📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 জাগরে গাফেল সরিয়ে ঘুমের পর্দা

📄 জাগরে গাফেল সরিয়ে ঘুমের পর্দা


একজন গভীর রাতে কিংবা রাত্রির শেষ প্রহরে ঘুমিয়েছে। মুয়াজ্জিন যখন সকলকে [الصلاة خير من النوم ঘুম থেকে নামাজ ভালো] বলে আহ্বান করে তখন সে অপ্রস্তুত ঘুম থেকে জেগে ওঠে। শারীরিক ক্লান্তি ও অক্ষমতা সত্ত্বেও ছুটে যায় মসজিদের দিকে। পক্ষান্তরে অন্য একজন রাতভর ঘুমানোর পরও তার কানের কাছে যদি ঘণ্টি পেটানো হয় তবুও সে জাগে না। নামাজের জন্য তার ন্যূনতম আগ্রহ নেই।

এ দু-জনের মাঝে পার্থক্য কোথায়? কেন একজন সমস্ত ক্লান্তি ও অক্ষমতা সত্ত্বেও ছুটে যায় মসজিদের দিকে এবং অন্যজনের রাতভর ঘুমানোর পরও জাগ্রত হয় না অলসতার চাদর সরিয়ে। শক্তিশালী ঘণ্টি বাজানোর পরও তার চেতনা জাগে না। হ্যাঁ, এটিই ঈমান। ইহাই ঈমানের প্রভাব। একজন আমলের প্রাসাদ নির্মাণ করছে, আরেকজন ধ্বংস করছে। এর প্রকৃত কারণ হলো, তাদের মাঝে রয়েছে ঈমানের তারতম্য। ঈমানের সুদৃঢ়তা ও দুর্বলতা। ঈমানের অবিচলতা আল্লাহর আনুগত্য ও নেক আমল করতে উদ্বুদ্ধ করে। আর দুর্বল ঈমান অবাধ্যতা ও নাফরমানির দিকে তাড়িত করে।

মুসলমানদের জীবনে আজ যে বিষয়টি চির সত্য ও বাস্তব বলে প্রমাণিত, তা হলো ঈমানের দুর্বলতা। মুসলমান আজ হৃদয় থেকে ঈমানের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ঈমানের আলো থেকে তারা দূরে সরে গেছে। উম্মাহর সকল অধঃপতন ও নির্মমতার একমাত্র কারণ হলো, ঈমান থেকে দূরে সরে যাওয়া। মুসলমানদের হৃদয়ে আজ যে পরিমাণ ঈমান অবশিষ্ট রয়েছে পৃথিবীতে তাদের শক্তিও সেই পরিমাণ।

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 ঈমান যখন জাগবে তোমার

📄 ঈমান যখন জাগবে তোমার


মুমিন তার ঈমান অনুযায়ী আমল করে। ঈমান অনুপাতে সে তার আমলের প্রাসাদ নির্মাণ করে। যার ঈমান শক্তিশালী সে কখনো মন্দ প্রবৃত্তি, দুনিয়ার স্বাদ ও শয়তানি ধোঁকায় পতিত হয় না। যার ঈমান দুর্বল সে সামান্যতেই প্রবৃত্তি, দুনিয়ার আসক্তি এবং শয়তানের ধোঁকায় পতিত হয়। অবাধ্যতা, নাফরমানিতে অতি সহজে লিপ্ত হয়ে যায়। কেউ কেউ আল্লাহর নিকট একবার চাইলেই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার ডাকে সাড়া দেন। আর কেউ কেউ হাজারবার ডেকেও ব্যর্থ হয়। আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন না। কেন এই পার্থক্য? কেন এত ব্যবধান? এই পার্থক্য ও ব্যবধানের একমাত্র কারণ হলো ঈমান। ঈমান সবকিছুর মাঝে পার্থক্য রচিত করে। ঈমান যাদের সুদৃঢ় তাদের অন্তর জীবিত। তাদের হৃদয়ে সর্বদা বিরাজ করে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ভয়। সকল কাজে তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তাদের অন্তরে এ অনুভূতি বিরাজমান থাকে যে, আমি যা কিছু করছি তার সবকিছু আল্লাহ দেখছেন। আমার কিছু থেকে কিছুই তার জ্ঞানের বাহিরে নয়। এ অন্তরকে বলা হয় জীবিত অন্তর। ঈমানের নূর দ্বারা আলোকিত অন্তর।

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে বারবার বলেছেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا 'হে ঈমানদারগণ! হে ঈমানদারগণ! হে ঈমানদারগণ!

