📄 ভালোবাসায় উত্তীর্ণ এক সাহাবী
একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, মক্কায় খালেদ আল হুযালি নামে এক দুর্ধর্ষ ব্যক্তি রয়েছে। তুমি তার মাথা কেটে নিয়ে আসো আমার নিকট। খালেদ আল হুযালি ছিল মক্কার অত্যন্ত সাহসী ব্যক্তি। তার ভয়ে লোকেরা তটস্থ থাকত। তার শক্তি ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল অত্যধিক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়সকে তার মাথা আনতে আদেশ করলেন তখন তিনি এ কথা বলেননি যে, আমি তার মাথা আনতে সক্ষম হবো না। তিনি বলেননি, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমাকে না পাঠিয়ে অন্য কাউকে পাঠান। এর কারণ হলো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য তাদের অন্তরে পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল।
ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا
'মুমিনের উক্তি তো এই যে, যখন তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেওয়ার জন্য আল্লাহ ও তার রাসুলের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তারা বলে, আমরা শ্রবণ করলাম এবং আনুগত্য করলাম। তারাই সফলকাম।'
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স রাদি.-কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করামাত্রই তিনি সম্মত হয়ে গেলেন। কোনো প্রকার টালবাহানা করেননি। অক্ষমতা পেশ করেননি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ পেয়ে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স রাদিয়াল্লাহু আনহু মদিনা থেকে মক্কা অভিমুখে রওনা করলেন। চলতে চলতে মক্কার উপকণ্ঠে আরাফাহর নিকট পৌঁছার পর দেখে খালেদ আল হুযালি একদল যুবককে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। এটা দেখে আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স রাদিয়াল্লাহু আনহু এগিয়ে গেলেন। খালেদ আল হুযালির নিকট গিয়ে বললেন, আমি আপনার সৈন্যদলে যোগ দিয়ে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাই।
তার আগ্রহ উদ্দীপনা দেখে খালেদ আল হুযালি তাকে নিজেদের দলভুক্ত করে নিলেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স রাদিয়াল্লাহু আনহু ধীরে ধীরে তাদের সাথে অন্তরঙ্গ হয়ে গেলেন। বাহিনীর সাথে সাথে যাচ্ছেন তিনি। চলতে চলতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স এবং খালেদ আল হুযালি বাহিনী থেকে পৃথক হয়ে গেলেন। বাহিনী সামনে সামনে চলছে আর তারা দুজন পেছনে পেছনে চলছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স রাদিয়াল্লাহু আনহু একে সুযোগ মনে করে কোমর থেকে তরবারি খাপমুক্ত করলেন। বাহিনীর পশ্চাদে তিনি খালেদ আল হুযালিকে হত্যা করেন। তরবারির আঘাতে দেহ থেকে মাথা ছিন্ন করে দ্রুত মদিনার দিকে রওনা করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এনে বীর-বিক্রমে খালেদ আল হুযালির কর্তিত মাথা পেশ করলেন। তা দেখে নবীজি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়সের প্রতি দারণ খুশি হন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়সকে আদেশ করেছেন মক্কার দুর্ধর্ষ খালেদ আল হুযালিকে হত্যা করার জন্য। এ ছিল অত্যন্ত কঠিন নির্দেশ। এখানে জীবন হারানোর শঙ্কা। শত্রুর হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার ভয়। কিন্তু যত ভয় আর আশঙ্কা হোক না কেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ মানতেই হবে। নিজের জীবন, পিতা-মাতা, সন্তন-সন্ততি, পৃথিবীর সকল কিছু থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রদর্শন করা মুমিনের অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য এবং হয়েছেও তাই। আদেশ শোনামাত্র তিনি প্রস্তুত হয়ে গেলেন। সামান্যও দ্বিধা করেননি। কিন্তু বর্তমানে আমাদের পূর্ববর্তীদের ন্যায় এত কঠিন কাজ চাপিয়ে দেওয়া হয়নি যেখানে জীবন হারানোর শঙ্কা রয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের জন্য সবকিছু সহজ করে দিয়েছেন। অনুকূল করে দিয়েছেন। দূর করে দিয়েছেন সকল প্রতিকূলতা। পূর্ববর্তী লোকেরা যেমন কষ্ট স্বীকার করেছেন আমাদেরও তা করতে হয় না। এটি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি অফুরন্ত রহমত।
বদরের রণাঙ্গনে সংঘটিত হয়েছে ইসলামি ইতিহাসের ঐতিহাসিক যুদ্ধ। কাফের ও মুসলমানদের মধ্যে সংগঠিত এ যুদ্ধ রচনা করেছে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য। সেদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমবেত সাহাবিদের যুদ্ধের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। তাদের সাহস ও প্রেরণা দিতে থাকেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের লক্ষ্য করে বলেন, তোমরা জান্নাতের দিকে অগ্রসর হও; যার প্রশস্ততা হলো সমস্ত আসমান-জমিনের ন্যায়। এ কথা শুনে এক সাহাবি বিস্ময়মাখা কণ্ঠে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! জান্নাত সমস্ত আসমান-জমিনের ন্যায় প্রশস্ত? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, জান্নাত সমস্ত আসমান-জমিনের ন্যায় প্রশস্ত। তখন উক্ত সাহাবি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! তাহলে আমার ও জান্নাতের মাঝে ব্যবধান কীসের? প্রত্যুত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। তখন ওই সাহাবির হাতে ছিল একটি খেজুর। তিনি খেজুরটি নিক্ষেপ করে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়েন। হে আল্লাহর বান্দা! কোন জিনিস নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে তাদের তাড়িত করেছে? কীসের টানে তারা জীবনকে তুচ্ছ মনে করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে যুদ্ধের ময়দানে, যেখানে চলতে থাকে রক্ত ও মৃত্যুর খেলা? কোন শক্তির বলে বলীয়ান হয়ে তারা আখেরাতকে দুনিয়ার ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন?
টিকাঃ
১৪. সুরা নুর: ৫১।
📄 আল্লাহর শপথ এর নামই ঈমান
আল্লাহর শপথ! এর নামই ঈমান। ঈমান তাদের সাহসী করে তুলেছে। ঈমানের শক্তিতে তারা ছিলেন বলীয়ান। ঈমানের আলোয় তারা আলোকিত ছিলেন বলেই জীবনকে মনে হয়েছে অতি সহজ। ঈমানের বলে বলীয়ান ছিলেন বলেই তারা দুনিয়াকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছেন। সবকিছুর ওপর তারা প্রাধান্য দিয়েছেন আখেরাতকে।
হে আল্লাহর বান্দা! তারাই সফল। কেননা, তারা আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্যের মাধ্যমে আখেরাতের উত্তম প্রাসাদ নির্মাণ করেছেন। পক্ষান্তরে আমাদের অবস্থা হলো অত্যন্ত করুণ। আমরা একদিকে নির্মাণ করি অপরদিকে ধ্বংস করি। ফলে আমাদের প্রাসাদ পূর্ণতায় পৌঁছে না। আখেরাতে বসবাস করার জন্য আমাদের জন্য নেই উত্তম কোনো বাসগৃহ। নিঃস্ব ও অসহায় হয়ে আমরা যাত্রা করছি পরকালের কঠিন সফরে।
