📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 রাসূলের সাথে এক সাহাবির কথোপকথন

📄 রাসূলের সাথে এক সাহাবির কথোপকথন


শোনো! কীভাবে অন্তরে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে তার পদ্ধতির কথা। একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববিতে প্রবেশ করে হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে হারেসা! আজ তুমি কীভাবে সকাল যাপন করেছ?' উত্তরে হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'প্রকৃত মুমিন অবস্থায় সকাল করেছি।' অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারেসাকে বললেন, 'ঈমানের হাকিকত কী?' প্রত্যুত্তরে হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি আমার অন্তরকে পার্থিব সকল মোহ ও আসক্তি থেকে বিরত রেখেছি। আর এটিই ঈমানের হাকিকত।' হে আল্লাহর বান্দা! শোনো ঈমানের নিদর্শন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশ্নের উত্তরে হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'অন্তরকে দুনিয়া থেকে বিরত রাখা। দুনিয়ার প্রতি আসক্তি ও আকৃষ্ট হওয়া থেকে অন্তরকে সংবরণ করা। সেই তো প্রকৃত মুমিন যার অন্তরে নেই দুনিয়ার প্রতি কোনো মোহ। আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের দুনিয়ার ধোঁকা ও প্রবঞ্চনা থেকে অধিকতর সতর্ক করেছেন।'

ইরশাদ হয়েছে, فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُم بِاللَّهِ الْغَرُورُ 'সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদের কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং সেই প্রবঞ্চক যেন তোমাদের কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে প্রবঞ্চিত না করে।'

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশ্নের উত্তরে হযরত হারেসা বলেছেন, 'আমি আমার অন্তরকে দুনিয়ার মোহ থেকে বিরত রেখেছি। আর এটিই হলো ঈমানের হাকিকত।'

সুতরাং অপরিহার্য হলো অন্তরকে দুনিয়ার মোহ ও আসক্তি থেকে সর্বতোভাবে বিরত রাখা। এবং সেই সঙ্গে মুমিনের জন্য অত্যাবশ্যক হলো অধিক পরিমাণে নেক আমল করা। হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, 'ঈমান কেবল আশা-আকাঙ্ক্ষার নাম নয়।

ঈমান তিন জিনিসের সমষ্টি। (এক) অন্তরের সুদৃঢ় বিশ্বাস, (দুই) মৌখিক স্বীকারোক্তি, (তিন) অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তৃক আমল।'

অতএব ঈমান আনার পর মুমিনের জন্য অপরিহার্য হলো আমল করা। হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, 'আমি রাত্রি জাগরণ করি নামাজরত অবস্থায় এবং দিনকে পিপাসার্ত করি রোজা অবস্থায়।'

হযরত হাসান বসরি রহ.-এর এ কথা রমজান মাসের ব্যাপারে নয়। আমরা তো রমজান মাস ব্যতীত অন্যান্য সময়ে রাতের নামাজ এবং দিনে রোজা রাখি না। হযরত হাসান বসরি রহ. তার ব্যাপারে এ স্বীকারোক্তি দিয়েছেন সব সময়ের জন্য। সর্বদা রাতে অধিক নামাজ পড়তেন। দিনে রোজা রাখতেন।

টিকাঃ
৩৭. সুরা লুকমান: ৩৩।

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 দ্বীনের স্তর তিনটি

📄 দ্বীনের স্তর তিনটি


দ্বীনের তিনটি স্তর রয়েছে। ইসলাম, ঈমান ও ইহসান।

বান্দা প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর যখন ইসলাম থেকে ঈমানের স্তরে উন্নীত হয় তখন এর দ্বারা ক্রমান্বয়ে সে ইহসানের স্তরে যাত্রা করে। আমাদের জন্য তাই অত্যাবশ্যক হলো ইসলাম গ্রহণ করার পর ক্রমান্বয়ে ঈমানের স্তরে উন্নীত হওয়া অতঃপর ইহসানের স্তরে উন্নীত হওয়া। সর্বোচ্চ মুমিন তারাই যারা ইহসানের স্তরে উন্নীত হয়েছে।

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 কে উত্তম কে অধম

📄 কে উত্তম কে অধম


ইরশাদ হয়েছে, الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য যে, কে তোমাদের মধ্যে অধিক উত্তম আমলকারী।

