📄 বিপদে বন্ধুর পরিচয়
প্রিয় ভাই, তোমার জন্য যখন পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে যাবে, তোমার চলার পথ যখন পিচ্ছিল হয়ে যাবে, বিপদাপদ এসে চার পাশ থেকে যখন তোমাকে ঘিরে ধরবে, তখনই তোমার প্রকৃত বন্ধু কে তা প্রকাশ পাবে। প্রকৃত বন্ধু তখন তোমার পাশে দাঁড়াবে। সব বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে চলার সাহস জোগাবে এবং যথাসধ্য সহযোগিতা করে তোমার কষ্টের বোঝাকে হালকা করার চেষ্টা করবে।
আর যখন তোমার পৃথিবী উর্বর হবে এবং দুনিয়া তোমার জন্য প্রশস্ত ও অনুকূল হবে, তখন সবাই তোমার বন্ধু হবে।
কবি বলেন: وَكُلُّ النَّاسِ إِخْوَانُ الرَّخَاءِ إِنَّمَا * الَّذِي أَخَاكَ عِنْدَ الشَّدَائِدِ
'সুখের সময় সকলেই তোমার বন্ধু। কিন্তু তোমার প্রকৃত বন্ধু সেই, যে কষ্টের মুহূর্তেও তোমার বন্ধু থাকে।'৩২
দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ও সর্বাপেক্ষা কঠিন মুসিবত হলো মৃত্যু। প্রকৃত বন্ধু এই মুসিবতের সময়েও বন্ধুর পাশে দাঁড়ায়। মৃত্যুর সময় কালিমার তালকিন করে তাকে ইমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে সহযোগিতা করে। মৃত্যুর পরে তাকে স্মরণ রাখে; ভুলে যায় না। তার এতিম ও অসহায় সন্তানসন্ততির খোঁজখবর রাখে। তাদের অভিভাবকত্ব করে।
আমাদের সালাফের মধ্যে কেউ কেউ তো বন্ধুর মৃত্যুর পর চল্লিশ বছর পর্যন্ত তার পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং তাদের প্রয়োজন পূর্ণ করেছেন।৩০_৩৪
এ জন্যই উমর বিন খাত্তাব বলেন, 'তোমরা সৎ ও পুণ্যবান লোকদের বন্ধু বানাও। কারণ তারা সচ্ছলতার সময় তোমাদের সৌন্দর্য ও অস্বচ্ছলতার সময় তোমাদের সম্বল হবে। কাউকে চূড়ান্তভাবে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার জন্য তোমার এমন অবস্থা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো, যা সে অপছন্দ করে। শত্রু থেকে দূরে থাকবে এবং বিশ্বস্ত বন্ধু ব্যতীত অন্যদের থেকে সতর্ক থাকবে। বিশ্বস্ত বন্ধু সে, যে আল্লাহকে ভয় করে। কোনো পাপীকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কোরো না, তাহলে তুমিও তার থেকে পাপ কাজ শিখবে। এবং কোনো পাপীর কাছে তোমার গোপন বিষয় প্রকাশ কোরো না।'৩৫
মালিক বিন দিনার বলেন, 'পাপিষ্ঠদের সাথে থেকে উন্নতমানের খাবার খাওয়ার চেয়ে পুণ্যবান বন্ধুদের সাথে থেকে পাথর বহন করে জীবিকা অর্জন করা উত্তম। '৩৬
আবু হাতিম বলেন, 'বুদ্ধিমান ব্যক্তি তার ইজ্জত-আবরু অক্ষুণ্ণ রাখে। খারাপ বন্ধুদের সঙ্গে মিশে কোনো খারাপ কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে না। ভালো মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার কাজে অলসতা করে না। কেননা, অভিজ্ঞ ও ভালো মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করলে নিজের ভেতর অনেক গোপন দোষ ধরা পড়ে, ফলে তা দূর করতে সহজ হয়।'
টিকাঃ
৩২. আল-আজলাহ: ৫৪
৩৩. আমিও ব্যক্তিগতভাবে এমন একজনকে চিনি, যিনি ১৮ বছর পর্যন্ত প্রয়াত বন্ধুর পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন। (লেখক)
৩৪. মিনহাজুল কাসিদিন: ১০৮
৩৫. মিনহাজুল কাসিদিন: ১০৮
৩৬. রওজাতুল উকালা: ১০০
📄 সালাফের বন্ধুত্ব বনাম আমাদের বন্ধুত্ব
প্রিয় ভাই, সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!?
আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের অধিকার ও দাবি আদায় করি না। অথচ আমাদের সালাফ ক্ষণিকের বন্ধুত্বের দাবি আদায়েও সচেষ্ট ছিলেন। ইমাম আবু হানিফা -এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি প্রায় সময় একজন অপরিচিত ব্যক্তির কাছ দিয়ে গমন করতেন। চলার পথে মাঝেমধ্যে এমনিতেই তার পাশে বসতেন; কোনো উদ্দেশ্য বা তার সাথে বিশেষ কোনো প্রয়োজনে বসতেন না। তবে যখন তিনি তার কাছ থেকে উঠে চলে আসতেন, তখন তার কুশল জিজ্ঞেস করতেন। সে সুস্থ হলে তার সাথে সুসম্পর্কের আবেশ রেখে চলে আসতেন। অসুস্থ হলে তার সেবা-শুশ্রূষা করতেন। ৩৭
বন্ধুর প্রতি কতিপয় হক ও দায়িত্ব রয়েছে। সাইদ ইবনুল আস বলেন, 'আমার ওপর আমার বন্ধুর তিনটি হক রয়েছে। ১. যখন সে আমার নিকট আসবে, তখন তাকে স্বাগতম জানাব। ২. সে কোনো কথা বললে আমি মনোযোগ দিয়ে তা শুনব। এবং ৩. সে যখন আমার পাশে বসবে, তখন তার জন্য জায়গা প্রশস্ত করব। '৩৮
আল্লাহ তাআলা মুমিন বন্ধুদের পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারে বলেন, رُحَاءُ بَيْنَهُمْ 'তারা পরস্পর সহানুভূতিশীল।' অর্থাৎ তারা একে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল ও পরস্পর সম্মান প্রদর্শনকারী। সহানুভূতির অর্থ কেবল ভালো ভালো খাবার খাওয়ানো ও সচ্ছলতার সময় পাশে থাকা নয়; বরং এর অর্থ হলো, বন্ধুর বিচ্ছেদে কষ্ট অনুভব করা এবং বন্ধুর অনুপস্থিতিতে মনের মাঝে শূন্যতা অনুভব করা। ৩৯
রাসুল ইরশাদ করেন : خَيْرُ الأَصْحَابِ عِنْدَ اللَّهِ خَيْرُهُمْ لِصَاحِبِهِ
'আল্লাহ তাআলার নিকট উত্তম বন্ধু সে, যে তার বন্ধুর নিকট উত্তম।'৪০
টিকাঃ
৩৭. তারিখু বাগদাদ: ১৩/৩৬০
৩৮. আল-ইহইয়া: ২/১৯১
৩৯. আল-ইহইয়া: ২/১৯১
৪০. সুনানুত তিরমিজি: ১৯৪৪
📄 উত্তম বন্ধু বনাম খারাপ বন্ধু
হে ভাই, উত্তম ও পুণ্যবান বন্ধু গ্রহণ করো। ভালো ও দ্বীনদার ব্যক্তিদের সংস্রবে থাকো। তারা তোমার কঠিন সময়ে তোমাকে সাহায্য করবে। বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করবে। কল্যাণ অর্জনে তোমাকে সহায়তা করবে। বিপদে ধৈর্যধারণের উপদেশ দেবে এবং সাহস জোগাবে।
অপরদিকে যারা খারাপ বন্ধু, তারা তোমার সামনে অশ্লীল ও মন্দ কাজকে সুন্দর করে উপস্থাপন করবে। ইবাদত-বন্দেগি থেকে তোমাকে দূরে রাখবে। হারাম কাজের পথ দেখাবে। এমন বন্ধুর মাধ্যমে না তুমি দুনিয়াতে কোনো ফায়দা হাসিল করতে পারবে, না আখিরাতে তারা তোমার কোনো উপকারে আসবে। বরং আখিরাতে তারাই তোমার দুর্ভোগ ও লজ্জার কারণ হবে। কিয়ামতের দিন এই বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যাবে এবং এই মিলন ও ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে। বন্ধুরা শত্রুতে পরিণত হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ 'বন্ধুরা সেদিন একে অপরের শত্রু হবে, তবে আল্লাহভীরুরা নয়। '৪১