আল্লাহ তায়ালা এ বলে সম্বোধন করেছেন, কেননা সবকিছুর ফয়সালা ও পরিমাপ হবে ঈমানের ভিত্তিতে। ঈমানই সফলতা ও ব্যর্থতার মাপকাঠি। সম্মান ও অপদস্থতার মানদণ্ড।

ইরশাদ হয়েছে, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি ঈমান আনো।'

এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে ঈমান আনার কথা বলেছেন। কেন! তারা কি মুমিন নয়? হ্যাঁ, তারা মুমিন। তথাপিও আল্লাহ তায়ালা ঈমান আনয়নের কথা বলেছেন, মূলত ঈমানের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করার জন্য। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা হলো, হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ঈমানকে সংরক্ষণ করো। ঈমানের প্রতি যত্নবান হও। ঈমানের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি পূরণ করো। ঈমানকে অন্তরে শক্তিশালী ও সুদৃঢ়ভাবে গেঁথে নাও।

ঈমান দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, আখেরাতের চেয়ে দুনিয়ার প্রতি অধিক আসক্ত হওয়া। দুনিয়ার মোহ ও ভালোবাসায় আচ্ছন্ন হওয়া। দুনিয়াবি বিষয় নিয়ে অধিক চিন্তা-ভাবনা করা। মানুষের হৃদয়ে ঈমান সৃষ্টি হওয়ার পর তা ক্রমাগত দুর্বল অথবা শক্তিশালী হয়।

টিকাঃ
৪. সুরা নিসা: ১৩৬।

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 আসক্ত নয় নিরাসক্ত হও

📄 আসক্ত নয় নিরাসক্ত হও


হে আমার প্রিয় বন্ধুগণ! আমরা কেন ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হই। যার ধ্বংস অনিবার্য, যার পতন অবশ্যম্ভাবী, যার বিনাশ সুনিশ্চিত তার প্রতি কেন আমাদের মোহ তৈরি হয়? আখেরাতের প্রতি কেন আমাদের অন্তরে আগ্রহ তৈরি হয় না। অথচ আখেরাত চিরস্থায়ী। যার সূচনা আছে কিন্তু সমাপ্তি নেই। যার কোনো ধ্বংস নেই। বিনাশ নেই। অনন্তকাল-ব্যাপী যা চলমান থাকবে।

রিজিকের অন্বেষণে ভোরের পাখিরা যখন ডানা মেলে উড়ে যায় দূর অরণ্যে তখন তারা নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়া মুসল্লিদের দেখে বলে, 'সফলতা কেবল তাদের জন্য যারা নামাজি। সফলতা তাদের জন্য যারা আল্লাহর নিরাপত্তার বেষ্টনীতে প্রবেশ করেছে।' আর কতক মানুষ এমন রয়েছে যারা সূর্যোদয়ের পর ঘুম থেকে জাগ্রত হয়। কিন্তু এজন্য হৃদয়ে তাদের কোনো প্রকার আক্ষেপ জাগে না। নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তারা লজ্জিত হয় না।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا

'আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তাহলে হাসতে কম, কাঁদতে বেশি।'

📘 পুণ্যময় আখেরাত > 📄 কোন দহনে আজ পুড়ছে হৃদয়

📄 কোন দহনে আজ পুড়ছে হৃদয়


জনৈক ব্যক্তি একটি ঘটনা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, 'একদিন আমি এক ব্যক্তির কর্মস্থলে তার সাথে দেখা করতে গেলাম। আমি দেখি তার চেহারায় অস্থিরতা ও চিন্তার ভাঁজ। পেরেশানিতে তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে আছে। তাকে দেখে আমার মনে হলো, হয়তো বড় কোনো বিপদ তার ওপর পতিত হয়েছে। তার পরিবার-পরিজন অথবা তার ধন-সম্পদের ওপর নেমে এসেছে ঘোর কোনো মুসিবত। যার প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে তার অবয়বেও। আমি তাকে বললাম, চিন্তা করবেন না। ইনশাআল্লাহ, ভালো হয়ে যাবে। আমি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কেননা, এক মুসলমানের ওপর আরেক মুসলমানের কর্তব্য হলো, বিপদে পতিত হলে তাকে সান্ত্বনা দেওয়া। আমার কথা শুনে লোকটি দারুণ চটে গেল। বলল, চুপ করুন। এমন সুযোগ আর কখনো ফিরে আসবে না। এর ক্ষতিপূরণ কিছুতেই সম্ভব নয়। হায়! আর কখনো ফিরে আসবে না এ সুযোগ।

