📄 একজন হাসান বসরি এবং আমাদের তফাত
হযরত হাসান বসরি রহ.-এর সন্তান বলেন, একদিন আমার পিতা রোজা অবস্থায় ছিলেন। যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো তখন ইফতারির জন্য আমি তার নিকট খাবার নিয়ে গেলাম এবং ইফতার গ্রহণের জন্য অনুরোধ করলাম। আমার হাতে খাবারের পাত্র দেখে তিনি কাঁদতে শুরু করেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত কাঁদতে থাকেন যতক্ষণ পর্যন্ত না খাবারের প্রতি তার অনাসক্তি তৈরি হয়। আমার পিতা সেদিন কিছুই আহার করেননি। অতঃপর তিনি পবিত্র কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করেন, إِنَّ لَدَيْنَا أَنكَالًا وَجَحِيمًا * وَطَعَامًا ذَا غُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا 'আমার নিকট আছে শৃঙ্খল ও প্রজ্বলিত আগুন। আর আছে এমন খাদ্য যা গলায় আটকে যায় এবং আছে মর্মন্তুদ শাস্তি। ৩১ এভাবে সারা রাত তিনি না খেয়েই কাটান। রাতভর ইবাদতে মশগুল থাকেন। পরদিনও তিনি রোজা রাখেন। যথারীতি যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আমি ইফতারের জন্য খাবার নিয়ে যাই এবং ইফতার গ্রহণের জন্য অনুরোধ করি। কিন্তু গতকালের ন্যায় আজও তিনি খাবার ফিরিয়ে দিলেন। অতঃপর তিলাওয়াত করেন,
إِنَّ لَدَيْنَا أَنكَالًا وَجَحِيمًا * وَطَعَامًا ذَا غُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا 'আমার নিকট আছে শৃঙ্খল ও প্রজ্বলিত আগুন। আর আছে এমন খাদ্য যা গলায় আটকে যায় এবং আছে মর্মন্তুদ শান্তি।'
এভাবে তৃতীয় দিনও তিনি রোজা রাখেন। খাদ্য ও পানীয় কিছুই গ্রহণ করেননি। রাতভর কেবল কান্নাকাটি করতেন। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতেন।
আল্লাহর শপথ! তারা খাদ্য ও পানীয় থেকেও দূরে থাকতেন কেবল এ জন্য যে, তাদের অন্তরে আখেরাতের ভয় ছিল অত্যধিক। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়াকে তারা ভয় করতেন। ভয় করতেন আল্লাহর বিচারকার্যকে। আখেরাতের ভয় তাদের অন্তর থেকে সকল কিছুর স্বাদ আস্বাদন ভুলিয়ে দিয়েছিল।
অতঃপর যখন তৃতীয় দিনও হাসান বসরি রহ. খাদ্য ও পানীয় ফিরিয়ে দিলেন তখন তার ছেলে কাঁদতে শুরু করে। আর বলতে থাকে, আমার, পিতা খাদ্য-পানীয় কিছুই গ্রহণ করছে না। তার কান্না দেখে হযরত হাসান বসরি রহ. খেজুরের সামান্য ছাতু মুখে দিলেন। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করেন,
إِنَّ لَدَيْنَا أَنكَالًا وَجَحِيمًا * وَطَعَامًا ذَا غُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا 'আমার নিকট আছে শৃঙ্খল ও প্রজ্বলিত আগুন। আর আছে এমন খাদ্য যা গলায় আটকে যায় এবং আছে মর্মন্তুদ শান্তি।'
يَوْمَ تَرْجُفُ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ وَكَانَتِ الْجِبَالُ كَثِيبًا مَّهِيلًا إِنَّا أَرْسَلْنَا إِلَيْكُمْ رَسُولًا شَاهِدًا عَلَيْكُمْ كَمَا أَرْسَلْنَا إِلَى فِرْعَوْنَ رَسُولًا فَعَصَى فِرْعَوْنُ الرَّسُولَ فَأَخَذْنَاهُ أَخْذًا وَبِيلًا
'সেদিন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে। পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে। আমি তোমাদের নিকট প্রেরণ করেছি একজন রাসুল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ, যেমন রাসুল প্রেরণ করেছিলাম ফিরাউনের নিকট। কিন্তু ফিরাউন সেই রাসুলকে অমান্য করেছিল। ফলে আমি তাকে কঠিন শাস্তি দিয়েছি।'
অতঃপর তিনি আমাদের লক্ষ্য করে বলেন, فَكَيْفَ تَتَّقُونَ إِن كَفَرْتُمْ يَوْمًا يَجْعَلُ الْوِلْدَانَ شِيبًا السَّمَاءُ مُنفَطِرُ بِهِ ، كَانَ وَعْدُهُ مَفْعُولًا إِنَّ هَذِهِ تَذْكِرَةٌ ، فَمَن شَاءَ اتَّخَذَ إِلَى رَبِّهِ سَبِيلًا
'অতএব তোমরা যদি কুফরি করো তবে কী করে আত্মরক্ষা করবে সেই দিন, যেদিন কিশোরকে পরিণত করবে বৃদ্ধে। যেদিন আকাশ হবে বিদীর্ণ। তার প্রতিশ্রুতি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। নিশ্চয়ই তা এক উপদেশ। অতএব যে চায় সে তার প্রতিপালকের পথ অবলম্বন করুক।'
দুনিয়াতে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য ও নেক আমলের দ্বারা মুমিন আখেরাতের সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করে। তাদের মধ্যে অনেকে সে প্রাসাদ নিজ কৃতকর্ম দ্বারা ধ্বংস করে ফেলে। কেউ কেউ তা ধ্বংস করা থেকে পরিপূর্ণরূপে হেফাজত করে।
টিকাঃ
৩১. সুরা মুজাম্মিল: ১২-১৩।
৩২. সুরা মুজাম্মিল: ১২-১৩।
৩৩. সুরা মুজাম্মিল: ১২-১৩।
৩৪. সুরা মুজাম্মিল: ১৪-১৫।
৩৫. সুরা মুজাম্মিল: ১৭-১৯।
📄 আনুগত্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রতিদান
