📄 প্রার্থনায় সদা বিগলিত হও
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি যদি আপনার আনুগত্যপরায়ণ ও নেককার বান্দাদের ব্যতীত কাউকে ক্ষমা না করেন, তাহলে গোনাহগার ও পাপী বান্দারা কোথায় যাবে? কার নিকট তারা আশ্রয় প্রার্থনা করবে? হে আল্লাহ! আপনি যদি কেবল মুত্তাকি বান্দাদের প্রতি রহম করেন তাহলে আপনার অবাধ্য ও পাপাচারী বান্দারা কার নিকট সাহায্য কামনা করবে? আপনি তো তাদেরও রব। আপনি ছাড়া তো কেউ নেই তাদের। হে আল্লাহ! যারা অসহায় ও দরিদ্র তারা তো ধনীদের দুয়ারে যাবেই। হে আল্লাহ আপনার চেয়ে বড় ধনী আর কে আছে? হে আল্লাহ যারা লাঞ্ছিত, অপমানিত তারা তো সম্মানিতদের দুয়ারে করাঘাত করবেই। হে আল্লাহ আপনার চেয়ে অধিক সম্মানিত আর কে আছে। হে রাহমানুর রহিম! হে আরহামার রাহিমিন! আপনি ক্ষমা করে দিন। আপনি ক্ষমা করে দিন। আপনি কাছে টেনে নিন। আপনি অনুগ্রহ করুন। আপনি করুনা করুন। আপনি আমাদের আপনার আনুগত্যের তাওফিক দিন। আপনি আমাদের আপনার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।
হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট আপনার ভালোবাসা কামনা করি। আমরা আপনার অন্তরপূর্ণ ভালোবাসা প্রার্থনা করি। এবং প্রার্থনা করি ওই ব্যক্তির ভালোবাসা যে আপনাকে ভালোবাসে। হে আল্লাহ! আপনি আপনার ভালোবাসাকে আমাদের অন্তরে পিপাসার্ত ব্যক্তির নিকট পানির চেয়ে অধিক প্রিয় বানিয়ে দিন। হে আল্লাহ! আপনি ঈমানকে আমাদের নিকট প্রিয় বানিয়ে দিন। আমাদের অন্তরে ঈমানকে সুসজ্জিত করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি কুফর, ফুসুক ও গোনাহকে আমাদের নিকট ঘৃণিত করে দিন। হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের সৎপথে পরিচালিত করুন।
📄 জান্নাতের সুসংবাদ
إِنَّ الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونعوذ بالله من شرور أنفسنا، ومن سيئات أعمالنا. من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلل فلا هادي له. وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمداً عبده ورسوله. يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُمْ مُسلِمُونَ
মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমকে তার প্রিয় বন্ধু ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর নিকট রহমত ও সুসংবাদরূপে প্রেরণ করেছেন। কুরআনুল কারিম আপাদমস্তক একটি উপদেশ গ্রন্থ। এর পরতে পরতে, ছত্রে ছত্রে আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করেছেন মানবজাতির প্রতি অসংখ্য উপদেশ। এসব উপদেশ বান্দার ঘুমন্ত সত্তাকে জাগ্রত করে। বান্দার অবাধ্য ও পাপাচারী অন্তরকে সংশোধন করে। অন্ধকার থেকে চিরন্তর আলোর পথে পরিচালিত করে। ভ্রষ্টতার বেড়াজাল ছিন্ন করে মানুষকে সরল ও সঠিক পথের পথনির্দেশ করে। কুফর ও শিরকের মূলোৎপাটন করে ঈমান ও ইয়াকিনের নুর প্রজ্জ্বলিত করার জন্যই কুরআনের অবতরণ।
জমিন যেমন আসমান থেকে অবতীর্ণ বৃষ্টির ছোঁয়া না পেলে মৃত ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে তেমনি মানুষের সত্তা যখন আসমানি গ্রন্থ কুরআনুল কারিমের ছোঁয়া ও পরশ থেকে বঞ্চিত হয় তখন সে মৃত ও নির্জীব সত্তায় পর্যবসিত হয়। জমিন যেমন প্রখর রোদে আসমানের পানে তাকিয়ে বৃষ্টির এক ফোঁটা শীতল পরশের জন্য হাহাকার করে, তেমনি প্রতিটি মানুষের আত্মা আসমানি গ্রন্থ পবিত্র কুরআনের সান্নিধ্য ও তার রুহানিয়তের জন্য হাহাকার করতে থাকে। আসমান থেকে যখন রাশি রাশি বৃষ্টির ফোঁটা ঝরতে থাকে তখন মৃত ও শুকনো জমিন নবপ্রাণে জেগে ওঠে। চারদিক সেজে উঠে সুন্দর সবুজ শ্যামলিমায়, তেমনি বান্দার তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে যখন পবিত্র কুরআনের উপদেশ ঝরতে থাকে তখন তার ঘুমন্ত হৃদয় জেগে ওঠে নবচেতনায়, নতুন প্রাণে।
