📄 পাপিষ্ঠ লোকের সাথে বন্ধুত্বের কুফল
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেন, 'নির্বোধ ব্যক্তি পুরাতন জীর্ণ বস্ত্রের মতো, যার একদিকে সেলাই করলে অন্যদিকে ছিঁড়ে যায়। এবং মাটির পাত্রের মতো, যা একবার ভেঙে গেলে দ্বিতীয়বার তৈরি করা তো যায় না; তারপর তা আর কোনোদিন আসল মাটিতেও পরিণত হয় না, যার ওপর উদ্ভিদ জন্মাতে পারে।
নির্বোধ ব্যক্তির পরিচয় হলো, তুমি তার সাথে বন্ধুত্ব করলে সে তোমার জীবনকে বিষিয়ে তোলে; তার থেকে বিচ্ছিন্ন হলে তোমার দুর্নাম রটায়; তোমাকে কিছু দান করলে তার খোটা দেয়; তোমার কাছে তার গোপনীয় কোনো বিষয় গচ্ছিত রাখলে তোমার বিরুদ্ধে তা ফাঁস করে দেওয়ার অভিযোগ আনে; তুমি তার কাছে গোপনীয় কোনো বিষয় গচ্ছিত রাখলে তাতে বিশ্বাসঘাতকতা করে; সে তোমার চেয়ে উচ্চস্তরের হলে তোমাকে তুচ্ছজ্ঞান করে এবং তোমার চেয়ে নিম্নস্তরের হলে তোমার সাথে হিংসা করে। '৪৫
হে মুসলিম ভাই, পাপিষ্ঠ লোকের সাথে বন্ধুত্বের পরিণতি বিচ্ছেদ, ক্ষতি ও বিপদ ছাড়া কিছুই নয়। একদিন না একদিন এই বন্ধুত্ব ভেঙে যায় এবং ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। কেননা, পাপিষ্ঠ লোকদের বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার বন্ধন মাকড়সার জালের মতো ঠুনকো—সামান্যতেই অস্তিত্ব হারায়।
আলি বিন হুসাইন বলেন, 'যে দুই ব্যক্তি পাপকর্মের ওপর পরস্পর বন্ধুত্ব করে, এই পাপকর্মের কারণেই অতি দ্রুত তাদের বন্ধুত্ব ছিন্ন হয়ে যায়। '৪৬
এর কারণ হলো, নাফরমানি ও পাপের ওপর ভিত্তি করে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা মাকড়সার জালের মতো খুবই দুর্বল ও ঠুনকো হয়। সামান্যতেই ভেঙে যায়। কারণ, এ সম্পর্কের ভিত্তি স্বার্থ ও অসত্যের ওপর হয়। সুতরাং স্বার্থ অর্জিত হয়ে গেলে বা পূরণ না হলে সে সম্পর্ক আর টিকে থাকে না।
টিকাঃ
৪৫. রওজাতুল উকালা: ১২২
৪৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯/১২১
📄 পুণ্যবান লোকের সাথে বন্ধুত্বের সুফল
পক্ষান্তরে যে সম্পর্ক হয় দ্বীনের জন্য এবং যার ভিত্তি হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি; সে সম্পর্ক অনেক মজবুত ও স্থায়ী হয়। এখানে একজন গাফিল হলে অপরজন তাকে সতর্ক করে দেয়। একজন আল্লাহর স্মরণ থেকে বিস্মৃত হয়ে পড়লে আরেকজন তাকে তাঁর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কারণ, এই সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের মাধ্যমে প্রত্যেকে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি কামনা করে; তাঁর নিকট প্রতিদানের আশা করে এবং পরস্পর ভালোবাসার মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জনের আশা করে।
প্রিয় ভাই আমার, যে ব্যক্তি তোমাকে আল্লাহর হক ও অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, তাঁর ইবাদতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে এবং নাফরমানি থেকে নিষেধ করে, সেই হলো তোমার প্রকৃত বন্ধু। সেই হলো তোমার সবচেয়ে কাছের ও বিশ্বস্ত বন্ধু। বরং সে তোমার ওই সব বন্ধুর চেয়ে হাজারগুণ বেশি উত্তম, যারা তোমার প্রতি দয়া করে এবং আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে। কারণ দ্বীনের ব্যাপারে ইহসান ও সহযোগিতাই হলো, প্রকৃত ইহসান ও সহযোগিতা।
বিলাল বিন সা'দ বলেন, তোমার যে বন্ধু প্রতি সাক্ষাতে তোমাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আল্লাহর ইবাদতের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে, সে তোমার ওই বন্ধুর চেয়ে উত্তম, যে প্রতি সাক্ষাতে তোমাকে এক দিনার করে দেয়। '৪৭
ভালো বন্ধু তোমাকে পরকালীন সফলতার পথ দেখাবে। ইবাদতের ব্যাপারে সহযোগিতা করবে। তোমার সামনে কল্যাণের পথসমূহ উন্মুক্ত করে রাখবে। কারণ ভালো বন্ধুর মাঝে সর্বদা আল্লাহভীতি ও তাঁর অস্তিত্বের অনুভব জাগ্রত থাকে, যা তোমাকেও ছুঁয়ে যাবে।
