📄 যুবকের হৃদয়ে ঈমানের প্রশান্তি
এক যুবক মাত্রই ঈমানের পথে যাত্রা করেছে। আখেরাতের প্রাসাদ নির্মাণের সূচনা হয়েছে কেবল। একদিন সে পবিত্র কুরআনের সুরা ফুরকান মুখস্থ করতে শুরু করল। কেউ যদি গভীর চিন্তাভাবনার সাথে সুরা ফুরকান পড়ে তাহলে সে অনুভব করতে সক্ষম হবে, সুরা ফুরকান অত্যন্ত চমৎকার একটি সুরা। এ সুরায় বর্ণিত হয়েছে তাদের কথা যারা দুনিয়ায় থেকে আখেরাতের প্রাসাদ নির্মাণ করে এবং সেটিকে ধ্বংস হওয়া থেকে সংরক্ষণ করে। সে যুবক বলল, আমার হৃদয়ের অনেক বড় আশা হলো আমি সুরা ফুরকান মুখস্থ করব। আর আমি তখন সবে ঈমানের পথে যাত্রা করেছি। আমি তা মুখস্থ করতে চেষ্টা শুরু করি। অল্প অল্প করে একদিন পূর্ণ সুরা মুখস্থ করে শেষ করি। যুবকটি বলল, আমি যখন সুরাটি মুখস্থ করে মসজিদ থেকে বের হই তখন আমি হৃদয়ে অনুভব করি, আমার সম্মান ও মর্যাদার ভার এতই যে, সমগ্র সৃষ্টিজগৎ আমাকে বহন করতে সক্ষম নয়। আরো অনুভব করি, আমার ঈমান সমগ্র সৃষ্টিজগতের ওপর অগ্রগণ্য। ঈমানের সামনে পার্থিব সকল কিছু তুচ্ছ।
এ অনুভূতি যুবকের হৃদয়ে কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে? কেন তার অনুভব হয়েছে যে, সমগ্র সৃষ্টিজগতের চেয়ে তার ঈমানের মূল্য বেশি? তা কি ঈমানের কারণে নয়? ঈমানের শক্তিই কি তার অন্তরকে আলোকিত করে তুলেনি? ঈমানের মিষ্টতার ফলেই কি সে দুনিয়ার সকল মিষ্টতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করেনি? আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সুরা ফুরকানে তার প্রিয় বান্দাদের গুণাবলি আলোচনা করেছেন।
ইরশাদ হয়েছে, وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
'রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। যখন মূর্খরা তাদেরকে ঝগড়ার জন্য আহ্বান করে তখন তারা বলে সালাম বা শান্তি (আমরা তোমাদের সাথে ঝগড়া করতে চাই না)।
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ * إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامًا وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذُلِكَ قَوَامًا وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِنَّهَا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ ، وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا
'যারা রাত্রি অতিবাহিত করে তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে এবং দণ্ডায়মান থেকে। আর বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের থেকে জাহান্নামের শান্তি দূর করে দিন। জাহান্নামের শাস্তি নিশ্চিত বিনাশ। নিশ্চয় তা অস্থায়ী ও স্থায়ী আবাসস্থল হিসেবে নিকৃষ্ট। যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না। কার্পণ্যও করে না। বরং তারা এ উভয়ের মাঝামাঝি অবস্থায়। তারা আল্লাহর সাথে কোনো উপাস্যকে ডাকে না। আল্লাহ যাদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাদের হত্যা করে না এবং তারা ব্যভিচার করে না। যে এগুলো করে সে শান্তি ভোগ করবে।
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا
(এবং রহমানের বান্দা তারা) যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং অসার ক্রিয়াকলাপের সম্মুখীন হলে আপন মর্যাদার সাথে তা পরিহার করে চলে।'
অর্থাৎ আল্লাহর প্রিয় ও বিশেষ নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা যারা তাদের নিকট অযথা বিনষ্ট করার মতো সময় নেই। সকল মিথ্যা ও অনর্থক বিষয়কে তারা পরিহার করে চলে। মন্দ লোকদের সাথে উঠাবসা করে না। তাদের সংস্পর্শে যায় না। কারণ, এসব মুমিনের গুণাবলি নয়। ইরশাদ হয়েছে,
وَالَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ لَمْ يَخِرُّوا عَلَيْهَا صُمًّا وَعُمْيَانًا . وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
'(রহমানের বান্দা তারা) যাদের তাদের প্রতিপালকের আয়াত স্মরণ করিয়ে দিলে তার প্রতি অন্ধ ও বধিরসদৃশ আচরণ করে না, এবং যারা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন যারা আমাদের জন্য হবে নয়নপ্রীতিকর এবং আমাদের বানান মুত্তাকিদের জন্য অনুসরণযোগ্য।'
যারা দুনিয়ায় থেকে আল্লাহর আনুগত্য ও নেক আমলের মাধ্যমে আখেরাতের উত্তম প্রাসাদ নির্মাণ করে তাদের প্রতিদান কী হবে সে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
أُوْلَئِكَ يُجْزَوْنَ الْغُرْفَةَ بِمَا صَبَرُوا وَيُلَقَّوْنَ فِيهَا تَحِيَّةً وَسَلَامًا خَالِدِينَ فِيهَا حَسُنَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامًا * قُلْ مَا يَعْبَأُ بِكُمْ رَبِّي لَوْلَا دُعَاؤُكُمْ فَقَدْ كَذَّبْتُمْ فَسَوْفَ يَكُونُ لِزَامًا
'তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষ যেহেতু তারা ছিল ধৈর্যশীল। সেখানে তাদের সংবর্ধনা প্রদান করা হবে অভিবাদন ও সালাম সহকারে। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে তা কত উৎকৃষ্ট। (হে নবী) আপনি বলুন, তোমরা আমার প্রতিপালককে না ডাকলে তার কিছুই আসে যায় না। তোমরা অস্বীকার করেছ, ফলে অচিরেই তোমাদের ওপর নেমে আসবে অপরিহার্য শাস্তি।
এ হলো তাদের অবস্থা যারা রহমানের প্রিয় বান্দা। যারা আখেরাতের জন্য নির্মাণ করছে সুরম্য প্রাসাদ। যেখানে তারা মৃত্যুর পর শান্তি ও চিরসুখের মাঝে বসবাস করবে। পক্ষান্তরে যারা রহমানের অবাধ্য বান্দা তাদের গুণাবলি হলো সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা আখেরাতের জন্য নির্মিত প্রাসাদকে ধ্বংস করছে প্রতিনিয়ত। তারাই হতভাগা। আখেরাতে তাদের জন্য নেই কোনো অংশ।
টিকাঃ
১৫. সুরা ফুরকান: ৬৩।
১৬. সুরা ফুরকান: ৬৪-৬৮।
১৭. সুরা ফুরকান: ৭২।
১৮. সুরা ফুরকান: ৭৩-৭৪।
১৯. সুরা ফুরকান: ৭৫-৭৭।
📄 বিপদসঙ্কুল পথ হুশিয়ার মুসাফির
এক যুবকের করুণ গল্প বলছি। সে ছিল আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে লিপ্ত। তার ছিল অনেক বন্ধু; যারা সকলেই ছিল চরিত্রহীন লম্পট। আল্লাহর কোনো আদেশ তারা পালন করত না। বেঁচে থাকত না নিষেধসমূহ থেকে। নামাজ পড়ত না। অন্যায় ও পাপাচারিতার এহেন কোনো কর্ম ছিল না যা তারা করত না। হঠাৎ একদিন সে যুবক তার অসৎ বন্ধুদের সঙ্গ ত্যাগ করে। অতীতের সকল পাপকর্ম থেকে তওবা করে নতুন জীবনে প্রবেশ করে। আল্লাহ্র আদেশ পালন করে। নিষেধ থেকে বেঁচে থাকে। নামাজ পড়ে। ধীরে ধীরে সে ভালো ও মন্দের ফারাক চিনতে পেরেছে।