আবু দারদা প্রায় সময় কবরস্থানের পাশে বসে থাকতেন। লোকেরা তাঁকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন, 'এখানে আমি এমন লোকদের নিকট বসি, যারা আমাকে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আমি যখন তাদের থেকে অনুপস্থিত থাকি, তখন তারা আমার গিবত করে না। '৪২
টিকাঃ
৪১. সুরা আজ-জুখরুফ: ৬৭
৪২. মিনহাজুল কাসিদিন: ৪৩২
📄 বন্ধু নির্ণয়ে বুদ্ধি ও বয়সের গুরুত্ব
সালাফে সালিহিন দ্বীনদার, মুত্তাকি, বুদ্ধিমান ও প্রজ্ঞাবান বয়স্ক লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করতেন।
আবু আমর ইবনুল আলা বলেন, 'সাইদ বিন জুবাইর আমাকে যুবকদের মাঝে বসে থাকতে দেখে বললেন, “তুমি যুবকদের সাথে কী করো? তোমার তো বৃদ্ধদের সাথে থাকা উচিত।”’৪৩
কমবয়সী লোকদের সংশ্রবে থাকার চেয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বয়স্ক লোকদের সংশ্রবে থাকার উপকারিতা বেশি। কারণ বয়স্ক লোকদের মুখ থেকে হিকমতপূর্ণ ও শিক্ষণীয় কথা বের হয়। তাদের নিকট বিগত সময়ের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ পরামর্শ পাওয়া যায়। এ দুটির পাশাপাশি তাদের মজলিসে থাকে আল্লাহর জিকির, ইসতিগফার, তাসবিহ, তাহমিদ ইত্যাদি। এদের মজলিসে যারা উপস্থিত হয়, তারা লাভবান হয় এবং যারা তাদের সুহবতে লেগে থাকে, তাদের ইলম ও হিকমত বৃদ্ধি পায়। সুতরাং যদি সুহবত ও সংশ্রব গ্রহণ করার জন্য এমন বয়স্ক লোকদের পাওয়া না যায়, তখন আবু দারদা -এর কথাই মেনে নেওয়া উত্তম। তিনি বলেন, 'একাকী থাকার চেয়ে উত্তম লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করা উত্তম। খারাপ লোকের সাথে বন্ধুত্ব করার চেয়ে একা থাকা উত্তম। নীরব থাকার চেয়ে মানুষকে কল্যাণের বিষয় লেখানো উত্তম। অকল্যাণের বিষয় লেখানোর চেয়ে নীরব থাকা উত্তম।'
আবু হাতিম বলেন, 'জ্ঞানীরা কখনো খারাপ লোকদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে না। কারণ খারাপ বন্ধু অঙ্গারের মতো— বাইরের আবরণের ভেতর লুকিয়ে রাখে বিদ্বেষের আগুন। সে কখনো বিশ্বস্ত বন্ধু হয় না এবং বন্ধুত্বের দাবিও পালন করে না।'
চারটি বিষয়ের মধ্যে মানুষের সৌভাগ্য নিহিত। ১. স্ত্রী আনুগত্যশীল হওয়া। ২. সন্তান পুণ্যবান হওয়া। ৩. ভাই-বন্ধুরা উত্তম ও সদাচারী হওয়া। এবং ৪. রিজিকের ব্যবস্থা নিজ শহরে হওয়া।
খারাপ লোকের সাথে বন্ধুত্ব করার চেয়ে কুকুরের সাথে বন্ধুত্ব করা ভালো। কারণ খারাপ লোকের সাথে বন্ধুত্ব করলে তার খারাপি ও অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায় না।
জুহরি বলেন, 'খারাপ চরিত্রের লোকদের নিকট থেকে কোনো উপকার অর্জন করা যায় না।'৪৪
টিকাঃ
৪৩. রওজাতুল উকালা: ১০১
৪৪. রওজাতুল উকালা: ৬৫