📄 আনুগত্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রতিদান
আখেরাতের প্রাসাদ হেফাজতের জন্য প্রয়োজন সীমাহীন প্রচেষ্টা। প্রয়োজন প্রবল ধৈর্যধারণ। আল্লাহ তায়ালার সাথে সততাপূর্ণ নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন। ইরশাদ হয়েছে,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ وَاخْشَوْا يَوْمًا لَّا يَجْزِي وَالِدٌ عَن وَلَدِهِ وَلَا مَوْلُودٌ هُوَ جَازٍ عَن وَالِدِهِ شَيْئًا إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ * فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاوةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُم بِاللَّهِ الْغَرُورُ
'হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। ভয় করো সেদিনের যখন পিতা সন্তানের কোনো উপকারে আসবে না, সন্তানও কোনো উপকারে আসবে না তার পিতার। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদের কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং সেই প্রবঞ্চক যেন তোমাদের কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে প্রবঞ্চিত না করে। '
টিকাঃ
৩৬. সুরা লুকমান: ৩৩।
📄 রাসূলের সাথে এক সাহাবির কথোপকথন
শোনো! কীভাবে অন্তরে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে তার পদ্ধতির কথা। একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববিতে প্রবেশ করে হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে হারেসা! আজ তুমি কীভাবে সকাল যাপন করেছ?' উত্তরে হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'প্রকৃত মুমিন অবস্থায় সকাল করেছি।' অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারেসাকে বললেন, 'ঈমানের হাকিকত কী?' প্রত্যুত্তরে হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি আমার অন্তরকে পার্থিব সকল মোহ ও আসক্তি থেকে বিরত রেখেছি। আর এটিই ঈমানের হাকিকত।' হে আল্লাহর বান্দা! শোনো ঈমানের নিদর্শন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশ্নের উত্তরে হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'অন্তরকে দুনিয়া থেকে বিরত রাখা। দুনিয়ার প্রতি আসক্তি ও আকৃষ্ট হওয়া থেকে অন্তরকে সংবরণ করা। সেই তো প্রকৃত মুমিন যার অন্তরে নেই দুনিয়ার প্রতি কোনো মোহ। আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের দুনিয়ার ধোঁকা ও প্রবঞ্চনা থেকে অধিকতর সতর্ক করেছেন।'
ইরশাদ হয়েছে, فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُم بِاللَّهِ الْغَرُورُ 'সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদের কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং সেই প্রবঞ্চক যেন তোমাদের কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে প্রবঞ্চিত না করে।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশ্নের উত্তরে হযরত হারেসা বলেছেন, 'আমি আমার অন্তরকে দুনিয়ার মোহ থেকে বিরত রেখেছি। আর এটিই হলো ঈমানের হাকিকত।'
সুতরাং অপরিহার্য হলো অন্তরকে দুনিয়ার মোহ ও আসক্তি থেকে সর্বতোভাবে বিরত রাখা। এবং সেই সঙ্গে মুমিনের জন্য অত্যাবশ্যক হলো অধিক পরিমাণে নেক আমল করা। হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, 'ঈমান কেবল আশা-আকাঙ্ক্ষার নাম নয়।
ঈমান তিন জিনিসের সমষ্টি। (এক) অন্তরের সুদৃঢ় বিশ্বাস, (দুই) মৌখিক স্বীকারোক্তি, (তিন) অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তৃক আমল।'
অতএব ঈমান আনার পর মুমিনের জন্য অপরিহার্য হলো আমল করা। হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, 'আমি রাত্রি জাগরণ করি নামাজরত অবস্থায় এবং দিনকে পিপাসার্ত করি রোজা অবস্থায়।'
