📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 কেয়ামত সন্নিকটে

📄 কেয়ামত সন্নিকটে


আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালা মানুষের দেহের ভেতর অসংখ্য নিদর্শন সৃষ্টি করেছেন। আসমান জমিনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অগণিত নিদর্শন তিনি বান্দাদের দৃষ্টিগোচর করেছেন। এর চেয়ে বড় নিদর্শন আর কী হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,

وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَوَاتُ مَطْوِيَّاتُ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ

'কেয়ামতের দিন সমস্ত পৃথিবী থাকবে তার হাতের মুঠোয় এবং আকাশমণ্ডলী থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তার দক্ষিণ হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি। তারা যাকে শরিক করে তিনি তার ঊর্ধ্বে। '

আল্লাহ তায়ালা কেয়ামত সত্য ও অবশ্যম্ভাবী হওয়ার ব্যাপারে আমাদের ছোটো-বড় বহু প্রমাণ দেখিয়েছেন। এসব প্রমাণ ও নিদর্শনের মাধ্যমে বারবার আমাদের সতর্ক করেছেন, যেন কেয়ামতের ভয়াবহতা অনুধাবন করে আমরা ফিরে আসি সঠিক পথে। তার অবাধ্যতা পরিত্যাগ করে যেন আনুগত্যের পথে ফিরে আসি। নাফরমানি পরিহার করে আমলের পথ অবলম্বন করি। আদেশসমূহ পালন করার পাশাপাশি যাবতীয় নিষেধ থেকে বেঁচে থাকি। মোটকথা, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের কেয়ামতের সত্যতার ব্যাপারে সতর্ক করে সফলতা ও চির কল্যাণের পথে আহ্বান করেছেন।

ইরশাদ হয়েছে,

فَهَلْ يَنْظُرُونَ إِلَّا السَّاعَةَ أَنْ تَأْتِيَهُمْ بَغْتَةً فَقَدْ جَاءَ أَشْرَاطُهَا فَأَنَّى لَهُمْ إِذَا جَاءَتْهُمْ ذِكْرَاهُمْ * فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ

'তারা কি কেবল এ জন্য অপেক্ষা করছে যে, আকস্মিকভাবে কেয়ামত তাদের অতি নিকটে এসে পড়ুক? কেয়ামতের নিদর্শনসমূহ তো এসেই পড়েছে। কেয়ামত এসে পড়লে তারা তখন উপদেশ গ্রহণ করবে কীভাবে? সুতরাং জেনে রাখো! আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই। ক্ষমা প্রার্থনা করো তোমার এবং মুমিন নারী-পুরুষের ত্রুটির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন।'

আল্লাহকে যারা ভয় করে এবং তার হক ও যথাযথ সম্মান রক্ষা করে তারা কেয়ামত দিবসের জন্য কাঙ্ক্ষিত প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। আর যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় নেই, যারা তার অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে মত্ত রয়েছে এবং তার হক ও সম্মান যথোচিত রক্ষা করে না তারা কেয়ামত দিবসের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে আছে। তাদের হৃদয়ে ন্যূনতম অনুভূতি জাগ্রত হয় না। তাদের সম্পর্কেই পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ

'তাদের ছেড়ে দাও, তারা ভক্ষণ করতে থাকুক, ভোগ করতে থাকুক এবং আশা তাদের মোহাচ্ছন্ন করে রাখুক। অচিরেই তারা জানতে পারবে।'

কেয়ামত অবশ্যম্ভাবী। তা সংঘটিত হবেই। নিশ্চিত এ পরিণতি থেকে কেউ রেহাই পাবে না। কেয়ামত দিবসে ঈমানের তারতম্য অনুযায়ী মুমিনদের অবস্থা বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত হবে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন, কেয়ামত দিবসে তিনি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষকে একত্রিত করবেন।

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কেয়ামত দিবস ও পরকালের প্রতি ঈমান আনাকে ঈমানের অন্যান্য আরো বহু শাখার ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন।

ইরশাদ হয়েছে- ذَلِكَ يُوعَظُ بِهِ مَنْ كَانَ مِنْكُمْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ 'এর মাধ্যমে যে আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে তাকে উপদেশ দেওয়া হয়। '

আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে ঈমানের অন্যান্য শাখা-প্রশাখার ওপর। এর কারণ হলো, যে ব্যক্তি পরকালের প্রতি ঈমান রাখে সে আল্লাহকে ভয় করে। পরকালের শান্তি থেকে বাঁচতে এবং পুরস্কার অর্জনে সচেষ্ট হয়। পরকালের প্রতি বিশ্বাস যার অন্তরে বিরাজমান তার কলব থাকে জীবিত। সে আল্লাহর আনুগত্য করে। অবাধ্যতা নাফরমানি থেকে বিরত থাকে। মন্দ আমল পরিহার করে। নেক আমল বেশি করে। পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের দ্বারা মুমিনের জীবনে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। পরকালের প্রতি যার বিশ্বাস যত সুদৃঢ় তার জীবন ততই আল্লাহর আনুগত্যশীল। তখন তার অন্তরে এ অনুভূতি জাগ্রত থাকে যে, আমি আল্লাহর বান্দা। আমাকে একদিন তাঁর সম্মুখে দাঁড়াতে হবে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করবেন আমার যাপিত জীবন সম্পর্কে। কোথায় তা ব্যয় করেছি।

জেনে রাখো, আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলের বিষয়ে অবগত। আমাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, দৃশ্য-অদৃশ্য কোনোকিছুই তার নিকট অজানা নয়। কিন্তু এ কথা জানা থাকা সত্ত্বেও আজ তাদের অবস্থা হলো অন্ধ, বোবা ও বধির ব্যক্তির মতো। তারা নিজেদের ক্ষেত্রে দাবি করে তারা ঈমানদার, আল্লাহ ও পরকালের প্রতি রয়েছে তাদের পূর্ণ বিশ্বাস। কিন্তু তাদের বাস্তব জীবনের প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত করলে পরিলক্ষিত হয়, আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানের কোনো প্রভাব ও ক্রিয়া তাদের মাঝে নেই। আনুগত্যের ব্যাপারে তারা দুর্বল। সকল প্রকার হারাম ও নাজায়েজ কাজে তারা জড়িয়ে পড়ছে। এ জন্য তাদের অন্তরে নেই কোনো প্রকার দ্বিধা ও ভয়। তাদের বিশ্বাস ও কর্মের মাঝে কোনো সামঞ্জস্য নেই। তারা বিশ্বাস করে আল্লাহ তাদের দেখছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা গুনাহও নাফরমানি থেকে বিরত থাকছে না। হ্যাঁ, কেন হচ্ছে এমনটি? কেন তারা মুখে ঈমানের কথা বললেও আমলে তাদের ঈমানের প্রতিফলন নেই। পরকালের শাস্তিকে ভয় করে ঠিক কিন্তু সে শাস্তি থেকে বেঁচে থাকার জন্য তারা কোনো চেষ্ট করছে না। তাদের এ কেমন ঈমান? এ কেমন ভয়?

এর প্রকৃত কারণ হলো, তারা মুখে যদিও বলে আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রয়েছে, কিন্তু কার্যত তারা আল্লাহকে যথাযথ ভয় করে না, তার হক আদায় করে না, তার যথোচিত সম্মান রক্ষা করে না।

কেয়ামত ও মহাপ্রলয়ের পূর্বে বড় বড় কতিপয় নিদর্শন প্রকাশিত হবে। হে আদম সন্তান! তখন তোমার কেমন পরিণতি হবে, যখন তুমি দেখবে সূর্য পূর্বদিকে উদিত না হয়ে পশ্চিম দিকে উদিত হচ্ছে সেদিন তোমার অন্তরের অবস্থা কেমন হবে? যেদিন দাজ্জাল পৃথিবীতে বিচরণ করবে? যখন দাব্বাতুল আরদ বের হবে তখন তুমি কী করবে? তখন তোমার পরিণাম কেমন হবে যখন ইয়াজুজ-মাজুজ উন্মোচিত হবে?

فَهَلْ يَنْظُرُونَ إِلَّا السَّاعَةَ أَنْ تَأْتِيَهُمْ بَغْتَةً فَقَدْ جَاءَ أَشْرَاطُهَا

'তারা কি কেবল এ জন্য অপেক্ষা করছে যে, কেয়ামত তাদের নিকট আকস্মিকভাবে এসে পড়ুক? কেয়ামতের নিদর্শন তো এসেই পড়েছে। কেয়ামত এসে পড়লে তারা উপদেশ গ্রহণ করবে কীভাবে?'

যাদের অন্তরে প্রকৃত ঈমান রয়েছে। যারা সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে ভয় করে। আল্লাহর হক ও সম্মান যথাযথ আদায় করে তারা যখন কেয়ামতের নিদর্শনসমূহ দেখবে তখন আখেরাতের জন্য আরো অধিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকবে। আল্লাহর আনুগত্য পূর্বের চেয়ে বেশি পরিমাণে করবে। হারাম ও নাজায়েজ থেকে সর্বতোভাবে বেঁচে থাকবে।

হে আদম সন্তান! হতে পারে তুমি সকাল যাপন করেছ কিন্তু সন্ধ্যার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করবে। কিংবা সন্ধ্যা যাপন করেছ কিন্তু রাত পেরিয়ে সকাল হওয়ার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করবে। আর যখন তুমি মৃত্যুবরণ করবে তখন থেকেই তোমার মহাপ্রলয় শুরু হয়ে যাবে।

হে আদম সন্তান! মৃত্যুর পূর্বেই তুমি শুনে নাও সেদিন তাদের কথা কেমন হবে যারা আল্লাহর হক ও তার সম্মান যথোচিত রক্ষা করেনি। দুনিয়াতে থেকেই শুনে নাও সেদিন তাদের পরিণাম হবে কেমন। ইরশাদ হয়েছে,

وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى النَّارِ فَقَالُوا يَا لَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا نُكَذِّبَ بِآيَاتِ رَبِّنَا وَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ

যদি দেখতে পেতে যখন তাদেরকে দোজখের পার্শ্বে দাঁড় করানো হবে এবং তারা বলবে, হায়! যদি আমরা ফিরে যেতে পারতাম তাহলে আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনকে অস্বীকার করতাম না এবং আমরা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। '

আর তারা যখন দুনিয়াতে ছিল তখন তারা কী বলত? ইরশাদ হয়েছে,

قَالُوا إِنْ هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ * وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى رَبِّهِمْ قَالَ أَلَيْسَ هَذَا بِالْحَقِّ قَالُوا بَلَى وَرَبِّنَا قَالَ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنتُمْ تَكْفُرُونَ * قَدْ خَسِرَ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِلِقَاءِ اللَّهِ حَتَّى إِذَا جَاءَتْهُمُ السَّاعَةُ بَغْتَةً قَالُوا يَا حَسْرَتَنَا عَلَى مَا فَرَّطْنَا فِيهَ وَهُمْ يَحْمِلُونَ أَوْزَارَهُمْ عَلَى ظُهُورِهِمْ أَلَا سَاءَ مَا يَزِرُونَ * وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ * قَدْ نَعْلَمُ إِنَّهُ لَيَحْزُنُكَ الَّذِي يَقُولُونَ فَإِنَّهُمْ لَا يُكَذِّبُونَكَ وَلَكِنَّ الظَّالِمِينَ بِآيَاتِ اللَّهِ يَجْحَدُونَ

'তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন। আমরা কখনো পুনরুত্থিত হবো না। তুমি যদি তাদের দেখতে পেতে যখন তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে দাঁড় করানো হবে এবং তিনি বলবেন, এটি কি প্রকৃত সত্য নয়? তারা বলবে, আমাদের প্রতিপালকের শপথ! নিশ্চয়ই সত্য। তিনি বলবেন, তবে তোমরা যে কুফরি করতে তার জন্য এখন শাস্তি ভোগ করো।

যারা আল্লাহর সম্মুখীন হওয়াকে মিথ্যা বলেছে তারা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি অকস্মাৎ তাদের নিকট যখন কেয়ামত উপস্থিত হবে তখন তারা বলবে, হায়! আমরা যে তাকে অবহেলা করেছি তার জন্য আক্ষেপ। তারা তাদের পিঠে নিজেদের পাপ বহন করবে। তারা যা বহন করবে তা অতি নিকৃষ্ট। পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক ব্যতীত আর কিছু নয়। যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখেরাতের আবাসই শ্রেয়। তোমরা কি তা অনুধাবন করো না? আমি অবশ্যই জানি যে, তারা যা বলে তা তোমাকে নিশ্চিত কষ্ট দেয়। কিন্তু তারা তো তোমাকে মিথ্যাবাদী বলে না। বরং যারা জালেম তারা আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করে। '

টিকাঃ
৫৬. সুরা যুমার: ৬৭।
৫৭. সুরা মুহাম্মদ: ১৮-২০।
৫৮. সুরা হিজর: ৩।
৫৯. সুরা বাকারাহ: ২৩২।
৬০. সুরা মুহাম্মদ: ১৮।
৬১. সুরা আনআম: ২৭।
৬২. সুরা আনআম: ২৮-৩৩।

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 কেয়ামত দিবসের অবস্থা

📄 কেয়ামত দিবসের অবস্থা


কেয়ামত দিবসে আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষকে একত্রিত করবেন। সেদিন কেমন হবে আমার ও আপনার অবস্থা? কী পরিণতি অপেক্ষা করছে সেদিন আমাদের জন্য? সেদিনের সূচনা হবে প্রলয়ঙ্করী এক শিঙ্গায় ফুৎকারের মাধ্যমে। বড় ধ্বংসাত্মক, নিদারুণ ও হৃদয়বিদারক এক ধ্বনি। ইরশাদ হয়েছে, وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَوَاتُ مَطْوِيَّاتُ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ * وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ 'তারা আল্লাহকে যথোচিত সম্মান করে না। কেয়ামতের দিন সমস্ত পৃথিবী থাকবে তার হাতের মুঠোয় এবং আকাশমণ্ডলী থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তার দক্ষিণ হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি। তারা যাকে শরিক করে তিনি তার ঊর্ধ্বে। শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে। ফলে আল্লাহ যাদের ইচ্ছা করেন তারা ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকল কিছু মূর্ছে যাবে। অতঃপর আবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, তৎক্ষণাৎ তারা দণ্ডায়মান হবে তাকাতে থাকবে। '

فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّورِ نَفْخَةٌ وَاحِدَةٌ * وَحُمِلَتِ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً وَاحِدَةً * فَيَوْمَئِذٍ وَقَعَتِ الْوَاقِعَةُ * وَانشَقَّتِ السَّمَاءُ فَهِيَ يَوْمَئِذٍ وَاهِيَةٌ * وَالْمَلَكُ عَلَى أَرْجَائِهَا وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَى مِنْكُمْ خَافِيَةٌ

'যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, একটিমাত্র ফুৎকার। পর্বতমালাসহ পৃথিবী উৎক্ষিপ্ত হবে এবং মাত্র এক ধাক্কায় সবকিছু চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। সেদিন সংগঠিত হবে মহাপ্রলয়। আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে আর সেদিন তা বিক্ষিপ্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। ফেরেশতাগণ আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে এবং সেদিন আটজন ফেরেশতা আরশকে ধারণ করবে তাদের ঊর্ধ্বে। সেদিন উপস্থিত করা হবে তোমাদের এবং তোমাদের কিছুই গোপন থাকবে না।'

সেদিন তাদের কী পরিণতি হবে যারা আল্লাহর হক যথাযথ আদায় করেনি, তার অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে লিপ্ত ছিল?

সেদিন তাদের অবস্থা হবে নিদারুণ করুণ। ভয়াল এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে তারা। তাদেরকে গ্রাস করবে কেয়ামত দিবসের বিভীষিকা। সে মহাপ্রলয়ের দিনে তাদের সূচনা হবে কবর থেকে উত্থিত হওয়ার মাধ্যমে। অতঃপর তাদের একত্রিত করা হবে। মাথার ওপর থাকবে জ্বলন্ত সূর্য। ঘাম ও পুঁজের সাগরে তারা হাবুডুবু খেতে থাকবে। এমতাবস্থায় তাদের প্রত্যেকের জীবনের হিসাব চাওয়া হবে। আল্লাহকে তখন পৃথিবীতে যাপিত প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে। এছাড়া এক কদমও কেউ নড়তে পারবে না। হে আল্লাহর বান্দা! বড় কঠিন সেই দিন। অতঃপর আমলনামা তাদের বাম হাতে দেওয়া হবে। আল্লাহর নিযুক্ত আজাবের ফেরেশতারা তাদের টেনে নেবে জাহান্নামের দিকে।

আমি আপনাদের জিজ্ঞেস করছি, আপনারা কি পবিত্র কুরআনে বর্ণিত কেয়ামত দিবসের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির বর্ণনা পড়েন? কুরআনের প্রতিটি পৃষ্ঠায় কি তা বারবার বর্ণিত হয়নি?

আল্লাহ তায়ালা কেয়ামত দিবসের বিভীষিকার কথা বর্ণনা করে বারবার মানুষকে সতর্ক করেছেন। তারা যেন ফিরে আসে মিথ্যা ছেড়ে সত্যের পথে। কুফর ছেড়ে ঈমানের পথে। মূর্খতা ছেড়ে জ্ঞানের পথে। অবাধ্যতা ছেড়ে আনুগত্যের পথে।।

যারা প্রকৃত মুমিন, আল্লাহকে ভয় করে, তারা সেদিনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। সেদিন যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে তাদের কোনো চিন্তা ও দুঃখবোধ নেই। আর যাদের আমলনামা দেওয়া হবে বাম হাতে তাদের দুর্ভোগ ও যন্ত্রণার অন্ত নেই।

ইরশাদ হয়েছে, ذَلِكَ يَوْمٌ مَجْمُوعُ لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمٌ مَشْهُودٌ * وَمَا نُؤَخِّرُهُ إِلَّا لِأَجَلٍ مَعْدُودٍ * يَوْمَ يَأْتِ لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَسَعِيدُ

'তা সেই দিন যেদিন সমস্ত মানুষকে একত্রিত করা হবে, তা সেই দিন যেদিন সকলকে উপস্থিত করা হবে। আমি নির্দিষ্ট কিছুকালের জন্য তা স্থগিত রাখি মাত্র। যখন সেদিন আসবে তখন আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ কথা বলতে পারবে না। তাদের মধ্যে কেউ হবে হতভাগ্য আর কেউ হবে সৌভাগ্যবান।'

কাফেররা কেয়ামত দিবস, পুনরুত্থান, হাশর ও হিসাব গ্রহণকে অস্বীকার করেছে।

ইরশাদ হয়েছে,

زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنْ لَنْ يُبْعَثُوا قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَثُنَّ ثُمَّ لَتُنَبَّؤُنَّ بِمَا عَمِلْتُمْ وَذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرُ

'কাফেররা ধারণা করে যে, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বলুন, নিশ্চয়ই হবে। আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদের সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। আর তা আল্লাহর পক্ষে সহজ।'

وَلِلَّهِ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ لِيَجْزِيَ الَّذِينَ أَسَاءُوا بِمَا عَمِلُوا وَيَجْزِيَ الَّذِينَ أَحْسَنُوا بِالْحُسْنَى

'আকাশমণ্ডলীতে যা কিছু আছে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা আল্লাহরই। যারা মন্দ কর্ম করে তাদের তিনি মন্দ প্রতিদান দেবেন এবং যারা সৎকর্ম করে তাদের তিনি দেবেন উত্তম পুরস্কার।'

يَوْمَ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ سِرَاعًا كَأَنَّهُمْ إِلَى نُصُبٍ يُوفِضُونَ . خَاشِعَةٌ أَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ ذَلِكَ الْيَوْمُ الَّذِي كَانُوا يُوعَدُونَ

'সেদিন তারা কবর থেকে বের হবে দ্রুতবেগে। মনে হবে তারা কোনো উপাসনালয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অবনত নেত্রে। হীনতা তাদের আচ্ছন্ন করবে। ইহাই সেই দিন যার বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছিলো।'

وَأَصْحَابُ الشِّمَالِ مَا أَصْحَابُ الشِّمَالِ فِي سَمُومٍ وَحَمِيمٍ وَظِلِّ مِنْ يَحْمُومٍ لَا بَارِدٍ وَلَا kَرِيمٍ إِنَّهُمْ كَانُوا قَبْلَ ذَلِكَ مُتْرَفِينَ وَكَانُوا يُصِرُّونَ عَلَى الْحِنْثِ الْعَظِيمِ وَكَانُوا يَقُولُونَ أَئِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا وَعِظَامًا أَئِنَّا لَمَبْعُوثُونَ أَوَآبَاؤُنَا الْأَوَّلُونَ قُلْ إِنَّ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ لَمَجْمُوعُونَ إِلَى مِيقَاتِ يَوْمٍ مَعْلُومٍ

'আর বামদিকের দল, কত হতভাগ্য বামদিকের দল! তারা থাকবে উষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে। কৃষ্ণবর্ণ ধূম্রের ছায়ায়। যা শীতল নয়, আরামদায়কও নয়। ইতিপূর্বে তারা তো মগ্ন ছিল ভোগ-বিলাসে। তারা অবিরাম লিপ্ত ছিল ঘোরতর পাপকর্মে। আর তারা বলত, মরে অস্থি ও মাটিতে পরিণত হলেও কি উত্থিত হবো আমরা? এবং আমাদের পূর্বপুরুষগণও? বলুন, অবশ্যই পূর্ববর্তীগণ ও পরবর্তীগণ-সকলকে একত্র করা হবে এক নির্ধারিত দিনের নির্দিষ্ট সময়ে। '

সেদিন কী পরিণতি হবে মানুষের? বিশেষত যারা আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে সদা ব্যস্ত তাদের?