কিন্তু তার বন্ধুরা পূর্বের ন্যায় অবাধ্যতা ও পাপাচারিতায় মজে আছে। সে তার বন্ধুদের জন্য আক্ষেপ করতে লাগল। মৃত্যুর পর তাদের করুণ পরিণতির কথা ভেবে দারুণ দুঃখবোধ হতে লাগল তার অন্তরে। সে চিন্তা করল তার বন্ধুদের অবাধ্যতা ও নাফরমানি থেকে সৎপথে ফিরিয়ে আনবে। তাদের তওবা করিয়ে আলোর পথে পরিচালিত করবে। একদিন সে তার বন্ধুদের নিকট উপস্থিত হলো। কিন্তু সে বড় একটি ভুল করেছে। ভুলটি হলো, সে একা একা গিয়েছে তার বন্ধুদের দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। এর এটি খুব বড় একটি ভুল।
দ্বীনের পথে আগমনকারী প্রত্যেক নতুন ব্যক্তির জন্য এ এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী যে, কখনো একা কাউকে দ্বীনের দাওয়াত দিতে যাবে না। তাহলে তারা যখন দ্বীন সম্পর্কে নানান প্রশ্ন করতে শুরু করবে তখন সেসবের সঠিক উত্তর দিতে সে সক্ষম হবে না। ফলে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাকে আক্রমণ করতে শুরু করবে। তাকে নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস করবে। ফলে এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। যুবকটি এখানেই ভুল করল। সে তার বন্ধুদের নিকট যখন একাকী গিয়ে হাজির হলো তখন তারা তাকে নানান কটু কথা বলে জর্জরিত করতে লাগল। তার অতীত জীবনের বিভিন্ন পাপাচারিতার কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে লাগল। তাদের এহেন আচরণে যুবকটি ভীষণ কষ্ট পেল। তাদের সম্মিলিত আক্রমণের সামনে সে টিকতে পারেনি। ব্যর্থ মনে সে ফিরে এলো। তাই অবশ্যকর্তব্য হলো, একাকী কারো সংশোধন করতে না যাওয়া।
যুবকের বন্ধুরা বিভিন্ন ফন্দি করতে লাগল কীভাবে তাকে পুনরায় খারাপ পথে ফিরিয়ে আনা যায়। ফের কীভাবে তাকে তাদের দলে নিয়ে আসা যায়। একদিন তারা প্রতারণামূলকভাবে যুবকের নিকট গিয়ে বলল, আমরা নিকটস্থ এক জায়গায় ভ্রমণে যাব। তুমিও আমাদের সাথে যাবে। তুমি আমাদের বিভিন্ন উপদেশ দেবে। উপকারী কথা বলবে। নামাজ শিক্ষা দেবে। সেদিনের ঘটনার জন্য তারা দুঃখ প্রকাশ করল। প্রকৃতার্থে এসব ছিল তাদের ছলনা ও অপকৌশল মাত্র। তাদের কথায় যুবক সম্মত হলো। একসঙ্গে তারা ভ্রমণে বের হলো। গন্তব্যে পৌঁছে তারা একটি হোটেল ভাড়া করল। তারা পরিকল্পনা করতে লাগল কীভাবে তাকে হারাম কাজে লিপ্ত করা যায়।
অনেক ভেবেচিন্তে তারা একজন দুশ্চরিত্রা মেয়েকে বহু টাকা দিয়ে সম্মত করল যুবককে নানান ছলনায় তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে বাধ্য করতে। মেয়েটি তাদের কথা অনুযায়ী হোটেলে যুবকের রুমে প্রবেশ করল। মেয়েটি বিভিন্নভাবে যুবককে উত্তেজিত করতে লাগল। তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে প্ররোচিত করতে লাগল। যে গৃহে নারী ও পুরুষ থাকে শয়তান তাদের ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য প্ররোচনা দিতে থাকে। শয়তান যুবকের অন্তরে ক্রমাগত অশ্লীল কাজের প্ররোচনা দিতে লাগল।