হযরত হাসান বসরি রহ.-এর এ কথা রমজান মাসের ব্যাপারে নয়। আমরা তো রমজান মাস ব্যতীত অন্যান্য সময়ে রাতের নামাজ এবং দিনে রোজা রাখি না। হযরত হাসান বসরি রহ. তার ব্যাপারে এ স্বীকারোক্তি দিয়েছেন সব সময়ের জন্য। সর্বদা রাতে অধিক নামাজ পড়তেন। দিনে রোজা রাখতেন।
টিকাঃ
৩৭. সুরা লুকমান: ৩৩।
📄 দ্বীনের স্তর তিনটি
দ্বীনের তিনটি স্তর রয়েছে। ইসলাম, ঈমান ও ইহসান।
বান্দা প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর যখন ইসলাম থেকে ঈমানের স্তরে উন্নীত হয় তখন এর দ্বারা ক্রমান্বয়ে সে ইহসানের স্তরে যাত্রা করে। আমাদের জন্য তাই অত্যাবশ্যক হলো ইসলাম গ্রহণ করার পর ক্রমান্বয়ে ঈমানের স্তরে উন্নীত হওয়া অতঃপর ইহসানের স্তরে উন্নীত হওয়া। সর্বোচ্চ মুমিন তারাই যারা ইহসানের স্তরে উন্নীত হয়েছে।
📄 কে উত্তম কে অধম
ইরশাদ হয়েছে, الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য যে, কে তোমাদের মধ্যে অধিক উত্তম আমলকারী।
মানুষের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয় হবে উত্তম আমলের ভিত্তিতে। যার আমল যত উত্তম হবে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নিকট তার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব হবে ততই অধিক। সকলেই আমল করে, আল্লাহর আনুগত্য করে, আদেশ- নিষেধ মেনে চলে, কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে আমল ও আনুগত্যের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। সকলেই নামাজ পড়ে কিন্তু তাদের নামাজের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। কারো নামাজ হয় অধিক সুন্দর। নামাজের সময় অন্তরে আল্লাহর উপস্থিতি থাকে পূর্ণমাত্রায়। যেমনটি হাদিসে বলা হয়েছে যে, তুমি আল্লাহর ইবাদত করো যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ। অথবা তিনি তোমাকে দেখছেন। পক্ষান্তরে কারো নামাজ হয় ভিন্ন। যেন কেবল রুকু সেজদা করছে। অন্তরে বিশেষ অবস্থা বিরাজ করে না। আল্লাহর ধ্যান আসে না। মুরাকাবা হয় না।
দ্বীন হলো আল্লাহ ও বান্দার মাঝে এক বিশেষ প্রতিশ্রুতি। এক বিশেষ অঙ্গীকার। বান্দাদের মধ্যে কতক রয়েছে যারা সেই প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার রক্ষা করে। আল্লাহ ও তাদের মাঝে কৃত ওয়াদা পালন করে।
ইরশাদ হয়েছে, مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ
'মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে।'
বান্দা যখন ঈমানের স্তরে উন্নীত হয় তখন সে বলে, আমি রাত্রি জাগরণ করি নামাজে দণ্ডায়মান অবস্থায় এবং দিবস যাপন করি রোজা রেখে পিপাসার্ত অবস্থায়। এবং বান্দা আরো বলে, কেমন যেন আমি আল্লাহর আরশ দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি জান্নাত ও জাহান্নাম; যেখানে এর অধিবাসীরা বিচরণ করছে।
বান্দা যখন ঈমানের স্তরে উন্নীত হয় তখন তার পরিণাম ও ফলাফল হয় অত্যন্ত শুভ। তার জীবন হয় সফল। দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতে সে হয় ধন্য। বদরের যুদ্ধে হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু শহিদ হয়েছেন। হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মা এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! হারেসা কি জান্নাতে গিয়েছে নাকি জাহান্নামে গিয়েছে? যদি জান্নাতে যায় তাহলে আমি খুশি হবো আর যদি জাহান্নামে যায় তাহলে আমি তার জন্য ক্রন্দন করব।' হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মায়ের কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হারেসা জান্নাতুল ফেরদৌসের সুউচ্চ স্তরে পৌঁছে গেছে।'
হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু কীভাবে এই সুবিশাল মর্যাদা লাভ করলেন? কীসের বলে এই সুউচ্চ শ্রেষ্ঠত্বে তিনি আরোহণ করলেন?
আল্লাহর শপথ! হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু এই মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব কেবল ঈমানের কারণেই লাভ করেছেন।
টিকাঃ
৩৮. সুরা মুলক: ২।
৩৯. সুরা আহযাব: ২৩।