📄 অনুবাদকের কথা
মানব জীবনের ধারাবাহিক দুটি স্তর-পার্থিব ও আখেরাত। পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী। আখেরাত চিরস্থায়ী-অনন্ত অনাদি। পার্থিব জীবনের সূচনা ও পরিসমাপ্তি উভয়টি রয়েছে। কিন্তু আখেরাতের সূচনা থাকলেও পরিসমাপ্তি নেই। এর শুরু আছে ঠিকই কিন্তু শেষ নেই। সত্যিই এ আমার রবের এক আশ্চর্য নিয়ম! চিরস্থায়ী আখেরাতের ভাগ্য ঝুলে থাকে ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের ওপর। মাত্র ষাট-সত্তর বছরের আলোকে নির্মিত হয় বান্দার অসীম অনন্ত জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতা। সত্যিই, এ এক বিস্ময়জাগানিয়া রহস্য। পার্থিব এ সময় যার সৌকর্যমণ্ডিত ও পুণ্যময় হবে চিরকালীন আখেরাত হবে তার জন্য শান্তি ও সুখের। আর এ পুরো সময় যে অসুন্দর ও পাপের চাষাবাদ করবে তার জন্য হবে নিদারুণ কষ্ট ও অনিঃশেষ যন্ত্রণার। প্রকৃতার্থে জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান তো তারাই যারা প্রথম শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
তাই প্রত্যেকটি মানুষের উচিত সফলতা ও ব্যর্থতার এ মানদণ্ড সম্পর্কে গভীর চিন্তা-ভাবনা করা। দুনিয়াতে আগমনের কারণ এবং স্রষ্টার সৃষ্টি-দর্শন নিয়ে নিবিড় মনোনিবেশ করা। জন্মের পর পরিণত বয়সে এ কথা ভুলে না যাওয়া— এর একদিন সমাপ্তি আছে। প্রত্যেক জিনিস তার শিকড়ের দিকে যাত্রা করে। তাহলে মানুষের শিকড় কোথায়? হে মুসাফির! কোথায় তোমার মনজিল? বুদ্ধিমান তো তারাই যারা ভ্রমণে বের হওয়ার পূর্বেই গন্তব্য নির্ধারণ করে নেয়। তাই আমাদের উচিত আমাদের গন্তব্য নির্ধারণ করে নেওয়া। জেনে রাখো! আমাদের গন্তব্য হলো আখেরাত। আমাদের শিকড় হলো আলমে আরওয়াহ বা রুহের জগৎ। মানুষ জানুক চাই না জানুক; অবশ্যই সে তার গন্তব্যের দিকেই যাত্রা করছে। কিন্তু পার্থক্য হলো, গন্তব্যের ঠিকানা জানা ও না জানার মাঝে। যে জানে সে প্রস্তুতি গ্রহণ করে। আখেরাত তার জন্য পুণ্যময়। সুখদ। শান্তির। যে জানে না সে প্রস্তুতি গ্রহণ করে না। আখেরাত তার জন্য অন্ধকার। শ্বাপদ। কণ্টকাকীর্ণ।
শাইখ খালিদ আর রশিদ হাফিজাহুল্লাহ একজন খ্যাতিমান দাঈ। অবস্থানগত দিক দিয়ে তিনি আরবের দাঈ হলেও মূলত বিশ্বব্যাপী চলমান তার দাওয়াতের কার্যক্রম। অফলাইন ও অনলাইন উভয় ধারায় সমানভাবে বিস্তৃত ছিল তার দাওয়াত ও মিশন। প্রযুক্তির কল্যাণে আজও তার উদাত্ত আহ্বান উম্মাহকে জাগ্রত করছে। তার প্রতিটি বয়ান মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ হচ্ছে। তার লেখা, তার লেকচার পথহারা মানুষের জীবনকে করছে দীপান্বিত। আলোকিত করছে গাফেল, উদাসীন মুসলমানদের। আরব তরুণদের প্রিয়ভাজন ছিলেন তিনি।
আরবের প্রজ্ঞাবান এই শাইখ বর্তমান সৌদি সরকারের রোষানলে কারাজীবন ভোগ করছেন। মহান রবের নিকট দোয়া করি এবং সকলের দোয়া কামনা করি, তিনি যেন সমকালীন বিশ্বের মহান এই আলেম ও দাঈকে জালিমের জিন্দানখানা থেকে মুক্ত করে পুনরায় উম্মাহর খেদমতে আত্মনিয়োগ করার তাওফিক দান করেন। তার ভরাট কণ্ঠের হৃদয়স্পর্শী আহ্বান যেন ফের মুসলিম উম্মাহর সদস্যদের কর্ণকোহরে ধ্বনিত হয়। মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে যেন আবারো ঢেউ তুলে তার উদাত্ত আহ্বান। খালিদ বিন ওয়ালিদ ও মুসআব ইবনে উমায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চেতনা ও রক্তকে ধারণকারী বীর সৈনিক আপনি দীর্ঘজীবী হোন। জয় হোক আপনার। বোধোদয় হোক আপনার শত্রুদের। মাত্র একটি বয়ানের জন্য তারা দীর্ঘ পনের বছর আপনাকে অন্ধকার গৃহে বন্দি করে রেখেছে। বঞ্চিত করছে উম্মাহর অজস্র সদস্যকে আপনার দরদীয় প্রেমার্ত কণ্ঠ থেকে।
বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি আরব শাইখ মুহতারাম খালিদ আর রশিদ হাফিজাহুল্লাহর দুটি লেকচারের অনুবাদ। তার প্রতিটি লেকচার আরবি, ইংরেজি-সহ পৃথিবীর বহুল প্রচলিত ভাষায় অনূদিত হচ্ছে। বাংলাভাষী পাঠককে শাইখের হৃদয়স্পর্শী ও আত্মবিগলিত লেখার সাথে পরিচিত করার লক্ষ্যে দাওয়াতি মেজাজ থেকে আমাদের এই শ্রম। গ্রন্থটি পাঠকের জীবনকে নতুন রঙে, নতুন চিন্তায় এবং নতুন স্বপ্নে তাড়িত করবে। ভেতরে জাগ্রত করবে ঈমানের আত্মমর্যাদা। আল্লাহর নির্দেশ এবং নবীজির সুন্নাহর প্রতি আকৃষ্ট করে তুলবে গভীরভাবে।
গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে রুচি ও সৃজনশীলতায় উত্তীর্ণ হাসানাহ পাবলিকেশন। একটি কল্যাণমূলক দাওয়াতের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তারা তাদের প্রকাশনীর কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের গ্রন্থ নির্বাচন এবং সাম্প্রতিক প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো সেদিকেই ইঙ্গিত করে। আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মান ও মর্যাদাশীল করুন। তাদের সকল খিদমাহ কবুল করুন।
লেখক, অনুবাদক, পাঠক, প্রকাশক ও সংশ্লিষ্ট সকলকে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কবুল করুন। দুনিয়াতে সম্মানিত করুন এবং পরকালে মুক্তির মাধ্যম বানান।
মুফতী জুবায়ের রশীদ মুশরিফ (ইফতা)
মারকাযুল উলুম আল-ইসলামিয়া উত্তরা, ঢাকা।
📄 পুণ্যময় আখেরাত
إن الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا. من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلل فلا هادي له. وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمداً عبده ورسوله. يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُمْ مُسْلِمُونَ
পার্থিব জীবনে আমাদের দৃষ্টান্ত হল, ওই পথিকের ন্যায় যে তার গৃহ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে দূরের কোন গন্তব্যে। বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে, বহু খানাখন্দ মারিয়ে যেখানে সে একদিন পৌঁছে যাবে ঠিকই, কিন্তু ফিরে আসবে না কখনো। আমরা আজন্ম এক সফরে আছি। অত্যন্ত সুদীর্ঘ সে সফর। যার সূচনা হলো দুনিয়া আর পরিসমাপ্তি হলো আখেরাত। আমাদের জীবন যেন এক অনিঃশেষ মুসাফিরের নাম। এই ভ্রমণে প্রয়োজন এমন কিছু পাথেয়; যা আমাদেরকে উপকৃত করবে এবং গন্তব্যে পৌঁছতে সাহায্য করবে। পাথেয় এবং উপকরণ যদি কম হয় এবং এগুলোর মূল্য যদি হয় বেশি তাহলে সফর হবে আরামদায়ক, তৃপ্তি ও প্রশান্তির। পক্ষান্তরে পাথেয় এবং উপকরণ যদি হয় অধিক এবং এসবের মূল্য যদি হয় স্বল্প তাহলে সফর হবে কণ্টকাকীর্ণ, বন্ধুর। কাঙ্ক্ষিত পথ পাড়ি দিতে জীবন হবে ততই ওষ্ঠাগত।
📄 চলে মুসাফির ফুরিয়ে বেলা
আমাদের চলমান এই সফর দুনিয়া থেকে আখেরাতের দিকে ধাবমান। প্রতিনিয়ত দুনিয়ার পথ সমাপ্ত করে আমরা আখেরাতের দিকে যাত্রা করছি। যেটি আমাদের উদ্দিষ্ট লক্ষ্য। পেছনের পথ যত পেরিয়ে যাচ্ছি আখেরাত ততই আমাদের নিকটবর্তী হচ্ছে। আমি প্রায়শই একটি উপমা পেশ করে থাকি; যাতে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে প্রকৃত বাস্তবতা। আর তা হলো, জনৈক ব্যক্তি একটি অট্টালিকা নির্মাণ শুরু করল। দীর্ঘ প্রচেষ্টা এবং অবিরাম শ্রমের পর সেটির নির্মাণ সমাপ্ত হলো। আর তখনই তার মালিক একটি ভারী ও শক্ত শাবল দিয়ে প্রাসাদের দেয়ালে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করতে লাগল।