ভালো ও পুণ্যবান লোকদের আল্লাহভীতি সম্পর্কিত একটি ঘটনা ফুজাইল বিন ইয়াজ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'তালহা বিন মুতাররিফ-এর ব্যাপারে আমি শুনেছি যে, একদিন তিনি কোনো কারণে খুব হাসলেন। তখন নিজেকে সম্বোধন করে বললেন, “তুমি হাসছ কেন? এভাবে হাসা তো কেবল তার পক্ষেই মানায়, যে কিয়ামতের ভয়াবহতা ও পুলসিরাত অতিক্রম করে জান্নাতের দরজায় পৌঁছে গেছে।” অতঃপর বললেন, “আমি কসম করছি যে, আমার চূড়ান্ত ফয়সালা সম্পর্কে যতদিন নিশ্চিত হব না, ততদিন পর্যন্ত হাসব না।” এরপর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সত্যিই তাকে কোনো দিন হাসতে দেখা যায়নি। '৪৮
প্রিয় ভাই, ভালো ও দ্বীনদার লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করলে ইবাদতের পথ সুগম হয়। সত্যপথে অটল থাকার সাহস অর্জিত হয়। আখিরাতের সফরের পাথেয় সংগ্রহ করা সহজ হয়। এ জন্যই সালাফে সালিহিন সব সময় উত্তম ও দ্বীনদার লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করা ও তাদের সংশ্রবে থাকার চেষ্টা করতেন।
ইবরাহিম আত-তাইমি বলেন, 'তুমি যদি কাউকে তাকবিরে উলার (ইমামের সাথে সাথে নামাজ শুরু করা) ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন করতে দেখো, তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কোরো না। '৪৯
ভালো ও দ্বীনদার লোকদের ভালোবাসা ও তাদের সংশ্রবে থাকা আবশ্যক। এ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ বিন উমর বলেন, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি যদি কোনো বিরতি না দিয়ে লাগাতার রোজা রাখি, বিশ্রাম না নিয়ে সারারাত সালাত আদায় করি এবং আল্লাহর রাস্তায় অঢেল সম্পদ খরচ করি, কিন্তু আমার অন্তরে ইমানদারদের প্রতি ভালোবাসা এবং বেইমানদের প্রতি ঘৃণা না থাকে—তাহলে মৃত্যুর পর এগুলো আমার কোনো কাজে আসবে না।'৫০
আমরা যাদের আল্লাহর জন্য ভালোবাসি, সেই সালাফের একটি নসিহত গভীরভাবে পড়ো। মুহাম্মাদ বিন ইউনুস বিন মুসা বলেন, 'আমি জুহাইর বিন নুআইম-কে বলতে শুনেছি যে, তাকে এক লোক বলল, “হে আবু আব্দুর রহমান, আপনি আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নসিহত করুন।” তখন তিনি নসিহত করলেন, “সতর্ক থাকবে, গাফিলতির অবস্থায় যেন তোমার মৃত্যু না আসে।""
টিকাঃ
৪৭. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/২২৫
৪৮. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/১৫
৪৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৪/২১৫
৫০. আল-ইহইয়া: ২/১৭৫
📄 সালাফের পারস্পরিক বন্ধুত্বের গভীরতা
উত্তম চরিত্র ও সুন্দর গুণাবলি ভালো মানুষের বৈশিষ্ট্য। তেমনই একজন ভালো মানুষ হলেন ইয়াজিদ বিন আবু হাবিব। তিনি বলেন, 'আমি আমার কোনো বন্ধুকে আমার ওপর দুবার ক্রুদ্ধ হতে দিই না। কারণ (একবার ক্রুদ্ধ হওয়ার পর) আমি গভীরভাবে ভেবে দেখি, প্রথমবারে আমার কোন বিষয়টি সে অপছন্দ করেছে। অতঃপর তা পরিত্যাগ করি।'৫১
একদিন হাসান ঘুমাচ্ছিলেন। তখন তার কয়েকজন বন্ধু ঘরে প্রবেশ করে তার ফল খেয়ে ফেললেন। ঘুম থেকে উঠে তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি রহম করুন। আল্লাহর কসম, এটাই তো বন্ধুদের কাজ।'৫২
ফাতাহ আল-মসুলি তার এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে দেখলেন, বন্ধু বাড়িতে নেই। তখন তিনি দাসীকে সিন্দুক খুলে দিতে বললেন। তারপর সিন্দুক থেকে প্রয়োজন পরিমাণ মাল নিয়ে চলে গেলেন। মনিব বাড়িতে ফিরলে দাসী তাকে ঘটনার বিবরণ শোনাল। তখন বন্ধু খুশি হয়ে বললেন, 'তোমার কথা যদি সত্য হয়, আজ থেকে তুমি মুক্ত।'
বর্তমান সময়ে এমন বন্ধুর উদাহরণ কোথায়?
