📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 পূর্ণ করো আমলের পাল্লা

📄 পূর্ণ করো আমলের পাল্লা


কেয়ামত দিবসে বান্দার বিচার করা হবে আমল অনুযায়ী। সেদিন পাল্লায় যার আমল হবে অধিক সেই সফল এবং যার পাল্লায় গোনাহ ও মন্দ আমল হবে সে ব্যর্থ। সকল সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ণয় করবে আমলের পাল্লা। কতই-না সৌভাগ্যবান সে ব্যক্তি যার আমলের পাল্লায় গোনাহের তুলনায় নেকি হবে অধিক। কিন্তু আমলের পাল্লায় সফলতার মাপকাঠি নির্ণয়কারী নেক আমল কখন অধিক হবে? তখনই অধিক হবে যখন কেউ আল্লাহর আনুগত্য করবে পূর্ণমাত্রায়। তখনই হবে যখন কেউ মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর সমস্ত আদেশ পালন করবে। নিষেধ থেকে বেঁচে থাকবে। গুনাহ ও নাফরমানি থেকে বিরত থাকবে।

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 অনুতপ্তের অশ্রুতে

📄 অনুতপ্তের অশ্রুতে


আল্লাহর শপথ! জান্নাতের অধিবাসীরা থাকবে আনতনয়না সুন্দরী রূপসি হুর, মনোরম প্রাসাদ, রকমারি ঝরনাসহ প্রভূত নেয়ামতরাজির মাঝে। জান্নাতের অধিবাসীরা সেদিন দুনিয়াতে অযথা নষ্ট করা প্রতিটি মুহূর্তের জন্য আফসোস করবে। আক্ষেপ ও অনুশোচনায় তাদের হৃদয় জ্বলতে থাকবে। বলবে, হায়! যদি দুনিয়ার ওই সামান্য সময়ও আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতাম। যদি প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যয় করতাম। জান্নাতের নেয়ামতরাজি তাদের অন্তরে আক্ষেপ ও অনুশোচনা জাগিয়ে তুলবে। তারা যখন আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বিশেষ বান্দাদের জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন দেখবে তখন তাদের অনুভূত হবে এ কথা যে, তাহলে আজ تو আরো বহু নেয়ামত এবং উচ্চস্তরের জান্নাতে আমাদের ঠিকানা হতো। দুনিয়াতে আল্লাহর অধিক আনুগত্য করতে না পারার দুঃখ তাদের পীড়িত করবে।

আল্লাহ তায়ালা জান্নাতকে তার প্রিয় ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। বিপরীতে অপর দল যারা দুনিয়াতে আল্লাহর অবাধ্যতা করেছে, গুনাহও পাপাচারিতায় ব্যস্ত ছিল তাদের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সৃষ্টি করেছেন জাহান্নাম। ইরশাদ হয়েছে,

يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَا لَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولَا

'যেদিন তাদের মুখমণ্ডল আগুনে উলট-পালট করা হবে সেদিন তারা বলবে, হায়! আমরা যদি আল্লাহকে মানতাম, রাসুলকে মানতাম।'

অপর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,

وَلَوْ تَرَى إِذِ الْمُجْرِمُونَ نَاكِسُوا رُءُوسِهِمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ رَبَّنَا أَبْصَرْنَا وَسَمِعْنَا فَارْجِعْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا إِنَّا مُوقِنُونَ

'হায় তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে মাথানত করে বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম, এখন আপনি আমাদের পুনরায় প্রেরণ করুন। আমরা সৎকর্ম করব। আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।'

وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا * يَا وَيْلَتَا لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخَذْ فُلَانًا خَلِيلًا

'জালিম ব্যক্তি সেদিন নিজ হাতদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে, হায়! আমি যদি রাসুলের সঙ্গে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায় দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!'

