📘 পুণ্যময় আখেরাত 📄 পাপ পুণ্যের চোরাবালি

📄 পাপ পুণ্যের চোরাবালি


মুমিনের ঈমান তখনই পূর্ণ হবে যখন গুনাহও নাফরমানি ছেড়ে দেবে। নেক কাজ করার পাশাপাশি যদি পাপকাজও করে তাহলে তার ঈমান কখনো পরিপূর্ণ হবে না। ঈমানের জন্য অপরিহার্য হলো নিষ্কলুষ, পবিত্র ও স্বচ্ছ হওয়া। এমন ঈমান যারা অর্জন করতে পারবে তারা ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে। তাদের আখেরাত হবে পুণ্যময়। আখেরাতের জন্য নির্মিত প্রাসাদ অক্ষত থাকবে, যা বাসস্থান হিসেবে অধিক উত্তম। পৃথিবীতে তার আমল ও নেক কাজের নিদর্শন ভেসে উঠবে প্রাসাদে। মধু যদি স্বচ্ছ ও পরিষ্কার না হয় তাহলে সে মধুর মিষ্টতা আস্বাদন করা যায় না। তার মূল্য পরখ করা যায় না। মধু যত বেশি স্বচ্ছ ও পরিষ্কার হবে ততই তার মিষ্টতা আস্বাদন হবে। ঠিক তদ্রূপ ঈমান যখন স্বচ্ছ, পরিষ্কার এবং দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হবে তখন ঈমানের মিষ্টতা মুমিন আস্বাদন করতে পারবে। কিন্তু আজ আমাদের দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, মুসলমান নেক আমল এবং একই সঙ্গে অন্যায়, নাফরমানي ও পাপাচারে লিপ্ত থাকে। আনুগত্য ও অবাধ্যতা একসঙ্গে চলছে। নামাজ পড়ে কিন্তু হারাম ভক্ষণ করছে। রোজা রাখছে, সদকাহ দিচ্ছে কিন্তু সেইসাথে হারাম কাজও করছে। এর নাম কি ঈমান? ঈমান কি কেবল মৌখিক স্বীকারোক্তির নাম? অন্তরের সুদৃঢ় বিশ্বাস এবং আমলের নাম কী ঈমান নয়?

জেনে রেখো! আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ আনুগত্যের মাধ্যমে আখেরাতে বান্দার প্রাসাদ নির্মিত হয়। তেমনিভাবে আল্লাহর অবাধ্যতা, গোানহ-পাপাচারিতার কারণে ঈমান হ্রাস ও দুর্বল হয়। নেক আমলের মাধ্যমে আখেরাতের জন্য যে প্রাসাদ নির্মাণ করে তা ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হতে থাকে।

ইরশাদ হয়েছে,

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَّهُمْ دَرَجَاتٌ عِندَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ

'মুমিন তো তারাই, আল্লাহর কথা স্মরণ হলে যাদের অন্তর ভীত হয় এবং তার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করলে যাদের অন্তরে ঈমান বৃদ্ধি পায়। আর তারা তাদের প্রভুর ওপর ভরসা করে। মুমিন তারাই যারা নামাজ সুসম্পন্ন করে এবং তাদের যা দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে। তারাই হলো সত্যিকারের মুমিন। তাদের জন্য তাদের প্রভুর নিকট রয়েছে মর্যাদা, ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা।'

বর্তমানে আমাদের অবস্থা হলো, আমরা আল্লাহর আনুগত্য করি, তার আদেশসমূহ পালন করি। কিন্তু হারাম ও নাজায়েজ কাজ পরিত্যাগ করি না। নেক আমল করার পাশাপাশি গোনাহের কাজও করি। আদেশ পালনের পাশাপাশি নিষেধেও লিপ্ত হই।

ইরশাদ হয়েছে,

وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَن يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

আর কোন কোন লোক রয়েছে যারা নিজেদের পাপ স্বীকার করেছে, তারা মিশ্রিত করেছে একটি নেককাজ ও অন্য একটি বদকাজ। শীঘ্রই আল্লাহ হয়ত তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