ইরশাদ হয়েছে,

وَلَوْ تَرَى إِذِ الْمُجْرِمُونَ نَاكِسُوا رُءُوسِهِمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ رَبَّنَا أَبْصَرْنَا وَسَمِعْنَا فَارْجِعْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا إِنَّا مُوقِنُونَ

'হায়! যদি তুমি দেখতে, যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে নত মস্তকে বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম। এখন আপনি আমাদের পুনরায় প্রেরণ করুন। আমরা সৎকর্ম করব, আর আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।'

وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى رَبِّهِمْ قَالَ أَلَيْسَ هَذَا بِالْحَقِّ قَالُوا بَلَى وَرَبِّنَا

'তুমি যদি তাদের দেখতে পেতে যখন তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে তাদের দাঁড় করানো হবে এবং তিনি বলবেন, এ কি প্রকৃত সত্য নয়? তারা বলবে, আমাদের প্রতিপালকের শপথ! নিশ্চয়ই সত্য। তিনি বলবেন, তবে তোমরা যে কুফরি করতে তার জন্য তোমরা এখন শাস্তি ভোগ করো।'

কেয়ামতের দিন তারা সকলেই আফসোস ও আক্ষেপের সুরে বলবে, يَا لَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا نُكَذِّبَ بِآيَاتِ رَبِّنَا وَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ

'তারা বলবে, হায়! যদি আমাদের প্রত্যাবর্তন ঘটত তাহলে আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনকে অস্বীকার করতাম না এবং আমরা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।'

কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে একত্রিত করবেন। সমগ্র জগত সেদিন উলট-পালট হয়ে যাবে। মাটির ভেতরে যারা ছিল তারা উত্থিত হবে। পায়ের নিচে জমিন থাকবে কিন্তু এ জমিন চেনা যাবে না। মাথার উপর আসমান থাকবে কিন্তু তা ছায়া দেবে না। বিভীষিকাময় সেদিন মানুষের পরিণতি কী হবে তা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাই ভালো জানেন।

ইরশাদ হয়েছে, يَوْمَ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ سِرَاعًا كَأَنَّهُمْ إِلَى نُصُبٍ يُوفِضُونَ * خَاشِعَةٌ أَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ ذَلِكَ الْيَوْمُ الَّذِي كَانُوا يُوعَدُونَ

'সেদিন তারা কবর থেকে বের হবে দ্রুতবেগে। মনে হবে তারা কোনো উপাসনালয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অবনত নেত্রে। হীনতা তাদের আচ্ছন্ন করবে। এটাই সেই দিন যার বিষয়ে তাদের সতর্ক করা হয়েছিল।'

يَوْمَ يَكُونُ النَّاسُ كَالْفَرَاشِ الْمَبْثُوثِ وَتَكُونُ الْجِبَالُ كَالْعِهْنِ الْمَنفُوشِ

'সেদিন মানুষ বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের ন্যায় হবে। পর্বতসমূহ হবে ধুনিত রঙিন পশমের ন্যায়। '

আল্লাহ তায়ালা মহাপ্রলয়কে 'কারিআ' বলে নামকরণ করেছেন। 'কারিআ' অর্থ হলো সজোরে আঘাত করা। মহাপ্রলয় যেহেতু কান ও অন্তঃকরণে সজোরে আঘাত করবে তাই কেয়ামতকে 'কারিআ' বলে নামকরণ করা হয়েছে।

পাহাড়ের অবস্থা যদি হয় ধুনিত পশমের ন্যায় তাহলে আমাদের অবস্থা হবে কেমন? আল্লাহ তায়ালা মানুষের অবস্থা কেমন হবে তার বর্ণনা দিয়ে বলেন, يَوْمَ يَكُونُ النَّاسُ كَالْفَرَاشِ الْمَبْثُوثِ 'সেদিন মানুষ বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের ন্যায় হবে। '

إِذَا دُكَّتِ الأَرْضُ دَكَّا دَكَّا * وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا 'যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে। যখন তোমরা প্রতিপালক উপস্থিত হবেন এবং ফেরেশতাগণও উপস্থিত হবেন সারিবদ্ধভাবে। '

যখন শিঙ্গার ফুৎকার বেজে উঠবে তখন সমস্ত মৃত মানুষ কবর থেকে জেগে উঠবে। তাদের ওপর থেকে মাটির স্তুপ সরে যাবে। এবং তারা বলতে থাকবে,

قَالُوا يَا وَيْلَنَا مَنْ بَعَثَنَا مِنْ مَرْقَدِنَا هَذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ * إِنْ كَانَتْ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً فَإِذَا هُمْ جَمِيعٌ لَدَيْنَا مُحْضَرُونَ

'তারা বলবে, হায়! দুর্ভোগ আমাদের, কে আমাদেরকে আমাদের নিদ্রাস্থল থেকে উত্থিত করল? দয়াময় আল্লাহ তো তারই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং রাসুলগণ সত্যই বলেছিলেন। তা কেবল এক মহা চিৎকার; তখনই তাদের সকলকে উপস্থিত করা হবে আমার সম্মুখে।'

কেয়ামত দিবসকে আল্লাহ তায়ালা 'ইয়াওমুত তালাক' তথা পারস্পরিক সাক্ষাতের দিবস বলে নামকরণ করেছেন। কেননা, এই দিন হযরত আদম আলাইহিস সালাম তার সকল বংশধরদের সাথে সাক্ষাৎ করবেন। দুনিয়াবাসী আসমানবাসীর সাথে সাক্ষাৎ করবে। জালিমের সাথে মাজলুমের সাক্ষাৎ হবে।

কেয়ামত দিবসকে আল্লাহ তায়ালা 'ইয়াওমুল জামই' তথা একত্রিত করণের দিন বলেও নামকরণ করেছেন। কেননা, এই দিন আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে একত্রিত করবেন।

পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে আল্লাহ তায়ালা কেয়ামত দিবসের আলোচনা করেছেন। পরতে পরতে, ছত্রে ছত্রে আলোচিত হয়েছে মহাপ্রলয় ও কেয়ামতের আলোচনা। এ আলোচনা অন্তরসমূহকে জীবিত করে। ঘুমন্ত সত্তাকে জাগ্রত করে। মানুষকে অবাধ্যতা থেকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে ফিরিয়ে আনে।

শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার পর যখন কবর থেকে উত্থিত হয়ে হাশরের মাঠের দিকে দৌড়াতে থাকবে। তাদের অবস্থা হবে এমন, যেন মায়ের উদর থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ হয়েছে। তাদের শরীরে কোনো কাপড় থাকবে না। পায়ে থাকবে না জুতা। ছন্নছাড়া হয়ে ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি বলে ক্রমাগত দৌড়াতে থাকবে।

ইরশাদ হয়েছে,

وَلَقَدْ جِئْتُمُونَا فُرَادَى كَمَا خَلَقْنَاكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ

'তোমরা তো আমার নিকট নিঃসঙ্গ অবস্থায় এসেছ, যেমন আমি প্রথমে তোমাদের সৃষ্টি করেছিলাম।'

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বললেন, কেয়ামতের দিন মানুষেরা কবর থেকে উত্থিত হয়ে উলঙ্গ হয়ে খালি পায়ে দৌড়াতে থাকবে, তখন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলেন, কেয়ামতের দিন নারী-পুরুষ সকলেই উলঙ্গ হবে? তারা কি একে অপরের দিকে তাকাবে? প্রত্যুত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন হে আয়েশা! কেয়ামতের দিন হবে এতই কঠিন ও বিপদময় যে, মানুষের মনে একে অপরের প্রতি তাকাবারও খেয়াল থাকবে না।'

কেয়ামতের দিবস হলো পলায়নের দিন। সেদিন একে অপরের থেকে পলায়ন করবে।

ইরশাদ হয়েছে, يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ * وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ * وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ * لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنُ يُغْنِيهِ 'সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাই থেকে, তার মা থেকে, তার পিতা থেকে, তার পত্নী ও তার সন্তান থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকের এমন গুরুতর অবস্থা হবে যা তাদের সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে।'

টিকাঃ
৬৩. সুরা যুমার: ৬৭-৬৮।
৬৪. সুরা হাক্কাহ: ১৩-১৮।
৬৫. সুরা হুদ: ১০৩-১০৫।
৬৬. সুরা তাগাবুন: ৭।
৬৭. সুরা নাজম: ৩১।
৬৮. সুরা মাআরিজ: ৪৩-৪৪।
৬৯. সুরা ওয়াকিআ: ৪১-৫১।
৭০. সুরা সাজদাহ: ১২।
৭১. সুরা আনআম: ৩০।
৭২. সুরা আনআম: ২৭।
৭৩. সুরা মাআরিজ: ৪৩-৪৪।
৭৪. সুরা কারিআ: ৪-৫।
৭৫. সুরা কারিআ: ৪।
৭৬. সুরা ফাজর: ২১-২২।
৭৭. সুরা ইয়াসিন: ৫২-৫৩।
৭৮. সুরা আনআম: ৯৪।
৭৯. সুরা আবাসা: ৩৪-৩৭।

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 কেয়ামত দিবসে মানুষের পরিণতি

📄 কেয়ামত দিবসে মানুষের পরিণতি


কেয়ামত দিবসে মানুষের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। সেদিন তাদের অন্তরে ভীষণ কম্পন সৃষ্টি হবে। চক্ষু হবে ভীতসন্ত্রস্ত। তারা কেউ জানবে না সেদিন তাদের সাথে কেমন আচরণ করা হবে। হাশরের মাঠ এত ভয়ানক ও বিভীষিকাময় হবে যে, দাঁড়িয়ে থাকা বড্ড কঠিন হবে। সূর্যকে এনে দেওয়া হবে তাদের মাথার ওপর।

হে আল্লাহর বান্দা! সূর্যকে যখন আল্লাহ তায়ালা মাথার ওপর নামিয়ে দেবেন সেদিন কেমন হবে মানুষের পরিণতি? সেদিন তখন তারা কোথায় পলায়ন করবে?

জেনে রাখো! সেদিন পলায়নের কোনো জায়গা থাকবে না। মানুষের ঘামে ভরে যাবে হাশরের মাঠ। সেদিন প্রত্যেকে তার আমল অনুযায়ী নিজ নিজ ঘামে হাবুডুবু খেতে থাকবে। কারো আমলনামা অনুযায়ী তার ঘام হবে টাখনু পরিমাণ। কারো হবে কোমর পরিমাণ। আবার কারো হবে গলা পরিমাণ। আল্লাহর শপথ! সেদিন মানুষের পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এক নিদারুণ বিভীষিকা তাদের গ্রাস করে নেবে। সেদিন কেউ পলায়ন করতে পারবে না। আল্লাহর শপথ! কেউ না।

কেয়ামত দিবসে মানুষের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। সেদিন তাদের অন্তরে ভীষণ কম্পন সৃষ্টি হবে। চক্ষু হবে ভীতসন্ত্রস্ত। তারা কেউ জানবে না সেদিন তাদের সাথে কেমন আচরণ করা হবে। হাশরের মাঠ এত ভয়ানক ও বিভীষিকাময় হবে যে, দাঁড়িয়ে থাকা বড্ড কঠিন হবে। সূর্যকে এনে দেওয়া হবে তাদের মাথার ওপর।

হে আল্লাহর বান্দা! সূর্যকে যখন আল্লাহ তায়ালা মাথার ওপর নামিয়ে দেবেন সেদিন কেমন হবে মানুষের পরিণতি? সেদিন তখন তারা কোথায় পলায়ন করবে?