মানুষের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয় হবে উত্তম আমলের ভিত্তিতে। যার আমল যত উত্তম হবে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নিকট তার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব হবে ততই অধিক। সকলেই আমল করে, আল্লাহর আনুগত্য করে, আদেশ- নিষেধ মেনে চলে, কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে আমল ও আনুগত্যের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। সকলেই নামাজ পড়ে কিন্তু তাদের নামাজের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। কারো নামাজ হয় অধিক সুন্দর। নামাজের সময় অন্তরে আল্লাহর উপস্থিতি থাকে পূর্ণমাত্রায়। যেমনটি হাদিসে বলা হয়েছে যে, তুমি আল্লাহর ইবাদত করো যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ। অথবা তিনি তোমাকে দেখছেন। পক্ষান্তরে কারো নামাজ হয় ভিন্ন। যেন কেবল রুকু সেজদা করছে। অন্তরে বিশেষ অবস্থা বিরাজ করে না। আল্লাহর ধ্যান আসে না। মুরাকাবা হয় না।

দ্বীন হলো আল্লাহ ও বান্দার মাঝে এক বিশেষ প্রতিশ্রুতি। এক বিশেষ অঙ্গীকার। বান্দাদের মধ্যে কতক রয়েছে যারা সেই প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার রক্ষা করে। আল্লাহ ও তাদের মাঝে কৃত ওয়াদা পালন করে।

ইরশাদ হয়েছে, مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ

'মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে।'

বান্দা যখন ঈমানের স্তরে উন্নীত হয় তখন সে বলে, আমি রাত্রি জাগরণ করি নামাজে দণ্ডায়মান অবস্থায় এবং দিবস যাপন করি রোজা রেখে পিপাসার্ত অবস্থায়। এবং বান্দা আরো বলে, কেমন যেন আমি আল্লাহর আরশ দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি জান্নাত ও জাহান্নাম; যেখানে এর অধিবাসীরা বিচরণ করছে।

বান্দা যখন ঈমানের স্তরে উন্নীত হয় তখন তার পরিণাম ও ফলাফল হয় অত্যন্ত শুভ। তার জীবন হয় সফল। দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতে সে হয় ধন্য। বদরের যুদ্ধে হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু শহিদ হয়েছেন। হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মা এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! হারেসা কি জান্নাতে গিয়েছে নাকি জাহান্নামে গিয়েছে? যদি জান্নাতে যায় তাহলে আমি খুশি হবো আর যদি জাহান্নামে যায় তাহলে আমি তার জন্য ক্রন্দন করব।' হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মায়ের কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হারেসা জান্নাতুল ফেরদৌসের সুউচ্চ স্তরে পৌঁছে গেছে।'

হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু কীভাবে এই সুবিশাল মর্যাদা লাভ করলেন? কীসের বলে এই সুউচ্চ শ্রেষ্ঠত্বে তিনি আরোহণ করলেন?

আল্লাহর শপথ! হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু এই মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব কেবল ঈমানের কারণেই লাভ করেছেন।

টিকাঃ
৩৮. সুরা মুলক: ২।
৩৯. সুরা আহযাব: ২৩।

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 এসো শামিল হই পুণ্যের কাফেলায়

📄 এসো শামিল হই পুণ্যের কাফেলায়


ওইসমস্ত লোকেরা ঈমানের বলে বলীয়ান ছিল বলেই দুনিয়া-আখেরাতে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা লাভ করেছে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সাথে সুগভীর সম্পর্ক ছিল বলেই তারা আখেরাতের জন্য নির্মাণ করতে পেরেছে সুরম্য প্রাসাদ। বর্তমানে আমাদের ঈমান অত্যন্ত দুর্বল। ঈমানের নুর আমাদের অন্তরে প্রতিফলিত হয় না। আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক নড়বড়ে। যার ফলে সম্মান ও মর্যাদা আমাদের পদচুম্বন করছে না। আখেরাতের জন্য আমরা নির্মাণ করতে পারছি না শান্তি ও সুখের সুরম্য প্রাসাদ, মৃত্যুর পর যেখানে আরাম ও প্রাচুর্যের সাথে বসবাস করব। আমাদের ঈমান এতই দুর্বল যে, ফজরের নামাজের জন্য আমাদের জাগ্রত করতে পারে না। আল্লাহর অনুগ্রহ ও কৃপা লাভের জন্য নিদ্রা ও বিছানা থেকে পৃথক করতে পারে না। এমন শক্তিহীন ও ভঙ্গুর ঈমান দিয়ে আখেরাতে শক্তিশালী ও সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করা সম্ভবপর নয়।

