📘 পুণ্যবান বন্ধু জীবনসফরে উত্তম সহযাত্রী 📄 আল্লাহর জন্য পরস্পর ভালোবাসার কতিপয় আদব

📄 আল্লাহর জন্য পরস্পর ভালোবাসার কতিপয় আদব


আল্লাহর জন্য পরস্পর ভালোবাসা ও দেখা-সাক্ষাতের কিছু আদব রয়েছে। তন্মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব মুজাহিদ বিন জাবার -এর একটি কথায় পাওয়া যায়। তিনি বলেন, 'তুমি তোমার ভাইয়ের দিকে অস্বস্তিকর দৃষ্টিতে তাকাবে না। এবং কোথা থেকে আসছ? কোথায় যাবে? বা এ টাইপের বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করে তাকে অস্বস্তিতে ফেলবে না।' ৭০
কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের পরস্পর দেখা-সাক্ষাতে এ ধরনের অমূলক ও অস্বস্তিকর প্রশ্নই বেশি থাকে। এসব থেকে বাঁচার জন্যই মালিক বিন দিনার নির্বোধ ও মূর্খ লোকদের সাথে তেমন একটা মেলামেশা করতেন না। তিনি বলেন, 'আমি নির্বোধ ও মূর্খ লোকদের সাথে খুব একটা মেলামেশা করিনি।'
প্রিয় ভাই, আজ সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!?
মুজাহিদ বলেন, 'আমি ইবনে উমর -এর সুহবত গ্রহণ করেছিলাম তাঁর খিদমত করার জন্য। কিন্তু তিনিই আমার খিদমত করতেন।' ৭১
সালাফের গুণাবলি ও চরিত্র এমনই ছিল। এমন গুণাবলি ও চরিত্রের মাধ্যমেই বন্ধুত্বের বন্ধন দৃঢ় ও স্থায়ী হয়।
মাইমুন বিন মিহরান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি ইবনে আব্বাস -কে বলতে শুনেছি, "আমি আমার কোনো বন্ধু থেকে অপছন্দনীয় ও অবন্ধুসুলভ কোনো আচরণ পাইনি। এর কারণ তিনটি। ১. বন্ধু যদি আমার চেয়ে উচ্চস্তরের হয়, তখন আমি তাকে তার যথাযোগ্য মর্যাদা দিই। ২. সে যদি আমার সমপর্যায়ের হয়, তখন নিজের ওপর তাকে প্রাধান্য দিই। এবং ৩. সে যদি আমার চেয়ে নিম্নস্তরের হয়, তখন তার ব্যাপারে আমি সতর্ক থাকি।"’ ৭২

টিকাঃ
৭০. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২০৯
৭১. আস-সিয়ার: ১/৭৫৪
৭২. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৭৫৪

📘 পুণ্যবান বন্ধু জীবনসফরে উত্তম সহযাত্রী 📄 বনি আদমের একটি সাধারণ রোগ

📄 বনি আদমের একটি সাধারণ রোগ


অধিকাংশ মানুষের একটি কমন রোগ সম্পর্কে হাসান বলেন, 'বনি আদম অন্যের ধারণাপ্রসূত দোষের কারণে তাকে ঘৃণা করতে শুরু করে; কিন্তু তার নিজের দোষের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও তার পক্ষে সাফাই গায়।'৭৩
তুমি নিজের দোষের ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে জানো, তবুও এর জন্য নিজেকে ঘৃণা করো না। কিন্তু বন্ধুদের দোষ সম্পর্কে ভাসা ভাসা জানা সত্ত্বেও তাদের ঘৃণা করো। এটা ঠিক নয়। সত্যিকারের বন্ধুত্বের মাঝে ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ একদমই থাকতে পারবে না। কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে যখন বন্ধুরা শত্রুতে পরিণত হবে, সে কঠিনতম দিনেও আল্লাহভীরু প্রকৃত বন্ধুরা বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখবে; শত্রুতে পরিণত হবে না। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ
'বন্ধুরা সেদিন একে অপরের শত্রু হবে, তবে আল্লাহভীরুরা নয়। '৭৪
আহমাদ বিন হারব বলেন, 'আমি পঞ্চাশ বছর যাবৎ আল্লাহর ইবাদত করেছি, কিন্তু ইবাদতের স্বাদ পাইনি। তবে যখন তিনটি বিষয় ছেড়ে দিয়েছি, তখন থেকে ইবাদতের স্বাদ অনুভব করেছি। ১. আমি মানুষের সন্তুষ্টি কামনা করা ছেড়ে দিয়েছি, তখন থেকে নির্ভীকচিত্তে সত্য বলতে পারি। ২. আমি ফাসিকের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেছি, তখন থেকে ভালো ও পুণ্যবান লোকদের সুহবত অর্জন করতে পেরেছি। এবং ৩. আমি দুনিয়ার স্বাদ ত্যাগ করেছি, তখন থেকে আখিরাতের স্বাদ পেতে শুরু করেছি। '৭৫
বন্ধু থাকা ভালো। তবে বন্ধুটি অবশ্যই ভালো ও চরিত্রবান হতে হবে। যদি এমন কোনো বন্ধু পাওয়া না যায়, যে দ্বীনের ক্ষেত্রে উত্তম সহযোগী হবে এবং ইবাদতে সাহায্য করবে—তখন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল -এর কথা অনুযায়ী একাকী থাকাই উত্তম। তিনি বলেন, 'একাকিত্ব আমার হৃদয়কে সবচেয়ে বেশি প্রশান্তি দেয়। '৭৬