জেনে রাখো! সেদিন পলায়নের কোনো জায়গা থাকবে না। মানুষের ঘামে ভরে যাবে হাশরের মাঠ। সেদিন প্রত্যেকে তার আমল অনুযায়ী নিজ নিজ ঘামে হাবুডুবু খেতে থাকবে। কারো আমলনামা অনুযায়ী তার ঘام হবে টাখনু পরিমাণ। কারো হবে কোমর পরিমাণ। আবার কারো হবে গলা পরিমাণ। আল্লাহর শপথ! সেদিন মানুষের পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এক নিদারুণ বিভীষিকা তাদের গ্রাস করে নেবে। সেদিন কেউ পলায়ন করতে পারবে না। আল্লাহর শপথ! কেউ না।

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 হাশরের ময়দানে সুপারিশ

📄 হাশরের ময়দানে সুপারিশ


হাশরের বিভীষিকাময় প্রান্তরে যখন একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ হবে তখন তারা বলতে থাকবে আমরা তো একদিন এখানে ছিলাম না। হায়! আমরা তো আজ নিদারুণ চিন্তা ও পেরেশানিতে পতিত হয়েছি। কে আজ আমাদের উদ্ধার করবে নিদারুণ এ পরিণতি থেকে? কে আজ আমাদের জন্য সুপারিশ করবে রবের নিকট?

হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, বিবাহের এক ওলিমায় আমরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। আমি নবীজির অত্যন্ত নিকটবর্তী হলাম। তখন তিনি বললেন, কেয়ামতের দিন আমি আদম সন্তানদের সর্দার হবো। তোমরা কি জানো তা কেন? সেদিন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে একত্রিত করা হবে। কারো প্রতি সামান্যতম প্রতারণা করা হবে না। সকলকে যখন একটি জায়গায় একত্রিত করা হবে তখন সূর্যকে তাদের মাথার এক মাইল ওপরে রেখে দেওয়া হবে। সেদিন লোকেরা তাদের ঘামে হাবুডুবু খেতে থাকবে।'

সে দিনটি এতই ভয়াবহ হবে যে, কেউ একটি কথা পর্যন্ত বলতে পারবে না। তবে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যাকে অনুমতি দেবেন কেবল সেই কথা বলতে পারবে। ইরশাদ হয়েছে,

إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا

'দয়াময় যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথা তিনি পছন্দ করবেন সে ব্যতীত কারো সুপারিশ সেদিন কোনো কাজে আসবে না।'

গভীরভাবে চিন্তা করো সে দিন সম্পর্কে। কেমন হবে সেদিনের ভয়ানক অবস্থা! আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনের স্থানে স্থানে এর আলোচনা করেছেন যেন ফিরে আসে মানুষ অবাধ্যতা থেকে। ইরশাদ হয়েছে,

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْجِبَالِ فَقُلْ يَنْسِفُهَا رَبِّي نَسْفًا فَيَذَرُهَا قَاعًا صَفْصَفًا لَا تَرَى فِيهَا عِوَجًا وَلَا أَمْنًا يَوْمَئِذٍ يَتَّبِعُونَ الدَّاعِيَ لَا عِوَجَ لَهُ ، وَخَشَعَتِ الْأَصْوَاتُ لِلرَّحْمَنِ فَلَا تَسْمَعُ إِلَّا هَمْسًا يَوْمَئِذٍ لَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِهِ عِلْمًا وَعَنَتِ الْوُجُوهُ لِلْحَيِّ الْقَيُّومِ ، وَقَدْ خَابَ مَنْ حَمَلَ ظُلْمًا

'তারা আপনাকে পর্বতসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলুন, আমার প্রতিপালক তাদের সমূলে উৎপাটন করে বিক্ষিপ্ত করে দেবেন। অতঃপর তিনি তাকে পরিণত করবেন মসৃণ সমতল ময়দানে। যেখানে তুমি বক্রতা ও উচ্চতা দেখবে না। সেদিন তারা আহ্বানকারীর অনুসরণ করবে। এ ব্যাপারে এদিক-ওদিক করতে পারবে না। দয়াময়ের সম্মুখে সকল শব্দ স্তব্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং মৃদু পদধ্বনি ব্যতীত তুমি কিছুই শুনবে না। দয়াময় যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথা তিনি পছন্দ করবেন সে ব্যতীত আর কারো সুপারিশ সেদিন কোনো কাজে আসবে না। তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে সে সম্পর্কে তিনি অবগত। কিন্তু তারা জ্ঞান দ্বারা তাকে আয়ত্ব করতে পারে না। চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারকের নিকট সকলেই হবে মস্তকাবনত এবং সেই ব্যর্থ হবে যে জুলুমের ভার বহন করবে।'

হাশরের ভয়াল দিনে তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলবে কে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে? কে আজ আমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করবে? হায়! আজ তো সকলে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। কেউ কি নেই যিনি আমাদের জন্য এগিয়ে আসবেন। অতঃপর তারা বলবে, চলো যাই হযরত আদম আলাইহিস সালামের নিকট। এসে বলবে, হে আদম! আপনি মানুষের পিতা। আল্লাহ আপনাকে নিজ কুদরতি হাতে সৃষ্টি করেছেন। আপনার মাঝে তিনি প্রাণের সঞ্চার করেছেন এবং আপনাকে বানিয়েছেন জান্নাতের অধিবাসী। হে আমাদের পিতা আদম! আপনি কি দেখছেন না আজ আমরা কী নিদারুণ কঠিন অবস্থায় পতিত হয়েছি? আপনি কি আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবেন না?

তাদের কথা শুনে হযরত আদম আলাইহিস সালাম বলবেন,

إني ربي غضب اليوم غضباً لم يغضب قبله مثله، ولن يغضب بعده مثله، وإني نهيت عن تلكم الشجرة فعصيت، نفسي نفسي نفسي، اذهبوا إلى نوح

'আজ আমার রব ভীষণ রেগে আছেন; ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, এবং আজকের পরেও কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আল্লাহ আমাকে নিষেধ করেছিলেন বৃক্ষের নিকটবর্তী হতে। কিন্তু আমি তার অবাধ্যতা করেছি। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা নুহ এর নিকট যাও।'

হযতর আদম আলাইহিস সালামের নিকট থেকে অতঃপর তারা যাবে হযরত নুহ আলাইহিস সালামের নিকট। তাকে বলবে, 'হে নুহ! আপনি পৃথিবীতে প্রথম রাসুল। আল্লাহ আপনার নাম রেখেছেন কৃতজ্ঞশীল বান্দা বলে। আপনি কি দেখছেন না আমরা আজ কী অবস্থার সম্মুখীন হয়েছি? আপনি কি আজ আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' তাদের কথা শুনে হযরত নুহ আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন। ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, এবং আজকের পরেও কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। তাছাড়া আমার দাওয়াত ছিল কেবল আমার সম্প্রদায়ের জন্য। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা ইবরাহিমের নিকট যাও।'

অতঃপর তারা দৌড়ে যাবে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের নিকট। বলবে, হে ইবরাহিম! আপনি আল্লাহর নবী এবং তার খলিল। আপনি কি দেখছেন না আমাদের পরিণতি? আপনি কি আজ আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' তাদের কথা শুনে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন। ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, আজকের পরেও কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আমি কীভাবে তোমাদের জন্য সুপারিশ করব। আমি মোট তিনবার মিথ্যা বলেছি। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা মুসার নিকট যাও।'

এবার তারা দৌড়ে যাবে হযরত মুসা আলাইহিস সালামের নিকট। বলবে, 'আপনি আল্লাহর নবী এবং তার কালিম। আপনি কি দেখছেন না আমাদের করুণ পরিণতি? আজ আপনি কি আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' তাদের কথা শুনে হযরত মুসা আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন। ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, এবং আজকের পরে আর কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আমি কীভাবে তোমাদের জন্য সুপারিশ করব, আমি তো একজনকে হত্যা করেছি। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা ইসার নিকট যাও।'

এবার তারা দৌড়াতে থাকবে হযরত ইসা আলাইসি সালামের নিকট। তার তাকে বলবে, আপনি আল্লাহর নবী এবং তার বাণী। আল্লাহ আপনাকে মারইয়ামের গর্ভে প্রেরণ করেছেন এবং তিনি আপনার মাঝে রুহ সঞ্চার করেছেন। আপনি কি দেখছেন আমাদের করুণ পরিণতি? আজ কি আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' হযরত ইসা আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন; ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি এবং আজকের পর আর কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা কি জানো সেদিন যারা নাফসি! নাফসি! নাফসি! করবে তারা কারা? তারা হলেন প্রথম সারির নবী-রাসুল! সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে তারা ছিলেন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নিকট অত্যন্ত প্রিয় ও আস্থাভাজন। যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয়, তাকওয়া ছিল সর্বাধিক। তাদের যদি এমন পরিণতি হয় হে আল্লাহর বান্দা! তাহলে আমার ও আপনার জন্য কেমন পরিণতি অপেক্ষা করছে? আর ওইসমস্ত লোকদেরই বা কী পরিণতি হবে যারা আল্লাহর অবাধ্যতা নাফরমানিতে সদা লিপ্ত। যারা আল্লাহর হক ও মর্যাদা যথাযথ আদায় করে না?

সর্বশেষ হযরত ইসা আলাইহিস সালাম বলবেন, তোমরা মুহাম্মদের নিকট যাও। হৃদয়ে তারা অপরিসীম আশা ও ভরসা নিয়ে দৌড়ে যাবে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের নিকট। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বলবে, হে মুহাম্মদ! আপনি আল্লাহর নবী, সর্বশেষ নবী। আল্লাহ আপনার পূর্বাপর সকল গুনাহক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি কি দেখছেন না আমাদের পরিণতি? আজ আপনি কি আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না? তখন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরশের দিকে দৌড়াতে থাকবেন। অন্য বর্ণনায় আছে, নবী তখন থাকবেন সেজদাবনত। আল্লাহ তায়ালা সেদিন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এত অধিক প্রশংসা করবেন, যে প্রশংসা তিনি ইতিপূর্বে কখনো করেননি। আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবিবের এ দৃশ্য দেখে সহ্য করবেন না। তখন আল্লাহ বলবেন, হে মুহাম্মদ! আপনি আপনার মাথা উত্তোলন করুন এবং সুপারিশ করুন। নবীজি সুপারিশ করবেন। বলবেন,

يَا رَبِّ أُمَّتِي، يَا رَبِّ أُمَّتِي 'হে রব! আমার উম্মত, হে রব! আমার উম্মত।'

হে আল্লাহর বান্দা! সেদিন সকল নবী-রাসুল যখন নাফসি! নাফসি! করতে থাকবে, একমাত্র আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতি উম্মতি বলে চিৎকার করবেন। সেদিন যখন নবী-রাসুল যখন নিজেদের পরিণতির কথা ভেবে চিন্তিত থাকবেন, একমাত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিজের কথা ভুলে আমাদের জন্য উম্মতি উম্মতি বলে চিৎকার করবেন। আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা করবেন। আমাদের মুক্তি ও নাজাতের জন্য সুপারিশ করবেন।

