📄 সালাফের বন্ধুত্ব বনাম আমাদের বন্ধুত্ব
প্রিয় ভাই, সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!?
আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের অধিকার ও দাবি আদায় করি না। অথচ আমাদের সালাফ ক্ষণিকের বন্ধুত্বের দাবি আদায়েও সচেষ্ট ছিলেন। ইমাম আবু হানিফা -এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি প্রায় সময় একজন অপরিচিত ব্যক্তির কাছ দিয়ে গমন করতেন। চলার পথে মাঝেমধ্যে এমনিতেই তার পাশে বসতেন; কোনো উদ্দেশ্য বা তার সাথে বিশেষ কোনো প্রয়োজনে বসতেন না। তবে যখন তিনি তার কাছ থেকে উঠে চলে আসতেন, তখন তার কুশল জিজ্ঞেস করতেন। সে সুস্থ হলে তার সাথে সুসম্পর্কের আবেশ রেখে চলে আসতেন। অসুস্থ হলে তার সেবা-শুশ্রূষা করতেন। ৩৭
বন্ধুর প্রতি কতিপয় হক ও দায়িত্ব রয়েছে। সাইদ ইবনুল আস বলেন, 'আমার ওপর আমার বন্ধুর তিনটি হক রয়েছে। ১. যখন সে আমার নিকট আসবে, তখন তাকে স্বাগতম জানাব। ২. সে কোনো কথা বললে আমি মনোযোগ দিয়ে তা শুনব। এবং ৩. সে যখন আমার পাশে বসবে, তখন তার জন্য জায়গা প্রশস্ত করব। '৩৮
আল্লাহ তাআলা মুমিন বন্ধুদের পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারে বলেন, رُحَاءُ بَيْنَهُمْ 'তারা পরস্পর সহানুভূতিশীল।' অর্থাৎ তারা একে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল ও পরস্পর সম্মান প্রদর্শনকারী। সহানুভূতির অর্থ কেবল ভালো ভালো খাবার খাওয়ানো ও সচ্ছলতার সময় পাশে থাকা নয়; বরং এর অর্থ হলো, বন্ধুর বিচ্ছেদে কষ্ট অনুভব করা এবং বন্ধুর অনুপস্থিতিতে মনের মাঝে শূন্যতা অনুভব করা। ৩৯
রাসুল ইরশাদ করেন : خَيْرُ الأَصْحَابِ عِنْدَ اللَّهِ خَيْرُهُمْ لِصَاحِبِهِ
'আল্লাহ তাআলার নিকট উত্তম বন্ধু সে, যে তার বন্ধুর নিকট উত্তম।'৪০
টিকাঃ
৩৭. তারিখু বাগদাদ: ১৩/৩৬০
৩৮. আল-ইহইয়া: ২/১৯১
৩৯. আল-ইহইয়া: ২/১৯১
৪০. সুনানুত তিরমিজি: ১৯৪৪
📄 উত্তম বন্ধু বনাম খারাপ বন্ধু
হে ভাই, উত্তম ও পুণ্যবান বন্ধু গ্রহণ করো। ভালো ও দ্বীনদার ব্যক্তিদের সংস্রবে থাকো। তারা তোমার কঠিন সময়ে তোমাকে সাহায্য করবে। বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করবে। কল্যাণ অর্জনে তোমাকে সহায়তা করবে। বিপদে ধৈর্যধারণের উপদেশ দেবে এবং সাহস জোগাবে।
অপরদিকে যারা খারাপ বন্ধু, তারা তোমার সামনে অশ্লীল ও মন্দ কাজকে সুন্দর করে উপস্থাপন করবে। ইবাদত-বন্দেগি থেকে তোমাকে দূরে রাখবে। হারাম কাজের পথ দেখাবে। এমন বন্ধুর মাধ্যমে না তুমি দুনিয়াতে কোনো ফায়দা হাসিল করতে পারবে, না আখিরাতে তারা তোমার কোনো উপকারে আসবে। বরং আখিরাতে তারাই তোমার দুর্ভোগ ও লজ্জার কারণ হবে। কিয়ামতের দিন এই বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যাবে এবং এই মিলন ও ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে। বন্ধুরা শত্রুতে পরিণত হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ 'বন্ধুরা সেদিন একে অপরের শত্রু হবে, তবে আল্লাহভীরুরা নয়। '৪১
আবু দারদা প্রায় সময় কবরস্থানের পাশে বসে থাকতেন। লোকেরা তাঁকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন, 'এখানে আমি এমন লোকদের নিকট বসি, যারা আমাকে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আমি যখন তাদের থেকে অনুপস্থিত থাকি, তখন তারা আমার গিবত করে না। '৪২
টিকাঃ
৪১. সুরা আজ-জুখরুফ: ৬৭
৪২. মিনহাজুল কাসিদিন: ৪৩২
📄 বন্ধু নির্ণয়ে বুদ্ধি ও বয়সের গুরুত্ব
সালাফে সালিহিন দ্বীনদার, মুত্তাকি, বুদ্ধিমান ও প্রজ্ঞাবান বয়স্ক লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করতেন।
আবু আমর ইবনুল আলা বলেন, 'সাইদ বিন জুবাইর আমাকে যুবকদের মাঝে বসে থাকতে দেখে বললেন, “তুমি যুবকদের সাথে কী করো? তোমার তো বৃদ্ধদের সাথে থাকা উচিত।”’৪৩