টিকাঃ
৭৩. আল-হাসানুল বসরি: ১০৬
৭৪. সুরা আজ-জুখরুফ: ৬৭
৭৫. আস-সিয়ার: ১১/৩৪
৭৬. আস-সিয়ার: ১১/২২৬

📘 পুণ্যবান বন্ধু জীবনসফরে উত্তম সহযাত্রী 📄 আল্লাহর জন্য ভালোবাসাই প্রকৃত ভালোবাসা

📄 আল্লাহর জন্য ভালোবাসাই প্রকৃত ভালোবাসা


একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য ভালোবাসাই হলো প্রকৃত ও স্থায়ী ভালোবাসা। এই ভালোবাসা দুনিয়াতে শুরু হলেও তা আখিরাতেও অটুট থাকে। কারণ এই ভালোবাসার ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও আনুগত্যের ওপর। এবং দ্বীনের অনুসরণ এই ভালোবাসার স্বচ্ছতা ও স্থায়িত্বকে টিকিয়ে রাখে।
রাসুল ইরশাদ করেন: المَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ
'মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার সাথেই থাকবে। '৭৭
কল্যাণকর ভালোবাসা কল্যাণের পথেই পরিচালিত করে। কারণ মুমিনের ইমানের দাবি হলো, সে কাউকে ভালোবাসবে একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং কাউকে ঘৃণা করবে একমাত্র আল্লাহর জন্যই। ফলে মুমিন আল্লাহর পুণ্যবান বানদাদের ভালোবাসবে; তাদের সাথে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক রাখবে; তাদের নিকট যাতায়াত করবে; তাদের কল্যাণকামী হবে; বিপদাপদে তাদের পাশে দাঁড়াবে এবং সান্ত্বনা দেবে। কারণ তারাই হলেন মুমিনের প্রকৃত বন্ধু ও আপনজন।
আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা নিছক একটি সম্পর্ক নয়; বরং এটি একটি ইবাদত। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জিত হয়। ইমানের স্বাদ অনুভব করা যায়। রাসুল ইরশাদ করেন:
ثَلَاثُ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ: مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ أَنْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ مِنْهُ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ
'যার মধ্যে তিনটি বিষয় থাকবে সে ইমানের স্বাদ অনুভব করবে।
১. আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ অন্য সব বিষয়ের চেয়ে প্রিয়তর হওয়া।
২. কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্য ভালোবাসা। ৩. কুফরি থেকে ফিরে আসার পর পুনরায় কুফরিতে প্রত্যাবর্তন করাকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপছন্দ করা। '৭৮
আব্দুল্লাহ বিন উমর বলেন, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি যদি কোনো বিরতি না দিয়ে লাগাতার রোজা রাখি, বিশ্রাম না নিয়ে সারারাত সালাত আদায় করি এবং আল্লাহর রাস্তায় অঢেল সম্পদ খরচ করি, কিন্তু আমার অন্তরে ইমানদারদের প্রতি ভালোবাসা এবং বেইমানদের প্রতি ঘৃণা না থাকে—তাহলে মৃত্যুর পর এগুলো আমার কোনো কাজে আসবে না। '৭৯
যে ভালোবাসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, তা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ দুনিয়ার তুচ্ছ স্বার্থ বা মানবিক দুর্বলতার ওপর এ ভালোবাসা গড়ে ওঠেনি। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এ ভালোবাসার সৃষ্টি।
সুফইয়ান বলেন, 'মুজাম্মা আত-তাইমি -এর প্রতি আমার ভালোবাসার মতো নিঃস্বার্থ ও নির্ভেজাল অন্য কোনো আমল আমার নেই। '৮০
তার এ কথাটি তার আমলের নিষ্ঠা ও ভালোবাসার সত্যতা প্রমাণিত করে। এটাই তো আল্লাহর জন্য ভালোবাসা। হ্যাঁ, এটাই আল্লাহর জন্য ভালোবাসার প্রকৃত রূপ।