যুবক প্রথমে নিজেকে সংবরণ করতে পারলেও পরে আর নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। শয়তানের প্ররোচনা ও মেয়েটির ক্রমাগত কুপ্রস্তাবে সম্মত হলো তার সঙ্গে ব্যভিচার করতে। যুবক ওই মেয়ের সাথে ব্যভিচার লিপ্ত হয়। আল্লাহ আমাদের ব্যভিচারসহ সকল জঘন্য পাপাচার থেকে হেফাজত করুন। মেয়েটি যখন তার উদ্দেশ্যে সফল হলো তখন তারা তাকে ধন্যবাদ জানাল। তারা হোটেলে প্রবেশ করে দেখে, সে উলঙ্গ হয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। তাকে নিয়ে উপহাস করতে লাগল। টানা-হেচড়া শুরু করে দিলো। তারা তাকে ঘুম থেকে জাগ্রত করার চেষ্টা করল। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও জাগাতে পারেনি। যুবকটি মদপান ও ব্যভিচার করার পর রাতেই সে মারা যায়। ইন্নালিল্লাহি...।
কত দুর্ভাগ্য সে যুবকের জন্য। যে বিছানায় রাতভর মদপান ও ব্যভিচার করেছে সে বিছানায় তার মৃত্যু হয়েছে। শেষ পরিণতি তার কতই-না নির্মম ও দুর্ভাগ্যের ছিল।
যে যুবক অতীত গুনাহ ও নাফরমানি থেকে তওবা করে সৎপথে ফিরে এসেছিল। খারাপ বন্ধুদের প্ররোচনায় পুনরায় গুনাহ ও নাফরমানিতে জড়িয়ে পড়ল। ধীরে ধীরে যে প্রাসাদ নির্মাণ করতে শুরু করেছিল সেটি ধ্বংস করে দিলো।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! ঈমান আমল ধ্বংস করার অন্যতম হাতিয়ার হলো অসৎসঙ্গ। তাদের সংস্পর্শে মুমিনের ঈমান হ্রাস পেতে থাকে। কখনো ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। তাই ঈমান বৃদ্ধি ও হেফাজতের জন্য করণীয় হলো অসৎসঙ্গ ত্যাগ করা। তাদের সংস্পর্শে কিছুতেই না যাওয়া। অসৎসঙ্গ ঈমান আমলের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ।
ইরশাদ হয়েছে, وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا * يَا وَيْلَتَا لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا
'জালিম ব্যক্তি সেদিন নিজে তার উভয় হাত দংশন করতে করতে বলবে, হায় আমি যদি রাসুলের সঙ্গে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায় দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!'
টিকাঃ
২০. সুরা ফুরকান: ২৭-২৮।
📄 প্রয়োজন ফিকরে আখেরাত
ঈমান শক্তিশালী ও সুদৃঢ়করণ এবং আখেরাতে উত্তম প্রাসাদ নির্মাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো অন্তরে পরকালের বিশ্বাস ও ভয় পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান থাকা। পূর্ববর্তী মনীষীগণ যাদের ঈমান ছিল অটুট ও অবিচল এবং তারা দুনিয়ায় থেকে আখেরাতের জন্য নির্মাণ করেছেন উত্তম প্রাসাদ পরকালের প্রতি তাদের ছিল পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস। পক্ষান্তরে পরকালের প্রতি আমাদের আস্থা ও বিশ্বাস পরিপূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান না থাকার কারণে আমরা প্রাসাদ নির্মাণ করতে পারছি না। পরকালের প্রতি ভয় না থাকায় আমাদের ঈমান শক্তিশালী ও সুদৃঢ় হচ্ছে না। এ জন্যই আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানি অধিক পরিমাণে করছি। লিপ্ত হচ্ছি গুনাহও পাপাচারে। সবকিছুর মূলে রয়েছে পরকালের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থার অভাব।
ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّهُمْ يَرَوْنَهُ بَعِيدًا * وَنَرَاهُ قَرِيبًا 'তারা আখেরাতকে দেখছে দূরবর্তী এবং আমরা দেখছি তা অতি নিকটেই।'
ذَلِكَ يَوْمٌ مَجْمُوعُ لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمُ مَشْهُودٌ * وَمَا نُؤَخِّرُهُ إِلَّا لِأَجَلٍ مَعْدُودٍ * يَوْمَ يَأْتِ لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَسَعِيدُ
'যে ব্যক্তি আখেরাতের শাস্তিকে ভয় করে তার জন্য এর মাঝে নিদর্শন রয়েছে। তা হলো সেই দিন যেদিন সমস্ত মানুষকে একত্রিত করা হবে। তা হলো সেই দিন যেদিন সকলকে উপস্থিত করা হবে। আমি নির্দিষ্ট কিছুকালের জন্য তা স্থগিত রাখি মাত্র। যখন সেদিন আসবে তখন আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ কথা বলতে পারবে না। তাদের মধ্যে কেউ হবে হতভাগা এবং কেউ হবে ভাগ্যবান।'
একদিন জনৈক ব্যক্তি হযরত ইবরাহিম ইবনে আদহামের নিকট এসে বলল, কিছু বিষয় নিয়ে আমি খুবই ব্যস্ত। ইবরাহিম ইবনে আদহাম তার কথা শুনে বললেন, রাখো তোমার ব্যস্ততা। আমিও আমার কাজ নিয়ে খুবই ব্যস্ত। লোকটি ইবরাহিম ইবনে আদহামকে জিজ্ঞেস করল, কোন জিনিস নিয়ে আপনি ব্যস্ত আছেন? আমাকে বলুন। আপনি যা নিয়ে ব্যস্ত আছেন আমিও তা নিয়ে ব্যস্ত হতে চাই। ইবরাহিম ইবনে আদহাম তাকে বললেন, আমি তিনটি বিষয় নিয়ে সর্বদা ব্যস্ত থাকি।
প্রথম বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهُ وَتَسْوَدُّ وُجُوهُ 'সে (কেয়ামতের) দিন কতক মুখমণ্ডল হবে উজ্জ্বল এবং কতক মুখমণ্ডল হবে কালো।' আমি জানি না কেয়ামতের দিন আমার মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে নাকি কালো হবে। এ চিন্তা আমাকে সর্বদা বিভোর করে রাখে।
দ্বিতীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَسَعِيد 'তাদের মধ্যে কতক হবে দুর্ভাগ্যবান এবং কতক হবে সৌভাগ্যবান।' আমি জানি না যে, আমি কোন দলের অন্তর্ভুক্ত। আমি কি দুর্ভাগ্যবান নাকি সৌভাগ্যবান হবো। এ চিন্তা আমাকে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত করে রাখে।
তৃতীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,
فَرِيقُ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقٌ فِي السَّعِيرِ
'একদল যাবে জান্নাতে এবং একদল যাবে জাহান্নামে। '
জানি না আমি কোনো দলের অন্তর্ভুক্ত। আমি জান্নাতিদের অন্তর্ভুক্ত নাকি জাহান্নামিদের। জান্নাত ও জাহান্নামের চিন্তা আমাকে সর্বক্ষণ ব্যস্ত করে রাখে।
টিকাঃ
২১. সুরা মাআরিজ: ৬-৭।
২২. সুরা হুদ: ১০৩-১০৫।
২৩. সুরা আলে ইমরান: ১০৬।
২৪. সুরা ক্বারা: ৭।
📄 কেন জাগ্রত হয় না ভয়
পূর্ববর্তী মনীষীগণ যারা ঈমান ও আমলে ছিলেন সফল, যারা আখেরাতের প্রাসাদকে পূর্ণ করেছেন, আখেরাতের চিন্তা-ভাবনা তাদের সর্বদা ব্যতিব্যস্ত করে রাখত। তাদের মন-মননে সর্বক্ষণ আখেরাতের পরিণতির কথা ঘুরতে থাকত। কিন্তু আজ কী হলো আমাদের? আমাদের অন্তরে আখেরাতের চিন্তা- ভাবনা মোটেও উদয় হয় না। আখেরাতের পরিণাম আমাদের বিচলিত করে না। আমাদের ঈমান দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ হলো অন্তর থেকে আখেরাতের ভয় দূর হয়ে গেছে। পবিত্র কুরআন সম্পর্কে যদি গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা হয় তাহলে কুরআনের পরতে পরতে, ছত্রে ছত্রে পাওয়া যাবে আখেরাতের কথা। আল্লাহ তায়ালা বহুবার আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়েছে দিয়েছেন।
