📄 কেয়ামত দিবসে মানুষের পরিণতি
কেয়ামত দিবসে মানুষের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। সেদিন তাদের অন্তরে ভীষণ কম্পন সৃষ্টি হবে। চক্ষু হবে ভীতসন্ত্রস্ত। তারা কেউ জানবে না সেদিন তাদের সাথে কেমন আচরণ করা হবে। হাশরের মাঠ এত ভয়ানক ও বিভীষিকাময় হবে যে, দাঁড়িয়ে থাকা বড্ড কঠিন হবে। সূর্যকে এনে দেওয়া হবে তাদের মাথার ওপর।
হে আল্লাহর বান্দা! সূর্যকে যখন আল্লাহ তায়ালা মাথার ওপর নামিয়ে দেবেন সেদিন কেমন হবে মানুষের পরিণতি? সেদিন তখন তারা কোথায় পলায়ন করবে?
জেনে রাখো! সেদিন পলায়নের কোনো জায়গা থাকবে না। মানুষের ঘামে ভরে যাবে হাশরের মাঠ। সেদিন প্রত্যেকে তার আমল অনুযায়ী নিজ নিজ ঘামে হাবুডুবু খেতে থাকবে। কারো আমলনামা অনুযায়ী তার ঘام হবে টাখনু পরিমাণ। কারো হবে কোমর পরিমাণ। আবার কারো হবে গলা পরিমাণ। আল্লাহর শপথ! সেদিন মানুষের পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এক নিদারুণ বিভীষিকা তাদের গ্রাস করে নেবে। সেদিন কেউ পলায়ন করতে পারবে না। আল্লাহর শপথ! কেউ না।
কেয়ামত দিবসে মানুষের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। সেদিন তাদের অন্তরে ভীষণ কম্পন সৃষ্টি হবে। চক্ষু হবে ভীতসন্ত্রস্ত। তারা কেউ জানবে না সেদিন তাদের সাথে কেমন আচরণ করা হবে। হাশরের মাঠ এত ভয়ানক ও বিভীষিকাময় হবে যে, দাঁড়িয়ে থাকা বড্ড কঠিন হবে। সূর্যকে এনে দেওয়া হবে তাদের মাথার ওপর।
হে আল্লাহর বান্দা! সূর্যকে যখন আল্লাহ তায়ালা মাথার ওপর নামিয়ে দেবেন সেদিন কেমন হবে মানুষের পরিণতি? সেদিন তখন তারা কোথায় পলায়ন করবে?
জেনে রাখো! সেদিন পলায়নের কোনো জায়গা থাকবে না। মানুষের ঘামে ভরে যাবে হাশরের মাঠ। সেদিন প্রত্যেকে তার আমল অনুযায়ী নিজ নিজ ঘামে হাবুডুবু খেতে থাকবে। কারো আমলনামা অনুযায়ী তার ঘام হবে টাখনু পরিমাণ। কারো হবে কোমর পরিমাণ। আবার কারো হবে গলা পরিমাণ। আল্লাহর শপথ! সেদিন মানুষের পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এক নিদারুণ বিভীষিকা তাদের গ্রাস করে নেবে। সেদিন কেউ পলায়ন করতে পারবে না। আল্লাহর শপথ! কেউ না।
📄 হাশরের ময়দানে সুপারিশ
হাশরের বিভীষিকাময় প্রান্তরে যখন একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ হবে তখন তারা বলতে থাকবে আমরা তো একদিন এখানে ছিলাম না। হায়! আমরা তো আজ নিদারুণ চিন্তা ও পেরেশানিতে পতিত হয়েছি। কে আজ আমাদের উদ্ধার করবে নিদারুণ এ পরিণতি থেকে? কে আজ আমাদের জন্য সুপারিশ করবে রবের নিকট?
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, বিবাহের এক ওলিমায় আমরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। আমি নবীজির অত্যন্ত নিকটবর্তী হলাম। তখন তিনি বললেন, কেয়ামতের দিন আমি আদম সন্তানদের সর্দার হবো। তোমরা কি জানো তা কেন? সেদিন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে একত্রিত করা হবে। কারো প্রতি সামান্যতম প্রতারণা করা হবে না। সকলকে যখন একটি জায়গায় একত্রিত করা হবে তখন সূর্যকে তাদের মাথার এক মাইল ওপরে রেখে দেওয়া হবে। সেদিন লোকেরা তাদের ঘামে হাবুডুবু খেতে থাকবে।'
সে দিনটি এতই ভয়াবহ হবে যে, কেউ একটি কথা পর্যন্ত বলতে পারবে না। তবে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যাকে অনুমতি দেবেন কেবল সেই কথা বলতে পারবে। ইরশাদ হয়েছে,
إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا
'দয়াময় যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথা তিনি পছন্দ করবেন সে ব্যতীত কারো সুপারিশ সেদিন কোনো কাজে আসবে না।'
গভীরভাবে চিন্তা করো সে দিন সম্পর্কে। কেমন হবে সেদিনের ভয়ানক অবস্থা! আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনের স্থানে স্থানে এর আলোচনা করেছেন যেন ফিরে আসে মানুষ অবাধ্যতা থেকে। ইরশাদ হয়েছে,
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْجِبَالِ فَقُلْ يَنْسِفُهَا رَبِّي نَسْفًا فَيَذَرُهَا قَاعًا صَفْصَفًا لَا تَرَى فِيهَا عِوَجًا وَلَا أَمْنًا يَوْمَئِذٍ يَتَّبِعُونَ الدَّاعِيَ لَا عِوَجَ لَهُ ، وَخَشَعَتِ الْأَصْوَاتُ لِلرَّحْمَنِ فَلَا تَسْمَعُ إِلَّا هَمْسًا يَوْمَئِذٍ لَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِهِ عِلْمًا وَعَنَتِ الْوُجُوهُ لِلْحَيِّ الْقَيُّومِ ، وَقَدْ خَابَ مَنْ حَمَلَ ظُلْمًا
'তারা আপনাকে পর্বতসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলুন, আমার প্রতিপালক তাদের সমূলে উৎপাটন করে বিক্ষিপ্ত করে দেবেন। অতঃপর তিনি তাকে পরিণত করবেন মসৃণ সমতল ময়দানে। যেখানে তুমি বক্রতা ও উচ্চতা দেখবে না। সেদিন তারা আহ্বানকারীর অনুসরণ করবে। এ ব্যাপারে এদিক-ওদিক করতে পারবে না। দয়াময়ের সম্মুখে সকল শব্দ স্তব্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং মৃদু পদধ্বনি ব্যতীত তুমি কিছুই শুনবে না। দয়াময় যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথা তিনি পছন্দ করবেন সে ব্যতীত আর কারো সুপারিশ সেদিন কোনো কাজে আসবে না। তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে সে সম্পর্কে তিনি অবগত। কিন্তু তারা জ্ঞান দ্বারা তাকে আয়ত্ব করতে পারে না। চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারকের নিকট সকলেই হবে মস্তকাবনত এবং সেই ব্যর্থ হবে যে জুলুমের ভার বহন করবে।'
হাশরের ভয়াল দিনে তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলবে কে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে? কে আজ আমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করবে? হায়! আজ তো সকলে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। কেউ কি নেই যিনি আমাদের জন্য এগিয়ে আসবেন। অতঃপর তারা বলবে, চলো যাই হযরত আদম আলাইহিস সালামের নিকট। এসে বলবে, হে আদম! আপনি মানুষের পিতা। আল্লাহ আপনাকে নিজ কুদরতি হাতে সৃষ্টি করেছেন। আপনার মাঝে তিনি প্রাণের সঞ্চার করেছেন এবং আপনাকে বানিয়েছেন জান্নাতের অধিবাসী। হে আমাদের পিতা আদম! আপনি কি দেখছেন না আজ আমরা কী নিদারুণ কঠিন অবস্থায় পতিত হয়েছি? আপনি কি আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবেন না?
তাদের কথা শুনে হযরত আদম আলাইহিস সালাম বলবেন,
إني ربي غضب اليوم غضباً لم يغضب قبله مثله، ولن يغضب بعده مثله، وإني نهيت عن تلكم الشجرة فعصيت، نفسي نفسي نفسي، اذهبوا إلى نوح
'আজ আমার রব ভীষণ রেগে আছেন; ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, এবং আজকের পরেও কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আল্লাহ আমাকে নিষেধ করেছিলেন বৃক্ষের নিকটবর্তী হতে। কিন্তু আমি তার অবাধ্যতা করেছি। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা নুহ এর নিকট যাও।'
হযতর আদম আলাইহিস সালামের নিকট থেকে অতঃপর তারা যাবে হযরত নুহ আলাইহিস সালামের নিকট। তাকে বলবে, 'হে নুহ! আপনি পৃথিবীতে প্রথম রাসুল। আল্লাহ আপনার নাম রেখেছেন কৃতজ্ঞশীল বান্দা বলে। আপনি কি দেখছেন না আমরা আজ কী অবস্থার সম্মুখীন হয়েছি? আপনি কি আজ আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' তাদের কথা শুনে হযরত নুহ আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন। ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, এবং আজকের পরেও কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। তাছাড়া আমার দাওয়াত ছিল কেবল আমার সম্প্রদায়ের জন্য। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা ইবরাহিমের নিকট যাও।'
অতঃপর তারা দৌড়ে যাবে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের নিকট। বলবে, হে ইবরাহিম! আপনি আল্লাহর নবী এবং তার খলিল। আপনি কি দেখছেন না আমাদের পরিণতি? আপনি কি আজ আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' তাদের কথা শুনে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন। ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, আজকের পরেও কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আমি কীভাবে তোমাদের জন্য সুপারিশ করব। আমি মোট তিনবার মিথ্যা বলেছি। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা মুসার নিকট যাও।'
এবার তারা দৌড়ে যাবে হযরত মুসা আলাইহিস সালামের নিকট। বলবে, 'আপনি আল্লাহর নবী এবং তার কালিম। আপনি কি দেখছেন না আমাদের করুণ পরিণতি? আজ আপনি কি আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' তাদের কথা শুনে হযরত মুসা আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন। ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, এবং আজকের পরে আর কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আমি কীভাবে তোমাদের জন্য সুপারিশ করব, আমি তো একজনকে হত্যা করেছি। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা ইসার নিকট যাও।'
এবার তারা দৌড়াতে থাকবে হযরত ইসা আলাইসি সালামের নিকট। তার তাকে বলবে, আপনি আল্লাহর নবী এবং তার বাণী। আল্লাহ আপনাকে মারইয়ামের গর্ভে প্রেরণ করেছেন এবং তিনি আপনার মাঝে রুহ সঞ্চার করেছেন। আপনি কি দেখছেন আমাদের করুণ পরিণতি? আজ কি আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' হযরত ইসা আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন; ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি এবং আজকের পর আর কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা কি জানো সেদিন যারা নাফসি! নাফসি! নাফসি! করবে তারা কারা? তারা হলেন প্রথম সারির নবী-রাসুল! সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে তারা ছিলেন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নিকট অত্যন্ত প্রিয় ও আস্থাভাজন। যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয়, তাকওয়া ছিল সর্বাধিক। তাদের যদি এমন পরিণতি হয় হে আল্লাহর বান্দা! তাহলে আমার ও আপনার জন্য কেমন পরিণতি অপেক্ষা করছে? আর ওইসমস্ত লোকদেরই বা কী পরিণতি হবে যারা আল্লাহর অবাধ্যতা নাফরমানিতে সদা লিপ্ত। যারা আল্লাহর হক ও মর্যাদা যথাযথ আদায় করে না?
