📄 প্রকৃত শান্তি কোথায়?
হে আল্লাহর বান্দাগণ! শোনো, কীসের জন্য আফসোস করছেন হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু। কীসের জন্য হৃদয় পুড়ছে তাঁর। হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল আফসোস আর আক্ষেপ করছেন রাতে বেশি বেশি নামাজ পড়ার জন্য, দিনের বেলা রোজা রাখার জন্য এবং আলেমদের মজলিসে বসার জন্য।
কবি বড় সুন্দর বলেছেন,
'আমার অশান্ত হৃদয় ক্রন্দন করে দুনিয়ার জন্য অথচ আমি জানি প্রগাঢ় শান্তি হলো দুনিয়াকে ত্যাগ করার মাঝে। মৃত্যুর পর আমার বাসগৃহ হবে সেটি যা আমি নির্মাণ করেছি মৃত্যুর পূর্বে। আমল যদি ভালো হয় তাহলে বাসগৃহ হবে সুন্দর। নচেৎ বাসস্থান হবে নিকৃষ্ট ও ভয়ংকর।'
আল্লাহ তায়ালা আখেরাতে বান্দার সাথে তেমনই আচরণ করবেন যেমনটি বান্দা দুনিয়াতে অর্জন করেছে। আখেরাতের বাসস্থান তেমনি হবে যেমনটি দুনিয়াতে নির্মাণ করেছে। যদি আল্লাহর আনুগত্য ও নেক আমলের মাধ্যমে উত্তম গৃহ নির্মাণ করে তাহলে বাসস্থান হবে আরামদায়ক ও প্রশান্তিঘেরা। আর যদি অবাধ্যতা ও গুনাহকরে তাহলে বাসস্থান হবে নিকৃষ্ট। তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। পুণ্যময় আখেরাতের জন্য প্রয়োজন আল্লাহর আনুগত্য করা। তার সকল আদেশ-নিষেধ মেনে চলা।
ঈমান ও আমলের ব্যাপারে মানুষ আজ ধোঁকার মধ্যে রয়েছে। আল্লাহর আনুগত্য করে এমন মানুষের সংখ্যা অনেক। কিন্তু খুব অল্প মানুষ রয়েছে এমন যারা আনুগত্যের পাশাপাশি হারাম ও নাজায়েজ থেকে বেঁচে থাকে। তাদের পরিণাম তো ওইসব ব্যক্তিদের মতোই যারা একদিকে নির্মাণ করে
📄 পাপ পুণ্যের চোরাবালি
মুমিনের ঈমান তখনই পূর্ণ হবে যখন গুনাহও নাফরমানি ছেড়ে দেবে। নেক কাজ করার পাশাপাশি যদি পাপকাজও করে তাহলে তার ঈমান কখনো পরিপূর্ণ হবে না। ঈমানের জন্য অপরিহার্য হলো নিষ্কলুষ, পবিত্র ও স্বচ্ছ হওয়া। এমন ঈমান যারা অর্জন করতে পারবে তারা ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে। তাদের আখেরাত হবে পুণ্যময়। আখেরাতের জন্য নির্মিত প্রাসাদ অক্ষত থাকবে, যা বাসস্থান হিসেবে অধিক উত্তম। পৃথিবীতে তার আমল ও নেক কাজের নিদর্শন ভেসে উঠবে প্রাসাদে। মধু যদি স্বচ্ছ ও পরিষ্কার না হয় তাহলে সে মধুর মিষ্টতা আস্বাদন করা যায় না। তার মূল্য পরখ করা যায় না। মধু যত বেশি স্বচ্ছ ও পরিষ্কার হবে ততই তার মিষ্টতা আস্বাদন হবে। ঠিক তদ্রূপ ঈমান যখন স্বচ্ছ, পরিষ্কার এবং দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হবে তখন ঈমানের মিষ্টতা মুমিন আস্বাদন করতে পারবে। কিন্তু আজ আমাদের দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, মুসলমান নেক আমল এবং একই সঙ্গে অন্যায়, নাফরমানي ও পাপাচারে লিপ্ত থাকে। আনুগত্য ও অবাধ্যতা একসঙ্গে চলছে। নামাজ পড়ে কিন্তু হারাম ভক্ষণ করছে। রোজা রাখছে, সদকাহ দিচ্ছে কিন্তু সেইসাথে হারাম কাজও করছে। এর নাম কি ঈমান? ঈমান কি কেবল মৌখিক স্বীকারোক্তির নাম? অন্তরের সুদৃঢ় বিশ্বাস এবং আমলের নাম কী ঈমান নয়?
