📄 বর্তমান যুগের বন্ধুত্বের বেহাল দশা
প্রিয় মুসলিম ভাই, বর্তমানে আমাদের পারস্পরিক বন্ধুত্ব তাকাল্লুফ বা কৃত্রিমতায় ভরা। সবাই শুধু বন্ধুত্বের অভিনয় করে চলে। নিঃস্বার্থতা ও আন্তরিকতার প্রচুর অভাব আমাদের বন্ধুত্বে। এর কারণ কী? এর কারণ হলো, আমরা আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের হক ও দাবি সম্পর্কে তেমন জানি না। আমরা বুঝি না, বন্ধুত্বের এই বন্ধন আসলে কতটা শক্তিশালী। সুতরাং আমরা যদি চাই, আমাদের বন্ধুত্ব সালাফের বন্ধুত্বের মতো নির্ভেজাল ও অকৃত্রিম হোক, তাহলে বন্ধুত্বের অধিকার ও দাবিসমূহ জানা একান্ত আবশ্যক।
আব্দুল্লাহ বিন ওয়ালিদ বলেন, 'আবু জাফর মুহাম্মাদ আলি আমাকে ও আমার বন্ধুদের উদ্দেশ্য করে বললেন, "তোমরা কি একে অপরের পকেটে হাত দিয়ে যা খুশি তা-ই নিয়ে নিতে পারো?” আমরা বললাম, “না।” তখন তিনি বললেন, “তাহলে তোমরা এখনও পরস্পর আন্তরিক বন্ধু হতে পারোনি।”২৮
উত্তম বন্ধুর চরিত্র হয় পবিত্র এবং গুণাবলি হয় প্রশংসনীয়। পক্ষান্তরে খারাপ বন্ধুর চরিত্র ও গুণাবলিও তার মতো খারাপ হয়। জনৈক কবি উত্তম বন্ধু ও খারাপ বন্ধুর পার্থক্য নির্ণয় করে বলেন:
وَتَرَى الكَرِيمَ إِذَا تَصَرَّمَ وَصْلُهُ * يُخْفِي الْقَبِيْحَ وَيُظْهِرُ الْإِحْسَانَا وَتَرَى اللُّثِيمَ إِذَا تَقَضَّى وَصْلُهُ * يُخْفِي الْجَمِيلَ وَيُظْهِرُ الْبُهْتَانَا
‘সেই হলো উত্তম বন্ধু, যে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পরও তোমার নেতিবাচক বিষয়গুলো গোপন রাখে এবং ইতিবাচক বিষয়গুলো প্রকাশ করে। আর খারাপ বন্ধু হলো সে, যে বন্ধুত্ব ছিন্ন হওয়ার পর তোমার ভালো গুণসমূহ গোপন রাখে এবং খারাপ গুণসমূহ প্রকাশ তো করেই, তার সাথে তোমার কুৎসা রটিয়ে বেড়ায়।’২৯
অন্য এক কবি বলেন :
إِنَّ الْكَرِيمَ الَّذِي تَبْقَى مَوَدَّتُهُ . وَيَحْفَظُ السِّرَّ إِنْ صَافَى وَإِنْ صَرَمَا لَيْسَ الْكَرِيمُ الَّذِي إِنْ زَلَّ صَاحِبُهُ * بَثَّ الَّذِي كَانَ مِنْ أَسْرَارِهِ عِلْمَا
‘সেই হলো উত্তম ও প্রকৃত বন্ধু, যে কোনো কারণে বন্ধুত্ব ছিন্ন হয়ে গেলেও বন্ধুত্বের আবেদন রক্ষা করে চলে এবং বন্ধুর গোপনীয় বিষয়গুলো কারও সামনে প্রকাশ করে না। সে বন্ধু উত্তম ও প্রকৃত বন্ধু নয়, যে বন্ধুর সাথে সম্পর্ক শীতল হয়ে গেলে বন্ধুর সব দোষ সবার সামনে উগরে দেয়।’৩০
জনৈক উপদেশদাতা বলেন, ‘এমন ব্যক্তিকে বন্ধু বানাও, যে তোমার গোপন বিষয় ও দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবে; বিপদাপদে তোমার সাথে থাকবে; তোমার আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দেবে; তোমার ভালো ও ইতিবাচক বিষয়সমূহ প্রকাশ করবে এবং তোমার দোষ-ত্রুটি ও নেতিবাচক বিষয়গুলো গোপন রাখবে। যদি এমন বন্ধু পাওয়া না যায়, তখন কাউকে বন্ধু না বানিয়ে নিজের সাথেই বন্ধুত্ব করবে।'
আবু হাতিম বলেন, 'জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য এমন লোকের বন্ধুত্ব থেকে আল্লাহর পানাহ চাওয়া আবশ্যক, যে ব্যক্তি তার বন্ধুর ভালো কাজে উৎসাহ দেয় না এবং খারাপ কাজ থেকে অনুৎসাহিত করে না; বন্ধু আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল হয়ে পড়লে তাকে সেই গাফিলতির ওপর অটল থাকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। মনে রাখবে, যে ব্যক্তির বন্ধুবান্ধব খারাপ, সে ব্যক্তি তার বন্ধুদের চেয়েও খারাপ। কারণ, ভালো মানুষ ভালো মানুষদের সাথেই বন্ধুত্ব করে; আর খারাপ মানুষ বন্ধু হিসেবে খারাপ লোকদেরই বেছে নেয়। সুতরাং কারও সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইলে একমাত্র ভালো লোকদের সাথেই বন্ধুত্ব করবে।'৩১