সর্বশেষ হযরত ইসা আলাইহিস সালাম বলবেন, তোমরা মুহাম্মদের নিকট যাও। হৃদয়ে তারা অপরিসীম আশা ও ভরসা নিয়ে দৌড়ে যাবে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের নিকট। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বলবে, হে মুহাম্মদ! আপনি আল্লাহর নবী, সর্বশেষ নবী। আল্লাহ আপনার পূর্বাপর সকল গুনাহক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি কি দেখছেন না আমাদের পরিণতি? আজ আপনি কি আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না? তখন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরশের দিকে দৌড়াতে থাকবেন। অন্য বর্ণনায় আছে, নবী তখন থাকবেন সেজদাবনত। আল্লাহ তায়ালা সেদিন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এত অধিক প্রশংসা করবেন, যে প্রশংসা তিনি ইতিপূর্বে কখনো করেননি। আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবিবের এ দৃশ্য দেখে সহ্য করবেন না। তখন আল্লাহ বলবেন, হে মুহাম্মদ! আপনি আপনার মাথা উত্তোলন করুন এবং সুপারিশ করুন। নবীজি সুপারিশ করবেন। বলবেন,
يَا رَبِّ أُمَّتِي، يَا رَبِّ أُمَّتِي 'হে রব! আমার উম্মত, হে রব! আমার উম্মত।'
হে আল্লাহর বান্দা! সেদিন সকল নবী-রাসুল যখন নাফসি! নাফসি! করতে থাকবে, একমাত্র আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতি উম্মতি বলে চিৎকার করবেন। সেদিন যখন নবী-রাসুল যখন নিজেদের পরিণতির কথা ভেবে চিন্তিত থাকবেন, একমাত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিজের কথা ভুলে আমাদের জন্য উম্মতি উম্মতি বলে চিৎকার করবেন। আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা করবেন। আমাদের মুক্তি ও নাজাতের জন্য সুপারিশ করবেন।
হায়! আজ কোথায় আমরা? কোথায় উম্মতে মুহাম্মদি? কেয়ামতের দিন যে নবী তার নিজের কথা ভুলে উম্মত উম্মত করবেন, আজ সে উম্মত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভুলে আছে। তার দ্বীনকে সাহায্য করছে না। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করছে না। আফসোস, শত আফসোস, সে নবীর উম্মত আজ জিহাদের রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। হাশরের বিভীষিকাময় ভয়াবহ দিবসে যে নবী তার উম্মতের জন্য পাগলপ্রায় হয়ে যাবেন, তাদের জন্য সুপারিশ করবেন, সে উম্মত আজ তার অনুসরণ থেকে দূরে সরে আছে। যে দ্বীন তিনি তাদের নিকট রেখে গেছেন তারা সে দ্বীনের অমর্যাদা করছে। দ্বীনকে পরাজিত হতে দেখে তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় না। পৃথিবীতে তার দ্বীনকে বিজয় ও সমুন্নত করার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করছে না। হায়! উম্মত আজ জিহাদকে ভুলে গেছে। তরবারির ছায়া থেকে পালিয়ে আজ তারা আশ্রয় নিচ্ছে গোলামি ও দাসত্বের ছায়ায়। হায় আফসোস! যদি বুঝত উম্মত তাদের কর্তব্য।
তুমি কি মনে করছ, হাশরের দিবস এখানেই সমাপ্ত? না, তা নয়। সবে তো সূচনা হয়েছে। সেদিন মানুষ এক কঠিন অবস্থা থেকে আরেক কঠিন অবস্থায় রূপান্তরিত হবে। অবশেষে আসবে সে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। আল্লাহ তায়ালা হিসাব গ্রহণের অনুমতি প্রদান করবেন। তখন সকলে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাদের চোখে-মুখে ফুটে উঠবে ভয় ও দুশ্চিন্তার কালো রেখা।
ইরশাদ হয়েছে, وَعُرِضُوا عَلَىٰ رَبِّكَ صَفًّا لَّقَدْ جِئْتُمُونَا كَمَا خَلَقْتُكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ بَلْ زَعَمْتُمْ أَلَّن نَّجْعَلَ لَكُم مَّوْعِدًا
'এবং তাদেরকে আপনার প্রতিপালকের নিকট সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত করে বলা হবে, তোমাদের প্রথমবার যেভাবে সৃষ্টি করেছিলাম সেভাবেই তোমরা আমার নিকট উপস্থিত হয়েছ। অথচ তোমরা মনে করতে যে, তোমাদের জন্য প্রতিশ্রুত ক্ষণ আমি কখনো উপস্থিত করব না।'
সকলে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাদের মাথা থাকবে অবনত। ভয়ে তাদের চক্ষু বিস্ফারিত হতে থাকবে। একে একে সকলের আমলনামা পেশ করা হবে। মিযানে সকলের আমলনামা পরিমাপ করা হবে। মানুষ সেদিন একটি নেক আমলের জন্য পাগলের মতো দৌড়াতে থাকবে। কোথাও যদি একটি নেক আমল পাওয়া যায়! কিন্তু কেউ কারো দিকে একটি বার ফিরে তাকাবে না। সকলে সেদিন সকলের থেকে পলায়ন করবে। একটি আমল কেউ কাউকে দেবে না। জেনে রাখো! সেদিন মা তার সন্তানকে বলবে, 'আমি তোমাকে নয় নয় মাস গর্ভে ধারণ করেছি। তোমার জন্য আমি ত্যাগ স্বীকার করেছি। হে আমার প্রাণাধিক প্রিয় সন্তান! আজ তুমি আমাকে একটি নেক আমল দাও। এমনিভাবে পিতা তার সন্তানকে বলবে। কিন্তু কেউ কারো ডাকে সাড়া দেবে না। সকলেই বলবে, নাফসি! নাফসি! নাফসি!
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেন, 'মানুষ কি সেদিন তার পরিবার-পরিজনকে চিনতে পারবে?'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'হ্যাঁ, সেদিন তারা একে অপরকে চিনতে পারবে। আর তিনটি সময় এমন রয়েছে যখন মানুষ তার পরিণতির কথা জানতে পারবে না। (এক) যখন তাদের আমলনামা প্রকাশ করা হবে, তখন জানবে না যে, আমলনামা কোথায় দেওয়া হবে। ডান হাতে নাকি বাম হাতে। (দুই) যখন আমলনামা পরিমাপ করার জন্য মিজানে রাখা হবে, তখন জানবে না নেক আমল অধিক হবে নাকি মন্দ আমল। (তিন) যখন পুলসিরাত অতিক্রম করবে তখন জানবে না, সে কি তা অতিক্রম করতে পারবে নাকি ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।'
হাশরের ভয়াবহ সেই কাল এক বা দুই দিন নয়, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর। এই সুদীর্ঘকাল মানুষ সেখানে একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকবে। মাথার ওপর থাকবে জ্বলন্ত সূর্য। আল্লাহু আকবার! সেদিন কী অবস্থা হবে আমাদের? কী অবস্থা হবে আমার আপনার? হে আল্লাহর বান্দা! একটি বার জিজ্ঞেস করো নিজেকে। সেদিনের জন্য তোমার প্রস্তুতি কেমন? ইরশাদ হয়েছে,
سَأَلَ سَائِلُ بِعَذَابٍ وَاقِعِ * لِلْكَافِرِينَ لَيْسَ لَهُ دَافِعُ * مِنَ اللَّهِ ذِي الْمَعَارِجِ * تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ
'এক প্রশ্নকারী শান্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করল, যা নেমে আসবে কাফেরদের ওপর, যাকে কেউ প্রতিহত করতে পারবে না। (যা আসবে ঊর্ধ্বারোহণের) সিঁড়ির অধিকারী আল্লাহর পক্ষ থেকে। তার (আরশের) দিকে ফেরেশতারা ও (পবিত্র) আত্মা (জিবরাইল) আরোহণ করে থাকে। (কাফেরদের ওপর ওই শান্তি নেমে আসবে) এমন একদিন যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। '
সুদীর্ঘ সেই পঞ্চাশ হাজার বছর তারা কিছুই খাবে না, পান করবে না। এমনকি কথাও পর্যন্ত বলবে না। তাদের অন্তর কাঁপতে থাকবে। তাদের চক্ষু বের হয়ে আসার উপক্রম হবে। কী হবে সেদিন আমার ও আপনার পরিণতি? আর তাদেরই-বা কেমন পরিণতি হবে যারা আল্লাহর অবাধ্যতা করে। তার হক ও সম্মান যথাযথ আদায় করে না।
কিন্তু সেই কঠিনতর দিনেও আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সাত প্রকার ব্যক্তিকে আরশের ছায়ার নিচে আশ্রয় দেবেন। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাদের জন্য এটি হবে বিশেষ পুরস্কারস্বরূপ। সেদিন আরশের ছায়া ব্যতীত গোটা হাশরের ময়দানে আর কোনো ছায়া থাকবে না। আর সূর্য থাকবে মাথার উপরে।
খুব গভীরভাবে চিন্তা করো দেখো, তুমি কি সেই সাত প্রকার ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত?
হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, 'তুমি কীভাবে পঞ্চাশ হাজার বছর নিজ পায়ে সেদিন দাঁড়িয়ে থাকবে? সেদিন তারা খাবে না, পান করবে না এবং কথাও বলবে না। কেমন পরিণতি হবে যখন সত্তর হাজার বেড়ি পরিহিত জাহান্নামকে টেনে আনা হবে। যার প্রতিটি বেড়ির সাথে থাকবে অনুরূপ সত্তর হাজার ফেরেশতা?
إِذَا رَأَتْهُم مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُّظًا وَزَفِيرًا
'দূর থেকে আগুন যখন তাদের দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে আগুনের ক্রুদ্ধ গর্জন ও চিৎকার।'
'যখন তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা জাহান্নামের বিকট শব্দ শুনবে আর তা হবে উদ্বেলিত। রোষে জাহান্নام যেন ফেটে পড়বে। যখনই তাতে কোনো দলকে নিক্ষেপ করা হবে তাদেরকে রক্ষীরা জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের নিকট কি কোনো সতর্ককারী আসেনি?'
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের ভয়াবহ সে কেয়ামত দিবসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে আদেশ করেছেন। তিনি আমাদের তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন। তার আনুগত্য করতে বলেছেন।
ইরশাদ হয়েছে, يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمُ يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدُ
‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। নিশ্চয় কেয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী ভুলে যাবে তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখবে নেশাগ্রস্ত; যদিও তারা প্রকৃতার্থে নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুত আল্লাহর শাস্তি কঠিন।’
সেদিন আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব গ্রহণ করবেন। সেদিন কারো প্রতি ন্যূনতম জুলুম করা হবে না। প্রত্যেকে সেদিন তাই পাবে যা সে দুনিয়াতে অর্জন করেছে। ইরশাদ হয়েছে,
لَا ظُلْمَ الْيَوْمَ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ
‘আজ কারো প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’
কেয়ামতের বিভীষিকা ও ভয়াবহ বর্ণনা করতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا * وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا * وَقَالَ الإِنسَانُ مَالَهَا * يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا * بِأَنَّ رَبَّكَ أَوْحَى لَهَا يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ * فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
‘পৃথিবী যখন প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে এবং পৃথিবী যখন তার ভার বের করে দেবে, মানুষ বলবে—তার কী হলো? সেদিন পৃথিবী তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে। কারণ তোমার প্রতিপালক তাকে আদেশ করবেন। সেদিন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দলে বের হবে, যেনো তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম দেখানো যায়। কেউ যদি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করে তাহলে সে তা দেখবে, আর যদি অণু পরিমাণ অসৎকর্ম দেখে সে তাও দেখবে। '
চিন্তা করো তখন তোমার কেমন পরিণতি হবে যখন বলা হবে, হে অমুকের ছেলে অমুক! তোমার আমলনামা পেশ করো? কেমন পরিণতি অপেক্ষা করছে সেদিন, যেদিন তোমার নাম ধরে ডেকে বলা হবে, দাও তোমার জীবনের হিসাব দাও, প্রতিটি সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দাও?
দুনিয়ার কোনো রাজা-বাদশাহ যখন তোমার সামনে উপস্থিত থাকে তখন তোমার অন্তর কাঁপতে থাকে। ভয়ে তোমার মুখ দিয়ে কথা পর্যন্ত বের হয় না। তাহলে সেদিন কী ভয়াবহ অবস্থা হবে যেদিন তোমার সামনে দণ্ডায়মান থাকবেন রাজাধিরাজ; যার হাতে সেদিন ভাঁজ করা থাকবে সমগ্র আসমান ও জমিন? ইরশাদ হয়েছে,
يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيَّ السِّجِلِّ لِلْكُتُبِ كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ
'সেদিন আকাশমণ্ডলীকে গুটিয়ে ফেলব, যেভাবে গুটানো হয় লিখিত কাগজ। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। প্রতিশ্রুতি পালন আমার কর্তব্য, আমি তা পালন করবই। '
বিচারগ্রহণের সময় সমস্ত ফেরেশতা ও মানুষ তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারা অপেক্ষারত থাকবে তোমার পরিণতি প্রত্যক্ষ করার জন্য। কিন্তু তুমি জানো না, তোমার সাথে কেমন আচরণ করা হবে। তুমি জানো না বিচার গ্রহণের পর তোমার অবস্থান হবে কোথায়।
যাদের অন্তরে তাকওয়া রয়েছে। পৃথিবীতে আল্লাহর আনুগত্য করেছে পূর্ণরূপে। যারা আল্লাহর সমস্ত হক ও তার সম্মান যথাযথ রক্ষা করেছে সেদিন তাদের পরিণতি কেমন হবে, এ সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা যখন তাকে হিসাব গ্রহণের জন্য আহ্বান করবেন। তখন একটি পর্দা দিয়ে তাকে ঢেকে নেবেন। তারপর পর্দাবৃত অবস্থায় তার হিসেব গ্রহণ করবেন। বান্দা তখন আল্লাহর সম্মুখে তার সকল অপরাধ স্বীকার করবে। দুনিয়াতে যা যা করেছে তা পরিপূর্ণরূপে তুলে ধরবে। অতঃপর বান্দা যখন ধারণা করবে, সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে তখন বলবে, 'আমার আল্লাহ সবচেয়ে দয়ালু।' তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, 'আমি দুনিয়াতে তোমার সকল দোষ-ত্রুটি গোপন রেখেছি, আজও আমি তা গোপন রাখব। অতঃপর আল্লাহ তার আমলনামা তার ডান হাতে দেবেন। সে হাসতে হাসতে আনন্দচিত্তে বের হয়ে আসবে। তখন সে উপস্থিত সকলকে লক্ষ্য করে সুউচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা দেবে,
هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهُ * إِنِّي ظَنَنتُ أَنِّي مُلَاقٍ حِسَابِيهِ فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَاضِيَةٍ * فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٍ
'নাও, আমার আমলনামা পড়ে দেখো। নিশ্চয়ই আমি জানতাম যে, আমাকে আমার হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং সে যাপন করবে সন্তোষজনক জীবন। সুউচ্চ জান্নাতে। '
পক্ষান্তরে যারা আল্লাহকে ভয় করে না। তার অবাধ্যতা ও নাফরমানি করে। অন্যায় পাপাচারে ডুবে থাকে। আল্লাহর যাবতীয় হক ও সম্মান যথাযথ আদায় করে না, তারা যখন হিসাব দেবে তখন ফেরেশতা ও মানুষ সকলে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারা যখন নিজেদের কৃতকর্মের হিসাব দেবে সকলে তা শুনবে। আল্লাহ তখন তাদের বলবেন, 'দুনিয়াতে যখন আমার অবাধ্যতা করেছিলে তখন কি লজ্জিত হওনি, তবে আজ কেন সকলের সম্মুখে কৃত অন্যায় ও পাপের স্বীকারোক্তি দিতে লজ্জিত হচ্ছ?
তখন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার ফেরেশতাদের ডেকে বলবেন, 'হে আমার ফেরেশতাগণ! তাকে বড় শক্তভাবে পাকড়াও করো। তাকে আমার আজাবে নিক্ষেপ করো। মর্মন্তুদ শাস্তি আস্বাদন করাও।
তাদের আমলনামা তাদের বাম হাতে দেওয়া হবে। আক্ষেপ, অনুশোচনায় তারা নিজেদের নত করে রাখবে। বলতে থাকবে,
يَا لَيْتَنِي لَمْ أُوتَ كِتَابِيَهْ وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهْ يَا لَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةَ مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَهُ هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهُ
'হায়! আমাকে যদি আমার আমলনামা না দেওয়া হতো। আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব। হায়! আমার মৃত্যুই যদি আমার শেষ হতো। আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো কাজেই এলো না। আমার ক্ষমতাও বিনষ্ট হয়ে গেছে।'
রাজাধিরাজ মহাশক্তিধর আমার প্রভু সেদিন তার ফেরেশতাদের ডেকে বলবেন,
خُذُوهُ فَغُلُّوهُ ثُمَّ الْجَحِيمَ صَلُّوهُ ثُمَّ فِي سِلْسِلَةٍ ذَرْعُهَا سَبْعُونَ ذِرَاعًا فَاسْلُكُوهُ إِنَّهُ كَانَ لَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ فَلَيْسَ لَهُ الْيَوْمَ هَاهُنَا حَمِيمٌ وَلَا طَعَامُ إِلَّا مِنْ غِسْلِينٍ لَا يَأْكُلُهُ إِلَّا الْخَاطِئُونَ
'তোমরা পাকড়াও করো তাকে। অতঃপর তার গলদেশে বেড়ি পরিয়ে দাও। তারপর তাকে নিক্ষেপ করো জাহান্নামে। তারপর তাকে সত্তর হাত লম্বা একটি শিকলে বাঁধ। সে তো মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিল না। অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে উৎসাহিত করতো না। অতএব আজকের দিনে তার কোনো বন্ধু থাকবে না। থাকবে না কোনো খাদ্য, তবে রয়েছে ক্ষতনিঃসৃত পুঁজ। যা অপরাধী ব্যতীত কেউ ভক্ষণ করে না।'
টিকাঃ
৮০. সুরা তহা: ১০৯।
৮১. সুরা তহা: ১০৫-১১১।
৮২. সুরা কাহফ: ৪৮।
৮৩. সুরা মাআরিজ: ১-৪।
৮৪. সুরা ফুরকান: ১২।
৮৫. সুরা হজ: ১-২।
৮৬. সুরা গাফের: ১৭।
৮৭. সুরা যিলযাল: ১-৮।
৮৮. এককালে দলিল-দস্তাবেজ, ফরমান ইত্যাদি গুটিয়ে রাখা হতো। এখানে এইভাবে কাগজপত্র গুটানোর সঙ্গে আকাশমণ্ডলীকে গুটিয়ে ফেলার তুলনা করা হয়েছে।
৮৯. সুরা আম্বিয়া: ১০৪।
৯০. সুরা হাক্কা: ১৯-২২।
৯১. সুরা হাক্কা: ২৫-২৯।
৯২. সুরা হাক্কা: ৩০-৩৭।
হাশরের বিভীষিকাময় প্রান্তরে যখন একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ হবে তখন তারা বলতে থাকবে আমরা তো একদিন এখানে ছিলাম না। হায়! আমরা তো আজ নিদারুণ চিন্তা ও পেরেশানিতে পতিত হয়েছি। কে আজ আমাদের উদ্ধার করবে নিদারুণ এ পরিণতি থেকে? কে আজ আমাদের জন্য সুপারিশ করবে রবের নিকট?
