📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 বিপদসঙ্কুল পথ হুশিয়ার মুসাফির

📄 বিপদসঙ্কুল পথ হুশিয়ার মুসাফির


এক যুবকের করুণ গল্প বলছি। সে ছিল আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে লিপ্ত। তার ছিল অনেক বন্ধু; যারা সকলেই ছিল চরিত্রহীন লম্পট। আল্লাহর কোনো আদেশ তারা পালন করত না। বেঁচে থাকত না নিষেধসমূহ থেকে। নামাজ পড়ত না। অন্যায় ও পাপাচারিতার এহেন কোনো কর্ম ছিল না যা তারা করত না। হঠাৎ একদিন সে যুবক তার অসৎ বন্ধুদের সঙ্গ ত্যাগ করে। অতীতের সকল পাপকর্ম থেকে তওবা করে নতুন জীবনে প্রবেশ করে। আল্লাহ্র আদেশ পালন করে। নিষেধ থেকে বেঁচে থাকে। নামাজ পড়ে। ধীরে ধীরে সে ভালো ও মন্দের ফারাক চিনতে পেরেছে।

কিন্তু তার বন্ধুরা পূর্বের ন্যায় অবাধ্যতা ও পাপাচারিতায় মজে আছে। সে তার বন্ধুদের জন্য আক্ষেপ করতে লাগল। মৃত্যুর পর তাদের করুণ পরিণতির কথা ভেবে দারুণ দুঃখবোধ হতে লাগল তার অন্তরে। সে চিন্তা করল তার বন্ধুদের অবাধ্যতা ও নাফরমানি থেকে সৎপথে ফিরিয়ে আনবে। তাদের তওবা করিয়ে আলোর পথে পরিচালিত করবে। একদিন সে তার বন্ধুদের নিকট উপস্থিত হলো। কিন্তু সে বড় একটি ভুল করেছে। ভুলটি হলো, সে একা একা গিয়েছে তার বন্ধুদের দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। এর এটি খুব বড় একটি ভুল।

দ্বীনের পথে আগমনকারী প্রত্যেক নতুন ব্যক্তির জন্য এ এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী যে, কখনো একা কাউকে দ্বীনের দাওয়াত দিতে যাবে না। তাহলে তারা যখন দ্বীন সম্পর্কে নানান প্রশ্ন করতে শুরু করবে তখন সেসবের সঠিক উত্তর দিতে সে সক্ষম হবে না। ফলে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাকে আক্রমণ করতে শুরু করবে। তাকে নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস করবে। ফলে এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। যুবকটি এখানেই ভুল করল। সে তার বন্ধুদের নিকট যখন একাকী গিয়ে হাজির হলো তখন তারা তাকে নানান কটু কথা বলে জর্জরিত করতে লাগল। তার অতীত জীবনের বিভিন্ন পাপাচারিতার কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে লাগল। তাদের এহেন আচরণে যুবকটি ভীষণ কষ্ট পেল। তাদের সম্মিলিত আক্রমণের সামনে সে টিকতে পারেনি। ব্যর্থ মনে সে ফিরে এলো। তাই অবশ্যকর্তব্য হলো, একাকী কারো সংশোধন করতে না যাওয়া।

যুবকের বন্ধুরা বিভিন্ন ফন্দি করতে লাগল কীভাবে তাকে পুনরায় খারাপ পথে ফিরিয়ে আনা যায়। ফের কীভাবে তাকে তাদের দলে নিয়ে আসা যায়। একদিন তারা প্রতারণামূলকভাবে যুবকের নিকট গিয়ে বলল, আমরা নিকটস্থ এক জায়গায় ভ্রমণে যাব। তুমিও আমাদের সাথে যাবে। তুমি আমাদের বিভিন্ন উপদেশ দেবে। উপকারী কথা বলবে। নামাজ শিক্ষা দেবে। সেদিনের ঘটনার জন্য তারা দুঃখ প্রকাশ করল। প্রকৃতার্থে এসব ছিল তাদের ছলনা ও অপকৌশল মাত্র। তাদের কথায় যুবক সম্মত হলো। একসঙ্গে তারা ভ্রমণে বের হলো। গন্তব্যে পৌঁছে তারা একটি হোটেল ভাড়া করল। তারা পরিকল্পনা করতে লাগল কীভাবে তাকে হারাম কাজে লিপ্ত করা যায়।