হায়! আজ কোথায় আমরা? কোথায় উম্মতে মুহাম্মদি? কেয়ামতের দিন যে নবী তার নিজের কথা ভুলে উম্মত উম্মত করবেন, আজ সে উম্মত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভুলে আছে। তার দ্বীনকে সাহায্য করছে না। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করছে না। আফসোস, শত আফসোস, সে নবীর উম্মত আজ জিহাদের রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। হাশরের বিভীষিকাময় ভয়াবহ দিবসে যে নবী তার উম্মতের জন্য পাগলপ্রায় হয়ে যাবেন, তাদের জন্য সুপারিশ করবেন, সে উম্মত আজ তার অনুসরণ থেকে দূরে সরে আছে। যে দ্বীন তিনি তাদের নিকট রেখে গেছেন তারা সে দ্বীনের অমর্যাদা করছে। দ্বীনকে পরাজিত হতে দেখে তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় না। পৃথিবীতে তার দ্বীনকে বিজয় ও সমুন্নত করার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করছে না। হায়! উম্মত আজ জিহাদকে ভুলে গেছে। তরবারির ছায়া থেকে পালিয়ে আজ তারা আশ্রয় নিচ্ছে গোলামি ও দাসত্বের ছায়ায়। হায় আফসোস! যদি বুঝত উম্মত তাদের কর্তব্য।

তুমি কি মনে করছ, হাশরের দিবস এখানেই সমাপ্ত? না, তা নয়। সবে তো সূচনা হয়েছে। সেদিন মানুষ এক কঠিন অবস্থা থেকে আরেক কঠিন অবস্থায় রূপান্তরিত হবে। অবশেষে আসবে সে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। আল্লাহ তায়ালা হিসাব গ্রহণের অনুমতি প্রদান করবেন। তখন সকলে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাদের চোখে-মুখে ফুটে উঠবে ভয় ও দুশ্চিন্তার কালো রেখা।

ইরশাদ হয়েছে, وَعُرِضُوا عَلَىٰ رَبِّكَ صَفًّا لَّقَدْ جِئْتُمُونَا كَمَا خَلَقْتُكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ بَلْ زَعَمْتُمْ أَلَّن نَّجْعَلَ لَكُم مَّوْعِدًا

'এবং তাদেরকে আপনার প্রতিপালকের নিকট সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত করে বলা হবে, তোমাদের প্রথমবার যেভাবে সৃষ্টি করেছিলাম সেভাবেই তোমরা আমার নিকট উপস্থিত হয়েছ। অথচ তোমরা মনে করতে যে, তোমাদের জন্য প্রতিশ্রুত ক্ষণ আমি কখনো উপস্থিত করব না।'

সকলে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাদের মাথা থাকবে অবনত। ভয়ে তাদের চক্ষু বিস্ফারিত হতে থাকবে। একে একে সকলের আমলনামা পেশ করা হবে। মিযানে সকলের আমলনামা পরিমাপ করা হবে। মানুষ সেদিন একটি নেক আমলের জন্য পাগলের মতো দৌড়াতে থাকবে। কোথাও যদি একটি নেক আমল পাওয়া যায়! কিন্তু কেউ কারো দিকে একটি বার ফিরে তাকাবে না। সকলে সেদিন সকলের থেকে পলায়ন করবে। একটি আমল কেউ কাউকে দেবে না। জেনে রাখো! সেদিন মা তার সন্তানকে বলবে, 'আমি তোমাকে নয় নয় মাস গর্ভে ধারণ করেছি। তোমার জন্য আমি ত্যাগ স্বীকার করেছি। হে আমার প্রাণাধিক প্রিয় সন্তান! আজ তুমি আমাকে একটি নেক আমল দাও। এমনিভাবে পিতা তার সন্তানকে বলবে। কিন্তু কেউ কারো ডাকে সাড়া দেবে না। সকলেই বলবে, নাফসি! নাফসি! নাফসি!

হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেন, 'মানুষ কি সেদিন তার পরিবার-পরিজনকে চিনতে পারবে?'

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'হ্যাঁ, সেদিন তারা একে অপরকে চিনতে পারবে। আর তিনটি সময় এমন রয়েছে যখন মানুষ তার পরিণতির কথা জানতে পারবে না। (এক) যখন তাদের আমলনামা প্রকাশ করা হবে, তখন জানবে না যে, আমলনামা কোথায় দেওয়া হবে। ডান হাতে নাকি বাম হাতে। (দুই) যখন আমলনামা পরিমাপ করার জন্য মিজানে রাখা হবে, তখন জানবে না নেক আমল অধিক হবে নাকি মন্দ আমল। (তিন) যখন পুলসিরাত অতিক্রম করবে তখন জানবে না, সে কি তা অতিক্রম করতে পারবে নাকি ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।'

হাশরের ভয়াবহ সেই কাল এক বা দুই দিন নয়, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর। এই সুদীর্ঘকাল মানুষ সেখানে একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকবে। মাথার ওপর থাকবে জ্বলন্ত সূর্য। আল্লাহু আকবার! সেদিন কী অবস্থা হবে আমাদের? কী অবস্থা হবে আমার আপনার? হে আল্লাহর বান্দা! একটি বার জিজ্ঞেস করো নিজেকে। সেদিনের জন্য তোমার প্রস্তুতি কেমন? ইরশাদ হয়েছে,

سَأَلَ سَائِلُ بِعَذَابٍ وَاقِعِ * لِلْكَافِرِينَ لَيْسَ لَهُ دَافِعُ * مِنَ اللَّهِ ذِي الْمَعَارِجِ * تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ

'এক প্রশ্নকারী শান্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করল, যা নেমে আসবে কাফেরদের ওপর, যাকে কেউ প্রতিহত করতে পারবে না। (যা আসবে ঊর্ধ্বারোহণের) সিঁড়ির অধিকারী আল্লাহর পক্ষ থেকে। তার (আরশের) দিকে ফেরেশতারা ও (পবিত্র) আত্মা (জিবরাইল) আরোহণ করে থাকে। (কাফেরদের ওপর ওই শান্তি নেমে আসবে) এমন একদিন যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। '

সুদীর্ঘ সেই পঞ্চাশ হাজার বছর তারা কিছুই খাবে না, পান করবে না। এমনকি কথাও পর্যন্ত বলবে না। তাদের অন্তর কাঁপতে থাকবে। তাদের চক্ষু বের হয়ে আসার উপক্রম হবে। কী হবে সেদিন আমার ও আপনার পরিণতি? আর তাদেরই-বা কেমন পরিণতি হবে যারা আল্লাহর অবাধ্যতা করে। তার হক ও সম্মান যথাযথ আদায় করে না।

কিন্তু সেই কঠিনতর দিনেও আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সাত প্রকার ব্যক্তিকে আরশের ছায়ার নিচে আশ্রয় দেবেন। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাদের জন্য এটি হবে বিশেষ পুরস্কারস্বরূপ। সেদিন আরশের ছায়া ব্যতীত গোটা হাশরের ময়দানে আর কোনো ছায়া থাকবে না। আর সূর্য থাকবে মাথার উপরে।

খুব গভীরভাবে চিন্তা করো দেখো, তুমি কি সেই সাত প্রকার ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত?

হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, 'তুমি কীভাবে পঞ্চাশ হাজার বছর নিজ পায়ে সেদিন দাঁড়িয়ে থাকবে? সেদিন তারা খাবে না, পান করবে না এবং কথাও বলবে না। কেমন পরিণতি হবে যখন সত্তর হাজার বেড়ি পরিহিত জাহান্নামকে টেনে আনা হবে। যার প্রতিটি বেড়ির সাথে থাকবে অনুরূপ সত্তর হাজার ফেরেশতা?

إِذَا رَأَتْهُم مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُّظًا وَزَفِيرًا

'দূর থেকে আগুন যখন তাদের দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে আগুনের ক্রুদ্ধ গর্জন ও চিৎকার।'

'যখন তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা জাহান্নামের বিকট শব্দ শুনবে আর তা হবে উদ্বেলিত। রোষে জাহান্নام যেন ফেটে পড়বে। যখনই তাতে কোনো দলকে নিক্ষেপ করা হবে তাদেরকে রক্ষীরা জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের নিকট কি কোনো সতর্ককারী আসেনি?'

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের ভয়াবহ সে কেয়ামত দিবসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে আদেশ করেছেন। তিনি আমাদের তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন। তার আনুগত্য করতে বলেছেন।

ইরশাদ হয়েছে, يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمُ يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدُ

‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। নিশ্চয় কেয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী ভুলে যাবে তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখবে নেশাগ্রস্ত; যদিও তারা প্রকৃতার্থে নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুত আল্লাহর শাস্তি কঠিন।’

সেদিন আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব গ্রহণ করবেন। সেদিন কারো প্রতি ন্যূনতম জুলুম করা হবে না। প্রত্যেকে সেদিন তাই পাবে যা সে দুনিয়াতে অর্জন করেছে। ইরশাদ হয়েছে,

لَا ظُلْمَ الْيَوْمَ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ

‘আজ কারো প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’

কেয়ামতের বিভীষিকা ও ভয়াবহ বর্ণনা করতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,

إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا * وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا * وَقَالَ الإِنسَانُ مَالَهَا * يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا * بِأَنَّ رَبَّكَ أَوْحَى لَهَا يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ * فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ

‘পৃথিবী যখন প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে এবং পৃথিবী যখন তার ভার বের করে দেবে, মানুষ বলবে—তার কী হলো? সেদিন পৃথিবী তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে। কারণ তোমার প্রতিপালক তাকে আদেশ করবেন। সেদিন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দলে বের হবে, যেনো তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম দেখানো যায়। কেউ যদি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করে তাহলে সে তা দেখবে, আর যদি অণু পরিমাণ অসৎকর্ম দেখে সে তাও দেখবে। '

চিন্তা করো তখন তোমার কেমন পরিণতি হবে যখন বলা হবে, হে অমুকের ছেলে অমুক! তোমার আমলনামা পেশ করো? কেমন পরিণতি অপেক্ষা করছে সেদিন, যেদিন তোমার নাম ধরে ডেকে বলা হবে, দাও তোমার জীবনের হিসাব দাও, প্রতিটি সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দাও?