মিথ্যার মায়াজাল ছিন্ন করে সত্যগ্রহণে হয়ে ওঠে উদগ্রীব। ইতিহাস সাক্ষী, কুরআনের পরশে বহু কাফের-মুশরিক ঈমানের শীতল শামিয়ানায় আশ্রয়প্রাপ্ত হয়েছে। অন্ধকার থেকে তারা ছুটে এসেছে আলোর বিয়াবানে। ভ্রষ্টতার দিগন্ত থেকে আলোকোজ্জ্বল প্রান্তরে ঘটেছে তাদের সুভাগমন। কুরআন এক পরশপাথরের নাম, যার ছোঁয়ায় কাফের হয়ে যায় মুমিন। অন্ধ হয়ে যায় আলো দৃষ্টিসম্পন্ন। বধির হয়ে যায় জাগ্রত ও চৌকষ।
ইরশাদ হয়েছে, وَتَرَى الْأَرْضَ هَامِدَةً فَإِذَا أَنزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ وَأَنْبَتَتْ مِنْ كُلِّ زَوْجٍ بَهِيجٍ 'তুমি ভূমিকে দেখো শুষ্ক, অতঃপর তাতে আমি বৃষ্টি বর্ষণ করলে তা শষ্য-শ্যামল হয়ে আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উৎপন্ন করে সকল প্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ। '
এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় এ কথা, আল্লাহ তায়ালা মৃতকে জীবিত করেন। নির্জীবকে করেন সজীব। প্রাণহীনকে করেন সপ্রাণ। এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তায়ালা সেই সত্তা যিনি সকল কিছুর ক্ষমতাবান।
ইরশাদ হয়েছে, 'তা এজন্য যে, আল্লাহ সত্য এবং তিনি মৃতকে জীবন দান করেন, তিনি সর্ববিষয়ে শক্তিমান। '
وَأَنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ لَا رَيْبَ فِيهَا وَأَنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ مَنْ فِي الْقُبُورِ 'কেয়ামাত আসবেই, এতে কোনো সন্দেহ নেই। যারা কবরে আছে তাদের নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্থিত করবেন। '
তুমি কি দেখো না যখন আসমান থেকে থোকা থোকা বৃষ্টি ঝরে তখন কীভাবে নবপ্রাণে জেগে ওঠে মৃতপ্রায় জমিন? কীভাবে প্রাণের হিন্দোলে নেচে ওঠে সবুজ শ্যামলিমা? হ্যাঁ, ঠিক সেভাবেই কুরআনের উপদেশবাণী মানুষের অন্তরকে জাগিয়ে তোলে। তাদের হৃদয়ে ঈমান ও সত্যের দোলা দেয়।
জেনো, আসমানের বৃষ্টি ব্যতীত জমিন যেমন মৃত ও শুষ্কে পরিণত হয় তেমনি কুরআনের ছোঁয়া ও উপদেশ ব্যতীত মানুষের আত্মাও প্রাণহীন ও নির্জীব। কুরআন আল্লাহর বাণী। আর আল্লাহর স্মরণ ব্যতীত অন্তর জীবিত থাকতে পারে না। যেমন রুহ ছাড়া দেহ জীবিত থাকে না।
সুতরাং আল্লাহর স্মরণে সজীব যে আত্মা কেবল সে আত্মাই জীবিত। পক্ষান্তরে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ ও দূরে সরে আছে যে আত্মা তা প্রকারান্তরে মৃত, প্রাণহীন। কুরআনের উপদেশ এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ থেকে যারা দূরে সরে আছে তারা আসমানের বৃষ্টিবঞ্চিত জমিনের ন্যায় মৃত।
টিকাঃ
৪৩. সুরা হজ: ৫।
৪৪. সুরা হজ: ৬।
৪৫. সুরা হজ: ৭।
📄 সুরা যুমারে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়ত্বের বর্ণনা
সুরা যুমার কুরআনুল কারিমের একটি মর্যাদাপূর্ণ সুরা। অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত সুরা। এ সুরায় বর্ণিত হয়েছে মহান আল্লাহ তায়ালার অপরিসীম বড়ত্ব ও মাহাত্ম্যের বর্ণনা।
