি, রাসূলের হাউজে কাওসার থেকে বঞ্চিত।

পুলসিরাতে আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক
ইতিপূর্বে আমরা লিখে এসেছি যে, হাশরের ময়দানে বান্দার হকের হিসাব নেয়া হবে, মাযলুমকে আল্লাহ্ জালেমের কাছ থেকে সমস্ত হক আদায় করে দিবেন। কিন্তু আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্কের হিসাব পুলসিরাতে নেয়া হেব। বা যাদের কাছ থেকে আল্লাহ্ হাশরের মাঠে নিতে চাইবেন তাদের কাছ থেকে সেখানেই সে হিসাব নিয়ে নিবেন। আর যাদের কাছ থেকে পুলসিরাতে হিসাব নিতে চাইবেন তাদের কাছ থেকে পুল সিরাতে হিসাব নিবেন। (এব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন)
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যখন পুলসিরাত জাহান্নামের ওপর স্থাপন করা হবে, তখন আমানত পুল সিরাতের ডান পাশে আর আত্মীয়তার সম্পর্ককে পুলসিরাতের বাম পাশে রাখা হবে। (মুসলিম)
পুলসিরাতের ওপর দিয়ে অতিক্রম করার সময় যে ব্যক্তি আমানতের খিয়ানত করেছে, তাকে আমানত ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। আর যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে নাই, তাকে আত্মীয়তার সম্পর্ক ধরে, জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। এ থেকে একথা প্রমাণিত হয় যে, অন্যান্য হকসমূহের মধ্যে আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক অধিক গুরুত্বপূর্ণ, যার হিসাব অন্যান্য হক থেকে পৃথকভাবে পুলসিরাতের ওপর নেয়া হবে। (এ ব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন) এ উভয়ের গুরুত্বের প্রতি লক্ষ্য রেখে আমরা তার শরঈ বিধান এখানে পরিষ্কার করতে চাই।
ক) আমানতঃ সাধারণত আমানত বলতে বুঝায় কোন ব্যক্তিকে কোন কিছু দিলে, আর সে তা ঐ ভাবে সংরক্ষণ করে ফেরত দিলে সে আমানত দার। বা কেউ তার কাজে কোন রকমের হের ফের না করলে, জায়েয না জায়েয, হালাল ও হারামের প্রতি লক্ষ্য রাখে তাহলে তাকে আমানতদার বলা হয়। এ চিন্তা যদিও ঠিক আছে কিন্তু এটা খুবই সীমিত। শরীয়তের পরিভাষায় শব্দটি আরো ব্যাপক। আবুযার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট সরকারী কোন পদ চাইলে তিনি বললেনঃ "এটি আমানত” যা কিয়ামতের দিন লজ্জা ও লাঞ্ছনার কারণ হবে। তবে ঐ ব্যক্তি ব্যতীত যে এ আমানত যথাযথ ভাবে আদায় করে। (মুসলিম)
এথেকে বুঝা গেল পদ ও দায়িত্ব আমানত। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, "বৈঠকের কথা বার্তাও আমানত”। (আবুদাউদ) অর্থাৎঃ কারো সাথে কোন গোপন কথা বলা হলে সে গোপন বিষয় প্রকাশ করলে আমানতের খিয়ানত করা হবে। অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, "নামায আমানত” “ওজু আমানত"। "মাপা আমানত"। (ইবনু কাসীর)
এক হাদীসে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নামাযে রুকু ও সেজদা ঠিক ভাবে না করাকে নামাযে চুরী করা বলে আক্ষায়িত করে ছেন। (আহমদ)
যা থেকে প্রমাণ হয় যে, নামাযের রুকন ও ওয়াজিব সমূহও আমানত। কোরআ'নে আল্লাহ্ এরশাদ করেছেন, (يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ) (سورة غافر : ١٩)
অর্থঃ "আল্লাহ্ চোখের খেয়ানত ও আন্তরের গোপন কথা সর্ম্পকেও অবগত আছেন।” (সূরা মুমেনঃ ১৯)
এথেকে বুঝা গেল চোখের দৃষ্টি শক্তিও আল্লাহ্র দেয়া আমানত। সূরা আহযাবে আল্লাহ্ কোরআ'নের এ শিক্ষা সমূহকেও আমানত বলে আক্ষায়িত করেছেন। আল্লাহ্র বাণীঃ
إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَن يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنسَانُ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا (سورة الأحزاب : ۷۲)
অর্থঃ "আমি তো আসমান, যমিন ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত অর্পণ করেছিলাম, তারা এটা বহন করতে অস্বীকার করল এবং ওতে শংকিত হল, কিন্তু মানুষ ওটা বহন করল, সে তো অতিশয় অজ্ঞ." (সূরা আহযাবঃ ৭২)
এ সবগুলো বিষয় একত্রিত করলে নিন্মোক্ত সবগুলো বিষয়ই আমানত বলে গণ্য হয়।
ক) ইসলামী বিধি-বিধানঃ সমস্ত ফরয, ওয়াজিব, নিদের্শ, নিষেধ, আল্লাহর হক, বান্দার হক, যা আদায়ে সওয়াব হবে আর অনাদায়ে শাস্তি হবে তা আমানতের অর্ন্তভুক্ত।
খ) পদ ও দায়িত্বঃ সরকারী, বে-সরকারী এবং অন্যান্য ছোট খাট দায়িত্বও আমানত, যে ব্যক্তি তার পদের দায়িত্ব যথাযথ ভাবে আদায় করে সে নিরাপদে আছে। আর যে ব্যক্তি স্বীয় দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করছে না, স্বীয় স্বার্থে তা ব্যবহার করছে, সে আমানতের খিয়ানতকারী। সরকারী, বে-সরকারী দায়িত্ব ব্যতীত অন্যান্য দায়িত্ব চাই তা ঘরের মধ্যে হোক যেমনঃ সন্তান-সন্ততিদেরকে সু শিক্ষা দেয়া, আর বাহিরে যেমনঃ কোন দ্বীনি, রাজনৈতিক, বা সামাজিক সংগঠনের দায়িত্ব, এসবই আমানত। যে ব্যক্তি এ সমস্ত দায়িত্ব ইসলামী বিধান মোতাবেক আদায় করছে সে নিরাপদ, আর যে তা ইসলমী বিধান মোতাবেক আদায় করছে না, সে আমানতের খিয়ানত কারী।
গ) নে'মতসমূহঃ আল্লাহ্ দেয়া ঐ সমস্ত ছোট বড় নে'মত যেমনঃ ধন-সম্পদ, সন্তান সন্ত তি, স্ত্রী, ঘর, বাড়ী, এমনকি চোখ, কান, অন্তর মস্তিষ্ক, হাত, পা, সুস্থতা, যৌবন এসমস্ত আল্লাহ্ দেয়া নে'মত সমূহও আমানত, এ নে'মতসমূহকে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের হুকুম মোতাবেক ব্যবহার কারী আমানতদার। আর আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ বহির্ভূত পদ্ধতিতে ব্যবহার কারী আমানতের খিয়ানতকারী। যদি আমানতের এ ব্যাপক অর্থকে সামনে রাখা যায় তাহলে, সমস্ত শরঈ বিধি-বিধান, ওয়াজিব, ফরজ, পূর্ণকারী আমানত দার, আর তা পূর্ণ না কারী খেয়ানত কারী। স্বীয় পদ, ক্ষমতা, বা অন্যান্য দায়িত্ব পূর্ণকারী আমানতদার, আর এথেকে অবৈধভাবে স্বীয় স্বার্থ হাসিলকারী বা তা পূর্ণ না কারী খিয়ানত কারী। এভাবে আল্লাহর দেয়া নে'মতসমূহকে তাঁর নির্দেশ মোতাবেক ব্যবহারকারী আমানতদার, আর তাঁর নির্দেশ বর্হিভুত পদ্ধতিতে ব্যবহারকারী খিয়ানত কারী। আমানতদার ও খিয়ানত কারীর এ পরিচয় সামনে রেখে আমাদের মধ্য থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির স্বীয় আমলের ওপর চিন্তা করে দেখা দরকার যে, যেসমস্ত দিকে আমানত রক্ষা করার ব্যাপারে দুর্বলতা আছে, তা পূর্ণ করার সর্বাত্বক চেষ্টা করা। আমানত ও দ্বীনদারীর ব্যাপারে প্রিয় জন্মভূমির (লিখকের) সামাজিক অবস্থার ওপরও দৃষ্টি দেয়া দরকার। আমাদের সুস্থ রায় এই যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়ে, এ পর্যন্ত আমাদের জাতীয় পর্যায়ে যেসমস্ত অবনতি হয়েছে তার বড় কারণ আমানতের খিয়ানত ও বে-দ্বীনি। ওপর থেকে নিয়ে নিচ পর্যন্ত, সরকারী সংস্থা সমূহ থেকে নিয়ে মাঠ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান সমূহ পর্যন্ত সর্বত্রই খিয়ানত ও বে-দ্বীনি, ধোঁকা ও চক্রান্ত রয়েছে। কতিপয় সংবাদ পত্রে দ্রষ্টব্য।
১ - এডমিরল মানসুরুল হক এস এম ৩৯ মিজাইলসমূহ ক্রয়ের ব্যাপারে আড়াই কোটি রুপী গ্রাস করেছে।⁴
২ - রাডার ক্রয়ের ব্যাপারে ৮০ মিলিয়ন ডলার লা-পাতা। সওল ইউ এশন ইথারে ইয়ার ভাইশ মর্শাল খোরশেদ আনোয়ার মিরজার সেচ্চা চারিতা।⁵
৩ - তিন হাজার সৈনিক ট্রাক ক্রয়ের ব্যাপারে দেড় কোটি রুপী লাপাত্তা।⁶
৪ - ২৮০ কোটি রুপীর ঘাপলায় এরফান পূরী বাইরুনে গিয়ে বিদ্রোহী হয়ে গেছেন।⁷
৫ - করাচীর আপার হাউজিং সোসাইটিতে ৭ কোটি রুপী আনন্দ উপভোগের জন্য অপব্যয়।⁸
৬-ওয়পদায় ৬০ কোটি রুপী এবং কে, ই, এস, সীতে ১৮ কোটি রুপীর কারেন্ট চুরী। এক বছর পূর্বে চিফ এক্সিকিউট সেক্রেটারিয়েট থেকে গোপন নির্দেশ এসেছে যে, করাচীর কারেন্ট চোরদের কার্যক্রম যেন প্রকাশ না করা হয়।⁹
৭-করাচীর গাড়ানী কাষ্টম হাউজে ১৫০ কোটি রুপি গোম।¹⁰
৮ - সিবি আরের চেয়ারম্যানের অধিনে ইনকাম টেক্সে ৪ কোটি রুপি লাপাত্তা।¹¹
৯-সিবি আর কোর্টে ৭ কোটি রুপি করাপশন অথচ সরকার নিশ্চুপ।¹²
১০- বি,এ, সি। এম,বি,বি, এস, পর্যন্ত ডিগ্রীসমূহ এক হাজার থেকে এক লাখ রুপির বিনিময়ে বিক্রি হচ্ছে। ¹³
১১- হোমিও প্যাথিক ডাক্টারদের ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট ৫ হাজার রুপির বিনিময়ে বিক্রি হচ্ছে। ¹⁴
১২-শহরের চেয়ারম্যানকে জিতানোর জন্য ১০ লাখ রুপি ঘুষ। ¹⁵
১৩- সরকারকে নিজেদের অনুকুলে রাখার জন্য গভর্ণর হাউজে ঘোড়ার ব্যবসা। ¹⁶
প্রিয় জন্মভূমির গুরুত্বপূর্ণ আসন সমূহে পদাধিকারী ব্যক্তিদের সম্পর্কে এসমস্ত খবর পড়ার পর, দেশের নিম্নপদের কর্মকর্তাদের দায়িত্ববোধ ও আমানতদারী এবং দ্বীনদারী সম্পর্কে এ অনুমান করা অসম্ভব নয় যে, মনে হচ্ছে আমরা যেন জাহেলিয়‍্যাতের যুগের কোন অন্ধকারে ডুবে আছি। যেখানে আমানত, দ্বীনদারী, সত্যতা, চরিত্র, নিয়ম, কানুন নামে কোন কিছু নেই। সর্বত্র শুধু ধোঁকা, চক্রান্ত, মিথ্যা, খিয়ানত, বে-দ্বীনি, লুট পাটের জোয়ার চলছে। সর্বত্রই শুধু ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। হালালা, হারাম, জায়েজ, নাজায়েজ, যেকোনভাবে সম্পদের আগুন জমাকরার প্রচেষ্টা চলছে। আর এপ্রচেষ্টায় ছোট বড়র কোন পার্থক্য নেই। দুনিয়াতে আমাদের ওপর আল্লাহর আযাব যদি নাও আসে, আর এ দুনিয়ায় যদি আল্লাহ্ নাও ধরেন, কিন্তু হাশরের মাঠে তাঁর শাস্তি থেকে কে বাঁচাবে। চুলের চেয়ে পাতলা আর তলওয়ারের চেয়ে ধার, পুলসিরাত দিয়ে এ খিয়ানত ও লুটপাটকারী বে-দ্বীনি কি করে অতিক্রম করবে। জাহান্নামের কিনারে হুক থাকবে যা দিয়ে ধরে এ ধরণের জালেমদেরকে জাহান্নামের অতল তলে নিক্ষেপ করা হবে।
অতএব কে আছে যে আজ আল্লাহকে ভয় করে বে-দ্বীনি ও খিয়ানতের রাস্তা ত্যাগ করে দ্বীনদারী ও আমানতদারীর রাস্তা অবলম্বন করবে? আছে কি কোন চিন্তাশীল?