টিকাঃ
৬. ইমাম শাফেই ও অন্যান্য সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের মতে ঈমানে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। তাদের দলিল হলো, কুরআন-সুন্নাহর বিভিন্ন টেক্সটের বাহ্যিক শব্দ। ওই সকল আয়াত ও হাদীসে স্পষ্টতই ঈমানের ব্যাপারে হ্রাস-বৃদ্ধি ইত্যাদি শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মত হলো, ঈমানের মাঝে কমবেশি হয় না। তার মতে ঈমান হচ্ছে কতিপয় অত্যাবশ্যকীয় বিষয় সত্যায়ন ও স্বীকার করার নাম। ইমাম আবু হানিফা রহ. যে ঈমান কমবেশি হয় না বলেন, তার ব্যাখ্যা হলো, ঈমান যে মৌলিক ন্যূনতম কতিপয় বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপনের নাম, এর কম কিছুতেই হতে পারবে না। পক্ষান্তরে বেশিরও প্রয়োজন নেই। যে সকল আয়াত-হাদিসে ঈমান কমবেশি হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা মূল ঈমানের মাঝে কমবেশি হওয়ার কথা বলা হয়নি। বরং সৎকাজ করলে, কুরআন তিলাওয়াত করলে, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ইত্যাদি মেনে চললে ঈমান শক্তিশালী ও সুদৃঢ় হবে। আল্লাহর নিকট প্রিয় হবে। ঈমান অটুট, অবিচল থাকবে। পক্ষান্তরে এর বিপরীত হলে, ঈমান দুর্বল হবে। মুমিন হিসেবে আল্লাহর নিকট তার সম্মান-মর্যাদা কম হবে। মৌলিক ঈমানের মাঝে ত্রুটি হবে না। যারা বলেন ঈমানের মাঝে কম-বেশি হয় না, তাদের উদ্দেশ্য হলো, মুতলাকুল ঈমান (ন্যূনতম ঈমান, আমল অন্তর্ভুক্ত নয়)-মুমিন হওয়ার জন্য যতটুকু ঈমান জরুরি সেখানে কম-বেশি হয় না। পক্ষান্তরে যারা বলেন, ঈমানের মাঝে কম-বেশি হয়, তাদের উদ্দেশ্য হলো, ঈমান মুতলাক (ঈমান ও সঙ্গে আমল অন্তর্ভুক্ত) এ কম-বেশি হয়। যত অধিক আমল করবে, আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করবে ঈমান তাদের তত পূর্ণতা পাবে। যেমন, এক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যখন কোনো ব্যক্তি ব্যভিচার করে তখন সে মুমিন থাকে না। যখন কোনো মুমিন চুরি করে তখন সে মুমিন থাকে না।' এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সে তখন পূর্ণ মুমিন থাকে না। মন্দ আমলের কারণে তার ঈমান তখন হ্রাস পায়। সুতরাং এ মতানৈক্য নিছক শাব্দিক; পারিভাষিক নয়। অনুবাদক।
৭. সুরা আনফাল: ২-৪
৮. সুরা তাওবা: ১০২।

📘 পুণ্যময় আখেরাত 📄 ঈমান কেন বাড়ে

📄 ঈমান কেন বাড়ে


মুমিনের জীবনে ঈমানের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যখন কুরআন তিলাওয়াত করে তখন হৃদয়ে তার ঈমান বৃদ্ধি হয়। যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ গুরুত্বের সাথে আদায় করে তখন ঈমান বৃদ্ধি হয়। যখন জোহরের নামাজের পূর্বে চার রাকাত সুন্নত আদায় করে তখন তার ঈমান বৃদ্ধি হয়। যখন সৎকাজের আদেশ করে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে তখন ঈমান বৃদ্ধি পায়। যখন অপর মুসলিম ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলে তখন ঈমান বৃদ্ধি হয়। এমনিভাবে মুমিন যখন সদকাহ দেয় তখন ঈমান বৃদ্ধি হয়। মোটকথা, প্রত্যেক নেক আমল ও আল্লাহর আনুগত্যের দ্বারা মুমিনের হৃদয়ে ঈমান বৃদ্ধি পায়।

পক্ষান্তরে এর বিপরীতে যখন অন্যায়, পাপাচারে লিপ্ত হয় তখন ঈমান হ্রাস হয়। যখন টেলিভিশনের সামনে বসে, গান-বাদ্য শ্রবণ করে, চোখে অশ্লীল জিনিস দেখে তখন ঈমান কমে। কুরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ, তাহলিল ইত্যাদির মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে হারাম কাজ করার দ্বারা, আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানির দ্বারা, অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলার দ্বারা ঈমান হ্রাস হয়। বর্তমানে মুসলমানদের অবস্থা তো হলো, তারা একই সঙ্গে ভালো ও মন্দ উভয়টি করে। আল্লাহর আনুগত্য করার পাশাপাশি হারাম ও নাজায়েজ কাজেও লিপ্ত হয়। ফলশ্রুতিতে এর পরিণাম হলো, আনুগত্য ও নেক আমলের দ্বারা একদিকে আখেরাতের উত্তম প্রাসাদ নির্মিত হয়, অপরদিকে গুনাহও অবাধ্যতার কারণে সে প্রাসাদ ধ্বংস হতে থাকে। শেষে আমাদের জীবনের কোনো মূল্যই আর অবশিষ্ট থাকে না। যখনই প্রাসাদ পূর্ণ হতে থাকে অমনি সেটি ধ্বংস করে ফেলে।