টিকাঃ
৭৭. সহিহুল বুখারি: ৬১৬৮
৭৮. সহিহু মুসলিম: ৪৩
৭৯. আল-ইহইয়া: ২/১৭৫
৮০. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/১০৮

📘 পুণ্যবান বন্ধু জীবনসফরে উত্তম সহযাত্রী 📄 আল্লাহর জন্য ভালোবাসার জন্য ইতিবাচক মনোভাব আবশ্যক

📄 আল্লাহর জন্য ভালোবাসার জন্য ইতিবাচক মনোভাব আবশ্যক


আল্লাহর জন্য ভালোবাসা মুসলমানের চরিত্রকে উন্নত করে এবং তাকে পদস্খলন ও কুধারণা পোষণ করা থেকে মুক্ত রাখে।
উমর বিন হাফস বলেন, 'উমর বিন আব্দুল আজিজ আমাকে বলেন, “মুসলমানের মুখনিঃসৃত সব কথার যথাসাথ্য ইতিবাচক অর্থ করার চেষ্টা করবে। যদি কোনোভাবেই ইতিবাচক অর্থ করা সম্ভব না হয়, কেবল তখনই তার নেতিবাচক অর্থের দিকে যাবে।""৮১
এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, কোনো ব্যক্তি যদি মানুষের আন্তরিকতা ও যত্ন কামনা করে, তখন তাকে অবশ্যই ওই সব লোকের কাছে যেতে হবে এবং মিশতে হবে, যারা তাদের নিকট তার আসাকে পছন্দ করে। ৮২
সুতরাং হে ভাই, লোকদের তোমার অবস্থানে এবং তোমাকে লোকদের অবস্থানে নিয়ে চিন্তা করো, তারা তোমার কী কী বিষয় পছন্দ বা অপছন্দ করে এবং তুমি তাদের কোন কোন বিষয় পছন্দ বা অপছন্দ করো? এভাবে ভেবে-চিন্তে মানুষের সাথে সম্পর্ক ও লেনদেন করলে অনেক সমস্যাকে সহজে এড়িয়ে যাওয়া যায় এবং অনেক সমস্যার সহজ সমাধান করা যায়।
বকর বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বলেন, 'যখন দেখবে, বন্ধুরা তোমাকে সম্মান করছে, তখন এটাকে তোমার প্রতি তাদের অনুগ্রহ ও ভদ্রতা মনে করবে। আর যখন দেখবে, তোমার প্রতি তাদের সম্মানে ভাটা পড়েছে, তখন ধরে নেবে, তোমার কোনো গুনাহের কারণেই এমন হচ্ছে।'৮৩
আমিরুল মুমিনিন উমর বিন খাত্তাব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'তোমার মুমিন ভাইয়ের মুখ থেকে বের হওয়া কথার যতক্ষণ পর্যন্ত ইতিবাচক অর্থ বা ব্যাখ্যা করা যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত সেটার নেতিবাচক অর্থ বা ব্যাখ্যা করবে না। '৮৪
আব্দুল্লাহ বিন জাইদ আল-জারমি বলেন, 'তোমার নিকট কোনো মুমিন ভাইয়ের পক্ষ থেকে যদি এমন আচরণ পৌঁছে, যা তুমি অপছন্দ করো, তখন এর জন্য তার পক্ষে কোনো অজুহাত দাঁড় করাও। কোনো অজুহাত পাওয়া না গেলেও নিজেকে এ বলে প্রবোধ দাও যে, "হয়তো আমার অজানা কোনো অজুহাত বা অপারগতার কারণে সে এমন আচরণ করেছে।""৮৫

টিকাঃ
৮১. তারিখুল খুলাফা: ৩২২
৮২. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৯৪
৮৩. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/২৪৮
৮৪. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৪/২১২
৮৫. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/২৩৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية