📄 নামাজ জীবনকে সুসংহত করে
মানুষকে সৎপথে চলতে এবং তাদের অন্তরে ঈমান বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের চেয়ে অধিক শক্তিশালী আর কিছু নেই। যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি যত্নবান সে দ্বীনের অন্যান্য বিষয়ের প্রতিও যত্নবান। আর যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি উদাসীন সে দ্বীনের অন্যান্য শাখার প্রতিও উদাসীন। আমি অত্যন্ত আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি এ কথা, যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথ আদায় করে সে কখনো তাদের মতো হতে পারে না, যারা একইসঙ্গে আখেরাতের প্রাসাদ নির্মাণ করে এবং ভেঙে ফেলে। তারা তো ওইসকল ব্যক্তি যারা নিজেদের নামাজের প্রতি যত্নবান না। আল্লাহর নামে সাক্ষ্য রেখে বলছি, যদি কেউ চল্লিশ দিন মসজিদে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করে সে অবশ্যই সঠিক পথের অনুসারী হবে। আল্লাহ তাকে সঠিক পথপ্রদর্শন করবেন। সে কখনো তার অতীত গোনাহের জীবনে ফিরে যেতে চাইবে না। পুনরায় অবাধ্যতা ও নাফরমানির জীবনে তারাই ফিরে যায় যারা নামাজ পড়ে না। নিজেদের নামাজের যথাযথ সংরক্ষণ করে না।
তুমি কি পারবে চল্লিশ দিন জামাতের সাথে নামাজ আদায় করতে? আমাদের পূর্ববর্তী যারা সফলকাম হয়েছে তারা সুদীর্ঘ বছর মসজিদে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তো এমন রয়েছে যারা চল্লিশ বছর আবার কেউ কেউ পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত তাকবিরে উলার সাথে নামাজ আদায় করেছে। এতো সুদীর্ঘকাল তাদের তাকবিরে উলা ছুটেনি একবারও।
টিকাঃ
৪১. সুরা কাহফ: ১৩।
৪২. সুরা মুহাম্মদ: ১৭।
📄 আনুগত্যই হৃদয়ের চিকিৎসা
কেউ যখন অসুস্থ হয় তখন সে ডাক্তারের নিকট যায়। চিকিৎসা গ্রহণ করে। নিয়মিত চিকিৎসকের কথানুযায়ী চলে আরোগ্য লাভ করে। তেমনিভাবে যাদের ঈমান দুর্বল তাদের চিকিৎসা হলো আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকা। সকল অবাধ্যতা নাফরমানي পরিহার করা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া। চল্লিশ দিন পর্যন্ত এভাবে দৃঢ়তার সাথে যদি চলতে পারে তাহলে কখনো পেছনের নোংরা ও ক্লেদাক্ত জীবনে কিছুতেই ফিরে যেতে সম্মত হবে না।
📄 প্রার্থনায় সদা বিগলিত হও
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি যদি আপনার আনুগত্যপরায়ণ ও নেককার বান্দাদের ব্যতীত কাউকে ক্ষমা না করেন, তাহলে গোনাহগার ও পাপী বান্দারা কোথায় যাবে? কার নিকট তারা আশ্রয় প্রার্থনা করবে? হে আল্লাহ! আপনি যদি কেবল মুত্তাকি বান্দাদের প্রতি রহম করেন তাহলে আপনার অবাধ্য ও পাপাচারী বান্দারা কার নিকট সাহায্য কামনা করবে? আপনি তো তাদেরও রব। আপনি ছাড়া তো কেউ নেই তাদের। হে আল্লাহ! যারা অসহায় ও দরিদ্র তারা তো ধনীদের দুয়ারে যাবেই। হে আল্লাহ আপনার চেয়ে বড় ধনী আর কে আছে? হে আল্লাহ যারা লাঞ্ছিত, অপমানিত তারা তো সম্মানিতদের দুয়ারে করাঘাত করবেই। হে আল্লাহ আপনার চেয়ে অধিক সম্মানিত আর কে আছে। হে রাহমানুর রহিম! হে আরহামার রাহিমিন! আপনি ক্ষমা করে দিন। আপনি ক্ষমা করে দিন। আপনি কাছে টেনে নিন। আপনি অনুগ্রহ করুন। আপনি করুনা করুন। আপনি আমাদের আপনার আনুগত্যের তাওফিক দিন। আপনি আমাদের আপনার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।
হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট আপনার ভালোবাসা কামনা করি। আমরা আপনার অন্তরপূর্ণ ভালোবাসা প্রার্থনা করি। এবং প্রার্থনা করি ওই ব্যক্তির ভালোবাসা যে আপনাকে ভালোবাসে। হে আল্লাহ! আপনি আপনার ভালোবাসাকে আমাদের অন্তরে পিপাসার্ত ব্যক্তির নিকট পানির চেয়ে অধিক প্রিয় বানিয়ে দিন। হে আল্লাহ! আপনি ঈমানকে আমাদের নিকট প্রিয় বানিয়ে দিন। আমাদের অন্তরে ঈমানকে সুসজ্জিত করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি কুফর, ফুসুক ও গোনাহকে আমাদের নিকট ঘৃণিত করে দিন। হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের সৎপথে পরিচালিত করুন।
📄 জান্নাতের সুসংবাদ
إِنَّ الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونعوذ بالله من شرور أنفسنا، ومن سيئات أعمالنا. من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلل فلا هادي له. وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمداً عبده ورسوله. يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُمْ مُسلِمُونَ
মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমকে তার প্রিয় বন্ধু ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর নিকট রহমত ও সুসংবাদরূপে প্রেরণ করেছেন। কুরআনুল কারিম আপাদমস্তক একটি উপদেশ গ্রন্থ। এর পরতে পরতে, ছত্রে ছত্রে আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করেছেন মানবজাতির প্রতি অসংখ্য উপদেশ। এসব উপদেশ বান্দার ঘুমন্ত সত্তাকে জাগ্রত করে। বান্দার অবাধ্য ও পাপাচারী অন্তরকে সংশোধন করে। অন্ধকার থেকে চিরন্তর আলোর পথে পরিচালিত করে। ভ্রষ্টতার বেড়াজাল ছিন্ন করে মানুষকে সরল ও সঠিক পথের পথনির্দেশ করে। কুফর ও শিরকের মূলোৎপাটন করে ঈমান ও ইয়াকিনের নুর প্রজ্জ্বলিত করার জন্যই কুরআনের অবতরণ।
জমিন যেমন আসমান থেকে অবতীর্ণ বৃষ্টির ছোঁয়া না পেলে মৃত ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে তেমনি মানুষের সত্তা যখন আসমানি গ্রন্থ কুরআনুল কারিমের ছোঁয়া ও পরশ থেকে বঞ্চিত হয় তখন সে মৃত ও নির্জীব সত্তায় পর্যবসিত হয়। জমিন যেমন প্রখর রোদে আসমানের পানে তাকিয়ে বৃষ্টির এক ফোঁটা শীতল পরশের জন্য হাহাকার করে, তেমনি প্রতিটি মানুষের আত্মা আসমানি গ্রন্থ পবিত্র কুরআনের সান্নিধ্য ও তার রুহানিয়তের জন্য হাহাকার করতে থাকে। আসমান থেকে যখন রাশি রাশি বৃষ্টির ফোঁটা ঝরতে থাকে তখন মৃত ও শুকনো জমিন নবপ্রাণে জেগে ওঠে। চারদিক সেজে উঠে সুন্দর সবুজ শ্যামলিমায়, তেমনি বান্দার তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে যখন পবিত্র কুরআনের উপদেশ ঝরতে থাকে তখন তার ঘুমন্ত হৃদয় জেগে ওঠে নবচেতনায়, নতুন প্রাণে।
মিথ্যার মায়াজাল ছিন্ন করে সত্যগ্রহণে হয়ে ওঠে উদগ্রীব। ইতিহাস সাক্ষী, কুরআনের পরশে বহু কাফের-মুশরিক ঈমানের শীতল শামিয়ানায় আশ্রয়প্রাপ্ত হয়েছে। অন্ধকার থেকে তারা ছুটে এসেছে আলোর বিয়াবানে। ভ্রষ্টতার দিগন্ত থেকে আলোকোজ্জ্বল প্রান্তরে ঘটেছে তাদের সুভাগমন। কুরআন এক পরশপাথরের নাম, যার ছোঁয়ায় কাফের হয়ে যায় মুমিন। অন্ধ হয়ে যায় আলো দৃষ্টিসম্পন্ন। বধির হয়ে যায় জাগ্রত ও চৌকষ।
ইরশাদ হয়েছে, وَتَرَى الْأَرْضَ هَامِدَةً فَإِذَا أَنزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ وَأَنْبَتَتْ مِنْ كُلِّ زَوْجٍ بَهِيجٍ 'তুমি ভূমিকে দেখো শুষ্ক, অতঃপর তাতে আমি বৃষ্টি বর্ষণ করলে তা শষ্য-শ্যামল হয়ে আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উৎপন্ন করে সকল প্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ। '
এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় এ কথা, আল্লাহ তায়ালা মৃতকে জীবিত করেন। নির্জীবকে করেন সজীব। প্রাণহীনকে করেন সপ্রাণ। এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তায়ালা সেই সত্তা যিনি সকল কিছুর ক্ষমতাবান।
ইরশাদ হয়েছে, 'তা এজন্য যে, আল্লাহ সত্য এবং তিনি মৃতকে জীবন দান করেন, তিনি সর্ববিষয়ে শক্তিমান। '
وَأَنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ لَا رَيْبَ فِيهَا وَأَنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ مَنْ فِي الْقُبُورِ 'কেয়ামাত আসবেই, এতে কোনো সন্দেহ নেই। যারা কবরে আছে তাদের নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্থিত করবেন। '
তুমি কি দেখো না যখন আসমান থেকে থোকা থোকা বৃষ্টি ঝরে তখন কীভাবে নবপ্রাণে জেগে ওঠে মৃতপ্রায় জমিন? কীভাবে প্রাণের হিন্দোলে নেচে ওঠে সবুজ শ্যামলিমা? হ্যাঁ, ঠিক সেভাবেই কুরআনের উপদেশবাণী মানুষের অন্তরকে জাগিয়ে তোলে। তাদের হৃদয়ে ঈমান ও সত্যের দোলা দেয়।
জেনো, আসমানের বৃষ্টি ব্যতীত জমিন যেমন মৃত ও শুষ্কে পরিণত হয় তেমনি কুরআনের ছোঁয়া ও উপদেশ ব্যতীত মানুষের আত্মাও প্রাণহীন ও নির্জীব। কুরআন আল্লাহর বাণী। আর আল্লাহর স্মরণ ব্যতীত অন্তর জীবিত থাকতে পারে না। যেমন রুহ ছাড়া দেহ জীবিত থাকে না।
সুতরাং আল্লাহর স্মরণে সজীব যে আত্মা কেবল সে আত্মাই জীবিত। পক্ষান্তরে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ ও দূরে সরে আছে যে আত্মা তা প্রকারান্তরে মৃত, প্রাণহীন। কুরআনের উপদেশ এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ থেকে যারা দূরে সরে আছে তারা আসমানের বৃষ্টিবঞ্চিত জমিনের ন্যায় মৃত।
টিকাঃ
৪৩. সুরা হজ: ৫।
৪৪. সুরা হজ: ৬।
৪৫. সুরা হজ: ৭।