আমরা ঈমানে স্বাদ আস্বাদন করতে পারি না। আমাদের ঈমান আমাদের পথ দেখায় না। দুর্বল ও ভঙ্গুর ঈমান নিয়ে সফলতার রাজপথ কায়েম করা যায় না। ঈমানের স্বাদ তো তারাই আস্বাদন করে যারা দিনের বেলা রোজা রাখে এবং রাতে তারা দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকে জায়নামাজে। আল্লাহর আনুগত্য এবং নেক কাজ যত অধিক করবে ঈমানের শক্তি ততই বৃদ্ধি পাবে। ঈমানের স্বাদ ততই আস্বাদিত হবে।
আল্লাহর শপথ! আমরা প্রচণ্ড এক অভাবের মাঝে আছি। আমাদের চিন্তা-চেতনাকে ঘিরে রেখেছে এক কঠিন দারিদ্র্য। আমাদের দারিদ্র্য ও অভাব হলো, আমরা ঈমানের মিষ্টতা আস্বাদন করতে পারছি না। আমাদের হৃদয়ে ঈমানের আলো প্রস্ফুটিত হয় না। আমরা আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করি না। আল্লাহ তায়ালার এ কথা স্বতঃসিদ্ধ, যে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত সে যেমন দুনিয়ার সাথে বসবাস করে, আর যে ঈমানের প্রতি আসক্ত সে আল্লাহর সাথে বসবাস করে। টাকা-পয়সার পূজারি যেমন তার ধন-সম্পদের সাথে বসবাস করে, তেমনি যার হৃদয়ে ঈমান রয়েছে তার বসবাস হলো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সাথে।
হৃদয়ে ঈমান তৈরি হবে আল্লাহ ও তার রাসুলকে সর্বাধিক ভালোবাসার মাধ্যমে। আল্লাহ ও তার রাসুলের ভালোবাসা অন্তরে সৃষ্টি না হলে ঈমান বৃদ্ধি ও শক্তিশালী হবে না। আর আল্লাহ ও তার রাসুলকে ভালোবাসার অর্থ হলো তাদের আনুগত্য করা। তারা যে-সমস্ত আদেশ করেছেন সেগুলো যথাযথ পালন করা। এবং যে-সমস্ত কাজ থেকে নিষেধ করেছেন সেগুলো থেকে সর্বতোভাবে বেঁচে থাকা। এটাই প্রকৃত ঈমান।
📄 যুবকের হৃদয়ে ঈমানের প্রশান্তি
এক যুবক মাত্রই ঈমানের পথে যাত্রা করেছে। আখেরাতের প্রাসাদ নির্মাণের সূচনা হয়েছে কেবল। একদিন সে পবিত্র কুরআনের সুরা ফুরকান মুখস্থ করতে শুরু করল। কেউ যদি গভীর চিন্তাভাবনার সাথে সুরা ফুরকান পড়ে তাহলে সে অনুভব করতে সক্ষম হবে, সুরা ফুরকান অত্যন্ত চমৎকার একটি সুরা। এ সুরায় বর্ণিত হয়েছে তাদের কথা যারা দুনিয়ায় থেকে আখেরাতের প্রাসাদ নির্মাণ করে এবং সেটিকে ধ্বংস হওয়া থেকে সংরক্ষণ করে। সে যুবক বলল, আমার হৃদয়ের অনেক বড় আশা হলো আমি সুরা ফুরকান মুখস্থ করব। আর আমি তখন সবে ঈমানের পথে যাত্রা করেছি। আমি তা মুখস্থ করতে চেষ্টা শুরু করি। অল্প অল্প করে একদিন পূর্ণ সুরা মুখস্থ করে শেষ করি। যুবকটি বলল, আমি যখন সুরাটি মুখস্থ করে মসজিদ থেকে বের হই তখন আমি হৃদয়ে অনুভব করি, আমার সম্মান ও মর্যাদার ভার এতই যে, সমগ্র সৃষ্টিজগৎ আমাকে বহন করতে সক্ষম নয়। আরো অনুভব করি, আমার ঈমান সমগ্র সৃষ্টিজগতের ওপর অগ্রগণ্য। ঈমানের সামনে পার্থিব সকল কিছু তুচ্ছ।
এ অনুভূতি যুবকের হৃদয়ে কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে? কেন তার অনুভব হয়েছে যে, সমগ্র সৃষ্টিজগতের চেয়ে তার ঈমানের মূল্য বেশি? তা কি ঈমানের কারণে নয়? ঈমানের শক্তিই কি তার অন্তরকে আলোকিত করে তুলেনি? ঈমানের মিষ্টতার ফলেই কি সে দুনিয়ার সকল মিষ্টতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করেনি? আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সুরা ফুরকানে তার প্রিয় বান্দাদের গুণাবলি আলোচনা করেছেন।