টিকাঃ
২৬. রওজাতুল উকালা: ১৭৪
২৭. আজ-জুহদ, বাইহাকি: ৩১০
২৮. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/১৮৭
২৯. আল-ইহইয়া: ১৯৫/২
৩০. তারিখু বাগদাদ: ৫/১৫৮
৩১. রওজাতুল উকালা: ১০২
📄 বিপদে বন্ধুর পরিচয়
প্রিয় ভাই, তোমার জন্য যখন পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে যাবে, তোমার চলার পথ যখন পিচ্ছিল হয়ে যাবে, বিপদাপদ এসে চার পাশ থেকে যখন তোমাকে ঘিরে ধরবে, তখনই তোমার প্রকৃত বন্ধু কে তা প্রকাশ পাবে। প্রকৃত বন্ধু তখন তোমার পাশে দাঁড়াবে। সব বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে চলার সাহস জোগাবে এবং যথাসধ্য সহযোগিতা করে তোমার কষ্টের বোঝাকে হালকা করার চেষ্টা করবে।
আর যখন তোমার পৃথিবী উর্বর হবে এবং দুনিয়া তোমার জন্য প্রশস্ত ও অনুকূল হবে, তখন সবাই তোমার বন্ধু হবে।
কবি বলেন: وَكُلُّ النَّاسِ إِخْوَانُ الرَّخَاءِ إِنَّمَا * الَّذِي أَخَاكَ عِنْدَ الشَّدَائِدِ
'সুখের সময় সকলেই তোমার বন্ধু। কিন্তু তোমার প্রকৃত বন্ধু সেই, যে কষ্টের মুহূর্তেও তোমার বন্ধু থাকে।'৩২
দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ও সর্বাপেক্ষা কঠিন মুসিবত হলো মৃত্যু। প্রকৃত বন্ধু এই মুসিবতের সময়েও বন্ধুর পাশে দাঁড়ায়। মৃত্যুর সময় কালিমার তালকিন করে তাকে ইমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে সহযোগিতা করে। মৃত্যুর পরে তাকে স্মরণ রাখে; ভুলে যায় না। তার এতিম ও অসহায় সন্তানসন্ততির খোঁজখবর রাখে। তাদের অভিভাবকত্ব করে।
আমাদের সালাফের মধ্যে কেউ কেউ তো বন্ধুর মৃত্যুর পর চল্লিশ বছর পর্যন্ত তার পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং তাদের প্রয়োজন পূর্ণ করেছেন।৩০_৩৪
এ জন্যই উমর বিন খাত্তাব বলেন, 'তোমরা সৎ ও পুণ্যবান লোকদের বন্ধু বানাও। কারণ তারা সচ্ছলতার সময় তোমাদের সৌন্দর্য ও অস্বচ্ছলতার সময় তোমাদের সম্বল হবে। কাউকে চূড়ান্তভাবে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার জন্য তোমার এমন অবস্থা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো, যা সে অপছন্দ করে। শত্রু থেকে দূরে থাকবে এবং বিশ্বস্ত বন্ধু ব্যতীত অন্যদের থেকে সতর্ক থাকবে। বিশ্বস্ত বন্ধু সে, যে আল্লাহকে ভয় করে। কোনো পাপীকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কোরো না, তাহলে তুমিও তার থেকে পাপ কাজ শিখবে। এবং কোনো পাপীর কাছে তোমার গোপন বিষয় প্রকাশ কোরো না।'৩৫
মালিক বিন দিনার বলেন, 'পাপিষ্ঠদের সাথে থেকে উন্নতমানের খাবার খাওয়ার চেয়ে পুণ্যবান বন্ধুদের সাথে থেকে পাথর বহন করে জীবিকা অর্জন করা উত্তম। '৩৬
আবু হাতিম বলেন, 'বুদ্ধিমান ব্যক্তি তার ইজ্জত-আবরু অক্ষুণ্ণ রাখে। খারাপ বন্ধুদের সঙ্গে মিশে কোনো খারাপ কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে না। ভালো মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার কাজে অলসতা করে না। কেননা, অভিজ্ঞ ও ভালো মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করলে নিজের ভেতর অনেক গোপন দোষ ধরা পড়ে, ফলে তা দূর করতে সহজ হয়।'
টিকাঃ
৩২. আল-আজলাহ: ৫৪
৩৩. আমিও ব্যক্তিগতভাবে এমন একজনকে চিনি, যিনি ১৮ বছর পর্যন্ত প্রয়াত বন্ধুর পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন। (লেখক)
৩৪. মিনহাজুল কাসিদিন: ১০৮
৩৫. মিনহাজুল কাসিদিন: ১০৮
৩৬. রওজাতুল উকালা: ১০০
📄 সালাফের বন্ধুত্ব বনাম আমাদের বন্ধুত্ব
প্রিয় ভাই, সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!?
আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের অধিকার ও দাবি আদায় করি না। অথচ আমাদের সালাফ ক্ষণিকের বন্ধুত্বের দাবি আদায়েও সচেষ্ট ছিলেন। ইমাম আবু হানিফা -এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি প্রায় সময় একজন অপরিচিত ব্যক্তির কাছ দিয়ে গমন করতেন। চলার পথে মাঝেমধ্যে এমনিতেই তার পাশে বসতেন; কোনো উদ্দেশ্য বা তার সাথে বিশেষ কোনো প্রয়োজনে বসতেন না। তবে যখন তিনি তার কাছ থেকে উঠে চলে আসতেন, তখন তার কুশল জিজ্ঞেস করতেন। সে সুস্থ হলে তার সাথে সুসম্পর্কের আবেশ রেখে চলে আসতেন। অসুস্থ হলে তার সেবা-শুশ্রূষা করতেন। ৩৭
বন্ধুর প্রতি কতিপয় হক ও দায়িত্ব রয়েছে। সাইদ ইবনুল আস বলেন, 'আমার ওপর আমার বন্ধুর তিনটি হক রয়েছে। ১. যখন সে আমার নিকট আসবে, তখন তাকে স্বাগতম জানাব। ২. সে কোনো কথা বললে আমি মনোযোগ দিয়ে তা শুনব। এবং ৩. সে যখন আমার পাশে বসবে, তখন তার জন্য জায়গা প্রশস্ত করব। '৩৮
আল্লাহ তাআলা মুমিন বন্ধুদের পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারে বলেন, رُحَاءُ بَيْنَهُمْ 'তারা পরস্পর সহানুভূতিশীল।' অর্থাৎ তারা একে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল ও পরস্পর সম্মান প্রদর্শনকারী। সহানুভূতির অর্থ কেবল ভালো ভালো খাবার খাওয়ানো ও সচ্ছলতার সময় পাশে থাকা নয়; বরং এর অর্থ হলো, বন্ধুর বিচ্ছেদে কষ্ট অনুভব করা এবং বন্ধুর অনুপস্থিতিতে মনের মাঝে শূন্যতা অনুভব করা। ৩৯
রাসুল ইরশাদ করেন : خَيْرُ الأَصْحَابِ عِنْدَ اللَّهِ خَيْرُهُمْ لِصَاحِبِهِ
'আল্লাহ তাআলার নিকট উত্তম বন্ধু সে, যে তার বন্ধুর নিকট উত্তম।'৪০
টিকাঃ
৩৭. তারিখু বাগদাদ: ১৩/৩৬০
৩৮. আল-ইহইয়া: ২/১৯১
৩৯. আল-ইহইয়া: ২/১৯১
৪০. সুনানুত তিরমিজি: ১৯৪৪
📄 উত্তম বন্ধু বনাম খারাপ বন্ধু
হে ভাই, উত্তম ও পুণ্যবান বন্ধু গ্রহণ করো। ভালো ও দ্বীনদার ব্যক্তিদের সংস্রবে থাকো। তারা তোমার কঠিন সময়ে তোমাকে সাহায্য করবে। বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করবে। কল্যাণ অর্জনে তোমাকে সহায়তা করবে। বিপদে ধৈর্যধারণের উপদেশ দেবে এবং সাহস জোগাবে।
অপরদিকে যারা খারাপ বন্ধু, তারা তোমার সামনে অশ্লীল ও মন্দ কাজকে সুন্দর করে উপস্থাপন করবে। ইবাদত-বন্দেগি থেকে তোমাকে দূরে রাখবে। হারাম কাজের পথ দেখাবে। এমন বন্ধুর মাধ্যমে না তুমি দুনিয়াতে কোনো ফায়দা হাসিল করতে পারবে, না আখিরাতে তারা তোমার কোনো উপকারে আসবে। বরং আখিরাতে তারাই তোমার দুর্ভোগ ও লজ্জার কারণ হবে। কিয়ামতের দিন এই বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যাবে এবং এই মিলন ও ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে। বন্ধুরা শত্রুতে পরিণত হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ 'বন্ধুরা সেদিন একে অপরের শত্রু হবে, তবে আল্লাহভীরুরা নয়। '৪১
আবু দারদা প্রায় সময় কবরস্থানের পাশে বসে থাকতেন। লোকেরা তাঁকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন, 'এখানে আমি এমন লোকদের নিকট বসি, যারা আমাকে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আমি যখন তাদের থেকে অনুপস্থিত থাকি, তখন তারা আমার গিবত করে না। '৪২
টিকাঃ
৪১. সুরা আজ-জুখরুফ: ৬৭
৪২. মিনহাজুল কাসিদিন: ৪৩২