জেনে রেখো! আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ আনুগত্যের মাধ্যমে আখেরাতে বান্দার প্রাসাদ নির্মিত হয়। তেমনিভাবে আল্লাহর অবাধ্যতা, গোানহ-পাপাচারিতার কারণে ঈমান হ্রাস ও দুর্বল হয়। নেক আমলের মাধ্যমে আখেরাতের জন্য যে প্রাসাদ নির্মাণ করে তা ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হতে থাকে।
ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَّهُمْ دَرَجَاتٌ عِندَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ
'মুমিন তো তারাই, আল্লাহর কথা স্মরণ হলে যাদের অন্তর ভীত হয় এবং তার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করলে যাদের অন্তরে ঈমান বৃদ্ধি পায়। আর তারা তাদের প্রভুর ওপর ভরসা করে। মুমিন তারাই যারা নামাজ সুসম্পন্ন করে এবং তাদের যা দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে। তারাই হলো সত্যিকারের মুমিন। তাদের জন্য তাদের প্রভুর নিকট রয়েছে মর্যাদা, ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা।'
বর্তমানে আমাদের অবস্থা হলো, আমরা আল্লাহর আনুগত্য করি, তার আদেশসমূহ পালন করি। কিন্তু হারাম ও নাজায়েজ কাজ পরিত্যাগ করি না। নেক আমল করার পাশাপাশি গোনাহের কাজও করি। আদেশ পালনের পাশাপাশি নিষেধেও লিপ্ত হই।
ইরশাদ হয়েছে,
وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَن يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
আর কোন কোন লোক রয়েছে যারা নিজেদের পাপ স্বীকার করেছে, তারা মিশ্রিত করেছে একটি নেককাজ ও অন্য একটি বদকাজ। শীঘ্রই আল্লাহ হয়ত তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
টিকাঃ
৬. ইমাম শাফেই ও অন্যান্য সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের মতে ঈমানে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। তাদের দলিল হলো, কুরআন-সুন্নাহর বিভিন্ন টেক্সটের বাহ্যিক শব্দ। ওই সকল আয়াত ও হাদীসে স্পষ্টতই ঈমানের ব্যাপারে হ্রাস-বৃদ্ধি ইত্যাদি শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মত হলো, ঈমানের মাঝে কমবেশি হয় না। তার মতে ঈমান হচ্ছে কতিপয় অত্যাবশ্যকীয় বিষয় সত্যায়ন ও স্বীকার করার নাম। ইমাম আবু হানিফা রহ. যে ঈমান কমবেশি হয় না বলেন, তার ব্যাখ্যা হলো, ঈমান যে মৌলিক ন্যূনতম কতিপয় বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপনের নাম, এর কম কিছুতেই হতে পারবে না। পক্ষান্তরে বেশিরও প্রয়োজন নেই। যে সকল আয়াত-হাদিসে ঈমান কমবেশি হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা মূল ঈমানের মাঝে কমবেশি হওয়ার কথা বলা হয়নি। বরং সৎকাজ করলে, কুরআন তিলাওয়াত করলে, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ইত্যাদি মেনে চললে ঈমান শক্তিশালী ও সুদৃঢ় হবে। আল্লাহর নিকট প্রিয় হবে। ঈমান অটুট, অবিচল থাকবে। পক্ষান্তরে এর বিপরীত হলে, ঈমান দুর্বল হবে। মুমিন হিসেবে আল্লাহর নিকট তার সম্মান-মর্যাদা কম হবে। মৌলিক ঈমানের মাঝে ত্রুটি হবে না। যারা বলেন ঈমানের মাঝে কম-বেশি হয় না, তাদের উদ্দেশ্য হলো, মুতলাকুল ঈমান (ন্যূনতম ঈমান, আমল অন্তর্ভুক্ত নয়)-মুমিন হওয়ার জন্য যতটুকু ঈমান জরুরি সেখানে কম-বেশি হয় না। পক্ষান্তরে যারা বলেন, ঈমানের