খ) আত্মীয়তার সম্পর্কঃ মানবিক সম্পর্কের মূল হল মায়ের উদর। তাই আত্মীয়তার সম্পর্কের হক আদায় করাকে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা বলা হয়। আর আত্মীয়তার সম্পর্কের হক আদায় না করাকে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা বলা হয়। আত্মীয়তার সম্পর্ক যত বেশি হবে, হকও তত বেশি হবে। আত্মীয়তার সম্পর্ক যত কম হবে, হকও তত কম হবে। এ দিক থেকে মানুষের ওপর সবচেয়ে বড় হক পিতা-মাতার হক। আল্লাহ্ কোর'আনে বার বার পিতা-মাতার সাথে সৎব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। ¹⁷
উল্লেখ্যঃ হক আদায়ের একটি স্তর হল ন্যায় পরায়নতা। আর ন্যায় পরায়নতা এই যে, যার হক যতটুকু তাতে বিন্দু পরিমাণে কম না করা এবং তা পরিপূর্ণভাবে আদায় করা। কিন্তু পিতা-মাতার ব্যাপারে আল্লাহ্ ন্যায় পরায়নতা থেকে অগ্রসর হয়ে, অনুগ্রহ করার নির্দেশ দিয়ে ছেন। আর অনুগ্রহ করার অর্থ হল এই যে, মানুষ পিতা-মাতার হক তো আদায় করবেই, এমনকি তাদের সাথে সদাচারণও করবে। মূল কথা হল এই যে, কোন ব্যক্তি পিতা-মাতার সেবার সম্পর্ক ন্যায়পরায়নতা সহও যদি আদায় করতে চায়, তবুও তা আদায় করা সম্ভব নয়। আর মানুষের পক্ষে পিতা-মাতার হক অনুগ্রহের সাথে আদায় করা তো অনেক দূরের কথা। এক ব্যক্তি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে জিজ্ঞেস করল হে আল্লাহ্র রাসূল! সন্তানদের ওপর পিতা-মাতার অধিকার কত টুকু। তিনি বললেনঃ তারা উভয়ে তোমার জন্য জান্নাত বা জাহান্নাম। (ইবনু মাযা)
অর্থাৎ: তারা উভয়ে যদি সন্তানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে সন্তান জান্নাতী হবে। আর যদি অসন্তুষ্ট হয় তাহলে সন্তান জাহান্নামী হবে।
অন্য হাদীসে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো স্পষ্ট করে বলেছেনঃ "পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান জান্নাতে যাবে না"। (নাসায়ী)
অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ঐ ব্যক্তি লাঞ্ছিত ও অপমানিত হোক যে তার পিতা-মাতার মধ্য থেকে উভয়কে, বা কোন একজনকে বৃদ্ধ বয়সে পেল অথচ তাদের খেদমত করে জান্নাত হাসিল করতে পারল না"। (হাকেম)
তাদের মৃত্যুর পর তাদের সাথে সদাচরণ এই যে, তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করা। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাণীঃ মৃত্যুর পর জান্নাতে সৎ লোকদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। তখন সে বলবে, এ মর্যাদা আমি কি করে হাসিল করলাম? আল্লাহ্ বলবেনঃ তোমার সন্তান তোমার জন্য মাগফিরাত কামনা করে ছিল। (আহমদ, ইবনু মাযা)
পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের সাথে সদাচরণের দ্বিতীয় পদ্ধতি এই যে, তাদের বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সদাচরণ করা। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ "নেক আমল সমূহের মধ্যে উত্তম নেক আমল এই যে, মানুষ তার পিত-মাতার মৃত্যুর পর তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সদাচরণ করবে। (মুসলিম)
"এক ব্যক্তি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট এসে বললঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার একটি বড় গোনাহ হয়ে গেছে। আমার তাওবা কবুল হবে কি? তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মা বেঁচে আছে কি? সে বললঃ না, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার খালা আছে? সে বললঃ হাঁ, তিনি বললেনঃ যাও তার সাথে ভাল আচরণ কর"। (তিরমিযী)
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের জন্য দূয়া করা, মাগফেরাত কামনা করা, তাদের ওসিয়ত পূর্ণ করা, তাদের আত্মীয়দের সাথে সদাচরণ করা, তাদের বন্ধুদেরকে সম্মান করাও তাদের সাথে সদাচরণ করার অর্ন্তভুক্ত। (আবুদাউদ)
পিতা-মাতার পর আপন ভাই বোনদের স্তর, যাদের সম্পর্ক একেই উদরের সাথে। ইসলাম আপন ভাই বোনদের হক আদায়ের ব্যাপারে বিশেষ গুরোত্ব আরোপ করেছে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আল্লাহ্ আত্মীয়তার সম্পর্ককে সম্বোধন করে বলেছেনঃ "যে তোমার সম্পর্ক অটুট রাখবে আমি তার সাথে সম্পর্ক অটুট রাখব, যে তোমার সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব"। (বোখারী)
অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন কারী জান্নাতে যাবে না।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার কল্যাণ ও উপকার সম্পর্কে সতর্ক করতে গিয়ে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ "আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার কারণে বংশের লোকদের মধ্যে মোহাব্বত বৃদ্ধি পায়, সম্পদ বাড়ে, হায়াত বাড়ে"। (তিরমিযী)
"আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে তিনি এও বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সম্পর্কের খাতিরে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে, সেটা এ সম্পর্ক রক্ষা করা নয় বরং এ সম্পর্ক রক্ষার অর্থ হল যে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা"। (বোখারী)
রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের পর ঐ সমস্ত আত্মীয় ও মুসলমানদের স্তর, যাদের সাথে সম্পর্ক রাখার জন্য রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন এবং যাদের সাথে সম্পর্ক ত্যাগের কারণে কঠিন সর্তকবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেনঃ মুসলমানদের জন্য জায়েজ নয় যে, সে তার কোন ভায়ের সাথে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকবে। আর যে ব্যক্তি তিন দেনের বেশি সময় সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকল এবং ঐ অবস্থায় মারা গেল তাহলে সে জাহান্নামী হবে"। (আহমদ, আবুদাউদ)
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভায়ের সাথে এক বছরের বেশি সময় সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকল, সে যেন তার মুসলমান ভাইকে হত্যা করল। (আবুদাউদ)
এ উভয় হাদীস থেকে একথা অনুমান করা যায় যে, যখন সাধারণ মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার এ শাস্তি, তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের সাথে, তিন দিনের বেশি সময় সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকলে কি অবস্থা হতে পারে?
এক বার সুলতান সালাহউদ্দীন আইউবী (রাহিমাহুল্লাহ) স্বীয় সেনাবাহিনীর সাথে সফর করতে ছিলেন, কোন এক স্থানে তাবু স্থাপন করলে, সৈনিকরা ঐ গ্রাম থেকে একটি গাভী ধরে এনে কোরবানী করল, গাভী এক বৃদ্ধ মহিলার ছিল, ঐ মহিলা পরের দিন সুলতান সালাহউদ্দীন (রাহিমাহুল্লাহর) চলার পথে এক পুলের নিকট এসে দাঁড়িয়ে থাকল, তিনি ঐ পথ অতিক্রম করার সময় মহিলা তাকে থামার জন্য ইশারা করল, তাঁর থামা মাত্রই মহিলা ঘোড়ার লাগাম ধরে নিল, তিনি জিজ্ঞেস করলেন হে সতী নারী তোমার কি হয়েছে? সে বললঃ বাদশাহ! আমার মামলার বিচার এ পুলে করতে চাও না পরকালের পুলে? সুলতান সালাহ উদ্দীন একথা শোনা মাত্র ঘোড়া থেকে অবতরণ করে বললঃ হে সতী নারী! পরকালে ফায়সালা করার হিম্মত কার আছে, আমাকে বল তোমার ওপর কি অবিচার করা হয়েছে? আমি তোমার মামলার ফায়সালা এখনই করব। বৃদ্ধা মহিলা বললঃ বাদশাহ শান্ত হোন। আমি এক গরীব মহিলা, একটি গাভী আমার জীবন যাপনের পাথেয় হিসেবে ছিল, তোমাদের সৈনিকরা আমার গাভী নিয়ে এসে কোরবানী করেছে, আমি আমার গাভী চাই। বাদশাহ তার সৈনিকদের এ জুলুমের জন্য শুধু ঐ বৃদ্ধ মহিলার নিকট ক্ষমাই চাইলেন না বরং অনেক দীনার ও দিরহাম দিয়ে ঐ মহিলাকে রাজি করাল এবং যথেষ্ট সম্মানের সাথে তাকে বিদায় জানাল।
আমাদের প্রত্যেককে হয় এ দুনিয়াতে আত্মীয়তার সম্পর্কের হক আদায় করতে হবে, আর না হয় পুলসিরাতে নিজ নিজ হিসাব বাধ্য হয়েই দিতে হবে। যার ভাল মনে হয় সে যেন এ দুনিয়াতেই আল্লাহ্ ও তাঁর রাসলের নির্দেশ মেনে চলে, আত্মীয়তার সম্পর্কের দাবী পুরণ করে, স্বীয় বোঝা হালকা করে, আর যার ভাল লাগে সে যেন তার আমিত্ব ও অহংকারের বোঝা মাথায় বহন করে পুলসিরাতের ওপর যায়, আর সেখানে অবশ্যই তাকে আত্মীয়তার সম্পর্কের সাথে সাক্ষাত করতে হবে, তখন সে নিজেই নিজের হক আদায় করে নিবে।
وَإِن مِّنكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَّقْضِيًّا (سورة مريم: ۷۱)
অর্থঃ "এবং তোমাদের প্রত্যেকেই ওটা অতিক্রম করবে, এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত।” (সূরা মারইয়ামঃ ৭১)

