📄 ধ্বংস নয় এসো নির্মাণ করি
হে আমার প্রিয় বন্ধুরা! ধ্বংস অত্যন্ত সহজ, কিন্তু নির্মাণ খুবই কঠিন। প্রতিটি নির্মাণই সীমাহীন প্রচেষ্টা ও শ্রমের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। প্রয়োজন হয় দীর্ঘ সময়ের। কিন্তু সেটি ধ্বংস করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় না। অধিক চেষ্টা ও শ্রমের দরকার পড়ে না। চার বা ছয় তলার একটি ভবন এক মুহূর্তে ভেঙে ফেলা সম্ভব। কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছরব্যাপী যেটি নির্মাণ করা হয়েছে সেটি কয়েক মুহূর্তে ধ্বংস করা অসম্ভব নয়। চূড়ায় আরোহণ করা বেশ কঠিন। প্রচুর সাহস ও আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন হয়। প্রচণ্ড কষ্ট ও পরিশ্রম শেষে তবেই পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করতে হয়। কিন্তু সেখান থেকে নিচে অবতরণ করা খুবই সহজ। তখন কষ্ট ও পরিশ্রমের দরকার হয় না। খুব সহজেই সেখান থেকে অবতরণ করা যায়।
ঠিক তেমনি মানুষের ক্ষেত্রে। অধিকাংশ মানুষ এমন, যারা দীর্ঘ কষ্ট ও পরিশ্রমে আমল করে। নেক কাজের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করে তার আমলের পাল্লা। নির্মাণ করে আখেরাতের জন্য সুদৃঢ় প্রাসাদ। কিন্তু শয়তান তাদের ধোঁকায় ফেলে নিমিষেই সকল আমল নষ্ট করে দেয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টা শেষে অর্জন বলতে কিছুই থাকে না তখন। শয়তান মানুষের অগ্রযাত্রা ও সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য বড় প্রতিবন্ধক। সরল-সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করতে শয়তান অসংখ্য কর্মপন্থা ছড়িয়ে রেখেছে চারপাশে।
📄 ঈমান পুণ্যময় প্রাসাদের শিকড়
মূল বিষয় হলো ঈমান। আখেরাতের জন্য নির্মিত সেই পুণ্যময় প্রাসাদ ধ্বংস হবে নাকি অটুট থাকবে এর সমাধান হবে ঈমানের ভিত্তিতে। কারো ঈমান যদি সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হয় তাহলে তার আমল দ্বারা নির্মিত প্রাসাদ ধ্বংস হবে না। শয়তান তাকে পরাস্ত করতে পারবে না। সরল-সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করতে সক্ষম হবে না। পক্ষান্তরে কারো ঈমান যদি হয় দুর্বল ও ভঙ্গুর, তাহলে তার আমলের মাধ্যমে নির্মিত অট্টালিকা ধ্বংস হয়ে যাবে। শয়তান তাকে সহজেই পরাস্ত করতে সক্ষম হবে। যার ঈমান যত শক্তিশালী হবে তার আমল ততই অধিক হবে। আখেরাতের জন্য নির্মিত প্রাসাদ ততই অটুট ও মজবুত থাকবে। আর যার ঈমান যত দুর্বল হবে তার আমল হবে তত নড়বড়ে।
ইরশাদ হয়েছে, عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَى لِلَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ 'আল্লাহর নিকট যা আছে তা উত্তম ও স্থায়ী তাদের জন্য, যারা ঈমান আনে এবং তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে।'
কারো আমল বিনষ্ট হয় না, আবার কারো আমল বিনষ্ট হয়ে যায়। কারো প্রাসাদ অক্ষত থাকে আবার কারো প্রাসাদ ধসে পড়ে। দুই শ্রেণির মাঝে ব্যবধান হবে ঈমান শক্তিশালী ও দুর্বল হওয়ার ভিত্তিতে। যাদের ঈমান শক্তিশালী তাদের কোনো ভয় নেই। আর যাদের ঈমান দুর্বল তাদের জন্য রয়েছে সমূহ দুর্গতি। আমল করে তারা আখেরাতের জন্য যে প্রাসাদ নির্মাণ করতে থাকবে, ঈমানের দুর্বলতার কারণে তা ধ্বংস হয়ে যাবে। ঈমান দুর্বল হওয়ার কারণে আমল করার পরও তারা শয়তানের ধোঁকায় পতিত হয়। প্রবৃত্তির তাড়নায় অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। গুনাহ ও পাপাচারিতায় জড়িয়ে পড়ে। ফলে তা নেক আমলকে ধ্বংস করে দেয়। ঈমান যদি শক্তিশালী ও সুদৃঢ় হয় তাহলে মসজিদ থেকে যখনই মুয়াজ্জিনের আজানের সুর ভেসে আসবে তখনই সে ছুটে যাবে মসজিদের দিকে। সকল