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, বিবাহের এক ওলিমায় আমরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। আমি নবীজির অত্যন্ত নিকটবর্তী হলাম। তখন তিনি বললেন, কেয়ামতের দিন আমি আদম সন্তানদের সর্দার হবো। তোমরা কি জানো তা কেন? সেদিন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে একত্রিত করা হবে। কারো প্রতি সামান্যতম প্রতারণা করা হবে না। সকলকে যখন একটি জায়গায় একত্রিত করা হবে তখন সূর্যকে তাদের মাথার এক মাইল ওপরে রেখে দেওয়া হবে। সেদিন লোকেরা তাদের ঘামে হাবুডুবু খেতে থাকবে।'
সে দিনটি এতই ভয়াবহ হবে যে, কেউ একটি কথা পর্যন্ত বলতে পারবে না। তবে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যাকে অনুমতি দেবেন কেবল সেই কথা বলতে পারবে। ইরশাদ হয়েছে,
إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا
'দয়াময় যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথা তিনি পছন্দ করবেন সে ব্যতীত কারো সুপারিশ সেদিন কোনো কাজে আসবে না।'
গভীরভাবে চিন্তা করো সে দিন সম্পর্কে। কেমন হবে সেদিনের ভয়ানক অবস্থা! আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনের স্থানে স্থানে এর আলোচনা করেছেন যেন ফিরে আসে মানুষ অবাধ্যতা থেকে। ইরশাদ হয়েছে,
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْجِبَالِ فَقُلْ يَنْسِفُهَا رَبِّي نَسْفًا فَيَذَرُهَا قَاعًا صَفْصَفًا لَا تَرَى فِيهَا عِوَجًا وَلَا أَمْنًا يَوْمَئِذٍ يَتَّبِعُونَ الدَّاعِيَ لَا عِوَجَ لَهُ ، وَخَشَعَتِ الْأَصْوَاتُ لِلرَّحْمَنِ فَلَا تَسْمَعُ إِلَّا هَمْسًا يَوْمَئِذٍ لَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِهِ عِلْمًا وَعَنَتِ الْوُجُوهُ لِلْحَيِّ الْقَيُّومِ ، وَقَدْ خَابَ مَنْ حَمَلَ ظُلْمًا
'তারা আপনাকে পর্বতসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলুন, আমার প্রতিপালক তাদের সমূলে উৎপাটন করে বিক্ষিপ্ত করে দেবেন। অতঃপর তিনি তাকে পরিণত করবেন মসৃণ সমতল ময়দানে। যেখানে তুমি বক্রতা ও উচ্চতা দেখবে না। সেদিন তারা আহ্বানকারীর অনুসরণ করবে। এ ব্যাপারে এদিক-ওদিক করতে পারবে না। দয়াময়ের সম্মুখে সকল শব্দ স্তব্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং মৃদু পদধ্বনি ব্যতীত তুমি কিছুই শুনবে না। দয়াময় যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথা তিনি পছন্দ করবেন সে ব্যতীত আর কারো সুপারিশ সেদিন কোনো কাজে আসবে না। তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে সে সম্পর্কে তিনি অবগত। কিন্তু তারা জ্ঞান দ্বারা তাকে আয়ত্ব করতে পারে না। চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারকের নিকট সকলেই হবে মস্তকাবনত এবং সেই ব্যর্থ হবে যে জুলুমের ভার বহন করবে।'
হাশরের ভয়াল দিনে তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলবে কে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে? কে আজ আমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করবে? হায়! আজ তো সকলে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। কেউ কি নেই যিনি আমাদের জন্য এগিয়ে আসবেন। অতঃপর তারা বলবে, চলো যাই হযরত আদম আলাইহিস সালামের নিকট। এসে বলবে, হে আদম! আপনি মানুষের পিতা। আল্লাহ আপনাকে নিজ কুদরতি হাতে সৃষ্টি করেছেন। আপনার মাঝে তিনি প্রাণের সঞ্চার করেছেন এবং আপনাকে বানিয়েছেন জান্নাতের অধিবাসী। হে আমাদের পিতা আদম! আপনি কি দেখছেন না আজ আমরা কী নিদারুণ কঠিন অবস্থায় পতিত হয়েছি? আপনি কি আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবেন না?
তাদের কথা শুনে হযরত আদম আলাইহিস সালাম বলবেন,
إني ربي غضب اليوم غضباً لم يغضب قبله مثله، ولن يغضب بعده مثله، وإني نهيت عن تلكم الشجرة فعصيت، نفسي نفسي نفسي، اذهبوا إلى نوح
'আজ আমার রব ভীষণ রেগে আছেন; ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, এবং আজকের পরেও কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আল্লাহ আমাকে নিষেধ করেছিলেন বৃক্ষের নিকটবর্তী হতে। কিন্তু আমি তার অবাধ্যতা করেছি। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা নুহ এর নিকট যাও।'
হযতর আদম আলাইহিস সালামের নিকট থেকে অতঃপর তারা যাবে হযরত নুহ আলাইহিস সালামের নিকট। তাকে বলবে, 'হে নুহ! আপনি পৃথিবীতে প্রথম রাসুল। আল্লাহ আপনার নাম রেখেছেন কৃতজ্ঞশীল বান্দা বলে। আপনি কি দেখছেন না আমরা আজ কী অবস্থার সম্মুখীন হয়েছি? আপনি কি আজ আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' তাদের কথা শুনে হযরত নুহ আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন। ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, এবং আজকের পরেও কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। তাছাড়া আমার দাওয়াত ছিল কেবল আমার সম্প্রদায়ের জন্য। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা ইবরাহিমের নিকট যাও।'
অতঃপর তারা দৌড়ে যাবে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের নিকট। বলবে, হে ইবরাহিম! আপনি আল্লাহর নবী এবং তার খলিল। আপনি কি দেখছেন না আমাদের পরিণতি? আপনি কি আজ আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' তাদের কথা শুনে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন। ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, আজকের পরেও কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আমি কীভাবে তোমাদের জন্য সুপারিশ করব। আমি মোট তিনবার মিথ্যা বলেছি। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা মুসার নিকট যাও।'
এবার তারা দৌড়ে যাবে হযরত মুসা আলাইহিস সালামের নিকট। বলবে, 'আপনি আল্লাহর নবী এবং তার কালিম। আপনি কি দেখছেন না আমাদের করুণ পরিণতি? আজ আপনি কি আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' তাদের কথা শুনে হযরত মুসা আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন। ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, এবং আজকের পরে আর কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আমি কীভাবে তোমাদের জন্য সুপারিশ করব, আমি তো একজনকে হত্যা করেছি। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা ইসার নিকট যাও।'
এবার তারা দৌড়াতে থাকবে হযরত ইসা আলাইসি সালামের নিকট। তার তাকে বলবে, আপনি আল্লাহর নবী এবং তার বাণী। আল্লাহ আপনাকে মারইয়ামের গর্ভে প্রেরণ করেছেন এবং তিনি আপনার মাঝে রুহ সঞ্চার করেছেন। আপনি কি দেখছেন আমাদের করুণ পরিণতি? আজ কি আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' হযরত ইসা আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন; ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি এবং আজকের পর আর কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা কি জানো সেদিন যারা নাফসি! নাফসি! নাফসি! করবে তারা কারা? তারা হলেন প্রথম সারির নবী-রাসুল! সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে তারা ছিলেন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নিকট অত্যন্ত প্রিয় ও আস্থাভাজন। যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয়, তাকওয়া ছিল সর্বাধিক। তাদের যদি এমন পরিণতি হয় হে আল্লাহর বান্দা! তাহলে আমার ও আপনার জন্য কেমন পরিণতি অপেক্ষা করছে? আর ওইসমস্ত লোকদেরই বা কী পরিণতি হবে যারা আল্লাহর অবাধ্যতা নাফরমানিতে সদা লিপ্ত। যারা আল্লাহর হক ও মর্যাদা যথাযথ আদায় করে না?
