📄 বন্ধুর মাঝে দ্বীনদারি ও সচেতনতার সমন্বয় থাকতে হবে
হ্যাঁ, ভালো ও পুণ্যবান বন্ধু আসলেই দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম সাহায্যকারী হয়। তবে বন্ধুটি পুণ্যবান হওয়ার পাশাপাশি আবু সুলাইমান দারানি-এর মতো সচেতনও হতে হবে—যিনি বলেন, 'আমি অনেক মানুষের মুখ থেকে অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কথা শুনেছি, কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর দলিল বা সমর্থন ব্যতীত তার একটাও গ্রহণ করিনি।'৫৬
কারণ বন্ধু যদি এরকম সচেতন না হয়, তখন অনেক ভ্রান্ত ও বাতিল কথাকে দ্বীনি কথা মনে করে তোমাকে বলবে। তখন লাভের চেয়ে ক্ষতির পাল্লা ভারী হবে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে বিভিন্ন মাহফিল ও মজলিসে কুরআন-সুন্নাহর কথার চেয়ে অহেতুক গল্পগুজব ও হাসি-কৌতুক বেশি হয়। বরং কোনো কোনো মজলিসে কুরআন ও সুন্নাহকে নিয়ে মজা করা হয়, বিদ্রুপ করা হয়। আল্লাহ তাআলা এমন মজলিস থেকে আমাদের হিফাজত করুন।
সালাফ কারও সংশ্রবে যাওয়া বা কারও সাথে বন্ধুত্ব করার পূর্বে এতে কোনো দ্বীনি উপকার হবে কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিতেন।
মালিক বিন দিনার মুগিরা বিন হাবিব -কে বলেন, 'হে মুগিরা, তোমার বন্ধুদের প্রতি তাকাও। তাদের মধ্য থেকে যার মাধ্যমে দ্বীনি কোনো উপকার হচ্ছে না, তার সঙ্গ ছেড়ে দাও।'৫৭
টিকাঃ
৫৪. সুরা আশ-শুআরা: ১০০-১০১
৫৫. আল-ইহইয়া: ২/১৭৫
৫৬. মাদারিজুস সালিকিন: ২/৪২
৫৭. আজ-জুহদ: ৪৪৯, সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/২৮৬
📄 তুচ্ছ কারণে বন্ধুত্ব ছিন্ন করা ঠিক নয়
আসল কথা হলো, বন্ধুত্ব হোক বা আর যা-ই হোক, যেসব বিষয়ে দ্বীন নেই, তা তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন। এসব বিষয়ের পেছনে সময় নষ্ট না করে যত দ্রুত সম্ভব তা ত্যাগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে দ্বীন ব্যতীত অন্য কোনো বিষয়ের কারণে সম্পর্ক বিনষ্ট করা ঠিক নয়।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'প্রত্যেক মতভেদের কারণে যদি দুই মুসলমানের সম্পর্ক ছিন্ন হতো, তাহলে মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বলতে কিছুই থাকত না।'৫৮
ফুজাইল বিন ইয়াজ বলেন, 'যে দোষ-ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত বন্ধু খোঁজে, তাকে বন্ধু ছাড়াই থাকতে হবে।'৫৯
আবু হাতিম বলেন, 'আল্লাহ তাআলা যখন কাউকে কোনো প্রকৃত মুসলমানের বন্ধুত্ব দান করেন, তখন বুদ্ধিমত্তার দাবি হলো, কখনো এ সম্পর্ক ছিন্ন না করা। সে যদি সম্পর্ক ছিন্ন করে, তখনও তার সাথে সুসম্পর্ক অব্যাহত রাখা। সে কোনো কিছু না দিলেও তার জন্য খরচ করা। দূরে ঠেলে দিতে চাইলে কাছে আসা। প্রকৃত মুসলমানের সাথে বন্ধুত্ব হলে এভাবে তার সাথে ছায়ার মতো লেগে থাকতে হবে। নিজের স্বার্থের অনুকূলে হলে বন্ধুত্ব করা এবং স্বার্থের প্রতিকূলে হলে বন্ধুত্ব ছিন্ন করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ, মানুষের অন্যতম বড় দোষ হলো, বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে ক্ষণে ক্ষণে রং বদলানো।'৬০
বন্ধুর তরফ থেকে অবন্ধুসুলভ কোনো আচরণ পাওয়া গেলে সাথে সাথে বন্ধুত্ব ছিন্ন করা উচিত নয়। বরং ইতিবাচক কোনো ব্যাখ্যা করে বা বন্ধুর অপারগতা মনে করে তা মেনে নেওয়া চাই।
বিনতে আব্দুল্লাহ বিন মুতি তার স্বামী তালহা বিন আব্দুর রহমান বিন আওফকে (যিনি তার সময়ে কুরাইশের সবচেয়ে বড় দানশীল ছিলেন) বলেন, 'আমি তোমার বন্ধুদের চেয়ে অকৃতজ্ঞ আর কাউকে দেখিনি।' তখন তিনি বললেন, 'চুপ করো, এভাবে বলছ কেন?' স্ত্রী বললেন, 'কারণ আমি লক্ষ করেছি যে, যখন তোমার অবস্থা সচ্ছল থাকে, তখন তারা তোমার সাথে থাকে; আর যখন তোমার অসচ্ছলতা আসে, তখন তারা তোমাকে পরিত্যাগ করে।' তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি তো এটাকে তাদের চারিত্রিক উদারতাই মনে করি। কারণ তারা এমন সময়ে আমার কাছে আসে, যে সময় তাদের হক আদায় করার সক্ষমতা আমার থাকে। এমন সময়ে আমার কাছে আসে না, যখন তাদের হক আদায় করতে আমি অক্ষম হয়ে পড়ি। এটা তো আমার প্রতি তাদের এক ধরনের অনুগ্রহই বলা যায়।'
সুবহানাল্লাহ! বন্ধুদের নেতিবাচক একটি কাজের কীরূপ ইতিবাচক ব্যাখ্যা দিলেন দেখো! স্বার্থপরতাকে তিনি চারিত্রিক উদারতা বলে ব্যাখ্যা করলেন। আসলে যাদের ইমান মজবুত, তাকওয়া দৃঢ় ও চরিত্র সুন্দর-তাদের পক্ষেই কেবল এটা সম্ভব।
প্রিয় ভাই আমার, সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!?
আব্দুল্লাহ বিন মুবারক একবার হজে যাওয়ার সংকল্প করলেন। তখন তার সঙ্গীদের বললেন, 'তোমাদের মধ্যে যারা এ বছর হজে যাবে, তাদের খরচ আমার কাছে জমা দাও; সকলের পক্ষ থেকে আমি খরচ করব।' তখন সবাই নিজেদের খরচ তার কাছে জমা দিলেন। তিনি প্রত্যেক ব্যক্তির খরচ আলাদা আলাদা থলেতে ভরে-প্রত্যেক থলের ওপর মালিকের নাম লিখে একটি সিন্দুকে ভরে বাড়িতে রেখে দিলেন। অতঃপর নিজের ধনভান্ডার থেকে যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ ও বাহন নিয়ে সঙ্গীদের সাথে নিয়ে হজের সফরে বেরিয়ে পড়লেন। হজের সময় সকলের জন্য প্রচুর পরিমাণে খরচ করলেন। যখন হজ শেষ হলো, তখন সবাইকে বললেন, 'তোমাদের পরিবারের লোকদের হাদিয়া দেওয়ার জন্য কিছু কিনতে হলে কিনে নাও। অতঃপর তিনি সবাইকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী তাদের পরিবারের লোকদের জন্য হাদিয়ার সামান কিনে দিলেন। তারপর সবাইকে নিয়ে নিজ শহরের উদ্দেশে রওনা দিলেন। শহরে পৌঁছার পূর্বেই কিছু লোককে আগে পাঠিয়ে দিয়ে সবার বাড়ির দরজায় রং লাগালেন এবং তাদের বাড়ির পুরোনো জিনিসপত্র মেরামত করিয়ে দিলেন।
টিকাঃ
৫৮. মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৪/১৭৩
৫৯. রওজাতুল উকালা: ১৬৯
৬০. রওজাতুল উকালা: ১০৩
📄 প্রকৃত বন্ধুত্বের কতিপয় শর্ত
প্রিয় ভাই, প্রকৃত বন্ধুত্বের কিছু শর্ত রয়েছে। তা হলো, বন্ধুত্বের ভিত্তি হতে হবে ইমান ও আল্লাহর জন্য ভালোবাসা। এ ছাড়া যে বন্ধুত্ব কোনো স্বার্থকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, তা প্রকৃত বন্ধুত্ব নয়। স্বার্থসিদ্ধি হয়ে গেলে এ বন্ধুত্ব আর থাকে না। আবার কখনো কখনো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে প্রবৃত্তির চাহিদার ওপর। এই বন্ধুত্বও ঠিক ততক্ষণই টিকে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রবৃত্তির চাহিদা বাকি থাকে। এ ধরনের বন্ধুত্বে এক বন্ধু অপর বন্ধুর মাধ্যমে বেশি প্রতারিত হয়। পক্ষান্তরে যে বন্ধুত্ব ইমান ও আল্লাহর জন্য ভালোবাসাকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, সেটাই প্রকৃত ও স্থায়ী বন্ধুত্ব।
