📄 আল্লাহর জন্য ভালোবাসাই প্রকৃত ভালোবাসা
একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য ভালোবাসাই হলো প্রকৃত ও স্থায়ী ভালোবাসা। এই ভালোবাসা দুনিয়াতে শুরু হলেও তা আখিরাতেও অটুট থাকে। কারণ এই ভালোবাসার ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও আনুগত্যের ওপর। এবং দ্বীনের অনুসরণ এই ভালোবাসার স্বচ্ছতা ও স্থায়িত্বকে টিকিয়ে রাখে।
রাসুল ইরশাদ করেন: المَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ
'মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার সাথেই থাকবে। '৭৭
কল্যাণকর ভালোবাসা কল্যাণের পথেই পরিচালিত করে। কারণ মুমিনের ইমানের দাবি হলো, সে কাউকে ভালোবাসবে একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং কাউকে ঘৃণা করবে একমাত্র আল্লাহর জন্যই। ফলে মুমিন আল্লাহর পুণ্যবান বানদাদের ভালোবাসবে; তাদের সাথে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক রাখবে; তাদের নিকট যাতায়াত করবে; তাদের কল্যাণকামী হবে; বিপদাপদে তাদের পাশে দাঁড়াবে এবং সান্ত্বনা দেবে। কারণ তারাই হলেন মুমিনের প্রকৃত বন্ধু ও আপনজন।
আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা নিছক একটি সম্পর্ক নয়; বরং এটি একটি ইবাদত। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জিত হয়। ইমানের স্বাদ অনুভব করা যায়। রাসুল ইরশাদ করেন:
ثَلَاثُ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ: مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ أَنْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ مِنْهُ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ
'যার মধ্যে তিনটি বিষয় থাকবে সে ইমানের স্বাদ অনুভব করবে।
১. আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ অন্য সব বিষয়ের চেয়ে প্রিয়তর হওয়া।
২. কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্য ভালোবাসা। ৩. কুফরি থেকে ফিরে আসার পর পুনরায় কুফরিতে প্রত্যাবর্তন করাকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপছন্দ করা। '৭৮
আব্দুল্লাহ বিন উমর বলেন, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি যদি কোনো বিরতি না দিয়ে লাগাতার রোজা রাখি, বিশ্রাম না নিয়ে সারারাত সালাত আদায় করি এবং আল্লাহর রাস্তায় অঢেল সম্পদ খরচ করি, কিন্তু আমার অন্তরে ইমানদারদের প্রতি ভালোবাসা এবং বেইমানদের প্রতি ঘৃণা না থাকে—তাহলে মৃত্যুর পর এগুলো আমার কোনো কাজে আসবে না। '৭৯
যে ভালোবাসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, তা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ দুনিয়ার তুচ্ছ স্বার্থ বা মানবিক দুর্বলতার ওপর এ ভালোবাসা গড়ে ওঠেনি। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এ ভালোবাসার সৃষ্টি।
সুফইয়ান বলেন, 'মুজাম্মা আত-তাইমি -এর প্রতি আমার ভালোবাসার মতো নিঃস্বার্থ ও নির্ভেজাল অন্য কোনো আমল আমার নেই। '৮০
তার এ কথাটি তার আমলের নিষ্ঠা ও ভালোবাসার সত্যতা প্রমাণিত করে। এটাই তো আল্লাহর জন্য ভালোবাসা। হ্যাঁ, এটাই আল্লাহর জন্য ভালোবাসার প্রকৃত রূপ।
