📘 পুণ্যবান বন্ধু জীবনসফরে উত্তম সহযাত্রী > 📄 সীমিত পর্যায়ের হাসি-কৌতুক প্রশংসিত

📄 সীমিত পর্যায়ের হাসি-কৌতুক প্রশংসিত


প্রিয় মুসলিম ভাই, সালাফের বিভিন্ন কথা ও ঘটনা শুনে মনে মনে খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছ, তাই না? মাথার ভেতর প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, তাহলে কি হাসি- কৌতুক একদম ছেড়ে দিতে হবে? বন্ধুদের সাথে একটু মজা করার সুযোগও কি নেই?
একটু ধৈর্য ধরো ভাই। দেখো, সালাফ এ প্রশ্নের কী উত্তর দেন।
জাহাবি বলেন, 'অল্প হাসি ও মুচকি হাসি উত্তম। এর চেয়ে অতিরিক্ত হাসির ব্যাপারে উলামায়ে কিরামের দুই ধরনের মতামত রয়েছে। ১. আল্লাহর ভয়ে এবং নিজের নিঃস্ব নফসের দিকে তাকিয়ে অতিরিক্ত হাসি ত্যাগ করা।
উত্তম। ২. তবে হাসি যদি অহংকার ও আত্মম্ভরিতার কারণে হয়, তবে তা চরম নিন্দিত, যা বর্জন করা আবশ্যক। কারণ বেশি হাসলে অন্তর মরে যায়। অবশ্য যৌবনকালের হাসি বার্ধক্যের হাসির চেয়ে কিছুটা ক্ষমাযোগ্য।'
পক্ষান্তরে, মুচকি হাসি ও চেহারাকে হাস্যোজ্জ্বল রাখা একটি ফজিলতপূর্ণ আমল। রাসুল ইরশাদ করেন:
تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ صَدَقَةٌ
'তোমার ভাইয়ের সামনে মুখে মুচকি হাসি রাখা সদাকা।'১১২
জারির বলেন:
وَلَا رَآنِي إِلَّا تَبَسَّمَ فِي وَجْهِي
'রাসুল যতবারই আমাকে দেখেছেন, ততবারই আমার মুখে মুচকি হাসি ছিল।'১১৩
এটাই হলো ইসলামের চরিত্র। এর সর্বোচ্চ স্তর হলো, রাতের অন্ধকারে আল্লাহর সামনে অশ্রু ঝরানো আর দিনের আলোতে মুখে মুচকি হাসা রাখা।
রাসুল ইরশাদ করেন:
لَنْ تَسَعُوا النَّاسَ بِأَمْوَالِكُمْ، فَلْيَسَعُهُمْ مِنْكُمْ بَسْطُ وَجْهِ، وَحُسْنُ خُلُقٍ
'তুমি কখনো সম্পদ দিয়ে মানুষকে পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট করতে পারবে না, সুতরাং হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ও উত্তম চরিত্র দিয়ে তাদের পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট করো।'১১৪
হাসির ব্যাপারে সুষ্ঠু ভারসাম্য ও মধ্যম পন্থাই ইসলামে কাম্য। সুতরাং যারা বেশি হাসে তাদের উচিত, হাসি কমিয়ে দেওয়া এবং অধিক হাসির কারণে নিজেদের তিরস্কার করা। আর যারা একদমই হাসে না; সব সময় মুখ গোমড়া করে থাকে, তাদের উচিত চেহারায় মৃদু হাসি ফুটিয়ে রাখা। এটাই উত্তম চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত। মনে রাখতে হবে, মধ্যম পন্থার বাইরে সবকিছুই খারাপ—চাই সেটা বাড়াবাড়ি হোক বা ছাড়াছাড়ি। এ মধ্যম পন্থা ও সুষ্ঠু ভারসাম্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনে কঠিন মেহনত করা আবশ্যক। ১১৫

টিকাঃ
১১২. আল-মুজামুল আওসাত লিত তাবারানি: ৮৩৪২
১১৩. সহিহুল বুখারি: ৩০৩৫, সহিহু মুসলিম: ২৪৭৫
১১৪. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা: ২৫৩৩৩
১১৫. আস-সিয়ার: ১০/১৪০