ইরশাদ হয়েছে, تَنْزِيلُ الْكِتَابِ مِنَ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ 'এ কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে। '
আল্লাহ তায়ালা তার রাজত্ব ও ক্ষমতার ক্ষেত্রে পরাক্রমশালী। এমনিভাবে পরাক্রমশালী তিনি তার পবিত্র নাম ও সমস্ত গুণাবলির ক্ষেত্রেও। এবং তিনি পূর্ণ প্রজ্ঞাময় তার সকল কাজ ও কর্মপন্থার ক্ষেত্রে। তার জ্ঞান বিশ্বজগতের সকল কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিটি অণু পরমাণু তার নখদর্পণে। সেই মহান সত্তা অবতীর্ণ করেছেন আমাদের নিকট মহাগ্রন্থ আল কুরআন।
ইরশাদ হয়েছে, تَنْزِيلُ الْكِتَابِ مِنَ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ * إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ فَاعْبُدِ اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ
‘এ কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে। আমি আপনার নিকট এই কিতাব সত্যসহ অবতীর্ণ করেছি। সুতরাং বিশুদ্ধচিত্তে তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। '
সুরা যুমারের সূচনা হয়েছে মহান আল্লাহ তায়ালার বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণনা দিয়ে। অতঃপর বর্ণিত হয়েছে বান্দার নিকট আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার প্রার্থিত ও কাঙ্ক্ষিত বিষয়। আর তা হলো, একনিষ্ঠচিত্তে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা। ইবাদত ও প্রার্থনায় তার সাথে কাউকে শরিক না করা। ইরশাদ হয়েছে, فَاعْبُدِ اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ * أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ 'তোমরা বিশুদ্ধচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করো। জেনে রেখো, আনুগত্য একমাত্র আল্লাহর জন্যই। '
টিকাঃ
৪৬. সুরা যুমার: ১।
৪৭. সুরা যুমার: ১-২
৪৮. সুরা যুমার: ২-৩
📄 একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা
হে আল্লাহর বান্দা! ইবাদত করতে হবে একমাত্র আল্লাহর। প্রার্থনা করতে হবে কেবল আল্লাহর নিকট। সেইসঙ্গে বান্দাকে আল্লাহর যাবতীয় হক আদায় করতে হবে। রক্ষা করতে হবে তার বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান। ইবাদতের ক্ষেত্রে তার সাথে অন্য কাউকে শরিক করা যাবে না। যারা আল্লাহ তায়ালার সাথে অন্য কারো ইবাদত করে তারা কাফের। তারা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়ত্বের সম্মান রক্ষা করে না। যারা কাউকে আল্লাহর সন্তান বলে সাব্যস্ত করে তারা আল্লাহকে যথোচিত সম্মান করে না। মুমিনদের মধ্যে যারা আল্লাহর অবাধ্যতা করে তারা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়ত্বের যথোচিত সম্মান রক্ষা করে না। যারা আল্লাহর দেওয়া আদেশসমূহ মেনে চলে না এবং নিষেধ থেকে সর্বতোভাবে বিরত থাকে না তারা আল্লাহকে যথোচিত সম্মান করে না। যারা বলে আল্লাহ সর্বশক্তিমান নয় তারা আল্লাহকে যথোচিত সম্মান করে না। আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমান ও ইয়াকিন পরিপূর্ণ নয়। কেননা, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন, তিনি একক ও সর্বশক্তিমান। শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়ত্বে তার সমকক্ষ কেউ নেই। বিশাল সৃষ্টিজগতের সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণাধীন। কোনোকিছুই তার ক্ষমতা ও পর্যবেক্ষণের বাহিরে নয়।