আল্লাহ্র আদালতেঃ
কিয়ামতের দিন পূর্বের ও পরের সমস্ত মানুষকে একা একা আল্লাহ্ আদালতে উপস্থিত হয়ে স্ব স্ব জীবনের আমলের হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ্ বাণীঃ
فَوَرَبِّكَ لَنَسْأَلَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ، عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ) (سورة الحجر : ٩٢-٩٣)
অর্থঃ "সুতরাং তোমার প্রতিপালকের কসম! আমি তাদের সকলকে প্রশ্ন করবই, সে বিষয়ে যা তারা করে থাকে।" (সূরা হিজরঃ ৯২-৯৩)
আল্লাহর আদালতে জাওয়াব দেহি কত কঠিন তা একথা থেকে অনুমান করা যাবে যে, বড় বড় নবীগণ নূহ (আঃ), ইবরাহিম (আঃ), মূসা (আঃ), ঈসা (আঃ), তাঁরাও কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদালতে উপস্থিত হতে ভয় করবেন।
বিদায় হজ্বের সময় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক লক্ষের অধিক সাহাবীর সম্মেলনে বক্তৃতা করতে গিয়ে বললেনঃ লোকেরা! এক দিন তোমাদেরকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে, আমাকে বল যে তোমারা আমার ব্যাপারে কি বলবে? সমস্ত সাহাবাগণ এক বাক্যে বললঃ আমরা সাক্ষ দিচ্ছি যে আপনি আপনার দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করেছেন এবং উম্মতের জন্য পরিপূর্ণরূপে কাল্যাণকামী ছিলেন। তখন তিনি আকাশের দিকে শাহাদাত আঙ্গুল উঁচু করে তিন বার বললেনঃ হে আল্লাহ্! সাক্ষী থাকুন হে আল্লাহ্! সাক্ষী থাকুন হে আল্লাহ্! সাক্ষী থাকুন (মুসলিম)
রিসালাতের দায়িত্ব পালন করার ব্যাপারে উম্মতের সাক্ষী নিয়ে আল্লাহকে সাক্ষ্য রাখার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ আদালতে জাওয়াব দিহিতা থেকে মুক্ত হওয়া। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আল্লাহ্ আদালতে উপস্থিতির ভয় তাঁর মধ্যে এত ছিল যে, একদা আবদুল্লাহ বিন মাসউদ কে নিদের্শ দিলেন যে, আবদুল্লাহ্ আমাকে কোরআ'ন তেলওয়াত করে শোনাও আবদুল্লাহ্ বিন মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললঃ হে আল্লাহ্র রাসূল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনার ওপর কোরআ'ন অবতীর্ণ হয়েছে আর আমি তা আপনাকে তেলওয়াত করে শোনাব? তিনি বললেনঃ আমার মন চায় যে অপরের কাছ থেকে তেলওয়াত শুনি। আবদুল্লাহ্ সূরা নিসা তেলওয়াত করতে লাগলেন। যখন
فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِن كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلاء شَهِيدًا) (سورة النساء : ٤١)
অর্থঃ "তখন কি অবস্থা হবে যখন আমি প্রত্যেক দ্বীনি সম্প্রদায় থেকে সাক্ষী আনয়ন করব, আর তোমাকে তাদের প্রতি সাক্ষী করব?" (সূরা নিসাঃ ৪১)
তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবদুল্লাহ্ বিন মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কে বললঃ আবদুল্লাহ্ থাম। তিনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দিকে তাকিয়ে দেখলেন যে তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে." (বোখারী)

যখন ঈসা (আঃ) কে আল্লাহর আদালতে ডেকে জিজ্ঞেস করা হবে যে,
أَأَنتَ قُلتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِن دُونِ اللَّهِ )
অর্থঃ "তুমি কি লোকদেরকে বলে ছিলা, তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া আমাকে ও আমার মাকে মা'বুদ রূপে গ্রহণ কর?"
ঈসা (আঃ) উত্তর দেয়ার পূর্বে আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করবেনঃ
قَالَ سُبْحَانَكَ
অর্থঃ "ঈসা বলবেঃ "আমি তো আপনাকে পবিত্র মনে করি,"
এরপর স্বীয় দুর্বলতা ও অনুনয় বর্ণনা করতে গিয়ে বলবেনঃ
مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقِّ
অর্থঃ"আমার পক্ষে কোনক্রমেই শোভনীয় ছিল না যে, আমি এমন কথা বলি যা বলার আমার কোন অধিকার নেই"।
এর পর আবার আল্লাহর গুণাবলী বর্ণনা করবেনঃ
إِن كُنتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْتَهُ نَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ إِنَّكَ أَنتَ عَلامُ الْغُيُوبِ) (سورة المائدة : ١١٦)
অর্থঃ "যদি আমি বলে থাকি, তবে অবশ্যই আপনার জানা থাকবে, আপনিতো আমার অন্ত রস্থিত কথাও জানেন, পক্ষান্তরে আপনার অন্তরে যা কিছু আছে, আমি তা জানিনা। সমস্ত গায়েবের বিষয় আপনিই জ্ঞাত।” (সূরা মায়েদাঃ ১১৬)
এ ভূমিকা পেশ করার পর ঈসা (আঃ) আল্লাহ্র মূল প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সাহস করবেন, তিনি বলবেনঃ
مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ
অর্থঃ "আমি তাদেরকে কিছুই বলিনি এটা ব্যতীত, যা আপনি আমাকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর, যিনি আমারও প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক।”
وَكُنتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَّا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنتَ أَنتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ) (سورة المائدة : ١١٧)
প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পর আবার আল্লাহ্র নিকট বিনয়ের সাথে পেশ করবে যে,
অর্থঃ "আমি তাদের সম্বন্ধে জ্ঞাত ছিলাম যতক্ষণ আমি তাদের মাঝে ছিলাম, অতপর যখন আপনি আমাকে উঠিয়ে নিয়েছেন, তখন আপনিই তাদের সম্বন্ধে অবগত রয়েছেন, আর আপনি সর্ব বিষয়ে পূর্ণ খবর রাখেন।”
পরিশেষে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বিনয়ের সাথে স্বীয় উম্মতের জন্য এ ভাষায় সুপারিশ করবেন,
إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (سورة المائدة : ١١٨)
অর্থঃ "আপনি যদি তাদেরকে শান্তি প্রদান করেন, তবে ওরা তো আপনার বান্দা, আর যদি ক্ষমা করে দেন, তবে আপনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” (সূরা মায়েদাঃ ১১৮)
আল্লাহ্র আদালতে নবীগণের উপস্থিতির এ ঘটনাবলী থেকে এ অনুমান করা যায় যে, সেখানকার পরিস্থিতি কত কঠিন হবে।