দুনিয়ার কোনো রাজা-বাদশাহ যখন তোমার সামনে উপস্থিত থাকে তখন তোমার অন্তর কাঁপতে থাকে। ভয়ে তোমার মুখ দিয়ে কথা পর্যন্ত বের হয় না। তাহলে সেদিন কী ভয়াবহ অবস্থা হবে যেদিন তোমার সামনে দণ্ডায়মান থাকবেন রাজাধিরাজ; যার হাতে সেদিন ভাঁজ করা থাকবে সমগ্র আসমান ও জমিন? ইরশাদ হয়েছে,

يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيَّ السِّجِلِّ لِلْكُتُبِ كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ

'সেদিন আকাশমণ্ডলীকে গুটিয়ে ফেলব, যেভাবে গুটানো হয় লিখিত কাগজ। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। প্রতিশ্রুতি পালন আমার কর্তব্য, আমি তা পালন করবই। '

বিচারগ্রহণের সময় সমস্ত ফেরেশতা ও মানুষ তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারা অপেক্ষারত থাকবে তোমার পরিণতি প্রত্যক্ষ করার জন্য। কিন্তু তুমি জানো না, তোমার সাথে কেমন আচরণ করা হবে। তুমি জানো না বিচার গ্রহণের পর তোমার অবস্থান হবে কোথায়।

যাদের অন্তরে তাকওয়া রয়েছে। পৃথিবীতে আল্লাহর আনুগত্য করেছে পূর্ণরূপে। যারা আল্লাহর সমস্ত হক ও তার সম্মান যথাযথ রক্ষা করেছে সেদিন তাদের পরিণতি কেমন হবে, এ সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা যখন তাকে হিসাব গ্রহণের জন্য আহ্বান করবেন। তখন একটি পর্দা দিয়ে তাকে ঢেকে নেবেন। তারপর পর্দাবৃত অবস্থায় তার হিসেব গ্রহণ করবেন। বান্দা তখন আল্লাহর সম্মুখে তার সকল অপরাধ স্বীকার করবে। দুনিয়াতে যা যা করেছে তা পরিপূর্ণরূপে তুলে ধরবে। অতঃপর বান্দা যখন ধারণা করবে, সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে তখন বলবে, 'আমার আল্লাহ সবচেয়ে দয়ালু।' তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, 'আমি দুনিয়াতে তোমার সকল দোষ-ত্রুটি গোপন রেখেছি, আজও আমি তা গোপন রাখব। অতঃপর আল্লাহ তার আমলনামা তার ডান হাতে দেবেন। সে হাসতে হাসতে আনন্দচিত্তে বের হয়ে আসবে। তখন সে উপস্থিত সকলকে লক্ষ্য করে সুউচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা দেবে,

هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهُ * إِنِّي ظَنَنتُ أَنِّي مُلَاقٍ حِسَابِيهِ فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَاضِيَةٍ * فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٍ

'নাও, আমার আমলনামা পড়ে দেখো। নিশ্চয়ই আমি জানতাম যে, আমাকে আমার হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং সে যাপন করবে সন্তোষজনক জীবন। সুউচ্চ জান্নাতে। '

পক্ষান্তরে যারা আল্লাহকে ভয় করে না। তার অবাধ্যতা ও নাফরমানি করে। অন্যায় পাপাচারে ডুবে থাকে। আল্লাহর যাবতীয় হক ও সম্মান যথাযথ আদায় করে না, তারা যখন হিসাব দেবে তখন ফেরেশতা ও মানুষ সকলে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারা যখন নিজেদের কৃতকর্মের হিসাব দেবে সকলে তা শুনবে। আল্লাহ তখন তাদের বলবেন, 'দুনিয়াতে যখন আমার অবাধ্যতা করেছিলে তখন কি লজ্জিত হওনি, তবে আজ কেন সকলের সম্মুখে কৃত অন্যায় ও পাপের স্বীকারোক্তি দিতে লজ্জিত হচ্ছ?

তখন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার ফেরেশতাদের ডেকে বলবেন, 'হে আমার ফেরেশতাগণ! তাকে বড় শক্তভাবে পাকড়াও করো। তাকে আমার আজাবে নিক্ষেপ করো। মর্মন্তুদ শাস্তি আস্বাদন করাও।

তাদের আমলনামা তাদের বাম হাতে দেওয়া হবে। আক্ষেপ, অনুশোচনায় তারা নিজেদের নত করে রাখবে। বলতে থাকবে,

يَا لَيْتَنِي لَمْ أُوتَ كِتَابِيَهْ وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهْ يَا لَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةَ مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَهُ هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهُ

'হায়! আমাকে যদি আমার আমলনামা না দেওয়া হতো। আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব। হায়! আমার মৃত্যুই যদি আমার শেষ হতো। আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো কাজেই এলো না। আমার ক্ষমতাও বিনষ্ট হয়ে গেছে।'

রাজাধিরাজ মহাশক্তিধর আমার প্রভু সেদিন তার ফেরেশতাদের ডেকে বলবেন,

خُذُوهُ فَغُلُّوهُ ثُمَّ الْجَحِيمَ صَلُّوهُ ثُمَّ فِي سِلْسِلَةٍ ذَرْعُهَا سَبْعُونَ ذِرَاعًا فَاسْلُكُوهُ إِنَّهُ كَانَ لَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ فَلَيْسَ لَهُ الْيَوْمَ هَاهُنَا حَمِيمٌ وَلَا طَعَامُ إِلَّا مِنْ غِسْلِينٍ لَا يَأْكُلُهُ إِلَّا الْخَاطِئُونَ

'তোমরা পাকড়াও করো তাকে। অতঃপর তার গলদেশে বেড়ি পরিয়ে দাও। তারপর তাকে নিক্ষেপ করো জাহান্নামে। তারপর তাকে সত্তর হাত লম্বা একটি শিকলে বাঁধ। সে তো মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিল না। অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে উৎসাহিত করতো না। অতএব আজকের দিনে তার কোনো বন্ধু থাকবে না। থাকবে না কোনো খাদ্য, তবে রয়েছে ক্ষতনিঃসৃত পুঁজ। যা অপরাধী ব্যতীত কেউ ভক্ষণ করে না।'

টিকাঃ
৮০. সুরা তহা: ১০৯।
৮১. সুরা তহা: ১০৫-১১১।
৮২. সুরা কাহফ: ৪৮।
৮৩. সুরা মাআরিজ: ১-৪।
৮৪. সুরা ফুরকান: ১২।
৮৫. সুরা হজ: ১-২।
৮৬. সুরা গাফের: ১৭।
৮৭. সুরা যিলযাল: ১-৮।
৮৮. এককালে দলিল-দস্তাবেজ, ফরমান ইত্যাদি গুটিয়ে রাখা হতো। এখানে এইভাবে কাগজপত্র গুটানোর সঙ্গে আকাশমণ্ডলীকে গুটিয়ে ফেলার তুলনা করা হয়েছে।
৮৯. সুরা আম্বিয়া: ১০৪।
৯০. সুরা হাক্কা: ১৯-২২।
৯১. সুরা হাক্কা: ২৫-২৯।
৯২. সুরা হাক্কা: ৩০-৩৭।

হাশরের বিভীষিকাময় প্রান্তরে যখন একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ হবে তখন তারা বলতে থাকবে আমরা তো একদিন এখানে ছিলাম না। হায়! আমরা তো আজ নিদারুণ চিন্তা ও পেরেশানিতে পতিত হয়েছি। কে আজ আমাদের উদ্ধার করবে নিদারুণ এ পরিণতি থেকে? কে আজ আমাদের জন্য সুপারিশ করবে রবের নিকট?

হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, বিবাহের এক ওলিমায় আমরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। আমি নবীজির অত্যন্ত নিকটবর্তী হলাম। তখন তিনি বললেন, কেয়ামতের দিন আমি আদম সন্তানদের সর্দার হবো। তোমরা কি জানো তা কেন? সেদিন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে একত্রিত করা হবে। কারো প্রতি সামান্যতম প্রতারণা করা হবে না। সকলকে যখন একটি জায়গায় একত্রিত করা হবে তখন সূর্যকে তাদের মাথার এক মাইল ওপরে রেখে দেওয়া হবে। সেদিন লোকেরা তাদের ঘামে হাবুডুবু খেতে থাকবে।'

সে দিনটি এতই ভয়াবহ হবে যে, কেউ একটি কথা পর্যন্ত বলতে পারবে না। তবে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যাকে অনুমতি দেবেন কেবল সেই কথা বলতে পারবে। ইরশাদ হয়েছে,

إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا

'দয়াময় যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথা তিনি পছন্দ করবেন সে ব্যতীত কারো সুপারিশ সেদিন কোনো কাজে আসবে না।'

গভীরভাবে চিন্তা করো সে দিন সম্পর্কে। কেমন হবে সেদিনের ভয়ানক অবস্থা! আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনের স্থানে স্থানে এর আলোচনা করেছেন যেন ফিরে আসে মানুষ অবাধ্যতা থেকে। ইরশাদ হয়েছে,

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْجِبَالِ فَقُلْ يَنْسِفُهَا رَبِّي نَسْفًا فَيَذَرُهَا قَاعًا صَفْصَفًا لَا تَرَى فِيهَا عِوَجًا وَلَا أَمْنًا يَوْمَئِذٍ يَتَّبِعُونَ الدَّاعِيَ لَا عِوَجَ لَهُ ، وَخَشَعَتِ الْأَصْوَاتُ لِلرَّحْمَنِ فَلَا تَسْمَعُ إِلَّا هَمْسًا يَوْمَئِذٍ لَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِهِ عِلْمًا وَعَنَتِ الْوُجُوهُ لِلْحَيِّ الْقَيُّومِ ، وَقَدْ خَابَ مَنْ حَمَلَ ظُلْمًا

'তারা আপনাকে পর্বতসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলুন, আমার প্রতিপালক তাদের সমূলে উৎপাটন করে বিক্ষিপ্ত করে দেবেন। অতঃপর তিনি তাকে পরিণত করবেন মসৃণ সমতল ময়দানে। যেখানে তুমি বক্রতা ও উচ্চতা দেখবে না। সেদিন তারা আহ্বানকারীর অনুসরণ করবে। এ ব্যাপারে এদিক-ওদিক করতে পারবে না। দয়াময়ের সম্মুখে সকল শব্দ স্তব্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং মৃদু পদধ্বনি ব্যতীত তুমি কিছুই শুনবে না। দয়াময় যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথা তিনি পছন্দ করবেন সে ব্যতীত আর কারো সুপারিশ সেদিন কোনো কাজে আসবে না। তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে সে সম্পর্কে তিনি অবগত। কিন্তু তারা জ্ঞান দ্বারা তাকে আয়ত্ব করতে পারে না। চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারকের নিকট সকলেই হবে মস্তকাবনত এবং সেই ব্যর্থ হবে যে জুলুমের ভার বহন করবে।'

হাশরের ভয়াল দিনে তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলবে কে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে? কে আজ আমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করবে? হায়! আজ তো সকলে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। কেউ কি নেই যিনি আমাদের জন্য এগিয়ে আসবেন। অতঃপর তারা বলবে, চলো যাই হযরত আদম আলাইহিস সালামের নিকট। এসে বলবে, হে আদম! আপনি মানুষের পিতা। আল্লাহ আপনাকে নিজ কুদরতি হাতে সৃষ্টি করেছেন। আপনার মাঝে তিনি প্রাণের সঞ্চার করেছেন এবং আপনাকে বানিয়েছেন জান্নাতের অধিবাসী। হে আমাদের পিতা আদম! আপনি কি দেখছেন না আজ আমরা কী নিদারুণ কঠিন অবস্থায় পতিত হয়েছি? আপনি কি আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবেন না?