মাঝে কম-বেশি হয়, তাদের উদ্দেশ্য হলো, ঈমান মুতলাক (ঈমান ও সঙ্গে আমল অন্তর্ভুক্ত) এ কম-বেশি হয়। যত অধিক আমল করবে, আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করবে ঈমান তাদের তত পূর্ণতা পাবে। যেমন, এক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যখন কোনো ব্যক্তি ব্যভিচার করে তখন সে মুমিন থাকে না। যখন কোনো মুমিন চুরি করে তখন সে মুমিন থাকে না।' এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সে তখন পূর্ণ মুমিন থাকে না। মন্দ আমলের কারণে তার ঈমান তখন হ্রাস পায়। সুতরাং এ মতানৈক্য নিছক শাব্দিক; পারিভাষিক নয়। অনুবাদক।
৭. সুরা আনফাল: ২-৪
৮. সুরা তাওবা: ১০২।
📄 ঈমান কেন বাড়ে
মুমিনের জীবনে ঈমানের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যখন কুরআন তিলাওয়াত করে তখন হৃদয়ে তার ঈমান বৃদ্ধি হয়। যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ গুরুত্বের সাথে আদায় করে তখন ঈমান বৃদ্ধি হয়। যখন জোহরের নামাজের পূর্বে চার রাকাত সুন্নত আদায় করে তখন তার ঈমান বৃদ্ধি হয়। যখন সৎকাজের আদেশ করে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে তখন ঈমান বৃদ্ধি পায়। যখন অপর মুসলিম ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলে তখন ঈমান বৃদ্ধি হয়। এমনিভাবে মুমিন যখন সদকাহ দেয় তখন ঈমান বৃদ্ধি হয়। মোটকথা, প্রত্যেক নেক আমল ও আল্লাহর আনুগত্যের দ্বারা মুমিনের হৃদয়ে ঈমান বৃদ্ধি পায়।
পক্ষান্তরে এর বিপরীতে যখন অন্যায়, পাপাচারে লিপ্ত হয় তখন ঈমান হ্রাস হয়। যখন টেলিভিশনের সামনে বসে, গান-বাদ্য শ্রবণ করে, চোখে অশ্লীল জিনিস দেখে তখন ঈমান কমে। কুরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ, তাহলিল ইত্যাদির মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে হারাম কাজ করার দ্বারা, আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানির দ্বারা, অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলার দ্বারা ঈমান হ্রাস হয়। বর্তমানে মুসলমানদের অবস্থা তো হলো, তারা একই সঙ্গে ভালো ও মন্দ উভয়টি করে। আল্লাহর আনুগত্য করার পাশাপাশি হারাম ও নাজায়েজ কাজেও লিপ্ত হয়। ফলশ্রুতিতে এর পরিণাম হলো, আনুগত্য ও নেক আমলের দ্বারা একদিকে আখেরাতের উত্তম প্রাসাদ নির্মিত হয়, অপরদিকে গুনাহও অবাধ্যতার কারণে সে প্রাসাদ ধ্বংস হতে থাকে। শেষে আমাদের জীবনের কোনো মূল্যই আর অবশিষ্ট থাকে না। যখনই প্রাসাদ পূর্ণ হতে থাকে অমনি সেটি ধ্বংস করে ফেলে।
📄 পূর্ণ করো আমলের পাল্লা
কেয়ামত দিবসে বান্দার বিচার করা হবে আমল অনুযায়ী। সেদিন পাল্লায় যার আমল হবে অধিক সেই সফল এবং যার পাল্লায় গোনাহ ও মন্দ আমল হবে সে ব্যর্থ। সকল সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ণয় করবে আমলের পাল্লা। কতই-না সৌভাগ্যবান সে ব্যক্তি যার আমলের পাল্লায় গোনাহের তুলনায় নেকি হবে অধিক। কিন্তু আমলের পাল্লায় সফলতার মাপকাঠি নির্ণয়কারী নেক আমল কখন অধিক হবে? তখনই অধিক হবে যখন কেউ আল্লাহর আনুগত্য করবে পূর্ণমাত্রায়। তখনই হবে যখন কেউ মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর সমস্ত আদেশ পালন করবে। নিষেধ থেকে বেঁচে থাকবে। গুনাহ ও নাফরমানি থেকে বিরত থাকবে।