শাবলের ক্রমাগত আঘাতে অট্টালিকাটি ভেঙে পড়ল। কিছুক্ষণ পূর্বে যেটি সৌন্দর্য আর ঐশ্বর্য নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেটি এখন দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে। দেখতে কী অসুন্দর আর কুৎসিত। আমরা ওই ব্যক্তিকে ঠিক কী বলে সম্বোধন করব? যদি কিছু না বলি, অন্তত এতটুকু তো বলব, সে একজন পাগল, বদ্ধ উন্মাদ। বিবেক-বুদ্ধির ন্যূনতম বালাই নেই তার মাঝে।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! বর্তমানে আমাদের প্রকৃত অবস্থা হলো ওই ব্যক্তির মতোই। যখন রহমত মাগফেরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আগমন করে মহিমান্বিত রমজান মাস, তখন দলে দলে লোকেরা মসজিদের দিকে ছুটে। আল্লাহর নিকট অনুনয়-বিনয়ের সাথে দোয়া করে। দীর্ঘ এক মাস অত্যন্ত আগ্রহ-উদ্দীপনার সাথে রমজানের সিয়াম পালন করে। কুরআন তিলাওয়াত এবং জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে। এসব হলো পাথেয়, যার দ্বারা মুসাফির পথিমধ্যে নিজের প্রয়োজনাদি পূরণ করে। কিন্তু যখনই রমজান বিদায় নিয়ে চলে যায় অমনি সে তার পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে।
পূর্বের ন্যায় অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে লিপ্ত হয়ে যায়। গুনাহ ও পাপাচারের সাগরে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। ফলে সে তার এক মাসের পালিত সিয়াম বিনষ্ট করে। নামাজ আদায় করে না। আজান হলেও মসজিদের দিকে ছুটে যায় না। কুরআন তিলাওয়াত, জিকিরের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। কেমন যেন দীর্ঘ এক মাস সিয়াম পালন করে, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া, কান্নাকাটি করে যে অট্টালিকাটি নির্মাণ করেছে সেটি ভেঙে ফেলেছে রমজানের পর।
📄 কুরআনের ভাষায় ওরা নির্বোধ
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে তাদের ব্যাপারে বড় চমৎকার একটি উপমা পেশ করেছেন,
وَلاَ تَكُونُوا كَالَّتِي نَقَضَتْ غَزْلَهَا مِنْ بَعْدِ قُوَّةٍ أَنكَانًا
'তোমরা সেই নারীর মতো হয়ো না, যে তার সুতা শক্তভাবে পাকানোর পর তার পাক খুলে দেয়।'
আল্লাহ তায়ালা আমল বিনষ্টকারী লোকদের ওই মহিলার সাথে তুলনা করেছেন যে তার দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও শ্রমের পর সুতাকে শক্তভাবে পাকিয়েছে। আর যখন সেটি পূর্ণতায় পৌঁছল তখনই সুতার পাক খুলে দিয়ে সেটিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়েছে। দীর্ঘ সময়ের প্রচেষ্টার কোনো মূল্য আর অবশিষ্ট রইল না। অযথা বৃথা গেল তার শ্রমটুকু। নামাজ, রোজা, ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকিরসহ যাবতীয় পুণ্য কাজ করার পর যখন মুসাফির পথের পাথেয় ও সামগ্রী সঞ্চয় করেছে, তখন সে যেন নিমিষেই তা পুড়িয়ে দিয়েছে। এখন পূর্বের ন্যায় পাথেয় এবং সামগ্রীবিহীন পথ পাড়ি দিতে হবে। আর মাঝখানে অযথাই কষ্ট করল। পরিশেষে তার ভাগ্যে জুটলো নিদারুণ পরিহাস, দুর্ভোগ ও লাঞ্ছনা। দুনিয়ার অসম্মান এবং আখেরাতের শাস্তি।
টিকাঃ
১. সুরা নাহল: ৯২।