ইরশাদ হয়েছে, وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَوَاتُ مَطْوِيَّاتُ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ
'তারা আল্লাহর যথোচিত সম্মান করে না। কেয়ামতের দিন সমস্ত পৃথিবী থাকবে তার হাতের মুঠোয় এবং আকাশমণ্ডলী থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তার দক্ষিণ হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি। তারা যাকে শরিক করে তিনি তার ঊর্ধ্বে।'
'আল্লাহর যথোচিত সম্মান করে না' এর অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালাকে সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী বলে বিশ্বাস না করা। পৃথিবীতে অসংখ্য ও অগণিত সৃষ্টিরাজি ছড়িয়ে আছে যা আল্লাহ তায়ালার বড়ত্ব ও একক কর্তৃত্বের প্রমাণ বহন করে। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের তার নিদর্শন দেখার জন্য পৃথিবীময় ভ্রমণ করতে বলেছেন। হে আল্লাহর বান্দাগণ! তাহলে কেন তোমরা পৃথিবীতে বিচরণ করে দেখো না তার শক্তি ও অপার ক্ষমতা। যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল এসেছেন পৃথিবীতে। তারা এসে বলেছেন এ কথাই যে আল্লাহ এক। তার কোনো শরিক নেই। তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনিই এ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। কোনোকিছুই তার নিয়ন্ত্রণের বাহিরে নয়। তিনি সবকিছু দেখেন, সবকিছু জানেন, সবকিছুর জ্ঞান রাখেন। অণু থেকে পরমাণু কিছুই তার আয়ত্বের বাহির নয়।
হযরত নুহ আলাইহিস সালাম তার সম্প্রদায়কে বলেছেন, مَا لَكُمْ لَا تَرْجُونَ لِلَّهِ وَقَارًا
'তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে চাইছ না?'
অর্থাৎ, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কেন আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়ত্ব মেনে নিচ্ছ না? কেন তোমরা আল্লাহকে যথোচিত সম্মান করছ না? কেন তার যাবতীয় হক আদায় করছ না? তোমরা কি তার কঠিন ও মর্মন্তুদ শাস্তিকে মোটেও ভয় পাচ্ছ না?
অতঃপর হযরত নুহ আলাইহিস সালাম তাদের নিকট আল্লাহর বড়ত্ব ও কর্তৃত্বের পরিচয় তুলে ধরেন।
ইরশাদ হয়েছে, وَقَدْ خَلَقَكُمْ أَطْوَارًا 'তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন পর্যায়ক্রমে।
هَلْ أَتَى عَلَى الْإِنْسَانِ حِينٌ مِّنَ الدَّهْرِ لَمْ يَكُنْ شَيْئًا مَّذْكُورًا إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُّطْفَةٍ أَمْشَاجِ نَّبْتَلِيْهِ فَجَعَلْنَهُ سَمِيعًا بَصِيرًا إِنَّا هَدَيْنَهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُوْرًا إِنَّا أَعْتَدْنَا لِلْكَفِرِيْنَ سَلْسِلَا وَأَغْلُلًا وَسَعِيرًا
'কালপ্রবাহে মানুষের ওপর তো এমন এক সময় এসেছিল যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না। আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শুক্রবিন্দু থেকে। তাকে পরীক্ষা করার জন্য। আর এজন্য আমি তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন। আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি, হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ। আমি অকৃতজ্ঞদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি শৃঙ্খল বেড়ি ও লেলিহান আগুন। '
হে আদম সন্তান! কে তুমি? কী তোমার পরিচয়? কে তোমাকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছেন?