অনেক ভেবেচিন্তে তারা একজন দুশ্চরিত্রা মেয়েকে বহু টাকা দিয়ে সম্মত করল যুবককে নানান ছলনায় তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে বাধ্য করতে। মেয়েটি তাদের কথা অনুযায়ী হোটেলে যুবকের রুমে প্রবেশ করল। মেয়েটি বিভিন্নভাবে যুবককে উত্তেজিত করতে লাগল। তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে প্ররোচিত করতে লাগল। যে গৃহে নারী ও পুরুষ থাকে শয়তান তাদের ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য প্ররোচনা দিতে থাকে। শয়তান যুবকের অন্তরে ক্রমাগত অশ্লীল কাজের প্ররোচনা দিতে লাগল।

যুবক প্রথমে নিজেকে সংবরণ করতে পারলেও পরে আর নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। শয়তানের প্ররোচনা ও মেয়েটির ক্রমাগত কুপ্রস্তাবে সম্মত হলো তার সঙ্গে ব্যভিচার করতে। যুবক ওই মেয়ের সাথে ব্যভিচার লিপ্ত হয়। আল্লাহ আমাদের ব্যভিচারসহ সকল জঘন্য পাপাচার থেকে হেফাজত করুন। মেয়েটি যখন তার উদ্দেশ্যে সফল হলো তখন তারা তাকে ধন্যবাদ জানাল। তারা হোটেলে প্রবেশ করে দেখে, সে উলঙ্গ হয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। তাকে নিয়ে উপহাস করতে লাগল। টানা-হেচড়া শুরু করে দিলো। তারা তাকে ঘুম থেকে জাগ্রত করার চেষ্টা করল। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও জাগাতে পারেনি। যুবকটি মদপান ও ব্যভিচার করার পর রাতেই সে মারা যায়। ইন্নালিল্লাহি...।

কত দুর্ভাগ্য সে যুবকের জন্য। যে বিছানায় রাতভর মদপান ও ব্যভিচার করেছে সে বিছানায় তার মৃত্যু হয়েছে। শেষ পরিণতি তার কতই-না নির্মম ও দুর্ভাগ্যের ছিল।

যে যুবক অতীত গুনাহ ও নাফরমানি থেকে তওবা করে সৎপথে ফিরে এসেছিল। খারাপ বন্ধুদের প্ররোচনায় পুনরায় গুনাহ ও নাফরমানিতে জড়িয়ে পড়ল। ধীরে ধীরে যে প্রাসাদ নির্মাণ করতে শুরু করেছিল সেটি ধ্বংস করে দিলো।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! ঈমান আমল ধ্বংস করার অন্যতম হাতিয়ার হলো অসৎসঙ্গ। তাদের সংস্পর্শে মুমিনের ঈমান হ্রাস পেতে থাকে। কখনো ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। তাই ঈমান বৃদ্ধি ও হেফাজতের জন্য করণীয় হলো অসৎসঙ্গ ত্যাগ করা। তাদের সংস্পর্শে কিছুতেই না যাওয়া। অসৎসঙ্গ ঈমান আমলের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ।

ইরশাদ হয়েছে, وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا * يَا وَيْلَتَا لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا

'জালিম ব্যক্তি সেদিন নিজে তার উভয় হাত দংশন করতে করতে বলবে, হায় আমি যদি রাসুলের সঙ্গে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায় দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!'

