📄 বন্ধুত্বের তিন ক্যাটাগরি
ইবনুল জাওজি -এর একটি কথার দ্বারা বন্ধুত্বের তিনটি পর্যায় বোঝা যায়। তিনি বলেন, 'আমার সকল বন্ধুকে আমি একই পর্যায়ের মনে করতাম। কিন্তু পরে অনুভব করলাম, তাদের অনেকেই অবন্ধুসুলভ আচরণ করে এবং বন্ধুত্বের শর্ত লঙ্ঘন করে। তখন আমি এ জন্য তাদের ভর্ৎসনা করতে শুরু করলাম। কিছুদিন পর খেয়াল করে দেখলাম, এ তিরস্কার ও ভর্ৎসনা আসলে কোনো কাজে আসবে না। তারা যদি ভালোও হয়ে যায়, তা হবে তিরস্কার ও ভর্ৎসনার ভয়ে; বন্ধুত্বের আবেদনে নয়। তাই তাদের সাথে একদম সম্পর্ক ছিন্ন করার মনস্থ করলাম। অতঃপর আমার জানাচেনা সব মানুষ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলাম। দেখলাম, তারা সবাই তিনটি ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত : সাধারণ পরিচিত, মৌখিক বন্ধু ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম, কারও সাথে একদম সম্পর্ক ছিন্ন করব না। বরং কেউ অবন্ধুসুলভ আচরণ করলে তাকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু থেকে মৌখিক বন্ধুতে স্থানান্তরিত করব। যদি তারও যোগ্য না হয়, তখন সাধারণ পরিচিতজনের মধ্যে রাখব। এবং পর্যায় ও ক্যাটাগরিভেদে সবার সাথে যথাযোগ্য আচরণ করব। তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করে কারও বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখারও কোনো প্রয়োজন নেই। আবার একদম সম্পর্ক ছিন্ন করাও ঠিক নয়।'
এবার তোমার চারপাশের বন্ধুদের প্রতি লক্ষ করো, তারা তোমার কোন পর্যায়ের বন্ধু। অতঃপর যে বন্ধু যে পর্যায়ের, তার সাথে তার উপযুক্ত আচরণ করো।
ইয়াহইয়া বিন মুআজ বলেন, 'ওই বন্ধু কতই না খারাপ, যাকে বলতে হয়, “আমার জন্য দুআ কোরো।” আসলে বর্তমান সময়ে প্রকৃত বন্ধু খুবই কম। যাদের আমরা বন্ধু বলি, তারা আসলে পরিচিতজন বা মৌখিক বন্ধু; প্রকৃত বন্ধু নয়। সুতরাং তুমি এমন লোকদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনে করে প্রতারিত হোয়ো না। কারণ তাদের আসল স্বরূপ প্রকাশ পাওয়া সময়ের ব্যাপার। কোন স্বার্থের কারণে সে তোমার সাথে বন্ধুত্ব করেছে, তা অচিরেই প্রকাশ পাবে।'
📄 প্রকৃত বন্ধু চেনার একটি প্রাচীন উপায়
ফুজাইল বিন ইয়াজ বলেন, 'তুমি যদি কারও সাথে বন্ধুত্ব করতে চাও, তাহলে প্রথমে তাকে রাগান্বিত কোরো। এর পরও যদি তার থেকে উত্তম আচরণ দেখতে পাও, তাহলে তার সাথে বন্ধুত্ব কোরো। তবে বর্তমান সময়ে এভাবে বন্ধুত্ব পরীক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এই সময়ে কাউকে রাগালে সাথে সাথেই সে শত্রু হয়ে যায়। '৬০
তাদের সময়েই এটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাহলে আমাদের সময়ে তা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হবে, তা বলাই বাহুল্য। কারণ এ যুগে মানুষের অন্তর অনেক স্বার্থপর ও সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। মনুষ্যত্ব ও মানবিকতা নেই বললে চলে। ব্যতিক্রমও অবশ্য আছে, তবে তা হাতে গোনা।
আব্দুল্লাহ বিন মুবারক খারাপ চরিত্রের এক লোকের সাথে এক সফরে ছিলেন। তিনি লোকটির বোঝা বহন করেছেন এবং তার সাথে ভালো আচরণ করেছেন। অতঃপর যখন তার থেকে পৃথক হলেন, তখন কাঁদতে লাগলেন। কান্নার কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি বললেন, 'আমি ওই লোকটার প্রতি করুণাস্বরূপ কাঁদছি। কারণ আমি তাকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছি যে, তার মন্দ স্বভাবগুলো তার সাথেই রয়ে গেছে।'৬৪
ফুজাইল বিন ইয়াজ বলেন, 'তুমি কারও সাথে বন্ধুত্ব করলে উত্তম চরিত্রের অধিকারী লোকের সাথেই কোরো। কারণ সে তোমাকে কল্যাণের পথে আহ্বান করবে-যে পথে আছে শান্তি ও নিরাপত্তা। খারাপ চরিত্রের লোকের সাথে বন্ধুত্ব কোরো না। কেননা সে তোমাকে অকল্যাণের পথে নিয়ে যাবে-যে পথে আছে কষ্ট ও অনিরাপত্তা। খারাপ চরিত্রের ইবাদতগুজার লোকের চেয়ে উত্তম চরিত্রের ফাসিক লোকের সাথে বন্ধুত্ব করা উত্তম। কারণ উত্তম চরিত্রের ফাসিক ব্যক্তি তার বিবেক ও উত্তম চরিত্রের দাবি অনুযায়ী মানুষকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। তাই মানুষ তাকে ভালোবাসে। কিন্তু খারাপ চরিত্রের ইবাদতগুজার ব্যক্তি তার খারাপ চরিত্রের কারণে মানুষের কষ্টের কারণ হয়। ফলে মানুষ তাকে ঘৃণা করে।'৬৫
টিকাঃ
৬৩. সাইদুল খাতির: ৪৯৭
৬৪. আল-ইহইয়া: ১০/৫৭
৬৫. রওজাতুল উকালা: ৬৪
📄 উত্তম চরিত্র ও খারাপ চরিত্রের প্রকৃত অর্থ কী?
প্রিয় ভাই, খারাপ চরিত্র বলতে কী বোঝায়? এবং উত্তম চরিত্র জানার উপায় কী? চলো, সালাফের কথায় তার উত্তর খুঁজি।
ইউসুফ বিন আসবাত বলেন, 'উত্তম চরিত্রের আলামত দশটি। ১. মতানৈক্য কম করা। ২. অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। ৩. অন্যের দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান না করা। ৪. অন্যের থেকে নেতিবাচক কিছু দেখলে তার যথাসম্ভব ইতিবাচক ব্যাখ্যা দেওয়া। ৫. অন্যের ভুলের ক্ষেত্রে তার অপারগতা মেনে নেওয়া। ৬. কষ্ট সহ্য করা। ৭. নিজেকে তিরস্কার করা। ৮. অন্যের দোষ না খুঁজে নিজের দোষ খোঁজা। ৯. ছোট-বড় সবার সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা। এবং ১০. ছোট-বড় সকলের সাথে নরম ও কোমল ভাষায় কথা বলা। ৬৬
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা কয়েকটি মৌলিক চরিত্রের বর্ণনা দিয়েছেন। ইরশাদ করেন :
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ * وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
'আর ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোলো, সৎ কাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ জাহিলদের থেকে দূরে সরে থাকো। আর যদি শয়তানের প্ররোচনা তোমাকে প্ররোচিত করে, তাহলে আল্লাহর শরণাপন্ন হও। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী। ৬৭
এ আয়াতদ্বয়ে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও লেনদেন-সম্পর্কিত চারটি মূলনীতি বিবৃত হয়েছে। ১. ক্ষমা করা। ২. সৎ কাজের আদেশ দেওয়া। ৩. জাহিলদের এড়িয়ে চলা। এবং ৪. শয়তানের প্ররোচনা থেকে আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা।
জাফর সাদিক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'সকল মৌলিক উত্তম চরিত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে এমন আয়াত পবিত্র কুরআনে এ দুটিই আছে। ৬৮
উমর বিন খাত্তাব কল্যাণ অর্জনের সহজ পন্থা দেখিয়ে বলেন, 'কল্যাণ অর্জনের সহজ পন্থা হলো, সবার সাথে হাসিমুখে দেখা-সাক্ষাৎ করা ও কোমল ভাষায় কথা বলা। ৬৯
টিকাঃ
৬৬. আল-ইহইয়া: ৩/৭৭
৬৭. সুরা আল-আরাফ: ১৯৯-২০০
৬৮. ফাতহুল বারি, ইবনু হাজার: ৮/৩০৬
৬৯. আল-ইহইয়া: ৩/১২৯
📄 আল্লাহর জন্য পরস্পর ভালোবাসার কতিপয় আদব
আল্লাহর জন্য পরস্পর ভালোবাসা ও দেখা-সাক্ষাতের কিছু আদব রয়েছে। তন্মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব মুজাহিদ বিন জাবার -এর একটি কথায় পাওয়া যায়। তিনি বলেন, 'তুমি তোমার ভাইয়ের দিকে অস্বস্তিকর দৃষ্টিতে তাকাবে না। এবং কোথা থেকে আসছ? কোথায় যাবে? বা এ টাইপের বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করে তাকে অস্বস্তিতে ফেলবে না।' ৭০
কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের পরস্পর দেখা-সাক্ষাতে এ ধরনের অমূলক ও অস্বস্তিকর প্রশ্নই বেশি থাকে। এসব থেকে বাঁচার জন্যই মালিক বিন দিনার নির্বোধ ও মূর্খ লোকদের সাথে তেমন একটা মেলামেশা করতেন না। তিনি বলেন, 'আমি নির্বোধ ও মূর্খ লোকদের সাথে খুব একটা মেলামেশা করিনি।'
প্রিয় ভাই, আজ সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!?
মুজাহিদ বলেন, 'আমি ইবনে উমর -এর সুহবত গ্রহণ করেছিলাম তাঁর খিদমত করার জন্য। কিন্তু তিনিই আমার খিদমত করতেন।' ৭১
সালাফের গুণাবলি ও চরিত্র এমনই ছিল। এমন গুণাবলি ও চরিত্রের মাধ্যমেই বন্ধুত্বের বন্ধন দৃঢ় ও স্থায়ী হয়।
মাইমুন বিন মিহরান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি ইবনে আব্বাস -কে বলতে শুনেছি, "আমি আমার কোনো বন্ধু থেকে অপছন্দনীয় ও অবন্ধুসুলভ কোনো আচরণ পাইনি। এর কারণ তিনটি। ১. বন্ধু যদি আমার চেয়ে উচ্চস্তরের হয়, তখন আমি তাকে তার যথাযোগ্য মর্যাদা দিই। ২. সে যদি আমার সমপর্যায়ের হয়, তখন নিজের ওপর তাকে প্রাধান্য দিই। এবং ৩. সে যদি আমার চেয়ে নিম্নস্তরের হয়, তখন তার ব্যাপারে আমি সতর্ক থাকি।"’ ৭২
টিকাঃ
৭০. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২০৯
৭১. আস-সিয়ার: ১/৭৫৪
৭২. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৭৫৪