সর্বশেষ হযরত ইসা আলাইহিস সালাম বলবেন, তোমরা মুহাম্মদের নিকট যাও। হৃদয়ে তারা অপরিসীম আশা ও ভরসা নিয়ে দৌড়ে যাবে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের নিকট। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বলবে, হে মুহাম্মদ! আপনি আল্লাহর নবী, সর্বশেষ নবী। আল্লাহ আপনার পূর্বাপর সকল গুনাহক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি কি দেখছেন না আমাদের পরিণতি? আজ আপনি কি আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না? তখন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরশের দিকে দৌড়াতে থাকবেন। অন্য বর্ণনায় আছে, নবী তখন থাকবেন সেজদাবনত। আল্লাহ তায়ালা সেদিন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এত অধিক প্রশংসা করবেন, যে প্রশংসা তিনি ইতিপূর্বে কখনো করেননি। আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবিবের এ দৃশ্য দেখে সহ্য করবেন না। তখন আল্লাহ বলবেন, হে মুহাম্মদ! আপনি আপনার মাথা উত্তোলন করুন এবং সুপারিশ করুন। নবীজি সুপারিশ করবেন। বলবেন,
يَا رَبِّ أُمَّتِي، يَا رَبِّ أُمَّتِي 'হে রব! আমার উম্মত, হে রব! আমার উম্মত।'
হে আল্লাহর বান্দা! সেদিন সকল নবী-রাসুল যখন নাফসি! নাফসি! করতে থাকবে, একমাত্র আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতি উম্মতি বলে চিৎকার করবেন। সেদিন যখন নবী-রাসুল যখন নিজেদের পরিণতির কথা ভেবে চিন্তিত থাকবেন, একমাত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিজের কথা ভুলে আমাদের জন্য উম্মতি উম্মতি বলে চিৎকার করবেন। আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা করবেন। আমাদের মুক্তি ও নাজাতের জন্য সুপারিশ করবেন।
হায়! আজ কোথায় আমরা? কোথায় উম্মতে মুহাম্মদি? কেয়ামতের দিন যে নবী তার নিজের কথা ভুলে উম্মত উম্মত করবেন, আজ সে উম্মত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভুলে আছে। তার দ্বীনকে সাহায্য করছে না। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করছে না। আফসোস, শত আফসোস, সে নবীর উম্মত আজ জিহাদের রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। হাশরের বিভীষিকাময় ভয়াবহ দিবসে যে নবী তার উম্মতের জন্য পাগলপ্রায় হয়ে যাবেন, তাদের জন্য সুপারিশ করবেন, সে উম্মত আজ তার অনুসরণ থেকে দূরে সরে আছে। যে দ্বীন তিনি তাদের নিকট রেখে গেছেন তারা সে দ্বীনের অমর্যাদা করছে। দ্বীনকে পরাজিত হতে দেখে তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় না। পৃথিবীতে তার দ্বীনকে বিজয় ও সমুন্নত করার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করছে না। হায়! উম্মত আজ জিহাদকে ভুলে গেছে। তরবারির ছায়া থেকে পালিয়ে আজ তারা আশ্রয় নিচ্ছে গোলামি ও দাসত্বের ছায়ায়। হায় আফসোস! যদি বুঝত উম্মত তাদের কর্তব্য।
তুমি কি মনে করছ, হাশরের দিবস এখানেই সমাপ্ত? না, তা নয়। সবে তো সূচনা হয়েছে। সেদিন মানুষ এক কঠিন অবস্থা থেকে আরেক কঠিন অবস্থায় রূপান্তরিত হবে। অবশেষে আসবে সে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। আল্লাহ তায়ালা হিসাব গ্রহণের অনুমতি প্রদান করবেন। তখন সকলে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাদের চোখে-মুখে ফুটে উঠবে ভয় ও দুশ্চিন্তার কালো রেখা।
ইরশাদ হয়েছে, وَعُرِضُوا عَلَىٰ رَبِّكَ صَفًّا لَّقَدْ جِئْتُمُونَا كَمَا خَلَقْتُكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ بَلْ زَعَمْتُمْ أَلَّن نَّجْعَلَ لَكُم مَّوْعِدًا
'এবং তাদেরকে আপনার প্রতিপালকের নিকট সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত করে বলা হবে, তোমাদের প্রথমবার যেভাবে সৃষ্টি করেছিলাম সেভাবেই তোমরা আমার নিকট উপস্থিত হয়েছ। অথচ তোমরা মনে করতে যে, তোমাদের জন্য প্রতিশ্রুত ক্ষণ আমি কখনো উপস্থিত করব না।'
সকলে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাদের মাথা থাকবে অবনত। ভয়ে তাদের চক্ষু বিস্ফারিত হতে থাকবে। একে একে সকলের আমলনামা পেশ করা হবে। মিযানে সকলের আমলনামা পরিমাপ করা হবে। মানুষ সেদিন একটি নেক আমলের জন্য পাগলের মতো দৌড়াতে থাকবে। কোথাও যদি একটি নেক আমল পাওয়া যায়! কিন্তু কেউ কারো দিকে একটি বার ফিরে তাকাবে না। সকলে সেদিন সকলের থেকে পলায়ন করবে। একটি আমল কেউ কাউকে দেবে না। জেনে রাখো! সেদিন মা তার সন্তানকে বলবে, 'আমি তোমাকে নয় নয় মাস গর্ভে ধারণ করেছি। তোমার জন্য আমি ত্যাগ স্বীকার করেছি। হে আমার প্রাণাধিক প্রিয় সন্তান! আজ তুমি আমাকে একটি নেক আমল দাও। এমনিভাবে পিতা তার সন্তানকে বলবে। কিন্তু কেউ কারো ডাকে সাড়া দেবে না। সকলেই বলবে, নাফসি! নাফসি! নাফসি!
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেন, 'মানুষ কি সেদিন তার পরিবার-পরিজনকে চিনতে পারবে?'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'হ্যাঁ, সেদিন তারা একে অপরকে চিনতে পারবে। আর তিনটি সময় এমন রয়েছে যখন মানুষ তার পরিণতির কথা জানতে পারবে না। (এক) যখন তাদের আমলনামা প্রকাশ করা হবে, তখন জানবে না যে, আমলনামা কোথায় দেওয়া হবে। ডান হাতে নাকি বাম হাতে। (দুই) যখন আমলনামা পরিমাপ করার জন্য মিজানে রাখা হবে, তখন জানবে না নেক আমল অধিক হবে নাকি মন্দ আমল। (তিন) যখন পুলসিরাত অতিক্রম করবে তখন জানবে না, সে কি তা অতিক্রম করতে পারবে নাকি ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।'
হাশরের ভয়াবহ সেই কাল এক বা দুই দিন নয়, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর। এই সুদীর্ঘকাল মানুষ সেখানে একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকবে। মাথার ওপর থাকবে জ্বলন্ত সূর্য। আল্লাহু আকবার! সেদিন কী অবস্থা হবে আমাদের? কী অবস্থা হবে আমার আপনার? হে আল্লাহর বান্দা! একটি বার জিজ্ঞেস করো নিজেকে। সেদিনের জন্য তোমার প্রস্তুতি কেমন? ইরশাদ হয়েছে,
سَأَلَ سَائِلُ بِعَذَابٍ وَاقِعِ * لِلْكَافِرِينَ لَيْسَ لَهُ دَافِعُ * مِنَ اللَّهِ ذِي الْمَعَارِجِ * تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ
'এক প্রশ্নকারী শান্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করল, যা নেমে আসবে কাফেরদের ওপর, যাকে কেউ প্রতিহত করতে পারবে না। (যা আসবে ঊর্ধ্বারোহণের) সিঁড়ির অধিকারী আল্লাহর পক্ষ থেকে। তার (আরশের) দিকে ফেরেশতারা ও (পবিত্র) আত্মা (জিবরাইল) আরোহণ করে থাকে। (কাফেরদের ওপর ওই শান্তি নেমে আসবে) এমন একদিন যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। '
সুদীর্ঘ সেই পঞ্চাশ হাজার বছর তারা কিছুই খাবে না, পান করবে না। এমনকি কথাও পর্যন্ত বলবে না। তাদের অন্তর কাঁপতে থাকবে। তাদের চক্ষু বের হয়ে আসার উপক্রম হবে। কী হবে সেদিন আমার ও আপনার পরিণতি? আর তাদেরই-বা কেমন পরিণতি হবে যারা আল্লাহর অবাধ্যতা করে। তার হক ও সম্মান যথাযথ আদায় করে না।
কিন্তু সেই কঠিনতর দিনেও আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সাত প্রকার ব্যক্তিকে আরশের ছায়ার নিচে আশ্রয় দেবেন। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাদের জন্য এটি হবে বিশেষ পুরস্কারস্বরূপ। সেদিন আরশের ছায়া ব্যতীত গোটা হাশরের ময়দানে আর কোনো ছায়া থাকবে না। আর সূর্য থাকবে মাথার উপরে।
খুব গভীরভাবে চিন্তা করো দেখো, তুমি কি সেই সাত প্রকার ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত?
হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, 'তুমি কীভাবে পঞ্চাশ হাজার বছর নিজ পায়ে সেদিন দাঁড়িয়ে থাকবে? সেদিন তারা খাবে না, পান করবে না এবং কথাও বলবে না। কেমন পরিণতি হবে যখন সত্তর হাজার বেড়ি পরিহিত জাহান্নামকে টেনে আনা হবে। যার প্রতিটি বেড়ির সাথে থাকবে অনুরূপ সত্তর হাজার ফেরেশতা?
إِذَا رَأَتْهُم مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُّظًا وَزَفِيرًا
'দূর থেকে আগুন যখন তাদের দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে আগুনের ক্রুদ্ধ গর্জন ও চিৎকার।'
'যখন তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা জাহান্নামের বিকট শব্দ শুনবে আর তা হবে উদ্বেলিত। রোষে জাহান্নام যেন ফেটে পড়বে। যখনই তাতে কোনো দলকে নিক্ষেপ করা হবে তাদেরকে রক্ষীরা জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের নিকট কি কোনো সতর্ককারী আসেনি?'
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের ভয়াবহ সে কেয়ামত দিবসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে আদেশ করেছেন। তিনি আমাদের তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন। তার আনুগত্য করতে বলেছেন।
ইরশাদ হয়েছে, يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمُ يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدُ
‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। নিশ্চয় কেয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী ভুলে যাবে তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখবে নেশাগ্রস্ত; যদিও তারা প্রকৃতার্থে নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুত আল্লাহর শাস্তি কঠিন।’
সেদিন আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব গ্রহণ করবেন। সেদিন কারো প্রতি ন্যূনতম জুলুম করা হবে না। প্রত্যেকে সেদিন তাই পাবে যা সে দুনিয়াতে অর্জন করেছে। ইরশাদ হয়েছে,
لَا ظُلْمَ الْيَوْمَ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ
‘আজ কারো প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’
কেয়ামতের বিভীষিকা ও ভয়াবহ বর্ণনা করতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا * وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا * وَقَالَ الإِنسَانُ مَالَهَا * يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا * بِأَنَّ رَبَّكَ أَوْحَى لَهَا يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ * فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
‘পৃথিবী যখন প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে এবং পৃথিবী যখন তার ভার বের করে দেবে, মানুষ বলবে—তার কী হলো? সেদিন পৃথিবী তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে। কারণ তোমার প্রতিপালক তাকে আদেশ করবেন। সেদিন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দলে বের হবে, যেনো তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম দেখানো যায়। কেউ যদি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করে তাহলে সে তা দেখবে, আর যদি অণু পরিমাণ অসৎকর্ম দেখে সে তাও দেখবে। '
চিন্তা করো তখন তোমার কেমন পরিণতি হবে যখন বলা হবে, হে অমুকের ছেলে অমুক! তোমার আমলনামা পেশ করো? কেমন পরিণতি অপেক্ষা করছে সেদিন, যেদিন তোমার নাম ধরে ডেকে বলা হবে, দাও তোমার জীবনের হিসাব দাও, প্রতিটি সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দাও?