📘 পুণ্যময় আখেরাত 📄 পূর্ণ করো আমলের পাল্লা

📄 পূর্ণ করো আমলের পাল্লা


কেয়ামত দিবসে বান্দার বিচার করা হবে আমল অনুযায়ী। সেদিন পাল্লায় যার আমল হবে অধিক সেই সফল এবং যার পাল্লায় গোনাহ ও মন্দ আমল হবে সে ব্যর্থ। সকল সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ণয় করবে আমলের পাল্লা। কতই-না সৌভাগ্যবান সে ব্যক্তি যার আমলের পাল্লায় গোনাহের তুলনায় নেকি হবে অধিক। কিন্তু আমলের পাল্লায় সফলতার মাপকাঠি নির্ণয়কারী নেক আমল কখন অধিক হবে? তখনই অধিক হবে যখন কেউ আল্লাহর আনুগত্য করবে পূর্ণমাত্রায়। তখনই হবে যখন কেউ মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর সমস্ত আদেশ পালন করবে। নিষেধ থেকে বেঁচে থাকবে। গুনাহ ও নাফরমানি থেকে বিরত থাকবে।

📘 পুণ্যময় আখেরাত 📄 অনুতপ্তের অশ্রুতে

📄 অনুতপ্তের অশ্রুতে


আল্লাহর শপথ! জান্নাতের অধিবাসীরা থাকবে আনতনয়না সুন্দরী রূপসি হুর, মনোরম প্রাসাদ, রকমারি ঝরনাসহ প্রভূত নেয়ামতরাজির মাঝে। জান্নাতের অধিবাসীরা সেদিন দুনিয়াতে অযথা নষ্ট করা প্রতিটি মুহূর্তের জন্য আফসোস করবে। আক্ষেপ ও অনুশোচনায় তাদের হৃদয় জ্বলতে থাকবে। বলবে, হায়! যদি দুনিয়ার ওই সামান্য সময়ও আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতাম। যদি প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যয় করতাম। জান্নাতের নেয়ামতরাজি তাদের অন্তরে আক্ষেপ ও অনুশোচনা জাগিয়ে তুলবে। তারা যখন আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বিশেষ বান্দাদের জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন দেখবে তখন তাদের অনুভূত হবে এ কথা যে, তাহলে আজ تو আরো বহু নেয়ামত এবং উচ্চস্তরের জান্নাতে আমাদের ঠিকানা হতো। দুনিয়াতে আল্লাহর অধিক আনুগত্য করতে না পারার দুঃখ তাদের পীড়িত করবে।

আল্লাহ তায়ালা জান্নাতকে তার প্রিয় ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। বিপরীতে অপর দল যারা দুনিয়াতে আল্লাহর অবাধ্যতা করেছে, গুনাহও পাপাচারিতায় ব্যস্ত ছিল তাদের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সৃষ্টি করেছেন জাহান্নাম। ইরশাদ হয়েছে,

يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَا لَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولَا

'যেদিন তাদের মুখমণ্ডল আগুনে উলট-পালট করা হবে সেদিন তারা বলবে, হায়! আমরা যদি আল্লাহকে মানতাম, রাসুলকে মানতাম।'

অপর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,

وَلَوْ تَرَى إِذِ الْمُجْرِمُونَ نَاكِسُوا رُءُوسِهِمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ رَبَّنَا أَبْصَرْنَا وَسَمِعْنَا فَارْجِعْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا إِنَّا مُوقِنُونَ

'হায় তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে মাথানত করে বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম, এখন আপনি আমাদের পুনরায় প্রেরণ করুন। আমরা সৎকর্ম করব। আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।'

وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا * يَا وَيْلَتَا لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخَذْ فُلَانًا خَلِيلًا

'জালিম ব্যক্তি সেদিন নিজ হাতদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে, হায়! আমি যদি রাসুলের সঙ্গে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায় দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!'

বর্তমান মুসলমানদের অবস্থা হলো, যদি তাদের জিজ্ঞেস করা হয় যে, কে তোমাদের আল্লাহর আনুগত্য থেকে বাধাপ্রদান করেছে? কে তোমাদের বাধা দিয়েছে আখেরাতে উত্তম প্রাসাদ নির্মাণ করতে? প্রতিউত্তরে তারা বলে, অমুক, অমুক, অমুক।

টিকাঃ
৯. সুরা আহযাব: ৬৬।
১০. সুরা সাজদাহ: ১২।
১১. সুরা ফুরকান: ২৭-২৮।

ফন্ট সাইজ
15px
17px