ইরশাদ হয়েছে, وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
'রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। যখন মূর্খরা তাদেরকে ঝগড়ার জন্য আহ্বান করে তখন তারা বলে সালাম বা শান্তি (আমরা তোমাদের সাথে ঝগড়া করতে চাই না)।
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ * إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامًا وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذُلِكَ قَوَامًا وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِنَّهَا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ ، وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا
'যারা রাত্রি অতিবাহিত করে তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে এবং দণ্ডায়মান থেকে। আর বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের থেকে জাহান্নামের শান্তি দূর করে দিন। জাহান্নামের শাস্তি নিশ্চিত বিনাশ। নিশ্চয় তা অস্থায়ী ও স্থায়ী আবাসস্থল হিসেবে নিকৃষ্ট। যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না। কার্পণ্যও করে না। বরং তারা এ উভয়ের মাঝামাঝি অবস্থায়। তারা আল্লাহর সাথে কোনো উপাস্যকে ডাকে না। আল্লাহ যাদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাদের হত্যা করে না এবং তারা ব্যভিচার করে না। যে এগুলো করে সে শান্তি ভোগ করবে।
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا
(এবং রহমানের বান্দা তারা) যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং অসার ক্রিয়াকলাপের সম্মুখীন হলে আপন মর্যাদার সাথে তা পরিহার করে চলে।'
অর্থাৎ আল্লাহর প্রিয় ও বিশেষ নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা যারা তাদের নিকট অযথা বিনষ্ট করার মতো সময় নেই। সকল মিথ্যা ও অনর্থক বিষয়কে তারা পরিহার করে চলে। মন্দ লোকদের সাথে উঠাবসা করে না। তাদের সংস্পর্শে যায় না। কারণ, এসব মুমিনের গুণাবলি নয়। ইরশাদ হয়েছে,
وَالَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ لَمْ يَخِرُّوا عَلَيْهَا صُمًّا وَعُمْيَانًا . وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
'(রহমানের বান্দা তারা) যাদের তাদের প্রতিপালকের আয়াত স্মরণ করিয়ে দিলে তার প্রতি অন্ধ ও বধিরসদৃশ আচরণ করে না, এবং যারা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন যারা আমাদের জন্য হবে নয়নপ্রীতিকর এবং আমাদের বানান মুত্তাকিদের জন্য অনুসরণযোগ্য।'
যারা দুনিয়ায় থেকে আল্লাহর আনুগত্য ও নেক আমলের মাধ্যমে আখেরাতের উত্তম প্রাসাদ নির্মাণ করে তাদের প্রতিদান কী হবে সে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
أُوْلَئِكَ يُجْزَوْنَ الْغُرْفَةَ بِمَا صَبَرُوا وَيُلَقَّوْنَ فِيهَا تَحِيَّةً وَسَلَامًا خَالِدِينَ فِيهَا حَسُنَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامًا * قُلْ مَا يَعْبَأُ بِكُمْ رَبِّي لَوْلَا دُعَاؤُكُمْ فَقَدْ كَذَّبْتُمْ فَسَوْفَ يَكُونُ لِزَامًا
'তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষ যেহেতু তারা ছিল ধৈর্যশীল। সেখানে তাদের সংবর্ধনা প্রদান করা হবে অভিবাদন ও সালাম সহকারে। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে তা কত উৎকৃষ্ট। (হে নবী) আপনি বলুন, তোমরা আমার প্রতিপালককে না ডাকলে তার কিছুই আসে যায় না। তোমরা অস্বীকার করেছ, ফলে অচিরেই তোমাদের ওপর নেমে আসবে অপরিহার্য শাস্তি।
এ হলো তাদের অবস্থা যারা রহমানের প্রিয় বান্দা। যারা আখেরাতের জন্য নির্মাণ করছে সুরম্য প্রাসাদ। যেখানে তারা মৃত্যুর পর শান্তি ও চিরসুখের মাঝে বসবাস করবে। পক্ষান্তরে যারা রহমানের অবাধ্য বান্দা তাদের গুণাবলি হলো সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা আখেরাতের জন্য নির্মিত প্রাসাদকে ধ্বংস করছে প্রতিনিয়ত। তারাই হতভাগা। আখেরাতে তাদের জন্য নেই কোনো অংশ।
টিকাঃ
১৫. সুরা ফুরকান: ৬৩।
১৬. সুরা ফুরকান: ৬৪-৬৮।
১৭. সুরা ফুরকান: ৭২।
১৮. সুরা ফুরকান: ৭৩-৭৪।
১৯. সুরা ফুরকান: ৭৫-৭৭।
📄 বিপদসঙ্কুল পথ হুশিয়ার মুসাফির
এক যুবকের করুণ গল্প বলছি। সে ছিল আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে লিপ্ত। তার ছিল অনেক বন্ধু; যারা সকলেই ছিল চরিত্রহীন লম্পট। আল্লাহর কোনো আদেশ তারা পালন করত না। বেঁচে থাকত না নিষেধসমূহ থেকে। নামাজ পড়ত না। অন্যায় ও পাপাচারিতার এহেন কোনো কর্ম ছিল না যা তারা করত না। হঠাৎ একদিন সে যুবক তার অসৎ বন্ধুদের সঙ্গ ত্যাগ করে। অতীতের সকল পাপকর্ম থেকে তওবা করে নতুন জীবনে প্রবেশ করে। আল্লাহ্র আদেশ পালন করে। নিষেধ থেকে বেঁচে থাকে। নামাজ পড়ে। ধীরে ধীরে সে ভালো ও মন্দের ফারাক চিনতে পেরেছে।
কিন্তু তার বন্ধুরা পূর্বের ন্যায় অবাধ্যতা ও পাপাচারিতায় মজে আছে। সে তার বন্ধুদের জন্য আক্ষেপ করতে লাগল। মৃত্যুর পর তাদের করুণ পরিণতির কথা ভেবে দারুণ দুঃখবোধ হতে লাগল তার অন্তরে। সে চিন্তা করল তার বন্ধুদের অবাধ্যতা ও নাফরমানি থেকে সৎপথে ফিরিয়ে আনবে। তাদের তওবা করিয়ে আলোর পথে পরিচালিত করবে। একদিন সে তার বন্ধুদের নিকট উপস্থিত হলো। কিন্তু সে বড় একটি ভুল করেছে। ভুলটি হলো, সে একা একা গিয়েছে তার বন্ধুদের দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। এর এটি খুব বড় একটি ভুল।
দ্বীনের পথে আগমনকারী প্রত্যেক নতুন ব্যক্তির জন্য এ এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী যে, কখনো একা কাউকে দ্বীনের দাওয়াত দিতে যাবে না। তাহলে তারা যখন দ্বীন সম্পর্কে নানান প্রশ্ন করতে শুরু করবে তখন সেসবের সঠিক উত্তর দিতে সে সক্ষম হবে না। ফলে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাকে আক্রমণ করতে শুরু করবে। তাকে নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস করবে। ফলে এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। যুবকটি এখানেই ভুল করল। সে তার বন্ধুদের নিকট যখন একাকী গিয়ে হাজির হলো তখন তারা তাকে নানান কটু কথা বলে জর্জরিত করতে লাগল। তার অতীত জীবনের বিভিন্ন পাপাচারিতার কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে লাগল। তাদের এহেন আচরণে যুবকটি ভীষণ কষ্ট পেল। তাদের সম্মিলিত আক্রমণের সামনে সে টিকতে পারেনি। ব্যর্থ মনে সে ফিরে এলো। তাই অবশ্যকর্তব্য হলো, একাকী কারো সংশোধন করতে না যাওয়া।