বর্তমান মুসলমানদের অবস্থা হলো, যদি তাদের জিজ্ঞেস করা হয় যে, কে তোমাদের আল্লাহর আনুগত্য থেকে বাধাপ্রদান করেছে? কে তোমাদের বাধা দিয়েছে আখেরাতে উত্তম প্রাসাদ নির্মাণ করতে? প্রতিউত্তরে তারা বলে, অমুক, অমুক, অমুক।

টিকাঃ
৯. সুরা আহযাব: ৬৬।
১০. সুরা সাজদাহ: ১২।
১১. সুরা ফুরকান: ২৭-২৮।

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 তারা ছিলেন অটল অবিচল

📄 তারা ছিলেন অটল অবিচল


বর্তমান লোকদের তুলনায় পূর্বেকার লোকদের ওপর জুলুম-নির্যাতন ছিল বেশি। আমাদের তুলনায় তাদের কষ্ট ছিল অধিক। তথাপিও তারা আল্লাহ ও তার রাসুলের অবাধ্যতা করেনি। তাদের একজনও আল্লাহর আদেশ পালনে সীমা লঙ্ঘন করেনি। আল্লাহর নিষেধে লিপ্ত হয়নি। তাদের জীবনে অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট থাকা সত্ত্বেও তারা আখেরাতের উত্তম প্রাসাদ নির্মাণে সামান্যতম কুণ্ঠিত হয়নি। পক্ষান্তরে বর্তমানে আমাদের জন্য অনেক সহজ হয়ে গেছে সবকিছু। আল্লাহ তায়ালা আমাদের ওপর সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট চাপিয়ে দেননি। আমাদের সাধ্যের বাহিরে কোনোকিছু আরোপ করেননি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের ওপর সীমাহীন রহম করেছেন। অসীম দয়া করেছেন। ইরশাদ হয়েছে,

يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ

'আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, তিনি তোমাদের জন্য কঠিন কিছু চান না।'

শত কষ্ট ও দুর্ভোগের ভিড়েও তারা আখেরাতের প্রাসাদ নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে। পক্ষান্তরে আমাদের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সবকিছু সহজ করে দিয়েছেন। আমাদের জীবনোপকরণ অত্যন্ত সুলভ। অসংখ্য নেয়ামত তিনি আমাদের অনুগত করে দিয়েছেন। তাই আসুন, আখেরাতের জন্য আমাদের প্রাসাদ নির্মাণ করি। তারা যেমন নিজেদের রক্ত, ঘামে, সময় ও শ্রম দিয়ে নির্মাণ করেছে আমরাও তেমনি নির্মাণ করি।

টিকাঃ
১২. মুসলিম: ৪৩।
১৩. সুরা বাকারাহ: ১৮৫।

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 ভালোবাসায় উত্তীর্ণ এক সাহাবী

📄 ভালোবাসায় উত্তীর্ণ এক সাহাবী


একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, মক্কায় খালেদ আল হুযালি নামে এক দুর্ধর্ষ ব্যক্তি রয়েছে। তুমি তার মাথা কেটে নিয়ে আসো আমার নিকট। খালেদ আল হুযালি ছিল মক্কার অত্যন্ত সাহসী ব্যক্তি। তার ভয়ে লোকেরা তটস্থ থাকত। তার শক্তি ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল অত্যধিক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়সকে তার মাথা আনতে আদেশ করলেন তখন তিনি এ কথা বলেননি যে, আমি তার মাথা আনতে সক্ষম হবো না। তিনি বলেননি, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমাকে না পাঠিয়ে অন্য কাউকে পাঠান। এর কারণ হলো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য তাদের অন্তরে পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল।

ইরশাদ হয়েছে,

إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا

'মুমিনের উক্তি তো এই যে, যখন তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেওয়ার জন্য আল্লাহ ও তার রাসুলের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তারা বলে, আমরা শ্রবণ করলাম এবং আনুগত্য করলাম। তারাই সফলকাম।'

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স রাদি.-কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করামাত্রই তিনি সম্মত হয়ে গেলেন। কোনো প্রকার টালবাহানা করেননি। অক্ষমতা পেশ করেননি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ পেয়ে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স রাদিয়াল্লাহু আনহু মদিনা থেকে মক্কা অভিমুখে রওনা করলেন। চলতে চলতে মক্কার উপকণ্ঠে আরাফাহর নিকট পৌঁছার পর দেখে খালেদ আল হুযালি একদল যুবককে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। এটা দেখে আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স রাদিয়াল্লাহু আনহু এগিয়ে গেলেন। খালেদ আল হুযালির নিকট গিয়ে বললেন, আমি আপনার সৈন্যদলে যোগ দিয়ে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাই।