টিকাঃ
২. সুরা শুরা: ৩৬।
📄 প্রকৃতার্থেই মুমিনগণই সফল
দুনিয়াতে ও আখেরাতে সফল তারাই যাদের ঈমান পরিপূর্ণ। যাদের ঈমান তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্য ও আমলের প্রতি ধাবিত করে। ইরশাদ হয়েছে,
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ. وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ. وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُونَ. وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ. فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاء ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ. وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ. وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ. أُوْلَئِكَ هُمُ الْوَارِثُونَ الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
'প্রকৃতার্থে মুমিনগণই সফল; যারা তাদের নামাজে একনিষ্ঠ, যারা অহেতুক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে, যারা দান করে এবং যারা তাদের গুপ্তাঙ্গ সংযত রাখে, তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাধীন দাসীদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে কোনো দোষ হবে না। কিন্তু এর বাইরে অন্যদের কামনা করলে তারা
সীমালঙ্ঘনকারী হবে। মুমিন তারা যারা তাদের আমানত ও ওয়াদা রক্ষা করে, যারা তাদের নামাজের ব্যাপারে যত্নবান থাকে। এরাই হলো প্রকৃত উত্তরাধিকারী। যারা বেহেশতের উত্তরাধিকারী হবে, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।
📄 জাগরে গাফেল সরিয়ে ঘুমের পর্দা
একজন গভীর রাতে কিংবা রাত্রির শেষ প্রহরে ঘুমিয়েছে। মুয়াজ্জিন যখন সকলকে [الصلاة خير من النوم ঘুম থেকে নামাজ ভালো] বলে আহ্বান করে তখন সে অপ্রস্তুত ঘুম থেকে জেগে ওঠে। শারীরিক ক্লান্তি ও অক্ষমতা সত্ত্বেও ছুটে যায় মসজিদের দিকে। পক্ষান্তরে অন্য একজন রাতভর ঘুমানোর পরও তার কানের কাছে যদি ঘণ্টি পেটানো হয় তবুও সে জাগে না। নামাজের জন্য তার ন্যূনতম আগ্রহ নেই।
এ দু-জনের মাঝে পার্থক্য কোথায়? কেন একজন সমস্ত ক্লান্তি ও অক্ষমতা সত্ত্বেও ছুটে যায় মসজিদের দিকে এবং অন্যজনের রাতভর ঘুমানোর পরও জাগ্রত হয় না অলসতার চাদর সরিয়ে। শক্তিশালী ঘণ্টি বাজানোর পরও তার চেতনা জাগে না। হ্যাঁ, এটিই ঈমান। ইহাই ঈমানের প্রভাব। একজন আমলের প্রাসাদ নির্মাণ করছে, আরেকজন ধ্বংস করছে। এর প্রকৃত কারণ হলো, তাদের মাঝে রয়েছে ঈমানের তারতম্য। ঈমানের সুদৃঢ়তা ও দুর্বলতা। ঈমানের অবিচলতা আল্লাহর আনুগত্য ও নেক আমল করতে উদ্বুদ্ধ করে। আর দুর্বল ঈমান অবাধ্যতা ও নাফরমানির দিকে তাড়িত করে।
মুসলমানদের জীবনে আজ যে বিষয়টি চির সত্য ও বাস্তব বলে প্রমাণিত, তা হলো ঈমানের দুর্বলতা। মুসলমান আজ হৃদয় থেকে ঈমানের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ঈমানের আলো থেকে তারা দূরে সরে গেছে। উম্মাহর সকল অধঃপতন ও নির্মমতার একমাত্র কারণ হলো, ঈমান থেকে দূরে সরে যাওয়া। মুসলমানদের হৃদয়ে আজ যে পরিমাণ ঈমান অবশিষ্ট রয়েছে পৃথিবীতে তাদের শক্তিও সেই পরিমাণ।