টিকাঃ
৭৭. সহিহুল বুখারি: ৬১৬৮
৭৮. সহিহু মুসলিম: ৪৩
৭৯. আল-ইহইয়া: ২/১৭৫
৮০. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/১০৮
📄 আল্লাহর জন্য ভালোবাসার জন্য ইতিবাচক মনোভাব আবশ্যক
আল্লাহর জন্য ভালোবাসা মুসলমানের চরিত্রকে উন্নত করে এবং তাকে পদস্খলন ও কুধারণা পোষণ করা থেকে মুক্ত রাখে।
উমর বিন হাফস বলেন, 'উমর বিন আব্দুল আজিজ আমাকে বলেন, “মুসলমানের মুখনিঃসৃত সব কথার যথাসাথ্য ইতিবাচক অর্থ করার চেষ্টা করবে। যদি কোনোভাবেই ইতিবাচক অর্থ করা সম্ভব না হয়, কেবল তখনই তার নেতিবাচক অর্থের দিকে যাবে।""৮১
এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, কোনো ব্যক্তি যদি মানুষের আন্তরিকতা ও যত্ন কামনা করে, তখন তাকে অবশ্যই ওই সব লোকের কাছে যেতে হবে এবং মিশতে হবে, যারা তাদের নিকট তার আসাকে পছন্দ করে। ৮২
সুতরাং হে ভাই, লোকদের তোমার অবস্থানে এবং তোমাকে লোকদের অবস্থানে নিয়ে চিন্তা করো, তারা তোমার কী কী বিষয় পছন্দ বা অপছন্দ করে এবং তুমি তাদের কোন কোন বিষয় পছন্দ বা অপছন্দ করো? এভাবে ভেবে-চিন্তে মানুষের সাথে সম্পর্ক ও লেনদেন করলে অনেক সমস্যাকে সহজে এড়িয়ে যাওয়া যায় এবং অনেক সমস্যার সহজ সমাধান করা যায়।
বকর বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বলেন, 'যখন দেখবে, বন্ধুরা তোমাকে সম্মান করছে, তখন এটাকে তোমার প্রতি তাদের অনুগ্রহ ও ভদ্রতা মনে করবে। আর যখন দেখবে, তোমার প্রতি তাদের সম্মানে ভাটা পড়েছে, তখন ধরে নেবে, তোমার কোনো গুনাহের কারণেই এমন হচ্ছে।'৮৩
আমিরুল মুমিনিন উমর বিন খাত্তাব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'তোমার মুমিন ভাইয়ের মুখ থেকে বের হওয়া কথার যতক্ষণ পর্যন্ত ইতিবাচক অর্থ বা ব্যাখ্যা করা যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত সেটার নেতিবাচক অর্থ বা ব্যাখ্যা করবে না। '৮৪
আব্দুল্লাহ বিন জাইদ আল-জারমি বলেন, 'তোমার নিকট কোনো মুমিন ভাইয়ের পক্ষ থেকে যদি এমন আচরণ পৌঁছে, যা তুমি অপছন্দ করো, তখন এর জন্য তার পক্ষে কোনো অজুহাত দাঁড় করাও। কোনো অজুহাত পাওয়া না গেলেও নিজেকে এ বলে প্রবোধ দাও যে, "হয়তো আমার অজানা কোনো অজুহাত বা অপারগতার কারণে সে এমন আচরণ করেছে।""৮৫
টিকাঃ
৮১. তারিখুল খুলাফা: ৩২২
৮২. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৯৪
৮৩. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/২৪৮
৮৪. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৪/২১২
৮৫. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/২৩৮
📄 সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল থাকা বন্ধুত্বের অন্যতম দাবি
হাম্মাদ বলেন 'আমি আইয়ুব আস-সাখতিয়ানি-এর চেয়ে লোকদের সামনে অধিক হাস্যোজ্জ্বল আর কাউকে দেখিনি।'৮৬
হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় থাকা ভালো, তবে তা শুধু মুসলমানদের সামনে। কাফিরদের সামনে অত আন্তরিকতা দেখানোর প্রয়োজন নেই। সুফইয়ান সাওরি-কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, 'আমি কি ইহুদি-নাসারাদের সাথে মুসাফাহা করতে পারব?' তিনি উত্তর দিলেন, 'যদি পা দ্বারা করো, তাহলে ঠিক আছে।'৮৭