আমাদের পূর্বসূরীগণ আল্লাহর আদালতে উপস্থিতির বিষয়ে কত ভীত সন্ত্রস্ত ছিলেন, তার কিছু উদাহরণ নিম্নে পেশ করা হল।
১ - আবুবকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) পাখীদেরকে দেখলে আফসোস করে বলতেনঃ পাখী তোমরা ধন্য হও, তোমারা পৃথিবীতে জীবন যাপন করছ, বৃক্ষের ছায়া গ্রহণ করছ, অথচ কিয়ামতের দিন তোমাদের কোন হিসাব কিতাব নেই, হায়! আবুবকর যদি তোমাদের মত হত।
২- ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রাস্তায় চলতে ছিলেন, হঠাৎ কিছু মনে হল, তিনি নিচের দিকে তাকালেন এবং একটি কাঠি উঠালেন, আর বললেনঃ হায়। আমি যদি এ কাঠি হতাম, হায়! আমাকে যদি সৃষ্টি না করা হত, হায়! আমাকে যদি আমার মা জন্ম না দিত। একদা তিনি সূরা তুর তেলওয়াত করতে ছিলেন, যখন এ আয়াতে পৌঁছলেন,
إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعٌ ، مَا لَهُ مِن دَافِعٍ) (سورة الطور : ۷-۸)
অর্থঃ "তোমার প্রতিপালকের শাস্তি অবশ্যম্ভাবী, এর নিবারণকারী কেউ নেই।” (সূরা তৃর-৭-৮)
তখন এত কাঁদলেন যে অসুস্থ হয়ে গেলেন এবং লোকেরা তাকে দেখতে আসতে লাগল।
২৩ হিযরীতে তিনি হজ্ব আদায় করেছেন, আসার পথে এক স্থানে, থেমে চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন, আর আকাশের দিকে তাকিয়ে হাত উঠিয়ে দুয়া করতে লাগলেন, হে আল্লাহ্ এখন বয়স বৃদ্ধি পাচ্ছে, শক্তি কমে আসছে, রাষ্ট্রের পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে, এ অবস্থায় তুমি আমাকে উঠিয়ে নাও যেন আমার আমল নষ্ট না হয়, আর আমি অধিক বার্ধক্যে না পৌঁছি।
৩- আমর বিন আস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মৃত্যুর সময় আকাশের দিকে হাত তুলে দূয়া করতে লাগলেন, হে আল্লাহ্ তুমি নির্দেশ দিয়েছ, আমি তা অমান্য করেছি, তুমি সুযোগ দিয়েছ আমি নাফরমানী করেছি, হে আল্লাহ্ আমি নিষ্পাপ নই যে ক্ষমা পেয়ে যাব, আবার শক্তিশালীও নই যে, তা প্রয়োগ করে মুক্তি নিব, যদি তোমার দয়া না হয় তাহলে ধ্বংস হয়ে যাব।
৪ - ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু), সালমান ফারেসী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কে মাদায়েনের গর্ভনর করে পাঠালেন, আর চার বা পাঁচ হাজার দিরহাম বেতন নির্ধারণ করলেন, তিনি যখন বেতন পেতেন তখন তা গরীব মিসকীনদের মধ্যে বন্টন করে দিতেন, আর নিজে সাধারণভাবে জীবন যাপন করতেন, তিনি যখন মৃত্যু সজ্জায় শায়িত তখন তার নিকট তাকে দেখার জন্য সায়াদ বিন আবু ওক্কাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আসল, তখন সালমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কাঁদতে লাগল, সায়াদ বিন আবু ওক্কাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কেন কাঁদছেন? সালমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেনঃ আল্লাহর কসম! না মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছি, না দুনিয়ার প্রতি কোন লোভ নিয়ে, বরং এজন্য কাঁদছি যে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কাছ থেকে ওয়াদা নিয়ে ছিলেন যে, দুনিয়া সংগ্রহ করবে না, আর দুনিয়া থেকে এমনভাবে বিদায় নিবে যেভাবে আমি নিয়েছি, আমার ভয় হচ্ছে, না জানি কিয়ামতের দিন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যিয়ারত থেকে বঞ্চিত হয়ে যাই। সালমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর মৃত্যুর পর তার ঘরে যা পাওয়া গিয়েছিল তাছিল এই যে, একটি পেয়ালা একটি জল পাত্র, একটি পুরাতন কম্বল, একটি বড় থাল আর বালিশ রাখার সমপরিমাণ দু'টি ইট।
৫-ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর শাসনামলে আবু দারদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন, একদা ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) গভর্নরের সাথে সাক্ষাতের জন্য সিরিয়া গেলেন, রাতে গভর্নর হাউজে পৌঁছলেন, সেখানে কোন আলোর ব্যবস্থা ছিল না। এক পাশে ঘোড়া থাকার জায়গা, কয়েকটি ইটের বিছানা, আর ঠান্ডা লাগলে ব্যবহারের জন্য একটি চাদর এছিল গভর্নর হউজের আসবাবপত্র। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এদেখে আশ্চার্য হলে আবুদারদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেনঃ আপনি কি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এ হাদীস শোনেন নাই তোমাদের নিকট এতটুকু সম্পদ থাকা চাই, যতটুকু মুসাফিরের পাথেয় হিসেবে থাকে। একথা শুনে ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কাঁদতে লাগলেন এবং আবুদারদাও কাঁদতে লাগল, আর এভাবেই ফজর হয়ে গেল।
৬- ওমর বিন আবদুল আজীজ (রাহিমাহুল্লাহ) রাত জেগে জেগে পরকালের জাওয়াবদেহিতার ব্যাপারে চিন্তা করতেন, আর হঠাৎ বেহুশ হয়ে পড়ে যেতেন। তার স্ত্রী তাকে সান্তনা দিত, কিন্তু তিনি আরাম বোধ করতেন না। মৃত্যুর পূর্বে তার স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তিকে উপদেশ করলেন যে, আমি পরকালের পথে পারি জমাচ্ছি, সেখানে আল্লাহ্ আমাকে প্রশ্ন করবেন, হিসাব নিবেন, তার কাছ থেকে কোন কিছু গোপন করা সম্ভব নয়, যদি আল্লাহ্ আমার প্রতি সন্তুষ্ট হন তাহলে তো কামিয়াব হব। আর না হলে আমার পরিণতি আফসোস জনক হবে। আমার পরে তোমাকে আমি আল্লাহ্ ভীতির উপদেশ দিচ্ছে, আর স্মরণ রাখ আমার পরে তুমি বেশি দিন বেঁচে থাকবে না, এমন যেন না হয় যে, অন্যমনস্ক হয়ে গিয়ে সময় কেটে না যায়।
৭- ইমাম আবুহানীফা (রাহিমাহুল্লাহ্) একদা এশার নামাযে সূরা যিল যাল তেলওয়াত করলেন, লোকেরা নামায পড়ে চলে গেল, ইমাম সাহেব সকাল পর্যন্ত চিন্তিতি হয়ে বসে থাকলেন, আর বার বার বলতে লাগলেন, যিনি বিন্দু পরিমাণ নেকির এবং বিন্দু পরিমাণ পাপের সাজা দিবে, হে আল্লাহ্ তুমি স্বীয় বান্দা নো'মানকে রক্ষা কর।
প্রিয় পাঠক, আমাদের পূর্বসূরীদের এসমস্ত ঘটনা থেকে অনুমান করুন যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ আদালতে সারা জীবনের হিসাব দেয়া কত কঠিন হবে।
আসুন আল্লাহ্ আদালতে উপস্থিতির পরিস্থিতি অন্যএক ভাবে অনুমান করি।
পরকালের বিষয় গুলোর সাথে দুনিয়ার কোন কিছুরই তুলনা হয়না। শুধু বিষয়টি অনুমান করার জন্য আমি এ উদহারণ গুলো পেশ করছি, আশা করি এতে বিষয়টি বুঝা সহজ হবে এবং তা দীর্ঘসময় পর্যন্ত মনে থাকবে ইনশাআল্লাহ্।
প্রিয় জন্ম ভূমি (লিখকের) পাকিস্তানে ১৯৯৯ইং ২১ অক্টবর সিপাহী বিপ্লব হয়েছে, সিভিল সরকারের প্রতি কিছু দোষ চাপিয়ে তাকে ক্ষমতা চুত করা হল, কিছু লোক গ্রেফতার হল, কিছু দেশেই আত্মগোপন করল, আবার কিছু বিদেশে পালিয়ে গেল, গ্রেফতার কৃতদের ওপর বিভিন্ন মামলা মোকাদ্দামা চাপানো হল, আদালতে উপস্থিতি, শুধু এক সপ্তা ১৫ দিনের সংক্ষিপ্ত গ্রেফতারী ও আদালতে উপস্থিতি সম্পর্কে দেশের একটি পরিচিত দৈনিকে যা প্রকাশিত হয়েছে, তার কিছু উদ্ধৃতি এখানে জ্ঞানীদের চিন্তা করার জন্য পেশ করা হল।
১ - ক্ষমতা চুত প্রধানমন্ত্রী আদালতে এসে অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে বলতেছিলেন যে, আমি নির্দোষ আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত হয়েছে, তিনি খুবই রেগে ছিলেন, তিনি আদালতে অভিযোগ করলেন যে, তাকে ৪৫ দিন অত্যন্ত অমানবিক পরিবেশে বিনা দোষে বন্দী করে রাখা হয়েছে, সর্বদা দুষিত পানি তার রুমে ভরে রাখা হয়, তাকে জোরপূর্বক জাগানো হয়েছে।
২ - ক্ষমতাচুত সরকারের কিছু কিছু মন্ত্রী ও উপদেষ্টা গ্রেফতার থেকে বাঁচার জন্য আত্মগোপন করেছে। ¹⁸
পাঞ্জাবের শ্রম মন্ত্রী ও তার সহযোগীদেরকে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে, তার নামে সরকারী ও বেসরকারী জমিন অবৈধ দখল ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, গ্রেফতার হওয়ার পর ক্ষমতাচুত সরকারের এ মন্ত্রী বার বার বেহুশ হতে ছিল। ¹⁹
আমি (লিখক) উল্লেখিত খবর সমূহ থেকে নাম এজন্য বাদ দিয়েছি যে, এখানে কোন ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা উদ্দেশ্য নয়, বরং উদ্দেশ্য হল স্মরণ করানো এবং শিক্ষা গ্রহণ করা।
চিন্তা করুন! যদি দুনিয়াতে গ্রেফতার, চেক, আদালতে উপস্থিতির এ ভয় হতে পারে, তাহলে আল্লাহর আদালতে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারে মানুষের কত ভয় হওয়া উচিত? অথচ দুনিয়ার আদালত সমূহে উকীল, পক্ষ অবলম্বনকারীও থাকে, কিন্তু পরকালের আদালতে কোন উকীল, বা পক্ষঅবলম্বনকারী থাকবে না। প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজ নিজ আমলের হিসাব নিজে নিজে দিতে হবে। দুনিয়ার আদালতে সুপারিশ ও ঘুষেরও সুযোগ আছে, অথচ পরকালের আদালতে তা নেই। দুনিয়ার আদালতে মিথ্যা ও মিথ্যা সাক্ষীর ও সুযোগ আছে, অথচ পরকালে তা নেই। দুনিয়ার আদালতে মামলার সীমিত চেক হয়ে থাকে, অথচ পরকালের আদালতে সারাজীবনের মামলার চেক হবে। দুনিয়ার আদালত থেকে বাঁচার জন্য গা ঢাকা দেয়া বা অন্য দেশে পালানো সম্ভব, কিন্তু পরকালের আদালতে তা সম্ভব নয়।
মূল কথা এইযে, যারা পরকালের প্রতি ঈমান রাখে না তাদের বিষয়টিই আলাদা, কিন্তু যারা পরকালের প্রতি ঈমান রাখে তাদেরকে সর্বদা ঐ বড় আদালতে উপস্থিতির জন্য চিন্তিত থাকা উচিত। কোন না কোন দিন গ্রেফতার হতে হবে, আবার এক দিন না এক দিন বড় আদালতে উপস্থিত ও হতে হবে। আর ঐ আদালতের ফায়সালাও হুবহু মেনে নিতে হবে। তাহলে ঐ উপস্থিতির জন্য আজ থেকেই কেন প্রস্তুতি নেয়া শুরু করা হবে না?
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ মৃত্যুর কথা বেশি বেশি করে স্মরণকারী, মৃত্যুর পর আগত পরিস্থিতির ব্যাপারে প্রস্তুত গ্রহণকারী সর্বাধিক জ্ঞানী (ইবনু মাযা)