প্রকৃত বন্ধু সে, যে তার বন্ধুর দুর্ব্যবহার সহ্য করে এবং তার ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে।
শুআইব বিন হারব বলেন, 'দুই ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারও সাথে বসবে না : ১. এমন ব্যক্তির সাথে বসবে, যার কাছ থেকে তুমি ভালো ও কল্যাণকর বিষয় শিখতে পারবে। ২. এমন ব্যক্তির সাথে বসবে, যাকে তুমি ভালো ও কল্যাণকর বিষয় শিক্ষা দিলে সে তা গ্রহণ করবে। এ দুই ব্যক্তি ব্যতীত তৃতীয় কারও সাথে বসবে না। '৬২
টিকাঃ
৬১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১০/২০৩
৬২. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/৮
📄 বন্ধুত্বের তিন ক্যাটাগরি
ইবনুল জাওজি -এর একটি কথার দ্বারা বন্ধুত্বের তিনটি পর্যায় বোঝা যায়। তিনি বলেন, 'আমার সকল বন্ধুকে আমি একই পর্যায়ের মনে করতাম। কিন্তু পরে অনুভব করলাম, তাদের অনেকেই অবন্ধুসুলভ আচরণ করে এবং বন্ধুত্বের শর্ত লঙ্ঘন করে। তখন আমি এ জন্য তাদের ভর্ৎসনা করতে শুরু করলাম। কিছুদিন পর খেয়াল করে দেখলাম, এ তিরস্কার ও ভর্ৎসনা আসলে কোনো কাজে আসবে না। তারা যদি ভালোও হয়ে যায়, তা হবে তিরস্কার ও ভর্ৎসনার ভয়ে; বন্ধুত্বের আবেদনে নয়। তাই তাদের সাথে একদম সম্পর্ক ছিন্ন করার মনস্থ করলাম। অতঃপর আমার জানাচেনা সব মানুষ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলাম। দেখলাম, তারা সবাই তিনটি ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত : সাধারণ পরিচিত, মৌখিক বন্ধু ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম, কারও সাথে একদম সম্পর্ক ছিন্ন করব না। বরং কেউ অবন্ধুসুলভ আচরণ করলে তাকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু থেকে মৌখিক বন্ধুতে স্থানান্তরিত করব। যদি তারও যোগ্য না হয়, তখন সাধারণ পরিচিতজনের মধ্যে রাখব। এবং পর্যায় ও ক্যাটাগরিভেদে সবার সাথে যথাযোগ্য আচরণ করব। তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করে কারও বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখারও কোনো প্রয়োজন নেই। আবার একদম সম্পর্ক ছিন্ন করাও ঠিক নয়।'
এবার তোমার চারপাশের বন্ধুদের প্রতি লক্ষ করো, তারা তোমার কোন পর্যায়ের বন্ধু। অতঃপর যে বন্ধু যে পর্যায়ের, তার সাথে তার উপযুক্ত আচরণ করো।
ইয়াহইয়া বিন মুআজ বলেন, 'ওই বন্ধু কতই না খারাপ, যাকে বলতে হয়, “আমার জন্য দুআ কোরো।” আসলে বর্তমান সময়ে প্রকৃত বন্ধু খুবই কম। যাদের আমরা বন্ধু বলি, তারা আসলে পরিচিতজন বা মৌখিক বন্ধু; প্রকৃত বন্ধু নয়। সুতরাং তুমি এমন লোকদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনে করে প্রতারিত হোয়ো না। কারণ তাদের আসল স্বরূপ প্রকাশ পাওয়া সময়ের ব্যাপার। কোন স্বার্থের কারণে সে তোমার সাথে বন্ধুত্ব করেছে, তা অচিরেই প্রকাশ পাবে।'