তার আগ্রহ উদ্দীপনা দেখে খালেদ আল হুযালি তাকে নিজেদের দলভুক্ত করে নিলেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স রাদিয়াল্লাহু আনহু ধীরে ধীরে তাদের সাথে অন্তরঙ্গ হয়ে গেলেন। বাহিনীর সাথে সাথে যাচ্ছেন তিনি। চলতে চলতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স এবং খালেদ আল হুযালি বাহিনী থেকে পৃথক হয়ে গেলেন। বাহিনী সামনে সামনে চলছে আর তারা দুজন পেছনে পেছনে চলছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স রাদিয়াল্লাহু আনহু একে সুযোগ মনে করে কোমর থেকে তরবারি খাপমুক্ত করলেন। বাহিনীর পশ্চাদে তিনি খালেদ আল হুযালিকে হত্যা করেন। তরবারির আঘাতে দেহ থেকে মাথা ছিন্ন করে দ্রুত মদিনার দিকে রওনা করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এনে বীর-বিক্রমে খালেদ আল হুযালির কর্তিত মাথা পেশ করলেন। তা দেখে নবীজি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়সের প্রতি দারণ খুশি হন।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়সকে আদেশ করেছেন মক্কার দুর্ধর্ষ খালেদ আল হুযালিকে হত্যা করার জন্য। এ ছিল অত্যন্ত কঠিন নির্দেশ। এখানে জীবন হারানোর শঙ্কা। শত্রুর হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার ভয়। কিন্তু যত ভয় আর আশঙ্কা হোক না কেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ মানতেই হবে। নিজের জীবন, পিতা-মাতা, সন্তন-সন্ততি, পৃথিবীর সকল কিছু থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রদর্শন করা মুমিনের অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য এবং হয়েছেও তাই। আদেশ শোনামাত্র তিনি প্রস্তুত হয়ে গেলেন। সামান্যও দ্বিধা করেননি। কিন্তু বর্তমানে আমাদের পূর্ববর্তীদের ন্যায় এত কঠিন কাজ চাপিয়ে দেওয়া হয়নি যেখানে জীবন হারানোর শঙ্কা রয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের জন্য সবকিছু সহজ করে দিয়েছেন। অনুকূল করে দিয়েছেন। দূর করে দিয়েছেন সকল প্রতিকূলতা। পূর্ববর্তী লোকেরা যেমন কষ্ট স্বীকার করেছেন আমাদেরও তা করতে হয় না। এটি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি অফুরন্ত রহমত।

বদরের রণাঙ্গনে সংঘটিত হয়েছে ইসলামি ইতিহাসের ঐতিহাসিক যুদ্ধ। কাফের ও মুসলমানদের মধ্যে সংগঠিত এ যুদ্ধ রচনা করেছে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য। সেদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমবেত সাহাবিদের যুদ্ধের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। তাদের সাহস ও প্রেরণা দিতে থাকেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের লক্ষ্য করে বলেন, তোমরা জান্নাতের দিকে অগ্রসর হও; যার প্রশস্ততা হলো সমস্ত আসমান-জমিনের ন্যায়। এ কথা শুনে এক সাহাবি বিস্ময়মাখা কণ্ঠে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! জান্নাত সমস্ত আসমান-জমিনের ন্যায় প্রশস্ত? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, জান্নাত সমস্ত আসমান-জমিনের ন্যায় প্রশস্ত। তখন উক্ত সাহাবি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! তাহলে আমার ও জান্নাতের মাঝে ব্যবধান কীসের? প্রত্যুত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। তখন ওই সাহাবির হাতে ছিল একটি খেজুর। তিনি খেজুরটি নিক্ষেপ করে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়েন। হে আল্লাহর বান্দা! কোন জিনিস নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে তাদের তাড়িত করেছে? কীসের টানে তারা জীবনকে তুচ্ছ মনে করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে যুদ্ধের ময়দানে, যেখানে চলতে থাকে রক্ত ও মৃত্যুর খেলা? কোন শক্তির বলে বলীয়ান হয়ে তারা আখেরাতকে দুনিয়ার ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন?

টিকাঃ
১৪. সুরা নুর: ৫১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00