ইরশাদ হয়েছে,
وَقَدْ خَلَقَكُمْ أَطْوَارًا 'তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন পর্যায়ক্রমে। '
অর্থাৎ, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তোমাকে পর্যায়ক্রমে এক স্তর থেকে অপর স্তরে রূপান্তর করে সৃষ্টি করেছেন। তুমি অনস্তিত্বে ছিলে অতঃপর ক্রমান্বয়ে তিনি তোমাকে অস্তিত্ব দান করেছেন। প্রথমে ছিলে এক ফোঁটা বীর্য। তারপর হলে জমাট রক্ত। তারপর একটি মাংস পিণ্ড। অতঃপর একটি শিশুর মতো তিনি তোমাকে পৃথিবীতে এনেছেন। প্রতিটি মানুষের সৃষ্টির প্রক্রিয়া এভাবেই হয়। সুতরাং যদি আল্লাহর ইবাদত না করো তবে কার ইবাদত করবে। যদি আল্লাহর যথোচিত সম্মান না করো তবে কার সম্মান করবে? আর কে আছে যে সৃষ্টি করেছে তোমাকে? আল্লাহ ব্যতীত আর কে আছে যে তোমাকে রিজিক দেয়? কে আছে যে তোমাকে অসুস্থতা থেকে আরোগ্য দান করে? কে আছে আল্লাহ ব্যতীত? হে আল্লাহ বান্দা! বারবার জিজ্ঞেস করো নিজেকে এ কথা। বিবেকের আদালতে পেশ করো তোমার এসব প্রশ্ন। তবেই ঠিক ঠিক উত্তর পেয়ে যাবে।
অতঃপর নুহ আলাইহিস সালাম তার সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলেন, তোমরা তাকিয়ে দেখো আসমান ও জমিনের দিকে। তাকিয়ে দেখো তোমাদের ডানে-বামে অসংখ্য সৃষ্টির দিকে। তাহলে দেখতে পাবে তার বড়ত্ব ও কর্তৃত্ব।
ইরশাদ হয়েছে,
أَلَمْ تَرَوْا كَيْفَ خَلَقَ اللَّهُ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيهِنَّ نُورًا وَجَعَلَ الشَّمْسَ سِرَاجًا وَاللَّهُ أَنبَتَكُم مِّنَ الْأَرْضِ نَبَاتًا ثُمَّ يُعِيدُكُمْ فِيهَا وَيُخْرِجُكُمْ إِخْرَاجًا وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ بِسَاطًا لِتَسْلُكُوا مِنْهَا سُبُلًا فِجَاجًا
'তোমরা কি দেখোনি আল্লাহ কীভাবে সৃষ্টি করেছেন সপ্তম্ভরে বিন্যস্ত আকাশমণ্ডলী? এবং সেখানে চন্দ্রকে স্থাপন করেছেন আলোকরূপে, সূর্যকে স্থাপন করেছেন প্রদীপরূপে। তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে। অতঃপর তিনি তোমাদের ফিরিয়ে নেবেন এবং তারপর পুনরুত্থিত করবেন। আল্লাহ তোমাদের জন্য ভূমিকে করেছেন বিস্তৃত। যাতে তোমরা চলাফেরা করতে পারো প্রশস্ত পথে। '
সুরা যুমারে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ
'তারা আল্লাহর যথোচিত সম্মান করে না। কেয়ামতের দিন সমস্ত পৃথিবী থাকবে তার হাতের মুঠোয় এবং আকাশমণ্ডলী থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তার দক্ষিণ হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি। তারা যাকে শরিক করে তিনি তার ঊর্ধ্বে। '
কবি বড় চমৎকার বলেছেন, 'হে আদম সন্তান! তুমি যখন জন্মেছিলে কাঁদতে ছিলে, হাসতে ছিল সবাই। এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, যেন মরণে হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভুবন।'
আর তা তখনই সম্ভব হবে যদি আল্লাহ তায়ালাকে যথোচিত সম্মান করো। তার যাবতীয় হক যথাযথ আদায় করো। যদি আল্লাহর আদেশের অবাধ্যতা করো, হারাম ও নাজায়েজ কাজে লিপ্ত হও, তাহলে তার হক আদায় হবে না। যথোচিত সম্মান রক্ষা হবে না। তার যথোচিত সম্মান রক্ষা হবে তখন যখন তুমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ব্যাপারে যত্নবান হবে। মসজিদের সাথে তোমার সম্পর্ক হবে গভীর। আর যদি উদাসীনতা ও গাফলতের ঘুমে বিভোর থাকো তাহলে আল্লাহ তায়ালার হক ও সম্মান যথোচিত আদায় হবে না। যদি জীবনভর অবাধ্যতা ও পাপাচারিতায় লিপ্ত থাকো তাহলে জন্মেছিলে যেমন কাঁদতে কাঁদতে, তেমনি মরণ হবে কাঁদতে কাঁদতে।
টিকাঃ
৪৯. সুরা যুমার: ৬৭।
৫০. সুরা নুহ: ১৩।
৫১. সুরা নুহ: ১৪।
৫২. সুরা দাহর: ১-৪।
৫৩. সুরা নুহ: ১৪।
৫৪. সুরা নুহ: ১৫-২০।
৫৫. সুরা যুমার: ৬৭।