📘 পুণ্যবান বন্ধু জীবনসফরে উত্তম সহযাত্রী > 📄 যখন বন্ধুহীন থাকা উত্তম

📄 যখন বন্ধুহীন থাকা উত্তম


প্রিয় ভাই, যদি সত্য ভালোবাসা ও প্রকৃত বন্ধুত্ব ইবাদতে সহায়ক হয় এবং কুপ্রবৃত্তি দমন করে, তখনই তা মুসলমানদের জন্য জরুরি। আর যদি এর উল্টো হয়, কিংবা এর মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য কোনো উপকার পাওয়া না যায়, তখন সম্পর্কহীন থাকাই উত্তম।
উমর বিন খাত্তাব বলেন, 'তোমরা প্রয়োজনে মানুষ থেকে সম্পর্কহীন থাকো। '১১৬
এখানে সম্পর্কহীন থাকার অর্থ এটা নয় যে, মানুষ সমাজ থেকে একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং জামাআতবদ্ধভাবে করার যে সকল ইবাদত ও আমল রয়েছে, তাও একাকী করতে শুরু করবে। যেমন: জামাআত সহকারে নামাজ পড়া, মানুষের সাথে হাসিমুখে কথা বলা, সালাম বিনিময় করা, অভিনন্দন জানানো ইত্যাদি। এখানে সম্পর্কহীন থাকার অর্থ হলো, মানুষের সাথে এমন মেলামেশা বন্ধ করা, যা দ্বীনের ক্ষতি করে এবং অন্যায়ের দিকে ধাবিত করে।
এ জন্যই ইবরাহিম নাখয়ি এক ব্যক্তিকে বলেন, 'তুমি বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করার পূর্বে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করো। অতঃপর যে বিচ্ছিন্নতা খারাপ কাজ ও গুনাহ থেকে বিরত রাখে, তা-ই অবলম্বন করো। এ বিচ্ছিন্নতা উত্তম ও প্রশংসনীয়। বিচ্ছিন্নতার এ প্রকারের দিকেই ইঙ্গিত করে উমর বিন খাত্তাব বলেন, “বিচ্ছিন্নতা খারাপ লোকদের সাথে মেলামেশা থেকে বিরত রাখে।""১১৭
আবু জার বলেন, 'চুপ থাকার চেয়ে কল্যাণের কথা লেখানো উত্তম; আর খারাপ জিনিস লেখানোর চেয়ে চুপ থাকা উত্তম। '১১৮
'প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য এমন কিছু মজলিস থাকা চাই, যেখানে সে একাকী বসে নিজের গুনাহ স্মরণ করবে এবং আল্লাহর কাছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে।'১১৯
যেসব মজলিসে পরচর্চা ও পরনিন্দা করা হয়, সেসব মজলিস থেকে বিচ্ছিন্নতা ও নির্জনতা অবলম্বন করার অনেক উপকারিতা রয়েছে।
ইসমাইল বিন মুহাম্মাদ বলেন, 'আমি ইবনে ইবরাহিম-কে বলতে শুনেছি, “একাকিত্ব গ্রহণের মাধ্যমে যদি শুধু এতটুকু ফায়দা হয় যে, এর কারণে গিবতকারী সঙ্গী থেকে বেঁচে থাকা যায়—তাহলে একাকিত্ব উত্তম হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট।""১২০
অধিকাংশ লোক একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাকে অপছন্দ করে। এর কারণ সম্পর্কে জনৈক দার্শনিক বলেন, 'মানুষ একাকিত্বকে অপছন্দ করার কারণ হলো, নিজ সত্তার সাথে স্বস্তিবোধ না করা। অর্থাৎ তারই আপন সত্তা যখন তার উত্তম বন্ধু হতে না পারে, তখন মানুষ অন্য লোকদের সাথে সম্পর্ক করে, যেন তার অস্বস্তিবোধ কেটে যায় এবং নিজের চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণা তাদের সাথে শেয়ার করতে পারে। তবে যাদের অন্তরাত্মা উন্নত, তারা নিজেরাই নিজেদের ভালো বন্ধু হতে পারে। তখন একাকিত্বই তার নিকট প্রিয় হয়ে ওঠে।'
মুসলমানদের জন্য সর্বোত্তম সঙ্গী হলো আল্লাহর কিতাব—নির্জনতার সময় যার তিলাওয়াত ও গবেষণার মাধ্যমে স্বস্তি ও প্রশান্তি অনুভব করা যায়।
জনৈক দার্শনিক বলেন, 'মানুষের সাথে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা দারিদ্র্যের আলামত।'১২১

টিকাঃ
১১৬. আল-আজলাহ: ১৮
১১৭. আল-আজলাহ: ১৮
১১৮. আল-আজলাহ: ৫৭
১১৯. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/২৬
১২০. আল-আজলাহ: ৩১
১২১. আল-আজলাহ: ২২

📘 পুণ্যবান বন্ধু জীবনসফরে উত্তম সহযাত্রী > 📄 ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের আসল অর্থ