মুনাফেক ও পুলসিরাত
মুনাফেক তার নেফাকীর কারণে দুনিয়াতে ইজ্জত ও মর্যাদা পায় না, বরং পরবর্তী জেনারেশন তাদের প্রতি সর্বদা অভিসম্পাত করতে থাকে, পৃথিবীর জীবনের পর আগত স্তর কবর, হাশর, পুলসিরাত ও জাহান্নামেও মুনাফেকদের সাথে কাফের মুশরেকদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি খারাপ ও লাঞ্ছনাময় আচরণ করা হবে। কবরে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হবে যে, "মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে তোমার আক্বীদা কি? তখন সে উত্তরে বলবে: আমি তাঁর ব্যাপারে তাই বিশ্বাস করতাম যা অন্যরা বিশ্বাস করত, এ উত্তর শুনে ফেরেস্তারা তার উভয়কানের মাঝে (মস্তিষ্কে) লোহার হাতুড়ী দিয়ে আঘাত করতে থাকবে, যার ফলে সে খুব উঁচু স্বরে চিল্লাতে থাকবে"। (বোখারী)
হাশরের মাঠেও লাঞ্ছিত ও অপমানিত হতে হবে। যখন তাকে প্রশ্ন করা হবে, তখন সে খুব মিষ্টি ভাষায় নিজের নামায, রোযা, হজ্ব, দান ইত্যাদির প্রশংসা করবে, তখন আল্লাহ্ তার মুখ বন্ধ করে দিবেন, আর তার অঙ্গ পতেঙ্গ তার মুনাফেকীর সাক্ষী দিবে। (মুসলিম)
পুলসিরাতেও তাকে লাঞ্ছিত করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। পুলসিরাত অতিক্রম করার পূর্বে সর্বত্র অন্ধকার ছেয়ে যাবে। সমস্ত সৃষ্টিকে পুলসিরাত অতিক্রম করার নির্দেশ দেয়া হবে, ঈমানদার ও মুনাফেক সকলকেই নূর দেয়া হবে, কিন্তু পুলসিরাতে চড়া মাত্রই মুনাফেকদের নূর বন্ধ হয়ে যাবে। তখন তারা ঈমানদারদের সাথে নিম্নোক্ত কথা বার্তা বলতে থাকবেঃ
মুনাফেকঃ ভাই আমাদের প্রতিও একটু করুনার দৃষ্টি দাও, যাতে তোমাদের আলো দিয়ে আমরাও একটু উপকৃত হতে পারি, (দুর্ভাগ্যবসত আমাদের নূর (আলো) বন্ধ হয়ে গেছে)
মোমেনঃ ধমক দিয়ে বলবে পিছনে যাও অন্য কারো কাছ থেকে তোমাদের আলো নিয়ে আস।
এর পর উভয় দলের মাঝে একটি দেয়াল দাঁড় করিয়ে দেয়া হবে, মুনাফেক এপাশ থেকে মোমেনদেরকে আওয়াজ দিতে থাকবে।
মুনাফেকঃ আমরা কি দুনিয়াতে তোমাদের সাথে ছিলাম না? (আমরা কি দুনিয়াতে কালেমা পড়ি নাই, তোমাদের সাথে নামায আদায় করি নাই, রোযা রাখি নাই, তোমাদের সাথে উঠা বসা করি নাই, এর পরও আমাদের সাথে কেন এ আচরণ করছ?
মোমেনঃ হা এগুলো সবই ঠিক আছে, কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে ফেতনায় ফেলেছ, (মুসলিম বলে দাবী করা সত্ত্বেও কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব বজিয়ে রেখেছ) সুযোগ মত আমল করেছ, (ইসলাম ও কুফরীর ব্যাপারে পার্থিব বিষয় গুলোকে প্রধান্য দিয়েছ) সন্দেহের মধ্যে ডুবে ছিলে, (যে ইসলামের শিক্ষা গ্রহণে কল্যাণ আছে না নাই)।
মিথ্যা কামনা তোমাদেরকে ধোঁকা দিয়েছে (কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব) আমাদেরকে দুনিয়াতে সম্মান ও মর্যাদা দিবে। এমন কি আল্লাহ্র ফায়সালা (মৃত্যু) এসে গেছে, অথচ শয়তান তখনো তোমাদেরকে ধোঁকায় রেখেছে যে, আল্লাহ্ অত্যন্ত দয়ালু, আর আমরা কালেমা পাঠ করেছি। তিনি অবশ্যই আমাদেরকে ক্ষমা করবেন। অতএব এখন আমাদের পিছন থেকে দূরে চলে যাও, তোমাদের ঠিকানা জাহান্নাম, আর তা খুবই নিকৃষ্ট ঠিকানা।²⁰
কিয়ামতের দিন মুনাফেকদেরকে কাফের ও মুশরেকদের চেয়েও কঠিন আযাব দেয়া হবে। আল্লাহর বাণীঃ
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا ) (سورة النساء: ١٤٥)
অর্থঃ "নিঃসন্দেহে মুনাফেক জাহান্নামের সর্ব নিম্ন স্তরে থাকবে। আর তোমরা কোন সাহায্যকারীও পাবে না।” (সূরা নিসাঃ ১৪৫)
পুলসিরাত অতিক্রম করার পূর্বে মুনাফেকদেরকে আলোও দেয়া হবে, কেবল তাদের লঞ্ছনা ও অপমানের মাত্রা বৃদ্ধি করার জন্যে। আর তাদেরকে রাগানো হবে এবলে যে, আজ তোমরা আমাদের দেয়া আলো থেকে এমনভাবে বঞ্চিত হতে চলছ, যেমন দুনিয়তে তোমরা আমার দেয়া নে'মতসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ছিলা।
আখেরাতে মুনাফেকদের এ লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি এ জন্য হবে যে, কাফের ও মুশরেকরা তো ইসলামের খোলা দুশমন, কিন্তু মুনাফেকরা ইসলামের জন্য আস্তিনের সাপের ন্যায়, মুসলমানদের যখনই পরাজয় হয়, সেটা ঐ মুনাফেকদের কারণেই হয়েছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগেও এ আস্তিনের সাপেরা মুসলমানদেরকে কোথায় কোথায় এবং কিভাবে যখম করেছে তার কিছু দৃষ্টান্ত নিম্নে পেশ করা হলঃ
১- উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের এক হাজার সৈন্যের মধ্যে থেকে আবদুল্লাহ্ বিন উবাই তিনশ মুনাফেকের একটি দল পৃথক করে ফিরিয়ে নিয়ে চলে গেল, আর মুসলমানদের বিপক্ষে ছিল অস্ত্রে সস্ত্রে সজ্জিত কাফেরদের তিন হাজার সৈন্য, যুদ্ধের সর্বশেষ প্রস্তুতির শেষ মূহর্তে মুনাফেকরা গাদ্দারী করে মুসলমানদেরকে পরাজিত কারার ষড়যন্ত্র করছিল।
২- ৩য় হিজরীতে উহুদের যুদ্ধ, ৪ হিজরীতে রাজি' ও বির মাউনার ঘটনার পর শত্রুদের প্রতিশোধের কামনা উত্তর উত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকল। ফলে বনী নাযিরের ইহুদীরা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে হত্যা করার জন্য ষড়যন্ত্র করতে শুরু করল, আল্লাহ্ ওহীর মাধ্যমে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে তা জানিয়ে দেন, তখন তিনি ইহুদীদেরকে দশ দিনের মধ্যে মদীনা ছাড়ার নিদের্শ দিলেন, মুনাফেক সর্দার আবদুল্লাহ্ বিন উবাই ইহুদীদেরকে প্রস্তাব দিল, মদীনা থেকে কোন অবস্থাতেই বের হবে না, নির্ভয়ে থাক, আমাদের নিকট দু'হাজার যুদ্ধা রয়েছে, যারা তোমাদেরকে সংরক্ষণ করবে, অবশ্য আবদুল্লাহ্ বিন উবায়ের এ ষড়যন্ত্র তার জন্য কোন ফল বয়ে আনতে পরে নাই। বনু নাযির গোত্রের সাথে যুদ্ধে আল্লাহ্ মুসলমানদেরকে পূর্ণ বিজয় দান করেছেন, কিন্তু মুসলমানদেরকে পরাজিত করার জন্য মুনাফেকরা কোন চেষ্টাই বাদ দেয় নাই।
৩ - ৫ হিজরীতে সংঘটিত খন্দকের যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যদের সংখ্যা ছিল তিন হাজার, আর কাফেরদের সংখ্যা ছিল দশ হাজার, তারা মদীনায় আক্রমণ করল, যাতে করে ইসলামী রাষ্ট্রকে পিষে দেয়া যায়, সে সময় মুনাফেকরা মুসলমানদেরকে পরাজিত করার জন্য বিভিন্ন রকম প্রপাগান্ডা শুরু করল, তাদের কেউ কেউ বললঃ আমাদেরকে স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে কিসরা ও কায়সার বিজয়ের, অথচ আমাদের অবস্থা এই যে, আমরা আমাদের নিজেদের প্রয়োজনই মিটাতে পারি না। কেউ কেউ এ বলে শুধু যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার কামনা করতে ছিল যে, আমাদের ঘর বিপদ গ্রস্ত আমাদের উচিত পশ্চাতে ঘর সামলানো। কোন কোন মুনাফেক এও বলতে লাগলঃ আক্রমণ কারীদের সাথে সন্ধি করে মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে তাদের হাতে তুলে দাও।