আখেরাতের প্রাসাদ হেফাজতের জন্য প্রয়োজন সীমাহীন প্রচেষ্টা। প্রয়োজন প্রবল ধৈর্যধারণ। আল্লাহ তায়ালার সাথে সততাপূর্ণ নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন। ইরশাদ হয়েছে,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ وَاخْشَوْا يَوْمًا لَّا يَجْزِي وَالِدٌ عَن وَلَدِهِ وَلَا مَوْلُودٌ هُوَ جَازٍ عَن وَالِدِهِ شَيْئًا إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ * فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاوةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُم بِاللَّهِ الْغَرُورُ
'হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। ভয় করো সেদিনের যখন পিতা সন্তানের কোনো উপকারে আসবে না, সন্তানও কোনো উপকারে আসবে না তার পিতার। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদের কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং সেই প্রবঞ্চক যেন তোমাদের কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে প্রবঞ্চিত না করে। '
টিকাঃ
৩৬. সুরা লুকমান: ৩৩।
📄 রাসূলের সাথে এক সাহাবির কথোপকথন
শোনো! কীভাবে অন্তরে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে তার পদ্ধতির কথা। একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববিতে প্রবেশ করে হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে হারেসা! আজ তুমি কীভাবে সকাল যাপন করেছ?' উত্তরে হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'প্রকৃত মুমিন অবস্থায় সকাল করেছি।' অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারেসাকে বললেন, 'ঈমানের হাকিকত কী?' প্রত্যুত্তরে হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি আমার অন্তরকে পার্থিব সকল মোহ ও আসক্তি থেকে বিরত রেখেছি। আর এটিই ঈমানের হাকিকত।' হে আল্লাহর বান্দা! শোনো ঈমানের নিদর্শন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশ্নের উত্তরে হযরত হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'অন্তরকে দুনিয়া থেকে বিরত রাখা। দুনিয়ার প্রতি আসক্তি ও আকৃষ্ট হওয়া থেকে অন্তরকে সংবরণ করা। সেই তো প্রকৃত মুমিন যার অন্তরে নেই দুনিয়ার প্রতি কোনো মোহ। আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের দুনিয়ার ধোঁকা ও প্রবঞ্চনা থেকে অধিকতর সতর্ক করেছেন।'
ইরশাদ হয়েছে, فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُم بِاللَّهِ الْغَرُورُ 'সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদের কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং সেই প্রবঞ্চক যেন তোমাদের কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে প্রবঞ্চিত না করে।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশ্নের উত্তরে হযরত হারেসা বলেছেন, 'আমি আমার অন্তরকে দুনিয়ার মোহ থেকে বিরত রেখেছি। আর এটিই হলো ঈমানের হাকিকত।'
সুতরাং অপরিহার্য হলো অন্তরকে দুনিয়ার মোহ ও আসক্তি থেকে সর্বতোভাবে বিরত রাখা। এবং সেই সঙ্গে মুমিনের জন্য অত্যাবশ্যক হলো অধিক পরিমাণে নেক আমল করা। হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, 'ঈমান কেবল আশা-আকাঙ্ক্ষার নাম নয়।
ঈমান তিন জিনিসের সমষ্টি। (এক) অন্তরের সুদৃঢ় বিশ্বাস, (দুই) মৌখিক স্বীকারোক্তি, (তিন) অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তৃক আমল।'
অতএব ঈমান আনার পর মুমিনের জন্য অপরিহার্য হলো আমল করা। হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, 'আমি রাত্রি জাগরণ করি নামাজরত অবস্থায় এবং দিনকে পিপাসার্ত করি রোজা অবস্থায়।'
হযরত হাসান বসরি রহ.-এর এ কথা রমজান মাসের ব্যাপারে নয়। আমরা তো রমজান মাস ব্যতীত অন্যান্য সময়ে রাতের নামাজ এবং দিনে রোজা রাখি না। হযরত হাসান বসরি রহ. তার ব্যাপারে এ স্বীকারোক্তি দিয়েছেন সব সময়ের জন্য। সর্বদা রাতে অধিক নামাজ পড়তেন। দিনে রোজা রাখতেন।
টিকাঃ
৩৭. সুরা লুকমান: ৩৩।
📄 দ্বীনের স্তর তিনটি
দ্বীনের তিনটি স্তর রয়েছে। ইসলাম, ঈমান ও ইহসান।
বান্দা প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর যখন ইসলাম থেকে ঈমানের স্তরে উন্নীত হয় তখন এর দ্বারা ক্রমান্বয়ে সে ইহসানের স্তরে যাত্রা করে। আমাদের জন্য তাই অত্যাবশ্যক হলো ইসলাম গ্রহণ করার পর ক্রমান্বয়ে ঈমানের স্তরে উন্নীত হওয়া অতঃপর ইহসানের স্তরে উন্নীত হওয়া। সর্বোচ্চ মুমিন তারাই যারা ইহসানের স্তরে উন্নীত হয়েছে।