টিকাঃ
২০. সুরা ফুরকান: ২৭-২৮।

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 প্রয়োজন ফিকরে আখেরাত

📄 প্রয়োজন ফিকরে আখেরাত


ঈমান শক্তিশালী ও সুদৃঢ়করণ এবং আখেরাতে উত্তম প্রাসাদ নির্মাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো অন্তরে পরকালের বিশ্বাস ও ভয় পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান থাকা। পূর্ববর্তী মনীষীগণ যাদের ঈমান ছিল অটুট ও অবিচল এবং তারা দুনিয়ায় থেকে আখেরাতের জন্য নির্মাণ করেছেন উত্তম প্রাসাদ পরকালের প্রতি তাদের ছিল পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস। পক্ষান্তরে পরকালের প্রতি আমাদের আস্থা ও বিশ্বাস পরিপূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান না থাকার কারণে আমরা প্রাসাদ নির্মাণ করতে পারছি না। পরকালের প্রতি ভয় না থাকায় আমাদের ঈমান শক্তিশালী ও সুদৃঢ় হচ্ছে না। এ জন্যই আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানি অধিক পরিমাণে করছি। লিপ্ত হচ্ছি গুনাহও পাপাচারে। সবকিছুর মূলে রয়েছে পরকালের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থার অভাব।

ইরশাদ হয়েছে,

إِنَّهُمْ يَرَوْنَهُ بَعِيدًا * وَنَرَاهُ قَرِيبًا 'তারা আখেরাতকে দেখছে দূরবর্তী এবং আমরা দেখছি তা অতি নিকটেই।'

ذَلِكَ يَوْمٌ مَجْمُوعُ لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمُ مَشْهُودٌ * وَمَا نُؤَخِّرُهُ إِلَّا لِأَجَلٍ مَعْدُودٍ * يَوْمَ يَأْتِ لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَسَعِيدُ

'যে ব্যক্তি আখেরাতের শাস্তিকে ভয় করে তার জন্য এর মাঝে নিদর্শন রয়েছে। তা হলো সেই দিন যেদিন সমস্ত মানুষকে একত্রিত করা হবে। তা হলো সেই দিন যেদিন সকলকে উপস্থিত করা হবে। আমি নির্দিষ্ট কিছুকালের জন্য তা স্থগিত রাখি মাত্র। যখন সেদিন আসবে তখন আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ কথা বলতে পারবে না। তাদের মধ্যে কেউ হবে হতভাগা এবং কেউ হবে ভাগ্যবান।'

একদিন জনৈক ব্যক্তি হযরত ইবরাহিম ইবনে আদহামের নিকট এসে বলল, কিছু বিষয় নিয়ে আমি খুবই ব্যস্ত। ইবরাহিম ইবনে আদহাম তার কথা শুনে বললেন, রাখো তোমার ব্যস্ততা। আমিও আমার কাজ নিয়ে খুবই ব্যস্ত। লোকটি ইবরাহিম ইবনে আদহামকে জিজ্ঞেস করল, কোন জিনিস নিয়ে আপনি ব্যস্ত আছেন? আমাকে বলুন। আপনি যা নিয়ে ব্যস্ত আছেন আমিও তা নিয়ে ব্যস্ত হতে চাই। ইবরাহিম ইবনে আদহাম তাকে বললেন, আমি তিনটি বিষয় নিয়ে সর্বদা ব্যস্ত থাকি।

প্রথম বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهُ وَتَسْوَدُّ وُجُوهُ 'সে (কেয়ামতের) দিন কতক মুখমণ্ডল হবে উজ্জ্বল এবং কতক মুখমণ্ডল হবে কালো।' আমি জানি না কেয়ামতের দিন আমার মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে নাকি কালো হবে। এ চিন্তা আমাকে সর্বদা বিভোর করে রাখে।

দ্বিতীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَسَعِيد 'তাদের মধ্যে কতক হবে দুর্ভাগ্যবান এবং কতক হবে সৌভাগ্যবান।' আমি জানি না যে, আমি কোন দলের অন্তর্ভুক্ত। আমি কি দুর্ভাগ্যবান নাকি সৌভাগ্যবান হবো। এ চিন্তা আমাকে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত করে রাখে।

তৃতীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,

فَرِيقُ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقٌ فِي السَّعِيرِ

'একদল যাবে জান্নাতে এবং একদল যাবে জাহান্নামে। '

জানি না আমি কোনো দলের অন্তর্ভুক্ত। আমি জান্নাতিদের অন্তর্ভুক্ত নাকি জাহান্নামিদের। জান্নাত ও জাহান্নামের চিন্তা আমাকে সর্বক্ষণ ব্যস্ত করে রাখে।

টিকাঃ
২১. সুরা মাআরিজ: ৬-৭।
২২. সুরা হুদ: ১০৩-১০৫।
২৩. সুরা আলে ইমরান: ১০৬।
২৪. সুরা ক্বারা: ৭।

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 কেন জাগ্রত হয় না ভয়

📄 কেন জাগ্রত হয় না ভয়


পূর্ববর্তী মনীষীগণ যারা ঈমান ও আমলে ছিলেন সফল, যারা আখেরাতের প্রাসাদকে পূর্ণ করেছেন, আখেরাতের চিন্তা-ভাবনা তাদের সর্বদা ব্যতিব্যস্ত করে রাখত। তাদের মন-মননে সর্বক্ষণ আখেরাতের পরিণতির কথা ঘুরতে থাকত। কিন্তু আজ কী হলো আমাদের? আমাদের অন্তরে আখেরাতের চিন্তা- ভাবনা মোটেও উদয় হয় না। আখেরাতের পরিণাম আমাদের বিচলিত করে না। আমাদের ঈমান দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ হলো অন্তর থেকে আখেরাতের ভয় দূর হয়ে গেছে। পবিত্র কুরআন সম্পর্কে যদি গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা হয় তাহলে কুরআনের পরতে পরতে, ছত্রে ছত্রে পাওয়া যাবে আখেরাতের কথা। আল্লাহ তায়ালা বহুবার আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়েছে দিয়েছেন।

ইরশাদ হয়েছে, الْقَارِعَةُ مَا الْقَارِعَةُ وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْقَارِعَةُ يَوْمَ يَكُونُ النَّاسُ كَالْفَرَاشِ الْمَبْثُوثِ وَتَكُونُ الْجِبَالُ كَالْعِهْنِ الْمَنْفُوشِ فَأَمَّا مَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَاضِيَةٍ وَأَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُمُّهُ هَاوِيَةٌ وَمَا أَدْرَاكَ مَا هِيَهْ نَارٌ حَامِيَةً

'মহাপ্রলয়। মহাপ্রলয় কী? মহাপ্রলয় সম্বন্ধে তুমি কী জানো? সেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের ন্যায়। পর্বতসমূহ হবে ধুনিত রঙ্গিন পশমের ন্যায়। তখন যার পাল্লা ভারী হবে সে লাভ করবে সন্তোষজনক জীবন। কিন্তু যার পাল্লা হবে হালকা, তার স্থান হবে হাবিয়া। তুমি কি জানো হাবিয়া কী? তা অতি উত্তপ্ত আগুন।'

আরো ইরশাদ হয়েছে, الْحَاقَّةُ : مَا الْحَاقَّةُ ، وَمَا أَدْرَكَ مَا الْحَاقَّةُ ، كَذَّبَتْ ثَمُودُ وَعَادُ بِالْقَارِعَةِ 'সেই অবশ্যম্ভাবী ঘটনা। কী সেই অবশ্যম্ভাবী ঘটনা? তুমি কি জানো সেই অবশ্যম্ভাবী ঘটনা কী? আদ ও সামুদ সম্প্রদায় অস্বীকার করেছিল মহাপ্রলয়।'