আমি তাকে বললাম, সময় ব্যতীত পৃথিবীর সবকিছুই ফিরে আসে। সময় ব্যতীত সবকিছুরই ক্ষতিপূরণ রয়েছে। আমি জানতে চাইলাম, কোন সে জিনিস যা তার হারিয়ে গেছে এবং আর কখনো ফিরে আসবে না? হে আল্লাহর বান্দাগণ! লোকটি কী বলেছে শোনো। আমার একটি ছয় তলা ভবন ছিল। প্রথম তলা পুরোটাই ছিল ব্যাবসার জন্য দারুণ উপযোগী। কিন্তু আমি সেটি খুব সস্তা ও নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছি। তার কথা শুনে আমি মনে মনে বললাম, ইন্নালিল্লাহি...! মুসলমান আজ কোন জিনিসের জন্য আফসোস করছে! কোন জিনিসের জন্য তাদের অন্তরে এত মর্মজ্বালা। শেষে আমি তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম আল্লাহ তায়ালার পবিত্র বাণী।

ইরশাদ হয়েছে, لِكَيْلا تَأْسَوْا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاكُمْ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ

'তা এজন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা বিমর্ষ না হও এবং যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল না হও। আল্লাহ পছন্দ করেন না উদ্ধত ও অহংকারীদের।'

কিন্তু শোনো, আজ কীসের জন্য আমরা ক্রন্দন করছি। শোনো, কোন জিনিসের আক্ষেপে পুড়ছে আমাদের অন্তর। পক্ষান্তরে দেখো হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু কোন জিনিসের জন্য ক্রন্দন ও সীমাহীন আক্ষেপ করেছেন। হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু ওই মহান সাহাবি যিনি শরিয়তের হালাল-হারাম সম্পর্কে ছিলেন সর্বাধিক জ্ঞাত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা হযরত মুয়াজকে বলেছিলেন,

وَاللهُ إِنِّي لَأُحِبُّكَ يَا مُعَاذُ 'হে মুয়াজ! আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে অত্যধিক ভালোবাসি।'

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওই ব্যক্তিকে ভালোবাসার ঘোষণা দিয়েছেন, যে আল্লাহর আনুগত্য ও নেক আমল করে আখেরাতের জন্য নির্মাণ করেছে পুণ্যের প্রাসাদ এবং মৃত্যু পর্যন্ত তার হেফাজত ও রক্ষণাবেক্ষণ করেছে। যে রাতে হযরত মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুমুখে পতিত হন সে রাতে তিনি বারবার তার পুত্রকে জিজ্ঞেস করছিলেন, ভোর উদিত হয়েছে কি? ছেলে বলল—না, আর খানিক পর। হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু কিছুক্ষণ পর পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ভোর উদিত হয়েছে কি? ছেলে জবাব দিলো-না, আরো খানিক পর। কিছুক্ষণ পর আবার জিজ্ঞেস করলেন, ভোর উদিত হয়েছে কি? ছেলে জবাব দিলো- হ্যাঁ, রাত অতিবাহিত হয়েছে। উদিত হয়েছে ভোর। তখন আল্লাহর নবীর প্রিয় সাহাবি হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে আল্লাহ! আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি এমন রাত থেকে যে রাত আমাকে জাহান্নামে নিয়ে যায়। অতঃপর যখন মৃত্যু তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল। তখন তিনি অত্যন্ত অনুনয়-বিনয়ের সুরে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাকে ডেকে বলেন হে আল্লাহ! আপনি তো জানেন, আমি আপনাকে ভয় করি। এবং এখন আমি আপনাকে অন্বেষণ করছি। হে আল্লাহ! আপনি তো জানেন, আমি দীর্ঘ সময় পৃথিবীতে অবস্থান, নদীতে সাঁতার এবং বৃক্ষরোপণ করে সুজল-সুফলা করার জন্য দুনিয়াকে ভালোবাসি না। দুনিয়াকে আমি ভালোবাসি রোজা রাখার জন্য, রাত্রিবেলা নামাজ পড়ান জন্য এবং আলেমদের মজলিসে বসার জন্য।'

টিকাঃ
৫. সুরা হাদীদ: ২৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00