যুবকের বন্ধুরা বিভিন্ন ফন্দি করতে লাগল কীভাবে তাকে পুনরায় খারাপ পথে ফিরিয়ে আনা যায়। ফের কীভাবে তাকে তাদের দলে নিয়ে আসা যায়। একদিন তারা প্রতারণামূলকভাবে যুবকের নিকট গিয়ে বলল, আমরা নিকটস্থ এক জায়গায় ভ্রমণে যাব। তুমিও আমাদের সাথে যাবে। তুমি আমাদের বিভিন্ন উপদেশ দেবে। উপকারী কথা বলবে। নামাজ শিক্ষা দেবে। সেদিনের ঘটনার জন্য তারা দুঃখ প্রকাশ করল। প্রকৃতার্থে এসব ছিল তাদের ছলনা ও অপকৌশল মাত্র। তাদের কথায় যুবক সম্মত হলো। একসঙ্গে তারা ভ্রমণে বের হলো। গন্তব্যে পৌঁছে তারা একটি হোটেল ভাড়া করল। তারা পরিকল্পনা করতে লাগল কীভাবে তাকে হারাম কাজে লিপ্ত করা যায়।
অনেক ভেবেচিন্তে তারা একজন দুশ্চরিত্রা মেয়েকে বহু টাকা দিয়ে সম্মত করল যুবককে নানান ছলনায় তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে বাধ্য করতে। মেয়েটি তাদের কথা অনুযায়ী হোটেলে যুবকের রুমে প্রবেশ করল। মেয়েটি বিভিন্নভাবে যুবককে উত্তেজিত করতে লাগল। তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে প্ররোচিত করতে লাগল। যে গৃহে নারী ও পুরুষ থাকে শয়তান তাদের ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য প্ররোচনা দিতে থাকে। শয়তান যুবকের অন্তরে ক্রমাগত অশ্লীল কাজের প্ররোচনা দিতে লাগল।
যুবক প্রথমে নিজেকে সংবরণ করতে পারলেও পরে আর নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। শয়তানের প্ররোচনা ও মেয়েটির ক্রমাগত কুপ্রস্তাবে সম্মত হলো তার সঙ্গে ব্যভিচার করতে। যুবক ওই মেয়ের সাথে ব্যভিচার লিপ্ত হয়। আল্লাহ আমাদের ব্যভিচারসহ সকল জঘন্য পাপাচার থেকে হেফাজত করুন। মেয়েটি যখন তার উদ্দেশ্যে সফল হলো তখন তারা তাকে ধন্যবাদ জানাল। তারা হোটেলে প্রবেশ করে দেখে, সে উলঙ্গ হয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। তাকে নিয়ে উপহাস করতে লাগল। টানা-হেচড়া শুরু করে দিলো। তারা তাকে ঘুম থেকে জাগ্রত করার চেষ্টা করল। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও জাগাতে পারেনি। যুবকটি মদপান ও ব্যভিচার করার পর রাতেই সে মারা যায়। ইন্নালিল্লাহি...।
কত দুর্ভাগ্য সে যুবকের জন্য। যে বিছানায় রাতভর মদপান ও ব্যভিচার করেছে সে বিছানায় তার মৃত্যু হয়েছে। শেষ পরিণতি তার কতই-না নির্মম ও দুর্ভাগ্যের ছিল।
যে যুবক অতীত গুনাহ ও নাফরমানি থেকে তওবা করে সৎপথে ফিরে এসেছিল। খারাপ বন্ধুদের প্ররোচনায় পুনরায় গুনাহ ও নাফরমানিতে জড়িয়ে পড়ল। ধীরে ধীরে যে প্রাসাদ নির্মাণ করতে শুরু করেছিল সেটি ধ্বংস করে দিলো।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! ঈমান আমল ধ্বংস করার অন্যতম হাতিয়ার হলো অসৎসঙ্গ। তাদের সংস্পর্শে মুমিনের ঈমান হ্রাস পেতে থাকে। কখনো ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। তাই ঈমান বৃদ্ধি ও হেফাজতের জন্য করণীয় হলো অসৎসঙ্গ ত্যাগ করা। তাদের সংস্পর্শে কিছুতেই না যাওয়া। অসৎসঙ্গ ঈমান আমলের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ।
ইরশাদ হয়েছে, وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا * يَا وَيْلَتَا لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا
'জালিম ব্যক্তি সেদিন নিজে তার উভয় হাত দংশন করতে করতে বলবে, হায় আমি যদি রাসুলের সঙ্গে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায় দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!'
টিকাঃ
২০. সুরা ফুরকান: ২৭-২৮।