কবি বড় চমৎকার বলেছেন,

'এ তো বিরাট হাস্যকর ব্যাপার যে, তুমি কোনো প্রকার কষ্ট ও বিবর্ণতা ছাড়াই মর্যাদা ও আভিজাত্যের সুউচ্চ শিখরে আরোহণ করতে চাও। জেনে রেখো! মৌচাক থেকে মধু আহরণ করতে হলে মৌমাছির সরু হুল তোমার বিদ্ধ হবেই।'

সুতরাং যার ঈমান যত শক্তিশালী হবে তার প্রাসাদ তত সুদৃঢ় হবে। আর যার ঈমান যত দুর্বল হবে তার প্রাসাদ তত দুর্বল হবে। তাই আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক হলো আল্লাহর অধিক আনুগত্য করা। অন্তরকে আল্লাহর আদেশ পালন করতে এবং নিষেধ থেকে বেঁচে থাকতে বাধ্য করা। এ ব্যাপারে সচেষ্ট থাকা যেন আনুগত্যের সাথে সাথে অবাধ্যতার সংমিশ্রণ না ঘটে। যেন আল্লাহর আদেশসমূহ পালনের পাশাপাশি হারাম ও নাজায়েজ কাজে লিপ্ত না হই। তাহলে একদিকে প্রাসাদ নির্মিত হবে অপরদিকে তা ভেঙে পড়বে। আনুগত্য ও ইবাদত হতে হবে নির্ভেজাল গোনাহমুক্ত।

আমাদের অন্তরে যখন ঈমান গেঁথে যাবে, যখন ঈমানকে হৃদয়ে অনুভব করতে পারব এবং ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারব তখন ঈমান পরিত্যাগ করে পুনরায় পেছনে ফিরে যেতে কখনো সম্মত হবে না। যারা প্রথমে আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে লিপ্ত ছিল, আখেরাতের প্রাসাদ ধ্বংস করত, তারা যখন ঈমানের ওপর অটল ও অবিচল হয়ে গেল তখন আমি তাদের জিজ্ঞেস করেছি যে, তারা কি পুনরায় তাদের অতীত জীবনে ফিরে যেতে চায় কি-না? তাদের একজনও সম্মত হয়নি অতীতের ক্লেদাক্ত ও পঙ্কিল জীবনে ফিরে যেতে। কেননা তাদের হৃদয়ে ঈমান গেঁথে গেছে। তারা ঈমানের মিষ্টতা আস্বাদন করেছে। ঈমানের মিষ্টতা একবার যে আস্বাদন করেছে সে কখনো কুফর ও আল্লাহর অবাধ্যতাকে পছন্দ করে না। আল্লাহর নৈকট্য যত বেশি অর্জন করবে ঈমান ততই সমুজ্জ্বল হবে। অন্তর ততই আলোকিত হবে।

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

من تقرب إلي شبراً تقربت إليه ذراعاً، ومن تقرب إلي ذراعاً تقربت إليه باعاً

‘যে ব্যক্তি আমার দিকে এক বিগত অগ্রসর হবে আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হবো। যে এক হাত অগ্রসর হবে আমি তার দিকে প্রসারিত দুই বাহু পরিমাণ অগ্রসর হবো।’

আল্লাহ তায়ালা আসহাবে কাহফের যুবকদের সম্পর্কে ইরশাদ করেন, نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ نَبَأَهُمْ بِالْحَقِّ إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَاهُمْ هُدًى '(হে নবী!) আমি আপনার নিকট তাদের বৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি, তারা ছিল কয়েকজন যুবক, তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদের (হেদায়েত) সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেছি।'

ইরশাদ হয়েছে, وَالَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى وَآتَاهُمْ تَقْواهُمْ 'যারা সৎপথ অবলম্বন করে আল্লাহ তাদের (হেদায়েত) সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেন এবং তাদের মুত্তাকি হওয়ার শক্তি দান করেন।'

টিকাঃ
৪০. সুরা ইউনুস: ৯-১০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00