ইরশাদ হয়েছে, الْقَارِعَةُ مَا الْقَارِعَةُ وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْقَارِعَةُ يَوْمَ يَكُونُ النَّاسُ كَالْفَرَاشِ الْمَبْثُوثِ وَتَكُونُ الْجِبَالُ كَالْعِهْنِ الْمَنْفُوشِ فَأَمَّا مَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَاضِيَةٍ وَأَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُمُّهُ هَاوِيَةٌ وَمَا أَدْرَاكَ مَا هِيَهْ نَارٌ حَامِيَةً
'মহাপ্রলয়। মহাপ্রলয় কী? মহাপ্রলয় সম্বন্ধে তুমি কী জানো? সেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের ন্যায়। পর্বতসমূহ হবে ধুনিত রঙ্গিন পশমের ন্যায়। তখন যার পাল্লা ভারী হবে সে লাভ করবে সন্তোষজনক জীবন। কিন্তু যার পাল্লা হবে হালকা, তার স্থান হবে হাবিয়া। তুমি কি জানো হাবিয়া কী? তা অতি উত্তপ্ত আগুন।'
আরো ইরশাদ হয়েছে, الْحَاقَّةُ : مَا الْحَاقَّةُ ، وَمَا أَدْرَكَ مَا الْحَاقَّةُ ، كَذَّبَتْ ثَمُودُ وَعَادُ بِالْقَارِعَةِ 'সেই অবশ্যম্ভাবী ঘটনা। কী সেই অবশ্যম্ভাবী ঘটনা? তুমি কি জানো সেই অবশ্যম্ভাবী ঘটনা কী? আদ ও সামুদ সম্প্রদায় অস্বীকার করেছিল মহাপ্রলয়।'
ذَلِكَ يَوْمٌ مَجْمُوعٌ لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمٌ مَشْهُودٌ * وَمَا نُؤَخِّرُهُ إِلَّا لِأَجَلٍ مَعْدُودٍ * يَوْمَ يَأْتِ لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَسَعِيدٌ 'যে ব্যক্তি আখেরাতের শাস্তিকে ভয় করে তার জন্য এর মাঝে নিদর্শন রয়েছে। সেটি এমন এক দিন যখন সকল মানুষকে একত্রিত করা হবে। সেটি এমন এক দিন যখন সকলকেই উপস্থিত থাকবে। আমি নির্দিষ্ট কিছুকালের জন্য তা স্থগিত রাখি মাত্র। যখন সেদিন আসবে তখন আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ কথা বলতে পারবে না। তাদের মধ্যে কেউ হবে হতভাগ্য এবং কেউ হবে ভাগ্যবান।'
'মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন। কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রেখেছে।'
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ 'হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো।'
وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ
'তোমরা সেদিনকে ভয় করো যেদিন আল্লাহর নিকট তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে।'
সুতরাং আখেরাতের সাথে যার অন্তরের সম্পর্ক তৈরি হবে তার নির্মিত প্রাসাদ অক্ষত থাকবে। যার সম্পর্ক তৈরি হবে না তার প্রাসাদ ধ্বংস হয়ে যাবে। আখেরাতের সাথে যার সম্পর্ক যত উন্নত হবে তার ঈমান ততই সুদৃঢ় হবে। আর আখেরাতের সাথে যার সম্পর্ক যত কম হবে তার ঈমান ততই দুর্বল হবে। আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তার ততই প্রবল।
টিকাঃ
২৫. সুরা কারিআ: ১-১১।
২৬. সুরা হাক্কা: ১-৪।
২৭. সুরা হুদ: ১০৩-১০৫।
২৮. সুরা আম্বিয়া: ১।
২৯. সুরা নিসা: ১।
৩০. সুরা বাকারাহ: ২৮১।