ذَلِكَ يَوْمٌ مَجْمُوعٌ لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمٌ مَشْهُودٌ * وَمَا نُؤَخِّرُهُ إِلَّا لِأَجَلٍ مَعْدُودٍ * يَوْمَ يَأْتِ لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَسَعِيدٌ 'যে ব্যক্তি আখেরাতের শাস্তিকে ভয় করে তার জন্য এর মাঝে নিদর্শন রয়েছে। সেটি এমন এক দিন যখন সকল মানুষকে একত্রিত করা হবে। সেটি এমন এক দিন যখন সকলকেই উপস্থিত থাকবে। আমি নির্দিষ্ট কিছুকালের জন্য তা স্থগিত রাখি মাত্র। যখন সেদিন আসবে তখন আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ কথা বলতে পারবে না। তাদের মধ্যে কেউ হবে হতভাগ্য এবং কেউ হবে ভাগ্যবান।'

'মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন। কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রেখেছে।'

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ 'হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো।'

وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ

'তোমরা সেদিনকে ভয় করো যেদিন আল্লাহর নিকট তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে।'

সুতরাং আখেরাতের সাথে যার অন্তরের সম্পর্ক তৈরি হবে তার নির্মিত প্রাসাদ অক্ষত থাকবে। যার সম্পর্ক তৈরি হবে না তার প্রাসাদ ধ্বংস হয়ে যাবে। আখেরাতের সাথে যার সম্পর্ক যত উন্নত হবে তার ঈমান ততই সুদৃঢ় হবে। আর আখেরাতের সাথে যার সম্পর্ক যত কম হবে তার ঈমান ততই দুর্বল হবে। আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তার ততই প্রবল।

টিকাঃ
২৫. সুরা কারিআ: ১-১১।
২৬. সুরা হাক্কা: ১-৪।
২৭. সুরা হুদ: ১০৩-১০৫।
২৮. সুরা আম্বিয়া: ১।
২৯. সুরা নিসা: ১।
৩০. সুরা বাকারাহ: ২৮১।

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 একজন হাসান বসরি এবং আমাদের তফাত

📄 একজন হাসান বসরি এবং আমাদের তফাত


হযরত হাসান বসরি রহ.-এর সন্তান বলেন, একদিন আমার পিতা রোজা অবস্থায় ছিলেন। যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো তখন ইফতারির জন্য আমি তার নিকট খাবার নিয়ে গেলাম এবং ইফতার গ্রহণের জন্য অনুরোধ করলাম। আমার হাতে খাবারের পাত্র দেখে তিনি কাঁদতে শুরু করেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত কাঁদতে থাকেন যতক্ষণ পর্যন্ত না খাবারের প্রতি তার অনাসক্তি তৈরি হয়। আমার পিতা সেদিন কিছুই আহার করেননি। অতঃপর তিনি পবিত্র কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করেন, إِنَّ لَدَيْنَا أَنكَالًا وَجَحِيمًا * وَطَعَامًا ذَا غُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا 'আমার নিকট আছে শৃঙ্খল ও প্রজ্বলিত আগুন। আর আছে এমন খাদ্য যা গলায় আটকে যায় এবং আছে মর্মন্তুদ শাস্তি। ৩১ এভাবে সারা রাত তিনি না খেয়েই কাটান। রাতভর ইবাদতে মশগুল থাকেন। পরদিনও তিনি রোজা রাখেন। যথারীতি যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আমি ইফতারের জন্য খাবার নিয়ে যাই এবং ইফতার গ্রহণের জন্য অনুরোধ করি। কিন্তু গতকালের ন্যায় আজও তিনি খাবার ফিরিয়ে দিলেন। অতঃপর তিলাওয়াত করেন,

إِنَّ لَدَيْنَا أَنكَالًا وَجَحِيمًا * وَطَعَامًا ذَا غُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا 'আমার নিকট আছে শৃঙ্খল ও প্রজ্বলিত আগুন। আর আছে এমন খাদ্য যা গলায় আটকে যায় এবং আছে মর্মন্তুদ শান্তি।'

এভাবে তৃতীয় দিনও তিনি রোজা রাখেন। খাদ্য ও পানীয় কিছুই গ্রহণ করেননি। রাতভর কেবল কান্নাকাটি করতেন। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতেন।