এর কারণ হলো, মুসলমানদের আলাদা একটা সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে— মুসলমান ব্যতীত অন্য কেউ এ সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য নয়।
মুহাম্মাদ বিন সিরিন-এর কিছু বাড়ি ছিল, যেগুলো তিনি জিম্মি (ইসলামি রাষ্ট্রের অনুগত ও কর দিয়ে থাকা কাফির জনগণ) ছাড়া কাউকে ভাড়া দিতেন না। একদিন এর কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি বললেন, 'প্রতি মাসের শুরুতে ভাড়া আদায়ের জন্য চাপাচাপি করার প্রয়োজন পড়ে। আর কোনো মুসলমানকে ভাড়ার জন্য চাপ দেওয়াকে আমি পছন্দ করি না।'৮৮
এক মুসলমানের প্রতি আরেক মুসলমানের অন্তরে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, সহানুভূতি ও মর্যাদাবোধ থাকা আবশ্যক। কারণ আল্লাহ তাআলা এটাকে মুসলমানদের অন্যতম গুণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ করেছেন, رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ‘তারা পরস্পর সহানুভূতিশীল।’৮৯
মুহাম্মাদ বিন আলি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আবু হামজা আস-সুক্কারি -এর এক প্রতিবেশী তার বাড়ি বিক্রি করার ইচ্ছা করল। যখন তাকে বাড়ির মূল্য জিজ্ঞেস করা হলো, তখন সে বলল, "বাড়ির মূল্য দুই হাজার এবং আবু হামজার প্রতিবেশিত্বের মূল্য দুই হাজার—মোট চার হাজার টাকা।" সংবাদটি যখন আবু হামজা-এর কানে গেল, তখন তিনি প্রতিবেশী লোকটির নিকট চার হাজার টাকা পাঠিয়ে বললেন, “বাড়িটি বিক্রি কোরো না।””৯০
আমাদের সালাফ মুসলমানদের আল্লাহর বিধান মানতে দেখলে এবং কল্যাণমূলক কাজের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও আগ্রহ দেখলে অত্যন্ত খুশি হতেন। আবার স্পষ্ট বাক্যে সে খুশি প্রকাশ করতেন।
সালিহ বিন আহমাদ বিন হাম্বল বলেন, 'আমাদের এক প্রতিবেশী দাঁড়িতে মেহেদি মেখে আমাদের বাড়িতে আসলেন। তখন আব্বাজান বললেন, 'আমি লোকটিকে রাসুল-এর একটি সুন্নাত জিন্দা করতে দেখে খুশি হয়েছি।'৯১
প্রিয় ভাই, সালাফের অবস্থা কেমন ছিল, আর আমাদের অবস্থা কী?
আবু মুআবিয়া আল-আসওয়াদ বললেন, 'আমার সকল বন্ধু আমার চেয়ে উত্তম।' তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'তা কীভাবে, হে আবু মুআবিয়া?' তিনি উত্তরে বললেন, 'আমার বন্ধুরা আমাকে তাদের ওপর প্রাধান্য দেয়। আর যারা আমাকে নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার মহানুভবতা দেখায়, তারা তো অবশ্যই আমার চেয়ে উত্তমই হবে।'
ইসলামের মাধ্যমেই এই গুণগুলো পূর্ণতা পেয়েছে এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়েছে। আর এ গুণগুলো অবলম্বন করেই আমাদের সালাফ উত্তম চরিত্র ও সুন্দর আচরণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পৃথিবীর বুকে।
টিকাঃ
৮৬. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১/১৩১
৮৭. ওয়াফায়াতুল আ'ইয়ান: ২/৩৮৮
৮৮. সিফাতুস সাফওয়াহ ৩/২৪, হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/২১৮
৮৯. সুরা আল-ফাতহ: ২৯
৯০. আস-সিয়ার: ৭/৩৮৭
৯১. আস-সিয়ার: ১১/২৩৫
📄 বন্ধুর ভুল ধরিয়ে দিতে হবে গোপনে