দুনিয়ার কোনো রাজা-বাদশাহ যখন তোমার সামনে উপস্থিত থাকে তখন তোমার অন্তর কাঁপতে থাকে। ভয়ে তোমার মুখ দিয়ে কথা পর্যন্ত বের হয় না। তাহলে সেদিন কী ভয়াবহ অবস্থা হবে যেদিন তোমার সামনে দণ্ডায়মান থাকবেন রাজাধিরাজ; যার হাতে সেদিন ভাঁজ করা থাকবে সমগ্র আসমান ও জমিন? ইরশাদ হয়েছে,
يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيَّ السِّجِلِّ لِلْكُتُبِ كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ
'সেদিন আকাশমণ্ডলীকে গুটিয়ে ফেলব, যেভাবে গুটানো হয় লিখিত কাগজ। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। প্রতিশ্রুতি পালন আমার কর্তব্য, আমি তা পালন করবই। '
বিচারগ্রহণের সময় সমস্ত ফেরেশতা ও মানুষ তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারা অপেক্ষারত থাকবে তোমার পরিণতি প্রত্যক্ষ করার জন্য। কিন্তু তুমি জানো না, তোমার সাথে কেমন আচরণ করা হবে। তুমি জানো না বিচার গ্রহণের পর তোমার অবস্থান হবে কোথায়।
যাদের অন্তরে তাকওয়া রয়েছে। পৃথিবীতে আল্লাহর আনুগত্য করেছে পূর্ণরূপে। যারা আল্লাহর সমস্ত হক ও তার সম্মান যথাযথ রক্ষা করেছে সেদিন তাদের পরিণতি কেমন হবে, এ সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা যখন তাকে হিসাব গ্রহণের জন্য আহ্বান করবেন। তখন একটি পর্দা দিয়ে তাকে ঢেকে নেবেন। তারপর পর্দাবৃত অবস্থায় তার হিসেব গ্রহণ করবেন। বান্দা তখন আল্লাহর সম্মুখে তার সকল অপরাধ স্বীকার করবে। দুনিয়াতে যা যা করেছে তা পরিপূর্ণরূপে তুলে ধরবে। অতঃপর বান্দা যখন ধারণা করবে, সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে তখন বলবে, 'আমার আল্লাহ সবচেয়ে দয়ালু।' তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, 'আমি দুনিয়াতে তোমার সকল দোষ-ত্রুটি গোপন রেখেছি, আজও আমি তা গোপন রাখব। অতঃপর আল্লাহ তার আমলনামা তার ডান হাতে দেবেন। সে হাসতে হাসতে আনন্দচিত্তে বের হয়ে আসবে। তখন সে উপস্থিত সকলকে লক্ষ্য করে সুউচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা দেবে,
هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهُ * إِنِّي ظَنَنتُ أَنِّي مُلَاقٍ حِسَابِيهِ فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَاضِيَةٍ * فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٍ
'নাও, আমার আমলনামা পড়ে দেখো। নিশ্চয়ই আমি জানতাম যে, আমাকে আমার হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং সে যাপন করবে সন্তোষজনক জীবন। সুউচ্চ জান্নাতে। '
পক্ষান্তরে যারা আল্লাহকে ভয় করে না। তার অবাধ্যতা ও নাফরমানি করে। অন্যায় পাপাচারে ডুবে থাকে। আল্লাহর যাবতীয় হক ও সম্মান যথাযথ আদায় করে না, তারা যখন হিসাব দেবে তখন ফেরেশতা ও মানুষ সকলে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারা যখন নিজেদের কৃতকর্মের হিসাব দেবে সকলে তা শুনবে। আল্লাহ তখন তাদের বলবেন, 'দুনিয়াতে যখন আমার অবাধ্যতা করেছিলে তখন কি লজ্জিত হওনি, তবে আজ কেন সকলের সম্মুখে কৃত অন্যায় ও পাপের স্বীকারোক্তি দিতে লজ্জিত হচ্ছ?
তখন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার ফেরেশতাদের ডেকে বলবেন, 'হে আমার ফেরেশতাগণ! তাকে বড় শক্তভাবে পাকড়াও করো। তাকে আমার আজাবে নিক্ষেপ করো। মর্মন্তুদ শাস্তি আস্বাদন করাও।
তাদের আমলনামা তাদের বাম হাতে দেওয়া হবে। আক্ষেপ, অনুশোচনায় তারা নিজেদের নত করে রাখবে। বলতে থাকবে,
يَا لَيْتَنِي لَمْ أُوتَ كِتَابِيَهْ وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهْ يَا لَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةَ مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَهُ هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهُ
'হায়! আমাকে যদি আমার আমলনামা না দেওয়া হতো। আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব। হায়! আমার মৃত্যুই যদি আমার শেষ হতো। আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো কাজেই এলো না। আমার ক্ষমতাও বিনষ্ট হয়ে গেছে।'
রাজাধিরাজ মহাশক্তিধর আমার প্রভু সেদিন তার ফেরেশতাদের ডেকে বলবেন,
خُذُوهُ فَغُلُّوهُ ثُمَّ الْجَحِيمَ صَلُّوهُ ثُمَّ فِي سِلْسِلَةٍ ذَرْعُهَا سَبْعُونَ ذِرَاعًا فَاسْلُكُوهُ إِنَّهُ كَانَ لَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ فَلَيْسَ لَهُ الْيَوْمَ هَاهُنَا حَمِيمٌ وَلَا طَعَامُ إِلَّا مِنْ غِسْلِينٍ لَا يَأْكُلُهُ إِلَّا الْخَاطِئُونَ
'তোমরা পাকড়াও করো তাকে। অতঃপর তার গলদেশে বেড়ি পরিয়ে দাও। তারপর তাকে নিক্ষেপ করো জাহান্নামে। তারপর তাকে সত্তর হাত লম্বা একটি শিকলে বাঁধ। সে তো মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিল না। অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে উৎসাহিত করতো না। অতএব আজকের দিনে তার কোনো বন্ধু থাকবে না। থাকবে না কোনো খাদ্য, তবে রয়েছে ক্ষতনিঃসৃত পুঁজ। যা অপরাধী ব্যতীত কেউ ভক্ষণ করে না।'
টিকাঃ
৮০. সুরা তহা: ১০৯।
৮১. সুরা তহা: ১০৫-১১১।
৮২. সুরা কাহফ: ৪৮।
৮৩. সুরা মাআরিজ: ১-৪।
৮৪. সুরা ফুরকান: ১২।
৮৫. সুরা হজ: ১-২।
৮৬. সুরা গাফের: ১৭।
৮৭. সুরা যিলযাল: ১-৮।
৮৮. এককালে দলিল-দস্তাবেজ, ফরমান ইত্যাদি গুটিয়ে রাখা হতো। এখানে এইভাবে কাগজপত্র গুটানোর সঙ্গে আকাশমণ্ডলীকে গুটিয়ে ফেলার তুলনা করা হয়েছে।
৮৯. সুরা আম্বিয়া: ১০৪।
৯০. সুরা হাক্কা: ১৯-২২।
৯১. সুরা হাক্কা: ২৫-২৯।
৯২. সুরা হাক্কা: ৩০-৩৭।
📄 আমলের পরিমাপ
হিসাব গ্রহণের পর উক্ত আমলনামা পরিমাপ করার জন্য পাল্লা স্থাপন করা হবে। এটি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ইনসাফ ও প্রজ্ঞার নিদর্শন। সেদিন তিনি কারো প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করবেন না। প্রত্যেকের আমলনামা অনুযায়ী ঠিক ঠিক ফয়সালা করবেন।
وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِينَ
'কেয়ামতের দিন আমি ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব। তাই কারো প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না। কারো যদি সরিষার দানা পরিমাণও কাজ (আমল) থাকে আমি তা উপস্থিত করব। হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট।'
আমল পরিমাপ করার প্রত্যেকে জানতে পারবে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নিকট তার মর্যাদা ঠিক কী পরিমাণ। প্রত্যেকের মর্যাদা ও অবস্থান সেই পরিমাণ হবে যে পরিমাণ হবে তার আমল। আল্লাহর স্থাপিত ন্যায়বিচারের মানদণ্ড কারো প্রতি ন্যূনতম অবিচার করবে না। ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের মূর্তপ্রতীক।
সেদিন এক মুমিন ব্যক্তি গোনাহের পাহাড় নিয়ে উপস্থিত হবে। যখন তার আমলনামা পরিমাপ করা হবে এবং সে বুঝতে পারবে তার ধ্বংস অনিবার্য। তখন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলবেন, 'আজ কারো প্রতি সামান্যতম জুলুম করা হবে না। আমার বান্দার কি কোনো একটি নেক আমল রয়েছে? তখন একটি লিখিত পত্র উপস্থিত করা হবে যেখানে লেখা রয়েছে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তখন উক্ত ব্যক্তি বলবে, 'এই পত্র আমার পাহাড় পরিমাণ পাপের তুলনায় কী হবে?' অতঃপর কালিমা লেখা সে পত্রটি পাহাড় পরিমাণ গোনাহের বিপরীত অপর পাল্লায় রাখা হবে। এক পাল্লায় পাহাড় পরিমাণ গোনাহ, অপর পাল্লায় কালিমা লেখা একটি পত্র। আশ্চর্য ও সত্য হলো, কালিমা সম্বলিত পত্রটি তার পাহাড় পরিমাণ গোনাহের তুলনায় অধিক ভারী হবে। তার জন্য নাজাতের ফয়সালা করা হবে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বান্দাকে এভাবেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে রক্ষা করবেন।
সুতরাং এই কালিমাকে হৃদয়ে সংরক্ষণ করো। তার যথোচিত হক ও মর্যাদা রক্ষা করো। বিভীষিকাময় সেদিন এই কালিমা ধ্বংস ও জাহান্নামের প্রজ্জ্বলিত আগুন থেকে রক্ষা করবে।