আল্লাহর শপথ! তারা খাদ্য ও পানীয় থেকেও দূরে থাকতেন কেবল এ জন্য যে, তাদের অন্তরে আখেরাতের ভয় ছিল অত্যধিক। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়াকে তারা ভয় করতেন। ভয় করতেন আল্লাহর বিচারকার্যকে। আখেরাতের ভয় তাদের অন্তর থেকে সকল কিছুর স্বাদ আস্বাদন ভুলিয়ে দিয়েছিল।

অতঃপর যখন তৃতীয় দিনও হাসান বসরি রহ. খাদ্য ও পানীয় ফিরিয়ে দিলেন তখন তার ছেলে কাঁদতে শুরু করে। আর বলতে থাকে, আমার, পিতা খাদ্য-পানীয় কিছুই গ্রহণ করছে না। তার কান্না দেখে হযরত হাসান বসরি রহ. খেজুরের সামান্য ছাতু মুখে দিলেন। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করেন,

إِنَّ لَدَيْنَا أَنكَالًا وَجَحِيمًا * وَطَعَامًا ذَا غُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا 'আমার নিকট আছে শৃঙ্খল ও প্রজ্বলিত আগুন। আর আছে এমন খাদ্য যা গলায় আটকে যায় এবং আছে মর্মন্তুদ শান্তি।'

يَوْمَ تَرْجُفُ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ وَكَانَتِ الْجِبَالُ كَثِيبًا مَّهِيلًا إِنَّا أَرْسَلْنَا إِلَيْكُمْ رَسُولًا شَاهِدًا عَلَيْكُمْ كَمَا أَرْسَلْنَا إِلَى فِرْعَوْنَ رَسُولًا فَعَصَى فِرْعَوْنُ الرَّسُولَ فَأَخَذْنَاهُ أَخْذًا وَبِيلًا

'সেদিন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে। পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে। আমি তোমাদের নিকট প্রেরণ করেছি একজন রাসুল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ, যেমন রাসুল প্রেরণ করেছিলাম ফিরাউনের নিকট। কিন্তু ফিরাউন সেই রাসুলকে অমান্য করেছিল। ফলে আমি তাকে কঠিন শাস্তি দিয়েছি।'

অতঃপর তিনি আমাদের লক্ষ্য করে বলেন, فَكَيْفَ تَتَّقُونَ إِن كَفَرْتُمْ يَوْمًا يَجْعَلُ الْوِلْدَانَ شِيبًا السَّمَاءُ مُنفَطِرُ بِهِ ، كَانَ وَعْدُهُ مَفْعُولًا إِنَّ هَذِهِ تَذْكِرَةٌ ، فَمَن شَاءَ اتَّخَذَ إِلَى رَبِّهِ سَبِيلًا

'অতএব তোমরা যদি কুফরি করো তবে কী করে আত্মরক্ষা করবে সেই দিন, যেদিন কিশোরকে পরিণত করবে বৃদ্ধে। যেদিন আকাশ হবে বিদীর্ণ। তার প্রতিশ্রুতি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। নিশ্চয়ই তা এক উপদেশ। অতএব যে চায় সে তার প্রতিপালকের পথ অবলম্বন করুক।'

দুনিয়াতে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য ও নেক আমলের দ্বারা মুমিন আখেরাতের সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করে। তাদের মধ্যে অনেকে সে প্রাসাদ নিজ কৃতকর্ম দ্বারা ধ্বংস করে ফেলে। কেউ কেউ তা ধ্বংস করা থেকে পরিপূর্ণরূপে হেফাজত করে।

টিকাঃ
৩১. সুরা মুজাম্মিল: ১২-১৩।
৩২. সুরা মুজাম্মিল: ১২-১৩।
৩৩. সুরা মুজাম্মিল: ১২-১৩।
৩৪. সুরা মুজাম্মিল: ১৪-১৫।
৩৫. সুরা মুজাম্মিল: ১৭-১৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00