আওজায়ি তার এক বন্ধুর নিকট চিঠি লিখলেন, 'সালাম নিবেদনের পর, নিশ্চয় গুনাহ তোমাকে চারপাশ থেকে বেষ্টন করে রেখেছে। রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টা তা তোমার সাথেই থাকে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো। ভয় করো কিয়ামতের দিন তাঁর সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে এবং তোমার ব্যাপারে তাঁর সর্বশেষ ফয়সালাকে। ওয়াসসালামু আলাইকুম।'৫৩
প্রিয় মুসলিম ভাই, আমাদের সালাফ পরস্পর ভালো বন্ধু ছিলেন। তারা একে অপরকে সৎ কাজের প্রতি উৎসাহিত করতেন এবং উত্তম উপদেশ দিতেন। ভালো বন্ধু থাকার এটাই লাভ। এ জন্যই আলি বিন আবু তালিব বলেন, 'তোমরা অবশ্যই পুণ্যবান লোকদের বন্ধু বানাবে। কারণ তারা দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের সাহায্যকারী হবে। তোমরা কি জানো না?— জাহান্নামিরা উত্তম বন্ধু না থাকার ওপর আক্ষেপ করে বলবে, فَمَا لَنَا مِن شَافِعِينَ * وَلَا صَدِيقٍ حَمِيمٍ (অতএব, আমাদের কোনো সুপারিশকারী নেই। এবং কোনো সহৃদয় বন্ধুও নেই।৫৪)'৫৫
টিকাঃ
৫১. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১/১৩০
৫২. মিনহাজুল কাসিদিন: ১০৮
৫৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৬/১৪০
📄 বন্ধুর মাঝে দ্বীনদারি ও সচেতনতার সমন্বয় থাকতে হবে
হ্যাঁ, ভালো ও পুণ্যবান বন্ধু আসলেই দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম সাহায্যকারী হয়। তবে বন্ধুটি পুণ্যবান হওয়ার পাশাপাশি আবু সুলাইমান দারানি-এর মতো সচেতনও হতে হবে—যিনি বলেন, 'আমি অনেক মানুষের মুখ থেকে অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কথা শুনেছি, কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর দলিল বা সমর্থন ব্যতীত তার একটাও গ্রহণ করিনি।'৫৬
কারণ বন্ধু যদি এরকম সচেতন না হয়, তখন অনেক ভ্রান্ত ও বাতিল কথাকে দ্বীনি কথা মনে করে তোমাকে বলবে। তখন লাভের চেয়ে ক্ষতির পাল্লা ভারী হবে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে বিভিন্ন মাহফিল ও মজলিসে কুরআন-সুন্নাহর কথার চেয়ে অহেতুক গল্পগুজব ও হাসি-কৌতুক বেশি হয়। বরং কোনো কোনো মজলিসে কুরআন ও সুন্নাহকে নিয়ে মজা করা হয়, বিদ্রুপ করা হয়। আল্লাহ তাআলা এমন মজলিস থেকে আমাদের হিফাজত করুন।
সালাফ কারও সংশ্রবে যাওয়া বা কারও সাথে বন্ধুত্ব করার পূর্বে এতে কোনো দ্বীনি উপকার হবে কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিতেন।
মালিক বিন দিনার মুগিরা বিন হাবিব -কে বলেন, 'হে মুগিরা, তোমার বন্ধুদের প্রতি তাকাও। তাদের মধ্য থেকে যার মাধ্যমে দ্বীনি কোনো উপকার হচ্ছে না, তার সঙ্গ ছেড়ে দাও।'৫৭
টিকাঃ
৫৪. সুরা আশ-শুআরা: ১০০-১০১
৫৫. আল-ইহইয়া: ২/১৭৫
৫৬. মাদারিজুস সালিকিন: ২/৪২
৫৭. আজ-জুহদ: ৪৪৯, সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/২৮৬