মুনাফেকদের এসমস্ত হীনমনতা ও গাদ্দারীরমূল আচরণের উদ্দেশ্য শুধু জিহাদ থেকে পলায়নই নয়, বরং তাদের উদ্দেশ্য ছিল সমস্ত মুসলমানদের সাথে গাদ্দারী করে ইসলামকে খতম করা।
৪- ৫ম হিযরীতে বানী মুসতালেক যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় রাস্তায় এক স্থানে তাবু টানানো হল, আয়শা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) এ সফরে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে ছিলেন, তিনি পায়খানা বা পেসাবের জন্য বের হলে, সেখানে তাঁর গলার হার হারিয়ে গেল, তিনি হারের তালাশে বের হলে, সে সময় কাফেলা রওয়ানা হয়ে গেল, তাঁর খালী পালকী উঠিয়ে উটের ওপর রেখে দেয়া হল, তিনি ওজনে হালকা হওয়ার কারণে কেউ অনুভব করতে পারে নাই, যে তিনি পালকীতে নেই। তিনি যখন সেখান থেকে ফিরে আসলেন তখন দেখলেন যে, ততক্ষণে কাফেলা ফিরে চলে গেছে, তখন তিনি চাদার দিয়ে নিজেকে আবরিত করে সেখানেই শুয়ে পড়লেন, সাফওয়ান বিন মোয়াত্তালকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেনাদলের পিছনে থাকার জন্য নির্দেশ দিয়ে রেখে ছিলেন, তিনি আয়শা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) কে দেখেই ইন্না লিল্লাহ্ পড়ে ঘোড়া তার কাছে এনে বসালেন, তিনি তাতে আরোহন করার পর, সে তাকে নিয়ে রওয়ানা হয়ে যায়। যখন সাফওয়ান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সেনাদলের সাথে মিলিত হতে হতে দুপুর হয়ে গিয়ে ছিল, মুনাফেক সর্দার আবদুল্লাহ্ বিন উবাই নবী পরিবারে আগুন লাগাতে ষড়যন্ত্র শুরু করল, "আল্লাহর কসম! সে রক্ষা পাবে না, দেখ তোমাদের নবীর স্ত্রী পর পুরুষের সাথে রাত্রি যাপন করেছে, সে তাকে নিয়ে প্রকাশ্যে চলা ফেরা করছে." ²¹
নবী পরিবারে এ মিথ্যা অপবাদ শুধু একটি শয়তানী চক্রান্তই ছিল না বরং তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, ইসলামের পবিত্র বৃক্ষটিকে সমূলে উৎপাটন করা।
৫- ৯- হিযরীতে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন, তখন প্রচন্ড গরম ছিল, ফসলও কাটার সময় হয়ে এসে ছিল, অস্ত্র সস্ত্রের সল্পতা ছিল, ৩০হাজার সৈনিক ছিল, আরোহনের জন্য প্রত্যেক আঠার জনে একটি করে উট ছিল, রসদ এত কম ছিল যে, উট যবেহ করে তার পেটে জমা পানি পান করা হত, ইসলাম ও কুফরীর মাঝে যুদ্ধের চরম মূহর্তেও মুনাফেকরা ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে গাদ্দারী এবং কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব পরিপূর্ণভাবে স্থাপন করত, জিহাদ থেকে আত্ম রক্ষার জন্য নুতন নুতন চাল চালত, এক মুনাফেক যাদ বিন কায়েস এসে বললঃ আমি একজন সুন্দর যুবক, রূমী নারীদেরকে দেখে ফেতনায় পড়ে যাব, তাই আপনি আমাকে জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকার অনুমতি দিন। মুনাফেকরা শুধু নিজেরাই জিহাদ থেকে বেঁচে থাকার জন্য ফন্দী আঁটত না, বরং নিজেদের বৈঠকসমূহে মুজাহিদদেরকে জিহাদের ময়দান থেকে পিছপা করার জন্য সূফীসুলভ আলোচনাও করত, তারা বলত মুসলমানরা রূমীদেরকে আরবদের ন্যায় মনে করতেছে, দেখা যাবে যে, যুদ্ধের ময়দানে সমস্ত মুজাহিদরা বন্দী হয়ে যাবে, এক মুনাফেক আরো বলেছে, যদি শত শত বেত্রাঘাত শরীরে লাগে, তাহলে মজাই হবে, কোন মুনাফেক এও বলেছে যে, দেখ জনাব! এরা হল ঐ সমস্ত লোক যারা রূম ও শামের কেল্লা বিজয় করতে যাচ্ছে। তাদের এ বিষাক্ত উক্তি স্বয়ং প্রমাণ করছে যে, মুনাফেকদের অন্তরে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের অনুসারীদের বিরুদ্ধে কত হিংসা ছিল।
নবী যুগে মুনাফেকদের ফেতনা ও গাদ্দারীর কিছু নমুনা আমরা এখানে উদহারণ সরূপ পেশ করলাম মাত্র, মূলত মদীনা যুগের পূর্ণটাই মুনাফেকদের ইসলাম বিদ্বেষী ও ষড়যন্ত্রে ভর পূর। আবুবকর (রাযিয়াল্লাহু আনহুর) যুগে যাকাত আদায় না কারী ও মোরতাদদের ফেতনার সৃষ্টিকারীরাও এ মুনাফেকরাই ছিল, ওসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর যুগের ফেতনা ও সাহাবাগণের মধ্যে ঘটে যাওয়া রক্ত পাতেও আবদুল্লাহ্ বিন সাবার ষড়যন্ত্র ছিল, উল্লেখ্যঃ আবদুল্লাহ্ বিন সাবা ইয়ামেনের ইহুদী ছিল, যে মুনাফেকী নিয়ে ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বা ওসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর যুগে ইসলাম গ্রহণ করে ছিল। আজ থেকে প্রায় সাতশত বছর পূর্বে ১২৩৬ হিঃ বাগদাদের পতন ও মুনাফেকদের ষড়যন্ত্রের ফলেই হয়েছে। নিকট অতীতের ইতিহাসে টিপু সুলতানের শাহাদাত, নওয়াব সিরাজুদ্দৌলার শাহাদাত, শহিদী আন্দৌলনের পতন, ঢাকার পতন, বাগদাদের পতন, কাবুলের পতন, ২০০৩ইং সালে বাগদাদের পুনঃপতন এ সবই বিশ্ব মুনাফেকদের ষড়যন্ত্রেরই ফল।
মুনাফেকদের এ অভিশপ্ত গ্রুপ মুসলিম মিল্লাতের মাঝে এমন এক রাস্তা তৈরী করল, যা সর্বকালেই অপুরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে, তাই কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিফলও কঠিন বেদনা দায়ক হবে। ²²
মোনাফেকদের পরিণতির কারণে অনেক সময় সাহাবাগণও চিন্তায় পড়ে যেতেন যে, আল্লাহ্ না করে নাজানি আমাদের মধ্যেও মোনাফেকের কোন আলামত আছে? রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হুযাইফা বিন ইয়ামেন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কে মোনাফেকদের নাম বলে দিয়ে ছিলেন। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) একদা হুযাইফা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কে জিজ্ঞেস করল, হুযাইফা আমাকে এতটুকু বল যে, মোনাফেকদের নামের মধ্যে আমার নাম আছে কি?
এতে অনুমান করা যায় যে, সাহাবাগণ মোনাফেকীর ব্যাপারে কত ভীত ছিলেন। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর অভ্যাস ছিল যে, কোন মুসলমানের জানাযায় হুযাইফা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) উপস্থিত না হলে, ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সেখানে উপস্থিত হতেন না।

• মোনাফেকের আলামতঃ রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মোনাফেকের চারটি আলামতের কথা উল্লেখ করেছেনঃ
(১) মিথ্যা বলা। (২) ওয়াদা ভঙ্গ করা। (৩) আমানতের খিয়ানত করা। (৪) ঝগড়া করলে গালী গালাজ করা। (বোখারী ও মুসলিম)

আল্লাহ্ দয়া ও অনুগ্রহে "তাফহিমুস সুন্না" সিরিজের ১৯ তম গ্রন্থ "কিয়ামতের বর্ণনা"। পূর্ণতা লাভ করল, আমি আল্লাহ্র নিকট এ মহান অনুগ্রহের জন্য সেজদা শুকর আদা করছি, এ গন্থের সমস্ত ভাল দিক গুলো মহান আল্লাহর অনুগ্রহের ফল, আর সমস্ত ত্রুটি সমূহ আমার সল্প জ্ঞান ও অলসতার কারণ, আল্লাহর নিকট দূয়া করছি যে, তিনি যেন এ গ্রন্থের ভাল দিক গুলো কবুল করে আমার গোনাহ গুলোকে ক্ষমা করেন, আর তা একমাত্র তাঁরই জন্য মানান সই।
পূর্বের ন্যায় এ গ্রন্থের হাদীসের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সর্তকতা অবলম্ভন করে, শায়েখ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহর) বিশ্লেষণকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এর পরও হাদীসের বিশুদ্ধতা, অনুবাদ ও মাসআলা ইস্তেমবাতের ব্যাপারে কোন ভুল-ভ্রান্তি পাঠকদের দৃষ্টি গোচর হলে, আর তা আমাকে অবগত করালে, আমি তাদের জন্য কৃতজ্ঞ হব।
আমি ঐ সমস্ত সম্মানিত ওলামাগণের কৃতজ্ঞতা পেশ করছি যারা আমাকে এ গ্রন্থ প্রস্তুত ও পূর্ণতার ব্যাপারে সহযোগীতা করেছে, ঐ সমস্ত সাথীদেরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যারা কিতাব ও সুন্নাতের দাওয়াতের ক্ষেত্রে আমাকে সহযোগীতা করে যাচ্ছে, আল্লাহ্ তাফহিমুসুন্না সিরিজের লিখক, প্রকাশক, বন্টনকারী, পাঠক, তাদের পিতা-মাতা সকলের জন্য তা সাদকা জারিয়া হিসেবে কবুল করেন, আমীন!
মোহাম্মদ ইকবাল কিলানী (আফাল্লাহু আনহু) ১৯ রবিউস্সানী ১৪২৪ হিঃ। রিয়াদ, সৌদী আরব।

টিকাঃ
১. কোন কোন আলেমগণের মতে আল্লাহর বাণীঃ ﴿ فَصَعِقَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَمَن فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَن شَاء اللَّهُ ﴾ (سورة الزمر : ٦٨) অর্থঃ "যাদেরকে আল্লাহ্ ইচ্ছা করেন তারা বর্তীত আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সবাই মুছিত হয়ে পড়বে। (সূরা যুমার-৬৮) এ আয়াতের ভিত্তিতে, ৮টি বস্তুর ধ্বংস হবেনা বলে বলেছেনঃ (১) আরশ (২) কুরসী (৩) লাউহ (৪) কলম (৫) জান্নাত (৬) জাহান্নাম (৭) সিঙ্গা (৮) আরওয়াহ। এব্যাপারে আল্লাহ্ ই ভাল জানেন।
২. শাহ রফিউদ্দীন (রাঃ) লিখিত "কিয়মত নামা"
৩. উল্লেখঃ ইসলামের দৃষ্টিতে কোন বিবাহিত লোক ব্যভিচারে লিপ্ত হলে তার শাস্তি হল, পাথর মেরে হত্যা করা, আর যদি অবিবাহিত হয় তাহলে তার শাস্তি হল ১০০ বেত্রাঘাত করা।
৪. হাফতা রোজা তাকবীর, করাচী, ২৫ এপ্রিল ২০০১ইং।
৫. হাফতা রোজা তাকবীর, করাচী, ১৪ মার্চ ২০০১ইং।
৬. হাফতা রোজা তাকবীর, করাচী, ১৩ফেব্রুয়ারী ২০০১ইং।
৭. হাফতা রোজা তাকবীর, করাচী, ৫ফেব্রুয়ারী, ২০০১ইং।
৮. হাফতা রোজা তাকবীর, করাচী, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০০১ইং। 'হাফতা রোজা তাকবীর, করাচী, ৬ ডিসেম্বর ২০০১ইং।
৯. হাফতা রোজা তাকবীর, করাচী, ১৯জুলাই, ২০০১ইং।
১০. হাফতা রোজা তাকবীর, করাচী, ১৯জুলাই, ২০০১ইং।
১১. হাফতা রোজা তাকবীর, করাচী, ৫জুলাই ২০০১ইং।
১২. হাফতা রোজা তাকবীর, করাচী, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০০১ইং।
১৩. হাফতা রোজা তাকবীর, করাচী, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০০২ইং।
১৪. হাফতা রোজা তাকবীর, করাচী, ১২ অক্টবর ২০০২ইং।
১৫. হাফতা রোজা তাকবীর, করাচী, ৬ নভেম্বর ২০০২ইং।
১৬. হাফতা রোজা তাকবীর, করাচী, ২৫ডিসেম্বর ২০০২ইং।
১৭. সূরা বানী ইসরাঈল, ২৩। সূরা আনকাবুত ৮, সূরা লুকমান ১৪।
১৮. বিস্তারিত জানার জন্য হাফতা রোজা তাকবীর করাচী, ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৯ইং করাচী।
১৯. উর্দু নিউজ জিদ্দা ৪ নভেম্বর ১৯৯৯ইং।
২০. সূরা হাদীদ, ১৩-১৫ আয়াত।
২১. বিস্তারিতের জন্য সূরা নূর ১১-২০ নং আয়াত দ্রঃ।
২২. এটা যেমন ঠিক যে, যে, মুনাফিকদের গাদ্দারীর ফলে মুসলিম মিল্লাত কঠিন ব্যথা প্রাপ্ত হয়েছে তেমনিভাবে তারাও পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি পেয়েছে। ৬৪১ হিঃ (১২৩৬ ইং) আব্বাসী খলীফা মু'তাসিম বিল্লাহ্ ক্ষমতায় ছিল, তার মন্ত্রী মুয়িদউদ্দীন আলকামী কট্টর পন্থী শিয়া ছিল, আর সে চাইত আব্বাসী খিলাফত খতম করে ওলুবী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে, এ লক্ষ্যে সে চেঙ্গিস খাঁনের নাতি হালকু খাঁন কে চিঠি লিখল যে, তুমি যদি ইরাকের ওপর হামলা কর তাহলে আমি অত্যন্ত সহজ ভাবে বিনা রক্ত পাতে ইরাক তোমার হস্তগত করে দিব। হালাকু খাঁন আরবদের বীরত্ব ও সাহসে ভীত সন্ত্রস্ত ছিল, তাই সে এজন্য ওয়ারেন্টি চাইল, আলকামী তার উত্তর পাঠল যে, খলীফাকে দিয়ে বাজেট কম করে সৈনিকদের বেতন বৃদ্ধি দাবী অপূরণ করে তাদের মাঝে বেতন কমের ঘোষণা করেছি, খলীফা তা মঞ্জুর করেছেন, এর পর আলকামী কিছু কিছু শিয়া মন্ত্রীদের মাধ্যমে হালাকু খাঁনকে ইরাকে আক্রমণ করার জন্য চিঠি লেখাল, সাথে সাথে সে হালুকু খাঁনের নিকট নিজের নিরাপত্বাও কামনা করল, আর হালাকু খাঁন তা খুশী মনে মেনে নিল, ইরাক বাসীরা পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত তাতারদের প্রতিরোধ করল, ঐ সময় আলকামী বাগদাদে থেকে গোপনে গোপনে হালুকু খাঁনকে খবর প্রাচার করতে থাকল, যখন মুসলমানদের প্রতিরোধ শক্তি দুর্বল হয়ে গেল, তখন আলকামী হালাকু খাঁনের নিকট গিয়ে শুধু নিজের নিরাপত্ত কামনা করল, ফিরে এসে খলীফাকে বললঃ আমি আপনার জন্যও নিরাপত্ব চেয়েছি, অতএব হালাকু খাঁনের নিকট চলুন, সে তার নির্দেশ মানার শর্তে আপনাকেই ইরাকের ক্ষমতায় বাহাল রাখবে। খলীফা তার ছেলেকে নিয়ে হালাকু খাঁনের নিকট গেল, তখন হালাকু খলীফাকে বললঃ আপনার মন্ত্রী পরষদ, শহরের আলেম ওলামা ও ফিকাহ্ বিদ দেরকে নিয়ে আশুন, খলীফা বিনা বাক্য বেয়ে সবাইকে ডেকে আনল, এর পর হালাকু খাঁন খলীফার সামনে এক এক কওে তাদেরকে হত্যা করে, এর পর হালাকু খলীফাকে প্রস্তাব দিল যে, শহরে নির্দেশ পাঠাও যে, সৈন্যরা যেন অস্ত্র ছেড়ে শহর থেকে বের হয়ে আসে, খলীফা এ নির্দেশওমাথা পেতে মেনে নিল, সৈন্যরা বাহিরে আসার পর তাদের সকলকে তাতারীরা হতা করে ফেলল, এর পর শহরে প্রবেশ করে সাধারণ লোকদেরকে নির্মমভাবে হতা করল। নারী ও শিশুরা মাথায় কোরআ'ন নিয়ে বের হল কিন্তু তাতাররা তাদেরকেও কতল করল। হিযরী ৬৫৬ শুক্রবার সফর মাসে হালাকুখান বিজয়ীর বেশে বাগদাদে প্রবেশ করে খলীফাকে ক্ষুধার্ত ও পিপাসিত অবস্থায় নযর বন্দী করল। খলীফা খাবার চাইল তখন হালাকু খাঁন সোনা রূপা ভরপুর একটি পাত্র এ বলে পাঠিয়ে দিল যে, "এটা খাও”খলীফা বলল আমি এগুলো কিভাবে খাব? হালাকু খাঁন বললঃ যে জিনিস তুমি খেতে পারবে না তা দিয়ে লাখ মুসলমানের জান বাঁচানোর জন্য কেন খরচ করলে না। হালাকু খলীফাকে হত্যার ব্যাপারে পরামর্শ চাইলে সমস্ত মন্ত্রীরা তাকে হত্যার ব্যাপারে পরমর্শ দিল, কিন্তু আলকামী ও হালাকুর শিয়া মন্ত্রী নাসীরুদ্দীন তুসী বললঃমুসলমানদের খলীফার রক্তে তলোয়ার রক্তাক্ত না করে বরং তাকে চটে পেচিয়ে পদদলিত করে মেরে ফেল। হালাকু তাই করল। তার মৃত্যুর পর খলীফার লাস কুফার গলিতে রেখে তাতারী সৈন্যরা পদদলিত করে ছিল। ইরাকে হামলা করার পূর্বে হালাকু আলকামীকে এ আশ্বাস দিয়ে ছিল যে, সে বাগদাদে উলবী বংসীয় কাউকে হাকেম বানিয়ে তাকে খলীফা উপাধী দিবে আর আলকামীকে তার উপখলীফা করবে। কিন্তু যখন হালুকু ইরাক দখল করে নিল তখন সর্বত্র তার বিশ্বস্ত লোকদেরকে বসাল। আলকামী তা দেখে অত্যন্ত পেরেশান হয়ে কটুচাল চালতে লাগল। হালাকুর দরবারে উপস্থিত হয়ে অনুনয় বিনয় প্রকাশ করল, কিন্তু হালাকু তাকে সেখান থেকে এমনভাবে তাড়িয়ে দিল যেমন কুকুরকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। আলকামী কিছু দিন সাধারণ খাদেমের ন্যায় তাতারীদের জুতা মুছে দিত, শেষে তার সমস্ত গাদ্দারী ও কটুচালে অকৃতকার্যতার হায়তাসে অকাল মৃত্যু হয়। হে জ্ঞানবনরা এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ কর। (মাওলানা আকবর শাহ খাঁন নজীবাবাদী লিখিত তারিখ ইসলামী ২য় খঃ সারসংক্ষেপ)