ইরশাদ হয়েছে,
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ 'অতএব জেনে রাখো, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।'
টিকাঃ
৯৩. সুরা আম্বিয়া: ৪৭।
৯৪. সুরা মুহাম্মদ: ১৯
হিসাব গ্রহণের পর উক্ত আমলনামা পরিমাপ করার জন্য পাল্লা স্থাপন করা হবে। এটি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ইনসাফ ও প্রজ্ঞার নিদর্শন। সেদিন তিনি কারো প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করবেন না। প্রত্যেকের আমলনামা অনুযায়ী ঠিক ঠিক ফয়সালা করবেন।
وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِينَ
'কেয়ামতের দিন আমি ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব। তাই কারো প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না। কারো যদি সরিষার দানা পরিমাণও কাজ (আমল) থাকে আমি তা উপস্থিত করব। হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট।'
আমল পরিমাপ করার প্রত্যেকে জানতে পারবে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নিকট তার মর্যাদা ঠিক কী পরিমাণ। প্রত্যেকের মর্যাদা ও অবস্থান সেই পরিমাণ হবে যে পরিমাণ হবে তার আমল। আল্লাহর স্থাপিত ন্যায়বিচারের মানদণ্ড কারো প্রতি ন্যূনতম অবিচার করবে না। ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের মূর্তপ্রতীক।
সেদিন এক মুমিন ব্যক্তি গোনাহের পাহাড় নিয়ে উপস্থিত হবে। যখন তার আমলনামা পরিমাপ করা হবে এবং সে বুঝতে পারবে তার ধ্বংস অনিবার্য। তখন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলবেন, 'আজ কারো প্রতি সামান্যতম জুলুম করা হবে না। আমার বান্দার কি কোনো একটি নেক আমল রয়েছে? তখন একটি লিখিত পত্র উপস্থিত করা হবে যেখানে লেখা রয়েছে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তখন উক্ত ব্যক্তি বলবে, 'এই পত্র আমার পাহাড় পরিমাণ পাপের তুলনায় কী হবে?' অতঃপর কালিমা লেখা সে পত্রটি পাহাড় পরিমাণ গোনাহের বিপরীত অপর পাল্লায় রাখা হবে। এক পাল্লায় পাহাড় পরিমাণ গোনাহ, অপর পাল্লায় কালিমা লেখা একটি পত্র। আশ্চর্য ও সত্য হলো, কালিমা সম্বলিত পত্রটি তার পাহাড় পরিমাণ গোনাহের তুলনায় অধিক ভারী হবে। তার জন্য নাজাতের ফয়সালা করা হবে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বান্দাকে এভাবেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে রক্ষা করবেন।
সুতরাং এই কালিমাকে হৃদয়ে সংরক্ষণ করো। তার যথোচিত হক ও মর্যাদা রক্ষা করো। বিভীষিকাময় সেদিন এই কালিমা ধ্বংস ও জাহান্নামের প্রজ্জ্বলিত আগুন থেকে রক্ষা করবে।
ইরশাদ হয়েছে,
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ 'অতএব জেনে রাখো, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।'
টিকাঃ
৯৩. সুরা আম্বিয়া: ৪৭।
৯৪. সুরা মুহাম্মদ: ১৯
📄 পুলসিরাত
কেয়ামতের দিন সকল মানুষ এক স্থান থেকে অপর স্থানে পদার্পণ করবে। এক বিপদ থেকে আরেক বিপদের দিকে যাত্রা করবে। এক বিভীষিকা থেকে আরেক বিভীষিকায় স্থানান্তরিত হবে। তারা কেউ জানবে না জান্নাত নাকি জাহান্নাম হবে তাদের আবাসস্থল। চোখে-মুখে নিদারুণ উৎকণ্ঠার ছাপ পষ্ট হয়ে উঠবে।
কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকের আমলের হিসাব গ্রহণ করার পর পুলসিরাত স্থাপন করা হবে। পুলসিরাত—যা হবে চুলের চেয়ে সরু, শানিত তরবারির চেয়ে ধারালো। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তখন সকলকে আদেশ করবেন, ভয়ংকর এই পুলসিরাত অতিক্রম করার জন্য। একে একে দুনিয়ার সকল মানুষ পুলসিরাতে আরোহণ করবে। যে ব্যক্তি পুলসিরাত অতিক্রম করতে পারবে সে শাশ্বত সুখ ও নেয়ামতরাজিতে ভরপুর চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে অতিক্রম করতে পারবে না চির দুঃখ ও অশান্তি ঘেরা জাহান্নাম হবে তার ঠিকানা।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তখন তার আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ কোনো কোনো বান্দাকে দেবেন বিশেষ একপ্রকার নুর বা আলো, যার সাহায্যে তারা খুব সহজেই পেরিয়ে যাবে পুলসিরাত। আল্লাহপ্রদত্ত সে আলোর পাওয়ার এতই অধিক হবে যে, তাদের সামনে ও পেছনে যারা চলবে আলো তাদেরও পুলসিরাত অতিক্রম করতে সহায়তা করবে। সেদিন প্রত্যেককে তার ঈমান, আমল, তাকওয়া অনুযায়ী বিশেষ নুর দেওয়া হবে। কারো আলো হবে বিশাল পাহাড় পরিমাণ। কারো হবে আকাশের নক্ষত্র সমপরিমাণ। কাউকে আবার দেওয়া হবে পায়ের বৃদ্ধ আঙুলের পরিমাণ আলো। যার ঈমান, আমল, তাকওয়া যত অধিক হবে তার আলোর পরিমাণও হবে তত বড়। আল্লাহপ্রদত্ত সে আলো একবার জ্বলে উঠবে একবার নিভে যাবে। যখনই জ্বলে উঠবে বান্দা এক কদম অগ্রসর হবে। আর যখনই নিভে যাবে বান্দা থেকে যাবে। সেদিন পুলসিরাতের ওপর দিয়ে চলতে চলতে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে থাকবেন,
اللهم سلم سلم
'হে আল্লাহ! আপনি রক্ষা করুন। হে আল্লাহ! আপনি রক্ষা করুন।'
হে আল্লাহর বান্দা! হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে ভেবে দেখো, আমার ও তোমার পরিণতি কেমন হবে? পার্থিব জীবনে যারা আল্লাহকে ভয় করে না, তার সমস্ত আদেশ-নিষেধ মেনে চলে না, তার হক ও সম্মান যথাযথ রক্ষা করে না তাদের পরিণতি কেমন ভয়াবহ হবে তা অনুমান করা যায় একটি বর্ণনার মাধ্যমে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা একদিন তার স্ত্রীর উরুতে মাথা রেখে কাঁদতে ছিলেন। তাকে কাঁদতে দেখে তার স্ত্রীও কাঁদতে শুরু করেন। এবার তিনি তার স্ত্রীকে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। স্ত্রী বললেন, 'আপনি কাঁদতেছেন তাই আমিও কাঁদতেছি। অতঃপর স্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা বলেন, কুরআনুল করিমের এই আয়াত আমার স্মরণ হয়েছে,
وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا
'তোমাদের প্রত্যেককেই সেখানেই যেতে হবে। '
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এ বলে পুলসিরাতকে বুঝিয়েছেন। তিনি জানেন না, পুলসিরাত তাকে জান্নাতে পৌঁছে দেবে নাকি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা বলেন, 'আমি পুলসিরাতের কথা স্মরণ করছি।'
সেদিনের ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে আমাদের কি ক্রন্দন করা উচিত নয়? সত্যিই সে এক ভয়ংকর দিন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে যার চিত্র এঁকেছেন এভাবে, وَيَقُولُ الْإِنْسَانُ أَإِذَا مَا مِنْ لَسَوْفَ أُخْرَجُ حَيَا أَوَلَا يَذْكُرُ الْإِنْسَانُ أَنَّا خَلَقْنَاهُ مِنْ قَبْلُ وَلَمْ يَكُ شَيْئًا فَوَرَبِّكَ لَنَحْشُرَنَّهُمْ وَالشَّيَاطِينَ ثُمَّ لَنُحْضِرَنَّهُمْ حَوْلَ جَهَنَّمَ جِثِيًّا ثُمَّ لَتَنْزِعَنَّ مِنْ كُلِّ شِيعَةٍ أَيُّهُمْ أَشَدُّ عَلَى الرَّحْمَنِ عِتِيًّا ثُمَّ لَنَحْنُ أَعْلَمُ بِالَّذِينَ هُمْ أَوْلَى بِهَا صِلِيًّا وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا
'মানুষ বলে, আমি যখন মারা যাব তারপর কি আমাকে জীবিত উঠানো হবে? আচ্ছা, তাহলে মানুষ কি স্মরণ করে না যে, ইতিপূর্বে যখন আমি তাকে সৃষ্টি করেছিলাম তখন সে কিছুই ছিল না? সুতরাং তোমার প্রভুর শপথ! অবশ্যই আমি তাদের এবং শয়তানদের একত্রিত করব, তারপর হাঁটুতে ভর করা অবস্থায় তাদের জাহান্নামের চারপাশে নিয়ে আসব। অতঃপর আমি প্রতিটি দল থেকে অবশ্যই টেনে বের করব, কে তাদের মধ্যে পরম করুণাময়ের সবচেয়ে বড় অবাধ্য। আমি তাদেরও ভালো জানি যারা জাহান্নামে দগ্ধ হওয়ার অধিক যোগ্য। আর তোমাদের প্রত্যেককেই সেখানে যেতে হবে। এটি তোমার প্রভুর অনিবার্য সিদ্ধান্ত। যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছিল আমি তাদের উদ্ধার করব এবং জালেমদের হাঁটুতে ভর করা অবস্থায় সেখানে রেখে দেব। সুতরাং আমরা কি তাদের অন্তর্ভুক্ত যারা আল্লাহকে ভয় করে?'