দুনিয়া হলো ভুল-ভ্রান্তি আর স্খলনের জায়গা। সুতরাং তোমার বন্ধুর ভুল হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়। সে কখনো দ্বীনের ক্ষেত্রে ভুল করবে, আবার কখনো বন্ধুত্বের হক আদায়ের ক্ষেত্রে তার পদস্খলন ঘটবে। যদি সে দ্বীনের ক্ষেত্রে ভুল করে এবং কোনো অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তুমি তার জন্য উত্তম নসিহতকারী হবে এবং হিকমতপূর্ণ পন্থায় তাকে ভুল থেকে ফিরিয়ে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করবে। আবারও বলছি, বন্ধুকে সতর্ক করতে হবে অবশ্যই হিকমতপূর্ণ পন্থা ও উত্তম নসিহতের মাধ্যমে। সুফইয়ান সাওরি বলেন, 'আমি সা'দ বিন কিদাম-কে বললাম, “কেউ আপনার দোষ-ত্রুটি ধরিয়ে দিক, তা কি আপনি পছন্দ করেন?” তিনি উত্তরে বললেন, “যদি নসিহতকারীর পক্ষ থেকে হয়, তাহলে তা অবশ্যই পছন্দ করি। আর যদি তিরস্কারকারীর পক্ষ থেকে হয়, তবে তা পছন্দ করি না।”৯২
ইমাম শাফিয়ি বলেন:
تعمدني بنصحك في انفرادي * وجنبني النصيحة في الجماعة
فإن النصح بين الناس نوع * من التوبيخ لا أرضى استماعه
فإن خالفتني وعصيت قولي * فلا تجزع إذا لم تعط طاعة
'যদি তুমি আমাকে নসিহত করতে চাও, তবে নির্জনে নসিহত কোরো। জনসম্মুখে নসিহত কোরো না। জনসম্মুখে নসিহত করা তিরস্কারের আধুনিক সংস্করণ। আর তিরস্কার শুনতে কারোই ভালো লাগে না। আমার অনুরোধটি যদি রাখতে না পারো, তাহলে তোমার কথা না মানার কারণে আমার প্রতি মনঃক্ষুণ হোয়ো না।'
একদা আবু দারদা এক ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যে সদ্য একটি গুনাহের কাজ করেছে। সেই গুনাহের কারণে লোকেরা তাকে তিরস্কার করছিল। আবু দারদা বললেন, 'এই লোকটা যদি কোনো কূপে পড়ে যেত, তোমরা কি তাকে তুলে নিতে না?' তারা বলল, 'অবশ্যই তুলে নিতাম।' তিনি বললেন, 'তাহলে তোমাদের ভাইকে তিরস্কার করো না। বরং এই গুনাহ থেকে তোমাদের বিরত রাখার ওপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো।' লোকেরা বলল, 'আমরা কি তাকে ঘৃণাও করতে পারব না?' তিনি বললেন, 'এখানে তার কর্মটিই ঘৃণার যোগ্য। যদি সে কাজটি ছেড়ে দেয়, তখন সে তোমাদেরই ভাই।'৯০
সালাফের দুই ভাই সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তাদের একজন হকের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছিলেন। তখন অপর ভাইকে বলা হলো, 'আপনি কি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না?' তিনি উত্তর দিলেন, 'এই মুহূর্তেই তো তার সাথে থাকা বেশি জরুরি, যেন তাকে উত্তম ও সুন্দর ভাষায় নসিহত করে সত্যের পথে ফিরিয়ে আনতে পারি।'৯৪
আবু হাতিম বলেন, 'মানুষের বুদ্ধিমত্তার দাবি হলো, উত্তম আচরণ অবলম্বন এবং মন্দ স্বভাব পরিত্যাগের মাধ্যমে লোকদের নিকট প্রিয় হওয়া। কারণ উত্তম আচরণ মানুষের পাপসমূহ এমনভাবে গলিয়ে দেয়, যেভাবে সূর্যরশ্মি বরফকে গলিয়ে দেয়। অনুরূপভাবে খারাপ স্বভাব মানুষের নেক আমলসমূহ এমনভাবে নষ্ট করে দেয়, যেভাবে বিষ মধুকে নষ্ট করে দেয়। কোনো মানুষের মধ্যে যদি অনেকগুলো ভালো গুণের সাথে একটিমাত্র খারাপ স্বভাব থাকে, তাহলে সেই একটি খারাপ স্বভাবই সকল ভালো গুণকে নষ্ট করে দেবে।'৯৫