📄 ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের আসল অর্থ


ইবনুল মুবারক -কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনি নামাজ পড়ার পর আমাদের সাথে বসেন না কেন?' তিনি বললেন, 'আমি সাহাবি ও তাবিয়িগণের সাথে বসি। তাঁদের কিতাব ও জীবনচরিত পড়ার মাধ্যমে তাঁদের সাথে সময় কাটাই। তা ছাড়া তোমাদের সাথে বসে কী করব? তোমরা তো মানুষের গিবত করো।'১২২
বন্ধুর সাথে চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া বা হাসি-কৌতুক করা ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব নয়। বরং বন্ধুর উপস্থিতিতে তনুমন প্রশান্ত ও আনন্দিত হওয়া এবং অনুপস্থিতিতে অস্থিরতা অনুভব করাই হলো ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের আলামত। যার ব্যাপারে তোমার এ অনুভূতি হয়, সেই তোমার ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ বন্ধু। যদিও দীর্ঘদিন পরপর তার সাথে দেখা হোক।
শাবিব বিন শাইবা বলেন, 'আমার বন্ধুদের মধ্যে কিছু বন্ধু এমন রয়েছে, যারা আমার নিকট বছরে একবার আসে। তারাই আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং তাদের আমি খুব ভালোবাসি। আর কিছু বন্ধু আছে, তারা প্রতিদিন আমার কাছে আসে এবং তাদের সাথে প্রতিদিন আড্ডা দিই। কিন্তু যদি সম্ভব হতো, আমি এদের আমার নিকট আসতে নিষেধ করতাম।'১২৩

টিকাঃ
১২২. আস-সিয়ার: ৮/৩৯৮
১২৩. আল-আজলাহ: ৪৫

📘 পুণ্যবান বন্ধু জীবনসফরে উত্তম সহযাত্রী > 📄 নিজের ক্ষতি করে বন্ধুত্বের সকল দাবি আদায় করা জরুরি নয়

📄 নিজের ক্ষতি করে বন্ধুত্বের সকল দাবি আদায় করা জরুরি নয়


মানুষ বন্ধুত্বের আবদার পূরণ করতে গিয়ে অনেক সময় নিজের ক্ষতি ডেকে আনে। সালাফ এ থেকে বাঁচার পথ বাতলে দিয়েছেন।
ইমাম শাফিয়ি ইউনুস বিন আব্দুল আ'লা -কে বলেন, 'হে আবু মুসা, তুমি কখনো মানুষের পরিপূর্ণ সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারবে না। তাদের সকল আবদার পূরণ করাও প্রায় অসম্ভব। সুতরাং তোমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব ততটুকুই করো। এর অতিরিক্ত করতে গিয়ে নিজের ক্ষতি কোরো না। বাকি অংশের ভার তাদের ওপরই ছেড়ে দাও।'১২৪
হে ভাই, সুফইয়ান সাওরি-এর কথাটি ভুলে যেয়ো না। তিনি বলেন, 'কোনো ব্যক্তির বন্ধু বেশি থাকা তার দ্বীনের দুর্বলতার লক্ষণ।'
আবু সুলাইমান সুফইয়ান সাওরি-এর কথাটির ব্যাখ্যায় বলেন, 'তার কথার মর্ম হলো, দ্বীনের ব্যাপারে ছাড় দিয়ে বন্ধুদের সাথে মজা করতে পারলেই বন্ধুদের সংখ্যা বাড়ে। কারণ কেউ যদি দ্বীনের সকল অনুশাসনের ওপর অটল থাকে, তখন বন্ধু হিসেবে সে কেবল দ্বীনদার লোকদেরই পায়— সমাজে যাদের সংখ্যা খুবই কম। ফলস্বরূপ, দ্বীনদার লোকদের বন্ধু কম হয় এবং অন্যদের বন্ধু বেশি হয়। এ জন্যই তিনি বলেছেন, “কোনো ব্যক্তির বন্ধু বেশি থাকা তার দ্বীনের দুর্বলতার লক্ষণ।”'১২৫
মালিক বলেন, 'পাখি যেমন কয়েক প্রজাতির আছে, তেমনই স্বভাব-চরিত্রের দিক দিয়ে মানুষও কয়েক প্রজাতির আছে। কবুতর কবুতরের সাথে, কাক কাকের সাথে, হাঁস হাঁসের সাথে, চড়ুই পাখি চড়ুই পাখির সাথে... এভাবে পাখিরা সখ্যতা পাতে। অনুরূপভাবে মানুষও তার স্বভাব-চরিত্রের সাথে মিল আছে—এমন লোকদের সাথেই বন্ধুত্ব করে।'১২৬

টিকাঃ
১২৪. আল-আজলাহ: ৭৯
১২৫. আল-আজলাহ: ৪৪
১২৬. রওজাতুল উকালা: ১০৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00