📘 কিয়ামতের বর্ণনা > 📄 পরকালের প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব

📄 পরকালের প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব


মাসআলা-১ঃ পরকালে বিশ্বাস রাখা ওয়াজিবঃ

عن عمر بن الخطاب رضى الله عنه قال : بينما نحن عند رسول الله صلى الله عليه وسلم ذات يوم اذ طلع علينا رجل شديد بياض الثياب شديد سواد الشعر لا يرى عليه اثر السفر ولا يعرفه منا احد حتى جلس الى النبي صلى الله عليه وسلم فاستد ركبتيه الى ركبتيه ووضع كفيه على فخذيه وقال يا محمد صلى الله عليه وسلم اخبرني عن الايمان قال تؤمن بالله وملائكته وكتبه ورسله واليوم الآخر وتؤمن بالقدر خيره وشره (رواه مسلم)

অর্থঃ “ওমর ইবনে খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) নিকট উপস্থিত ছিলাম, এমন সময় এক ব্যক্তি আমাদের সামনে আবির্ভূত হল, তার পরনের কাপড়-চোপড় ছিল ধবধবে সাদা এবং মাথার চুল ছিল মিশ কালো। সফর করে আসার কোন চিহ্নও তার মধ্যে দেখা যায়নি, আমাদের কেউ তাকে চিনেও না। অবশেষে সে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) সামনে বসল, তার হাঁটুদ্বয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) হাঁটুদ্বয়ের সাথে মিলিয়ে দিল এবং দুই হাতের তালু তাঁর বা নিজের উরুর ওপর রাখল, আর বললঃ হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ ঈমান হচ্ছে এই তুমি আল্লাহ্, সমস্ত ফেরেস্তা, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর প্রেরিত নবীগণ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখবে, তাকদীরের ভাল ও মন্দের প্রতি ঈমান রাখবে”। (মুসলিম)
নোটঃ উল্লেখিত হাদীসটি একটি লম্বা হাদীসের অংশ বিশেষ, প্রশ্নকর্তা জিবরীল (আঃ), সে প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে সাহাবাগণকে দ্বীন শিখাতে এসেছিল।

📘 কিয়ামতের বর্ণনা > 📄 কিয়ামত অস্বীকার কারীদের আবাকতা

📄 কিয়ামত অস্বীকার কারীদের আবাকতা


মাসআলা-৫ঃ পুনরুত্থান হওয়া কত অবাক বিষয়ঃ

( فَقَالَ الْكَافِرُونَ هَذَا شَيْءٌ عَجِيبٌ، أَئِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا ذَلِكَ رَجْعَ بَعِيدٌ ) (سورة ق : ٢-٣)
অর্থঃ "কাফেররা বলে এটা তো এক আশ্চার্য ব্যাপার, আমরা মৃত্যুবরণ করলে বা মৃত্তিকায় পরিণত হলে (আমরা কি পুনরুজ্জীবিত হব) সে প্রত্যাবর্তন তো সুদূর পরাহত।" (সূরা কাফঃ ২- ৩)

মাসআলা-৬ঃ আর কিয়ামত যদি এসেই যায় তাহলে ওখানেও আমাদের আরাম হবেঃ

( وَدَخَلَ جَنَّتَهُ وَهُوَ ظَالِمٌ لِّنَفْسِهِ قَالَ مَا أَظُنُّ أَن تَبِيدَ هَذِهِ أَبَدًا، وَمَا أَظُنُّ السَّاعَةَ قَائِمَةً وَلَئِن ردِدتُ إِلَى رَبِّي لَأَجِدَنَّ خَيْرًا مِّنْهَا مُنقَلَبًا ) (سورة الكهف : ٣٥-٣٦)
অর্থঃ "এভাবে নিজেদের প্রতি যলুম করে সে তার উদ্যানে প্রবেশ করল, সে বললঃ আমি মনে করিনা যে, এটা কখনো ধ্বংস হয়ে যাবে, আমি মনে করিনা যে কিয়ামত হবে, আর আমি যদি আমার প্রতি পালকের নিকট প্রত্যাবৃত্ত হইই তবে আমি তো নিশ্চয়ই এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্থান পাব।" (সূরা আল ক্বাহাফঃ ৩৫-৩৬)

মাসআলা-৭ঃ আমরা পানা-হার কারী মানুষ আল্লাহ্ আমাদেরকে শাস্তি দিবেন নাঃ

( وَمَا أَرْسَلْنَا فِي قَرْيَةٍ مِّن نَّذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُم بِهِ كَافِرُونَ، وَقَالُوا نَحْنُ أَكْثَرُ أَمْوَالًا وَأَوْلَادًا وَمَا نَحْنُ بِمُعَذِّبِينَ ) (سورة سبأ : ٣٤-٣٥)
অর্থঃ "যখনই আমি কোন জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করেছি তখনই ওর বিত্তশালী অধিবাসীরা বলেছেঃ তোমরা যাসহ প্রেরিত হয়েছ, আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি। তারা আরো বলতঃ আমরা ধনে-জনে সমৃদ্ধশালী, সুতরাং আমাদেরকে কিছুতেই শান্তি দেয়া হবে না।" (সূরা সাবা-৩৪-৩৫)

📘 কিয়ামতের বর্ণনা > 📄 কিয়ামত অস্বীকার কারীদের ভ্রান্তি

📄 কিয়ামত অস্বীকার কারীদের ভ্রান্তি


মাসআলা-৮ঃ কিয়ামতকে অস্বীকারকারীরা দুনিয়ার জীবনকে খুব বেশি হলে ১০দিন বা এক দিন বা এক ঘন্টা মনে করবেঃ

يَوْمَ يُنفَخُ فِي الصُّورِ وَنَحْشُرُ الْمُجْرِمِينَ يَوْمَئِذٍ زُرْقًا، يَتَخَافَتُونَ بَيْنَهُمْ إِن لَبِثْتُمْ إِلَّا عَشْرًا، نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَقُولُونَ إِذْ يَقُولُ أَمْثَلُهُمْ طَرِيقَةً إِن لَبِثْتُمْ إِلَّا يَوْمًا﴾ (سورة طه : ١٠٢-١٠٤)
অর্থঃ "যে দিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে, সেদিন আমি অপরাধীকে দৃষ্টিহীন অবস্থায় সমবেত করব। তারা নিজেদের মধ্যে চুপি চুপি বলা বলি করবে তোমরা মাত্র দশ দিন (পৃথিবীতে) অবস্থান করছিলে”। তারা কি বলবে তা আমি ভাল করে জানি, তাদের মধ্যে যে অপেক্ষাকৃত সৎ পথে ছিল, সে বলবেঃ তোমারা মাত্র এক দিন অবস্থান করছিলে।” (সূরা ত্বাহাঃ ১০২-১০৪)

وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يُقْسِمُ الْمُجْرِمُونَ مَا لَبِثُوا غَيْرَ سَاعَةٍ كَذَلِكَ كَانُوا يُؤْفَكُونَ﴾ (سورة الروم : ٥٥)
অর্থঃ "যেদিন কিয়ামত হবে সেদিন অপরাধীরা শপথ করে বলবেঃ যে তারা মূর্হতকালের বেশি অবস্থান করেনি, এভাবেই তারা সত্য ভ্রষ্ট হত।” (সূরা রুমঃ ৫৫)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00