তাদের কথা শুনে হযরত আদম আলাইহিস সালাম বলবেন,

إني ربي غضب اليوم غضباً لم يغضب قبله مثله، ولن يغضب بعده مثله، وإني نهيت عن تلكم الشجرة فعصيت، نفسي نفسي نفسي، اذهبوا إلى نوح

'আজ আমার রব ভীষণ রেগে আছেন; ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, এবং আজকের পরেও কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আল্লাহ আমাকে নিষেধ করেছিলেন বৃক্ষের নিকটবর্তী হতে। কিন্তু আমি তার অবাধ্যতা করেছি। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা নুহ এর নিকট যাও।'

হযতর আদম আলাইহিস সালামের নিকট থেকে অতঃপর তারা যাবে হযরত নুহ আলাইহিস সালামের নিকট। তাকে বলবে, 'হে নুহ! আপনি পৃথিবীতে প্রথম রাসুল। আল্লাহ আপনার নাম রেখেছেন কৃতজ্ঞশীল বান্দা বলে। আপনি কি দেখছেন না আমরা আজ কী অবস্থার সম্মুখীন হয়েছি? আপনি কি আজ আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' তাদের কথা শুনে হযরত নুহ আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন। ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, এবং আজকের পরেও কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। তাছাড়া আমার দাওয়াত ছিল কেবল আমার সম্প্রদায়ের জন্য। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা ইবরাহিমের নিকট যাও।'

অতঃপর তারা দৌড়ে যাবে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের নিকট। বলবে, হে ইবরাহিম! আপনি আল্লাহর নবী এবং তার খলিল। আপনি কি দেখছেন না আমাদের পরিণতি? আপনি কি আজ আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' তাদের কথা শুনে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন। ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, আজকের পরেও কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আমি কীভাবে তোমাদের জন্য সুপারিশ করব। আমি মোট তিনবার মিথ্যা বলেছি। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা মুসার নিকট যাও।'

এবার তারা দৌড়ে যাবে হযরত মুসা আলাইহিস সালামের নিকট। বলবে, 'আপনি আল্লাহর নবী এবং তার কালিম। আপনি কি দেখছেন না আমাদের করুণ পরিণতি? আজ আপনি কি আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' তাদের কথা শুনে হযরত মুসা আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন। ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি, এবং আজকের পরে আর কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আমি কীভাবে তোমাদের জন্য সুপারিশ করব, আমি তো একজনকে হত্যা করেছি। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা ইসার নিকট যাও।'

এবার তারা দৌড়াতে থাকবে হযরত ইসা আলাইসি সালামের নিকট। তার তাকে বলবে, আপনি আল্লাহর নবী এবং তার বাণী। আল্লাহ আপনাকে মারইয়ামের গর্ভে প্রেরণ করেছেন এবং তিনি আপনার মাঝে রুহ সঞ্চার করেছেন। আপনি কি দেখছেন আমাদের করুণ পরিণতি? আজ কি আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না?' হযরত ইসা আলাইহিস সালাম বলবেন, 'আমার প্রভু আজ ভীষণ রেগে আছেন; ইতিপূর্বে কখনো তিনি এমন রাগান্বিত হননি এবং আজকের পর আর কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। নাফসি! নাফসি! নাফসি! তোমরা কি জানো সেদিন যারা নাফসি! নাফসি! নাফসি! করবে তারা কারা? তারা হলেন প্রথম সারির নবী-রাসুল! সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে তারা ছিলেন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নিকট অত্যন্ত প্রিয় ও আস্থাভাজন। যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয়, তাকওয়া ছিল সর্বাধিক। তাদের যদি এমন পরিণতি হয় হে আল্লাহর বান্দা! তাহলে আমার ও আপনার জন্য কেমন পরিণতি অপেক্ষা করছে? আর ওইসমস্ত লোকদেরই বা কী পরিণতি হবে যারা আল্লাহর অবাধ্যতা নাফরমানিতে সদা লিপ্ত। যারা আল্লাহর হক ও মর্যাদা যথাযথ আদায় করে না?

সর্বশেষ হযরত ইসা আলাইহিস সালাম বলবেন, তোমরা মুহাম্মদের নিকট যাও। হৃদয়ে তারা অপরিসীম আশা ও ভরসা নিয়ে দৌড়ে যাবে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের নিকট। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বলবে, হে মুহাম্মদ! আপনি আল্লাহর নবী, সর্বশেষ নবী। আল্লাহ আপনার পূর্বাপর সকল গুনাহক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি কি দেখছেন না আমাদের পরিণতি? আজ আপনি কি আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না? তখন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরশের দিকে দৌড়াতে থাকবেন। অন্য বর্ণনায় আছে, নবী তখন থাকবেন সেজদাবনত। আল্লাহ তায়ালা সেদিন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এত অধিক প্রশংসা করবেন, যে প্রশংসা তিনি ইতিপূর্বে কখনো করেননি। আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবিবের এ দৃশ্য দেখে সহ্য করবেন না। তখন আল্লাহ বলবেন, হে মুহাম্মদ! আপনি আপনার মাথা উত্তোলন করুন এবং সুপারিশ করুন। নবীজি সুপারিশ করবেন। বলবেন,

يَا رَبِّ أُمَّتِي، يَا رَبِّ أُمَّتِي 'হে রব! আমার উম্মত, হে রব! আমার উম্মত।'

হে আল্লাহর বান্দা! সেদিন সকল নবী-রাসুল যখন নাফসি! নাফসি! করতে থাকবে, একমাত্র আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতি উম্মতি বলে চিৎকার করবেন। সেদিন যখন নবী-রাসুল যখন নিজেদের পরিণতির কথা ভেবে চিন্তিত থাকবেন, একমাত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিজের কথা ভুলে আমাদের জন্য উম্মতি উম্মতি বলে চিৎকার করবেন। আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা করবেন। আমাদের মুক্তি ও নাজাতের জন্য সুপারিশ করবেন।

হায়! আজ কোথায় আমরা? কোথায় উম্মতে মুহাম্মদি? কেয়ামতের দিন যে নবী তার নিজের কথা ভুলে উম্মত উম্মত করবেন, আজ সে উম্মত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভুলে আছে। তার দ্বীনকে সাহায্য করছে না। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করছে না। আফসোস, শত আফসোস, সে নবীর উম্মত আজ জিহাদের রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। হাশরের বিভীষিকাময় ভয়াবহ দিবসে যে নবী তার উম্মতের জন্য পাগলপ্রায় হয়ে যাবেন, তাদের জন্য সুপারিশ করবেন, সে উম্মত আজ তার অনুসরণ থেকে দূরে সরে আছে। যে দ্বীন তিনি তাদের নিকট রেখে গেছেন তারা সে দ্বীনের অমর্যাদা করছে। দ্বীনকে পরাজিত হতে দেখে তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় না। পৃথিবীতে তার দ্বীনকে বিজয় ও সমুন্নত করার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করছে না। হায়! উম্মত আজ জিহাদকে ভুলে গেছে। তরবারির ছায়া থেকে পালিয়ে আজ তারা আশ্রয় নিচ্ছে গোলামি ও দাসত্বের ছায়ায়। হায় আফসোস! যদি বুঝত উম্মত তাদের কর্তব্য।

তুমি কি মনে করছ, হাশরের দিবস এখানেই সমাপ্ত? না, তা নয়। সবে তো সূচনা হয়েছে। সেদিন মানুষ এক কঠিন অবস্থা থেকে আরেক কঠিন অবস্থায় রূপান্তরিত হবে। অবশেষে আসবে সে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। আল্লাহ তায়ালা হিসাব গ্রহণের অনুমতি প্রদান করবেন। তখন সকলে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাদের চোখে-মুখে ফুটে উঠবে ভয় ও দুশ্চিন্তার কালো রেখা।

ইরশাদ হয়েছে, وَعُرِضُوا عَلَىٰ رَبِّكَ صَفًّا لَّقَدْ جِئْتُمُونَا كَمَا خَلَقْتُكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ بَلْ زَعَمْتُمْ أَلَّن نَّجْعَلَ لَكُم مَّوْعِدًا

'এবং তাদেরকে আপনার প্রতিপালকের নিকট সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত করে বলা হবে, তোমাদের প্রথমবার যেভাবে সৃষ্টি করেছিলাম সেভাবেই তোমরা আমার নিকট উপস্থিত হয়েছ। অথচ তোমরা মনে করতে যে, তোমাদের জন্য প্রতিশ্রুত ক্ষণ আমি কখনো উপস্থিত করব না।'

সকলে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাদের মাথা থাকবে অবনত। ভয়ে তাদের চক্ষু বিস্ফারিত হতে থাকবে। একে একে সকলের আমলনামা পেশ করা হবে। মিযানে সকলের আমলনামা পরিমাপ করা হবে। মানুষ সেদিন একটি নেক আমলের জন্য পাগলের মতো দৌড়াতে থাকবে। কোথাও যদি একটি নেক আমল পাওয়া যায়! কিন্তু কেউ কারো দিকে একটি বার ফিরে তাকাবে না। সকলে সেদিন সকলের থেকে পলায়ন করবে। একটি আমল কেউ কাউকে দেবে না। জেনে রাখো! সেদিন মা তার সন্তানকে বলবে, 'আমি তোমাকে নয় নয় মাস গর্ভে ধারণ করেছি। তোমার জন্য আমি ত্যাগ স্বীকার করেছি। হে আমার প্রাণাধিক প্রিয় সন্তান! আজ তুমি আমাকে একটি নেক আমল দাও। এমনিভাবে পিতা তার সন্তানকে বলবে। কিন্তু কেউ কারো ডাকে সাড়া দেবে না। সকলেই বলবে, নাফসি! নাফসি! নাফসি!

হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেন, 'মানুষ কি সেদিন তার পরিবার-পরিজনকে চিনতে পারবে?'

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'হ্যাঁ, সেদিন তারা একে অপরকে চিনতে পারবে। আর তিনটি সময় এমন রয়েছে যখন মানুষ তার পরিণতির কথা জানতে পারবে না। (এক) যখন তাদের আমলনামা প্রকাশ করা হবে, তখন জানবে না যে, আমলনামা কোথায় দেওয়া হবে। ডান হাতে নাকি বাম হাতে। (দুই) যখন আমলনামা পরিমাপ করার জন্য মিজানে রাখা হবে, তখন জানবে না নেক আমল অধিক হবে নাকি মন্দ আমল। (তিন) যখন পুলসিরাত অতিক্রম করবে তখন জানবে না, সে কি তা অতিক্রম করতে পারবে নাকি ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।'

হাশরের ভয়াবহ সেই কাল এক বা দুই দিন নয়, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর। এই সুদীর্ঘকাল মানুষ সেখানে একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকবে। মাথার ওপর থাকবে জ্বলন্ত সূর্য। আল্লাহু আকবার! সেদিন কী অবস্থা হবে আমাদের? কী অবস্থা হবে আমার আপনার? হে আল্লাহর বান্দা! একটি বার জিজ্ঞেস করো নিজেকে। সেদিনের জন্য তোমার প্রস্তুতি কেমন? ইরশাদ হয়েছে,

سَأَلَ سَائِلُ بِعَذَابٍ وَاقِعِ * لِلْكَافِرِينَ لَيْسَ لَهُ دَافِعُ * مِنَ اللَّهِ ذِي الْمَعَارِجِ * تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ

'এক প্রশ্নকারী শান্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করল, যা নেমে আসবে কাফেরদের ওপর, যাকে কেউ প্রতিহত করতে পারবে না। (যা আসবে ঊর্ধ্বারোহণের) সিঁড়ির অধিকারী আল্লাহর পক্ষ থেকে। তার (আরশের) দিকে ফেরেশতারা ও (পবিত্র) আত্মা (জিবরাইল) আরোহণ করে থাকে। (কাফেরদের ওপর ওই শান্তি নেমে আসবে) এমন একদিন যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। '

সুদীর্ঘ সেই পঞ্চাশ হাজার বছর তারা কিছুই খাবে না, পান করবে না। এমনকি কথাও পর্যন্ত বলবে না। তাদের অন্তর কাঁপতে থাকবে। তাদের চক্ষু বের হয়ে আসার উপক্রম হবে। কী হবে সেদিন আমার ও আপনার পরিণতি? আর তাদেরই-বা কেমন পরিণতি হবে যারা আল্লাহর অবাধ্যতা করে। তার হক ও সম্মান যথাযথ আদায় করে না।

কিন্তু সেই কঠিনতর দিনেও আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সাত প্রকার ব্যক্তিকে আরশের ছায়ার নিচে আশ্রয় দেবেন। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাদের জন্য এটি হবে বিশেষ পুরস্কারস্বরূপ। সেদিন আরশের ছায়া ব্যতীত গোটা হাশরের ময়দানে আর কোনো ছায়া থাকবে না। আর সূর্য থাকবে মাথার উপরে।

খুব গভীরভাবে চিন্তা করো দেখো, তুমি কি সেই সাত প্রকার ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত?

হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, 'তুমি কীভাবে পঞ্চাশ হাজার বছর নিজ পায়ে সেদিন দাঁড়িয়ে থাকবে? সেদিন তারা খাবে না, পান করবে না এবং কথাও বলবে না। কেমন পরিণতি হবে যখন সত্তর হাজার বেড়ি পরিহিত জাহান্নামকে টেনে আনা হবে। যার প্রতিটি বেড়ির সাথে থাকবে অনুরূপ সত্তর হাজার ফেরেশতা?

إِذَا رَأَتْهُم مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُّظًا وَزَفِيرًا

'দূর থেকে আগুন যখন তাদের দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে আগুনের ক্রুদ্ধ গর্জন ও চিৎকার।'

'যখন তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা জাহান্নামের বিকট শব্দ শুনবে আর তা হবে উদ্বেলিত। রোষে জাহান্নام যেন ফেটে পড়বে। যখনই তাতে কোনো দলকে নিক্ষেপ করা হবে তাদেরকে রক্ষীরা জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের নিকট কি কোনো সতর্ককারী আসেনি?'

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের ভয়াবহ সে কেয়ামত দিবসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে আদেশ করেছেন। তিনি আমাদের তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন। তার আনুগত্য করতে বলেছেন।

ইরশাদ হয়েছে, يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمُ يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدُ

‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। নিশ্চয় কেয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী ভুলে যাবে তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখবে নেশাগ্রস্ত; যদিও তারা প্রকৃতার্থে নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুত আল্লাহর শাস্তি কঠিন।’

সেদিন আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব গ্রহণ করবেন। সেদিন কারো প্রতি ন্যূনতম জুলুম করা হবে না। প্রত্যেকে সেদিন তাই পাবে যা সে দুনিয়াতে অর্জন করেছে। ইরশাদ হয়েছে,

لَا ظُلْمَ الْيَوْمَ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ

‘আজ কারো প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’

কেয়ামতের বিভীষিকা ও ভয়াবহ বর্ণনা করতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,

إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا * وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا * وَقَالَ الإِنسَانُ مَالَهَا * يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا * بِأَنَّ رَبَّكَ أَوْحَى لَهَا يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ * فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ

‘পৃথিবী যখন প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে এবং পৃথিবী যখন তার ভার বের করে দেবে, মানুষ বলবে—তার কী হলো? সেদিন পৃথিবী তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে। কারণ তোমার প্রতিপালক তাকে আদেশ করবেন। সেদিন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দলে বের হবে, যেনো তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম দেখানো যায়। কেউ যদি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করে তাহলে সে তা দেখবে, আর যদি অণু পরিমাণ অসৎকর্ম দেখে সে তাও দেখবে। '

চিন্তা করো তখন তোমার কেমন পরিণতি হবে যখন বলা হবে, হে অমুকের ছেলে অমুক! তোমার আমলনামা পেশ করো? কেমন পরিণতি অপেক্ষা করছে সেদিন, যেদিন তোমার নাম ধরে ডেকে বলা হবে, দাও তোমার জীবনের হিসাব দাও, প্রতিটি সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দাও?

দুনিয়ার কোনো রাজা-বাদশাহ যখন তোমার সামনে উপস্থিত থাকে তখন তোমার অন্তর কাঁপতে থাকে। ভয়ে তোমার মুখ দিয়ে কথা পর্যন্ত বের হয় না। তাহলে সেদিন কী ভয়াবহ অবস্থা হবে যেদিন তোমার সামনে দণ্ডায়মান থাকবেন রাজাধিরাজ; যার হাতে সেদিন ভাঁজ করা থাকবে সমগ্র আসমান ও জমিন? ইরশাদ হয়েছে,

يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيَّ السِّجِلِّ لِلْكُتُبِ كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ

'সেদিন আকাশমণ্ডলীকে গুটিয়ে ফেলব, যেভাবে গুটানো হয় লিখিত কাগজ। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। প্রতিশ্রুতি পালন আমার কর্তব্য, আমি তা পালন করবই। '

বিচারগ্রহণের সময় সমস্ত ফেরেশতা ও মানুষ তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারা অপেক্ষারত থাকবে তোমার পরিণতি প্রত্যক্ষ করার জন্য। কিন্তু তুমি জানো না, তোমার সাথে কেমন আচরণ করা হবে। তুমি জানো না বিচার গ্রহণের পর তোমার অবস্থান হবে কোথায়।

যাদের অন্তরে তাকওয়া রয়েছে। পৃথিবীতে আল্লাহর আনুগত্য করেছে পূর্ণরূপে। যারা আল্লাহর সমস্ত হক ও তার সম্মান যথাযথ রক্ষা করেছে সেদিন তাদের পরিণতি কেমন হবে, এ সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা যখন তাকে হিসাব গ্রহণের জন্য আহ্বান করবেন। তখন একটি পর্দা দিয়ে তাকে ঢেকে নেবেন। তারপর পর্দাবৃত অবস্থায় তার হিসেব গ্রহণ করবেন। বান্দা তখন আল্লাহর সম্মুখে তার সকল অপরাধ স্বীকার করবে। দুনিয়াতে যা যা করেছে তা পরিপূর্ণরূপে তুলে ধরবে। অতঃপর বান্দা যখন ধারণা করবে, সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে তখন বলবে, 'আমার আল্লাহ সবচেয়ে দয়ালু।' তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, 'আমি দুনিয়াতে তোমার সকল দোষ-ত্রুটি গোপন রেখেছি, আজও আমি তা গোপন রাখব। অতঃপর আল্লাহ তার আমলনামা তার ডান হাতে দেবেন। সে হাসতে হাসতে আনন্দচিত্তে বের হয়ে আসবে। তখন সে উপস্থিত সকলকে লক্ষ্য করে সুউচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা দেবে,

هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهُ * إِنِّي ظَنَنتُ أَنِّي مُلَاقٍ حِسَابِيهِ فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَاضِيَةٍ * فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٍ

'নাও, আমার আমলনামা পড়ে দেখো। নিশ্চয়ই আমি জানতাম যে, আমাকে আমার হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং সে যাপন করবে সন্তোষজনক জীবন। সুউচ্চ জান্নাতে। '

পক্ষান্তরে যারা আল্লাহকে ভয় করে না। তার অবাধ্যতা ও নাফরমানি করে। অন্যায় পাপাচারে ডুবে থাকে। আল্লাহর যাবতীয় হক ও সম্মান যথাযথ আদায় করে না, তারা যখন হিসাব দেবে তখন ফেরেশতা ও মানুষ সকলে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারা যখন নিজেদের কৃতকর্মের হিসাব দেবে সকলে তা শুনবে। আল্লাহ তখন তাদের বলবেন, 'দুনিয়াতে যখন আমার অবাধ্যতা করেছিলে তখন কি লজ্জিত হওনি, তবে আজ কেন সকলের সম্মুখে কৃত অন্যায় ও পাপের স্বীকারোক্তি দিতে লজ্জিত হচ্ছ?

তখন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার ফেরেশতাদের ডেকে বলবেন, 'হে আমার ফেরেশতাগণ! তাকে বড় শক্তভাবে পাকড়াও করো। তাকে আমার আজাবে নিক্ষেপ করো। মর্মন্তুদ শাস্তি আস্বাদন করাও।

তাদের আমলনামা তাদের বাম হাতে দেওয়া হবে। আক্ষেপ, অনুশোচনায় তারা নিজেদের নত করে রাখবে। বলতে থাকবে,

يَا لَيْتَنِي لَمْ أُوتَ كِتَابِيَهْ وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهْ يَا لَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةَ مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَهُ هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهُ

'হায়! আমাকে যদি আমার আমলনামা না দেওয়া হতো। আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব। হায়! আমার মৃত্যুই যদি আমার শেষ হতো। আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো কাজেই এলো না। আমার ক্ষমতাও বিনষ্ট হয়ে গেছে।'

রাজাধিরাজ মহাশক্তিধর আমার প্রভু সেদিন তার ফেরেশতাদের ডেকে বলবেন,

خُذُوهُ فَغُلُّوهُ ثُمَّ الْجَحِيمَ صَلُّوهُ ثُمَّ فِي سِلْسِلَةٍ ذَرْعُهَا سَبْعُونَ ذِرَاعًا فَاسْلُكُوهُ إِنَّهُ كَانَ لَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ فَلَيْسَ لَهُ الْيَوْمَ هَاهُنَا حَمِيمٌ وَلَا طَعَامُ إِلَّا مِنْ غِسْلِينٍ لَا يَأْكُلُهُ إِلَّا الْخَاطِئُونَ

'তোমরা পাকড়াও করো তাকে। অতঃপর তার গলদেশে বেড়ি পরিয়ে দাও। তারপর তাকে নিক্ষেপ করো জাহান্নামে। তারপর তাকে সত্তর হাত লম্বা একটি শিকলে বাঁধ। সে তো মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিল না। অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে উৎসাহিত করতো না। অতএব আজকের দিনে তার কোনো বন্ধু থাকবে না। থাকবে না কোনো খাদ্য, তবে রয়েছে ক্ষতনিঃসৃত পুঁজ। যা অপরাধী ব্যতীত কেউ ভক্ষণ করে না।'

টিকাঃ
৮০. সুরা তহা: ১০৯।
৮১. সুরা তহা: ১০৫-১১১।
৮২. সুরা কাহফ: ৪৮।
৮৩. সুরা মাআরিজ: ১-৪।
৮৪. সুরা ফুরকান: ১২।
৮৫. সুরা হজ: ১-২।
৮৬. সুরা গাফের: ১৭।
৮৭. সুরা যিলযাল: ১-৮।
৮৮. এককালে দলিল-দস্তাবেজ, ফরমান ইত্যাদি গুটিয়ে রাখা হতো। এখানে এইভাবে কাগজপত্র গুটানোর সঙ্গে আকাশমণ্ডলীকে গুটিয়ে ফেলার তুলনা করা হয়েছে।
৮৯. সুরা আম্বিয়া: ১০৪।
৯০. সুরা হাক্কা: ১৯-২২।
৯১. সুরা হাক্কা: ২৫-২৯।
৯২. সুরা হাক্কা: ৩০-৩৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00