কমবয়সী লোকদের সংশ্রবে থাকার চেয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বয়স্ক লোকদের সংশ্রবে থাকার উপকারিতা বেশি। কারণ বয়স্ক লোকদের মুখ থেকে হিকমতপূর্ণ ও শিক্ষণীয় কথা বের হয়। তাদের নিকট বিগত সময়ের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ পরামর্শ পাওয়া যায়। এ দুটির পাশাপাশি তাদের মজলিসে থাকে আল্লাহর জিকির, ইসতিগফার, তাসবিহ, তাহমিদ ইত্যাদি। এদের মজলিসে যারা উপস্থিত হয়, তারা লাভবান হয় এবং যারা তাদের সুহবতে লেগে থাকে, তাদের ইলম ও হিকমত বৃদ্ধি পায়। সুতরাং যদি সুহবত ও সংশ্রব গ্রহণ করার জন্য এমন বয়স্ক লোকদের পাওয়া না যায়, তখন আবু দারদা -এর কথাই মেনে নেওয়া উত্তম। তিনি বলেন, 'একাকী থাকার চেয়ে উত্তম লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করা উত্তম। খারাপ লোকের সাথে বন্ধুত্ব করার চেয়ে একা থাকা উত্তম। নীরব থাকার চেয়ে মানুষকে কল্যাণের বিষয় লেখানো উত্তম। অকল্যাণের বিষয় লেখানোর চেয়ে নীরব থাকা উত্তম।'
আবু হাতিম বলেন, 'জ্ঞানীরা কখনো খারাপ লোকদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে না। কারণ খারাপ বন্ধু অঙ্গারের মতো— বাইরের আবরণের ভেতর লুকিয়ে রাখে বিদ্বেষের আগুন। সে কখনো বিশ্বস্ত বন্ধু হয় না এবং বন্ধুত্বের দাবিও পালন করে না।'
চারটি বিষয়ের মধ্যে মানুষের সৌভাগ্য নিহিত। ১. স্ত্রী আনুগত্যশীল হওয়া। ২. সন্তান পুণ্যবান হওয়া। ৩. ভাই-বন্ধুরা উত্তম ও সদাচারী হওয়া। এবং ৪. রিজিকের ব্যবস্থা নিজ শহরে হওয়া।
খারাপ লোকের সাথে বন্ধুত্ব করার চেয়ে কুকুরের সাথে বন্ধুত্ব করা ভালো। কারণ খারাপ লোকের সাথে বন্ধুত্ব করলে তার খারাপি ও অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায় না।
জুহরি বলেন, 'খারাপ চরিত্রের লোকদের নিকট থেকে কোনো উপকার অর্জন করা যায় না।'৪৪
টিকাঃ
৪৩. রওজাতুল উকালা: ১০১
৪৪. রওজাতুল উকালা: ৬৫
📄 পাপিষ্ঠ লোকের সাথে বন্ধুত্বের কুফল
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেন, 'নির্বোধ ব্যক্তি পুরাতন জীর্ণ বস্ত্রের মতো, যার একদিকে সেলাই করলে অন্যদিকে ছিঁড়ে যায়। এবং মাটির পাত্রের মতো, যা একবার ভেঙে গেলে দ্বিতীয়বার তৈরি করা তো যায় না; তারপর তা আর কোনোদিন আসল মাটিতেও পরিণত হয় না, যার ওপর উদ্ভিদ জন্মাতে পারে।
নির্বোধ ব্যক্তির পরিচয় হলো, তুমি তার সাথে বন্ধুত্ব করলে সে তোমার জীবনকে বিষিয়ে তোলে; তার থেকে বিচ্ছিন্ন হলে তোমার দুর্নাম রটায়; তোমাকে কিছু দান করলে তার খোটা দেয়; তোমার কাছে তার গোপনীয় কোনো বিষয় গচ্ছিত রাখলে তোমার বিরুদ্ধে তা ফাঁস করে দেওয়ার অভিযোগ আনে; তুমি তার কাছে গোপনীয় কোনো বিষয় গচ্ছিত রাখলে তাতে বিশ্বাসঘাতকতা করে; সে তোমার চেয়ে উচ্চস্তরের হলে তোমাকে তুচ্ছজ্ঞান করে এবং তোমার চেয়ে নিম্নস্তরের হলে তোমার সাথে হিংসা করে। '৪৫
হে মুসলিম ভাই, পাপিষ্ঠ লোকের সাথে বন্ধুত্বের পরিণতি বিচ্ছেদ, ক্ষতি ও বিপদ ছাড়া কিছুই নয়। একদিন না একদিন এই বন্ধুত্ব ভেঙে যায় এবং ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। কেননা, পাপিষ্ঠ লোকদের বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার বন্ধন মাকড়সার জালের মতো ঠুনকো—সামান্যতেই অস্তিত্ব হারায়।
আলি বিন হুসাইন বলেন, 'যে দুই ব্যক্তি পাপকর্মের ওপর পরস্পর বন্ধুত্ব করে, এই পাপকর্মের কারণেই অতি দ্রুত তাদের বন্ধুত্ব ছিন্ন হয়ে যায়। '৪৬
এর কারণ হলো, নাফরমানি ও পাপের ওপর ভিত্তি করে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা মাকড়সার জালের মতো খুবই দুর্বল ও ঠুনকো হয়। সামান্যতেই ভেঙে যায়। কারণ, এ সম্পর্কের ভিত্তি স্বার্থ ও অসত্যের ওপর হয়। সুতরাং স্বার্থ অর্জিত হয়ে গেলে বা পূরণ না হলে সে সম্পর্ক আর টিকে থাকে না।
টিকাঃ
৪৫. রওজাতুল উকালা: ১২২
৪৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯/১২১