শোনো! সেদিন যারা পুলসিরাত অতিক্রম করে জান্নাতে পৌঁছে যাবে এবং যারা অতিক্রম করতে না পেরে জাহান্নামে পতিত হবে তাদের কথা। কারা সেই সৌভাগ্যবান যাদের আল্লাহ তায়ালা পুলসিরাত অতিক্রম করার তাওফিক দিবেন। এবং কারা সেই দুর্ভাগা যারা দ্বিখণ্ডিত হয়ে পতিত হবে ঘোরতর বিপদ ও জ্বলন্ত আগুনে প্রজ্বলিত জাহান্নামে।
ইরশাদ হয়েছে, الَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ إِنَّ رَبَّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ هُوَ أَعْلَمُ بِكُمْ إِذْ أَنشَأَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَإِذْ أَنْتُمْ أَجِنَّةٌ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ فَلَا تُزَكُّوا أَنفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى
'যারা ছোটোখাটো অপরাধ করে ফেললেও বড় বড় পাপ ও সকল প্রকার কুকর্ম থেকে দূরে থাকে। তোমার প্রভু ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। তিনি তোমাদের সম্পর্কে ভালো জানেন, যখন তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যখন তোমরা মায়ের পেটে ভ্রুণ ছিলে। অতএব তোমরা নিজেদের সাফাই গেয়ো না। তিনি ভালো জানেন কে তাকওয়া অবলম্বনকারী।
টিকাঃ
৯৫. সুরা মারইয়াম: ৭১।
৯৬. সুরা মারইয়াম: ৬৬-৭২।
৯৭. সুরা নাজম: ৩২।
কেয়ামতের দিন সকল মানুষ এক স্থান থেকে অপর স্থানে পদার্পণ করবে। এক বিপদ থেকে আরেক বিপদের দিকে যাত্রা করবে। এক বিভীষিকা থেকে আরেক বিভীষিকায় স্থানান্তরিত হবে। তারা কেউ জানবে না জান্নাত নাকি জাহান্নাম হবে তাদের আবাসস্থল। চোখে-মুখে নিদারুণ উৎকণ্ঠার ছাপ পষ্ট হয়ে উঠবে।
কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকের আমলের হিসাব গ্রহণ করার পর পুলসিরাত স্থাপন করা হবে। পুলসিরাত—যা হবে চুলের চেয়ে সরু, শানিত তরবারির চেয়ে ধারালো। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তখন সকলকে আদেশ করবেন, ভয়ংকর এই পুলসিরাত অতিক্রম করার জন্য। একে একে দুনিয়ার সকল মানুষ পুলসিরাতে আরোহণ করবে। যে ব্যক্তি পুলসিরাত অতিক্রম করতে পারবে সে শাশ্বত সুখ ও নেয়ামতরাজিতে ভরপুর চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে অতিক্রম করতে পারবে না চির দুঃখ ও অশান্তি ঘেরা জাহান্নাম হবে তার ঠিকানা।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তখন তার আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ কোনো কোনো বান্দাকে দেবেন বিশেষ একপ্রকার নুর বা আলো, যার সাহায্যে তারা খুব সহজেই পেরিয়ে যাবে পুলসিরাত। আল্লাহপ্রদত্ত সে আলোর পাওয়ার এতই অধিক হবে যে, তাদের সামনে ও পেছনে যারা চলবে আলো তাদেরও পুলসিরাত অতিক্রম করতে সহায়তা করবে। সেদিন প্রত্যেককে তার ঈমান, আমল, তাকওয়া অনুযায়ী বিশেষ নুর দেওয়া হবে। কারো আলো হবে বিশাল পাহাড় পরিমাণ। কারো হবে আকাশের নক্ষত্র সমপরিমাণ। কাউকে আবার দেওয়া হবে পায়ের বৃদ্ধ আঙুলের পরিমাণ আলো। যার ঈমান, আমল, তাকওয়া যত অধিক হবে তার আলোর পরিমাণও হবে তত বড়। আল্লাহপ্রদত্ত সে আলো একবার জ্বলে উঠবে একবার নিভে যাবে। যখনই জ্বলে উঠবে বান্দা এক কদম অগ্রসর হবে। আর যখনই নিভে যাবে বান্দা থেকে যাবে। সেদিন পুলসিরাতের ওপর দিয়ে চলতে চলতে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে থাকবেন,
اللهم سلم سلم
'হে আল্লাহ! আপনি রক্ষা করুন। হে আল্লাহ! আপনি রক্ষা করুন।'
হে আল্লাহর বান্দা! হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে ভেবে দেখো, আমার ও তোমার পরিণতি কেমন হবে? পার্থিব জীবনে যারা আল্লাহকে ভয় করে না, তার সমস্ত আদেশ-নিষেধ মেনে চলে না, তার হক ও সম্মান যথাযথ রক্ষা করে না তাদের পরিণতি কেমন ভয়াবহ হবে তা অনুমান করা যায় একটি বর্ণনার মাধ্যমে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা একদিন তার স্ত্রীর উরুতে মাথা রেখে কাঁদতে ছিলেন। তাকে কাঁদতে দেখে তার স্ত্রীও কাঁদতে শুরু করেন। এবার তিনি তার স্ত্রীকে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। স্ত্রী বললেন, 'আপনি কাঁদতেছেন তাই আমিও কাঁদতেছি। অতঃপর স্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা বলেন, কুরআনুল করিমের এই আয়াত আমার স্মরণ হয়েছে,
وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا
'তোমাদের প্রত্যেককেই সেখানেই যেতে হবে। '
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এ বলে পুলসিরাতকে বুঝিয়েছেন। তিনি জানেন না, পুলসিরাত তাকে জান্নাতে পৌঁছে দেবে নাকি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা বলেন, 'আমি পুলসিরাতের কথা স্মরণ করছি।'
সেদিনের ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে আমাদের কি ক্রন্দন করা উচিত নয়? সত্যিই সে এক ভয়ংকর দিন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে যার চিত্র এঁকেছেন এভাবে, وَيَقُولُ الْإِنْسَانُ أَإِذَا مَا مِنْ لَسَوْفَ أُخْرَجُ حَيَا أَوَلَا يَذْكُرُ الْإِنْسَانُ أَنَّا خَلَقْنَاهُ مِنْ قَبْلُ وَلَمْ يَكُ شَيْئًا فَوَرَبِّكَ لَنَحْشُرَنَّهُمْ وَالشَّيَاطِينَ ثُمَّ لَنُحْضِرَنَّهُمْ حَوْلَ جَهَنَّمَ جِثِيًّا ثُمَّ لَتَنْزِعَنَّ مِنْ كُلِّ شِيعَةٍ أَيُّهُمْ أَشَدُّ عَلَى الرَّحْمَنِ عِتِيًّا ثُمَّ لَنَحْنُ أَعْلَمُ بِالَّذِينَ هُمْ أَوْلَى بِهَا صِلِيًّا وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا
'মানুষ বলে, আমি যখন মারা যাব তারপর কি আমাকে জীবিত উঠানো হবে? আচ্ছা, তাহলে মানুষ কি স্মরণ করে না যে, ইতিপূর্বে যখন আমি তাকে সৃষ্টি করেছিলাম তখন সে কিছুই ছিল না? সুতরাং তোমার প্রভুর শপথ! অবশ্যই আমি তাদের এবং শয়তানদের একত্রিত করব, তারপর হাঁটুতে ভর করা অবস্থায় তাদের জাহান্নামের চারপাশে নিয়ে আসব। অতঃপর আমি প্রতিটি দল থেকে অবশ্যই টেনে বের করব, কে তাদের মধ্যে পরম করুণাময়ের সবচেয়ে বড় অবাধ্য। আমি তাদেরও ভালো জানি যারা জাহান্নামে দগ্ধ হওয়ার অধিক যোগ্য। আর তোমাদের প্রত্যেককেই সেখানে যেতে হবে। এটি তোমার প্রভুর অনিবার্য সিদ্ধান্ত। যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছিল আমি তাদের উদ্ধার করব এবং জালেমদের হাঁটুতে ভর করা অবস্থায় সেখানে রেখে দেব। সুতরাং আমরা কি তাদের অন্তর্ভুক্ত যারা আল্লাহকে ভয় করে?'
শোনো! সেদিন যারা পুলসিরাত অতিক্রম করে জান্নাতে পৌঁছে যাবে এবং যারা অতিক্রম করতে না পেরে জাহান্নামে পতিত হবে তাদের কথা। কারা সেই সৌভাগ্যবান যাদের আল্লাহ তায়ালা পুলসিরাত অতিক্রম করার তাওফিক দিবেন। এবং কারা সেই দুর্ভাগা যারা দ্বিখণ্ডিত হয়ে পতিত হবে ঘোরতর বিপদ ও জ্বলন্ত আগুনে প্রজ্বলিত জাহান্নামে।
ইরশাদ হয়েছে, الَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ إِنَّ رَبَّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ هُوَ أَعْلَمُ بِكُمْ إِذْ أَنشَأَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَإِذْ أَنْتُمْ أَجِنَّةٌ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ فَلَا تُزَكُّوا أَنفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى
'যারা ছোটোখাটো অপরাধ করে ফেললেও বড় বড় পাপ ও সকল প্রকার কুকর্ম থেকে দূরে থাকে। তোমার প্রভু ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। তিনি তোমাদের সম্পর্কে ভালো জানেন, যখন তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যখন তোমরা মায়ের পেটে ভ্রুণ ছিলে। অতএব তোমরা নিজেদের সাফাই গেয়ো না। তিনি ভালো জানেন কে তাকওয়া অবলম্বনকারী।
টিকাঃ
৯৫. সুরা মারইয়াম: ৭১।
৯৬. সুরা মারইয়াম: ৬৬-৭২।
৯৭. সুরা নাজম: ৩২।