অনুগ্রহশীল ও কল্যাণকামী বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু। ইয়াহইয়া বিন মুআজ বলেন, 'সেই তোমার প্রকৃত বন্ধু, যে তোমার দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে তোমাকে অবগত করে এবং গুনাহের কাজ থেকে সতর্ক করে।'
আমাদের সালাফ জনসম্মুখে কারও ভুল ধরতেন না এবং কাউকে উপদেশ দিতেন না। যদি একান্তই কখনো কাউকে জনসম্মুখে উপদেশ দেওয়ার প্রয়োজন হতো, তখন খুবই সতর্কতার সাথে উত্তম ও কোমল ভাষায় উপদেশ দিতেন। একবার আলি বিন হুসাইন মসজিদে যাওয়ার জন্য বের হলেন। পথে এক লোক তাকে গালি দিল। তখন লোকজন তার ওপর হামলে পড়লে তিনি বললেন, 'তাকে ছেড়ে দাও।' অতঃপর লোকটিকে বললেন, 'আমার কোনো দোষের কারণেই তো আমাকে গালি দিয়েছ। কিন্তু এ ছাড়াও আমার অনেক দোষ আছে, যা সম্পর্কে তুমি জানো না। সেসব জানতে ইচ্ছে হলে বলো; আমি বলতে প্রস্তুত।' তখন লোকটি ভীষণ লজ্জা পেল। অতঃপর হুসাইন তার নিকট যা ছিল, তা লোকটিকে দিয়ে দিলেন এবং আরও এক হাজার দিরহাম দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিলেন।'৯৬
হাবিব আল-জাল্লাব বলেন, 'আমি ইবনুল মুবারক-কে জিজ্ঞেস করলাম, “মানুষের নিকট আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বড় নিয়ামত কী?” তিনি বললেন, “তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা।” আমি বললাম, এটা না থাকলে?” তিনি বললেন, “উত্তম চরিত্র।” আমি বললাম, “এটা না থাকলে?” তিনি বললেন, “উত্তম বন্ধু-যে তাকে সঠিক পরামর্শ দেয়।” আমি বললাম, “তাও না থাকলে?” তিনি বললেন, “চুপ থাকা।” আমি বললাম, “এটাও না থাকলে?” তিনি বললেন, “দ্রুত মৃত্যুবরণ করা।””৯৭
সালাফ কাউকে উপদেশ দেওয়ার ইচ্ছা করলে গোপনে উপদেশ দিতেন। এ সম্পর্কে জনৈক সালাফ বলেন, 'গোপনে উপদেশ দেওয়াই মূলত উপদেশ। জনসম্মুখে উপদেশ দেওয়া তিরস্কারের অন্তর্ভুক্ত।'
ফুজাইল বিন ইয়াজ নসিহতকারী ও তিরস্কারকারীর মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে গিয়ে বলেন, 'মুমিন তার ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখে এবং অগোচরে উপদেশ দেয়; আর ফাসিক তা সবার সামনে প্রকাশ করে তাকে লজ্জা দেয়।'৯৮
আবু দারদা বলেন, 'বন্ধুকে ভর্ৎসনা করতে গিয়ে তাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলো না। তার মতো বন্ধু আর নাও পেতে পারো। সুতরাং তাকে উত্তম ও কোমল ভাষায় উপদেশ দাও। তার ব্যাপারে কোনো হিংসুকের কান-কথায় কান দিয়ো না; তখন তুমিও হিংসুকে পরিণত হবে। অন্যথায় সে মরে গেলে তোমার কান্না করার কোনো অধিকার নেই। কারণ তুমি তো সে জীবিত থাকতেই তার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেছ।'৯৯
টিকাঃ
৯২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৭/২১৭
৯৩. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৬৪০, হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/২২৫
৯৪. আল-ইহইয়া: ২/২০০
৯৫. রওজাতুল উকালা: ৬৪
৯৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯/১১৮
৯৭. আস-সিয়ার: ৮/৩৯৭
৯৮. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৭৭
৯৯. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৩৬৪