📘 পুণ্যবান বন্ধু জীবনসফরে উত্তম সহযাত্রী > 📄 উত্তম বন্ধুর গুণাবলি

📄 উত্তম বন্ধুর গুণাবলি


প্রিয় মুসলিম ভাই, যার সাথে তুমি বন্ধুত্ব করতে আগ্রহী, তার মধ্যে অবশ্যই পাঁচটি গুণ থাকতে হবে : ১. সে যেন জ্ঞানী হয়, ২. চরিত্রবান হয়, ৩. ফাসিক বা দুষ্কৃতকারী না হয়, ৪. বিদআতি না হয় এবং ৫. দুনিয়ালোভী না হয়।
আল্লাহ তাআলা উত্তম ও পবিত্র বন্ধুত্বের প্রশংসা করেছেন এবং এটাকে জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম কারণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যেমন হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: أَيْنَ الْمُتَحَابُّونَ بِجَلَالِي الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّي
'আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন বলবেন, "সেই সব লোকরা কোথায়, যারা আমার মহত্ত্বের জন্য পরস্পর ভালোবেসেছিল? আজ আমি আমার (আরশের) ছায়াতলে তাদের আশ্রয় দেবো। আজ আমার (আরশের) ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া নেই।"'৭
অন্য হাদিসে তিনি ইরশাদ করেন :
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ يَوْمَ القِيَامَةِ فِي ظِلِّهِ، يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ: إِمَامٌ عَادِلُ، وَشَابٌ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ اللهِ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ فِي خَلَاءٍ فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّق فِي المَسْجِدِ، وَرَجُلَانِ تَحَابًا فِي اللهِ، وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةُ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ إِلَى نَفْسِهَا، قَالَ: إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ، وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا صَنَعَتْ يَمِينُهُ
'সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ কিয়ামত দিবসে তাঁর (আরশের) ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন, যেদিন এই ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না। (তারা হলো) ১. ন্যায়পরায়ণ শাসক। ২. এমন যুবক, যে তার যৌবনকাল আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করে। ৩. এমন ব্যক্তি, যে একাকী বসে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার চোখদুটো আল্লাহর ভয়ে অশ্রুপাত করে। ৪. সেই ব্যক্তি, যার অন্তর সব সময় মসজিদের সাথে সংযুক্ত থাকে (অর্থাৎ প্রতি ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে জামাআত সহকারে আদায়ের জন্য উন্মুখ থাকে)। ৫. এমন দুই ব্যক্তি, যারা একমাত্র আল্লাহর জন্য একে অন্যকে ভালোবাসে এবং তাঁর জন্যই পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়। ৬. সেই ব্যক্তি, যাকে কোনো অভিজাত শ্রেণির সুন্দরী মহিলা ব্যভিচারের দিকে আহ্বান করলে সে প্রত্যাখ্যান করে বলে, "আমি আল্লাহকে ভয় করি।" ৭. সেই ব্যক্তি, যে এতটাই গোপনে দান-সদাকা করে যে, তার ডান হাত কী দান করেছে, তা বাম হাতও জানতে পারে না।'৮
সৎ ও পুণ্যবান লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করলে নিজের মর্যাদাও বৃদ্ধি পায়। যেমন : আসহাবে কাহফের সঙ্গ বেছে নেওয়ায় তাদের কুকুরটির মর্যাদা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে তার কথা উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ করেছেন:
سَيَقُولُونَ ثَلَاثَةٌ رَابِعُهُمْ كَلْبُهُمْ
'...এখন তারা বলবে, “তারা ছিল তিন জন; তাদের চতুর্থটি তাদের কুকুর।”'৯
বন্ধু হলো আয়নার মতো। মানুষ তার মাঝেই তোমার স্বরূপ ও প্রকৃতি দেখতে পাবে। তাকে দেখেই বুঝে নেবে, তুমি কেমন। কারণ, প্রত্যেক ব্যক্তি তার বন্ধুর ধর্ম (স্বভাব-চরিত্র) দ্বারা প্রভাবিত হয়। সুতরাং কারও সাথে বন্ধুত্ব করতে হলে খুব দেখেশুনে করতে হবে।
আবু সুলাইমান বলেন, 'রাসুল -এর হাদিস (الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ)-এর ব্যাখ্যা হলো, তুমি যার দ্বীনদারি ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে নিশ্চিত হবে, কেবল তাকেই বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে। কারণ তুমি যাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে, সে তার ধর্ম ও চিন্তা-চেতনার প্রতি তোমাকে আকৃষ্ট করবে। তোমার দ্বীনদারির ওপর ভরসা করে এমন লোককে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কোরো না, যার দ্বীনদারি ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে তুমি নিশ্চিত নও।'১০
প্রিয় মুসলিম ভাই, কথিত আছে, 'বিপদে বন্ধুর পরিচয়।' তাই বিপদে পাশে দাঁড়াবে না—এমন লোকদের সাথে বন্ধুত্ব কোরো না। এমন লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, যারা কিয়ামতের ভয়াবহতম দিনেও তোমার বন্ধু থাকবে, শত্রুতে পরিণত হবে না। এ সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ
'বন্ধুরা সেদিন একে অপরের শত্রু হবে, তবে আল্লাহভীরুরা নয়।'১১
হাদিস শরিফে উত্তম বন্ধু ও খারাপ বন্ধুর খুব সুন্দর উপমা বিবৃত হয়েছে। রাসুল বলেন: إِنَّمَا مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ، وَالْجَلِيسِ السَّوْءِ، كَحَامِلِ الْمِسْكِ، وَنَافِخِ الْكِيرِ، فَحَامِلُ الْمِسْكِ: إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةٌ، وَنَافِخُ الْكِيرِ: إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيحًا خَبِيثَةً
'উত্তম বন্ধু ও মন্দ বন্ধুর উদাহরণ হলো, সুগন্ধি বিক্রেতা ও হাপরে ফুঁকদানকারী। সুগন্ধিওয়ালা হয়তো তোমাকে উপহারস্বরূপ সুগন্ধি দেবে অথবা তার কাছ থেকে তুমি কিনে নেবে। তাও না হলেও তার কাছ থেকে অন্তত সুগন্ধি পাবে। আর হাপরে ফুঁকদানকারী হয়তো তোমার কাপড় পুড়ে ফেলবে অথবা দুর্গন্ধ পাবে।১২
আলি বলেন, 'তোমরা অবশ্যই পুণ্যবান লোকদের বন্ধু বানাবে, কারণ তারা দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের সাহায্যকারী হবে। তোমরা কি জানো না?-জাহান্নামিরা উত্তম বন্ধু না থাকার ওপর আক্ষেপ করে বলবে, فَمَا لَنَا مِنْ شَافِعِينَ * وَلَا صَدِيقٍ حَمِيمٍ (অতএব, আমাদের কোনো সুপারিশকারী নেই এবং কোনো সহৃদয় বন্ধুও নেই।১৩)'১৪
বন্ধুত্বের অনেক দাবি ও অধিকার রয়েছে। আতা বিন মাইসারা বলেন, 'বন্ধুত্বের দাবি তিনটি: ১. বন্ধু অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া। ২. ব্যস্ততার সময় তাকে সাহায্য করা। এবং ৩. সে কোনো বিষয় ভুলে গেলে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া।'১৫
মনে রাখবে, কোনো মানুষ দোষ-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। আসলে প্রত্যেক মাখলুকের মধ্যেই কোনো না কোনো দোষ অবশ্যই থাকে। সুতরাং দ্বীন ও উত্তম চরিত্র দেখে তুমি যাদের বন্ধু বানিয়েছ, তাদের মধ্যেও ছোটখাটো দোষ থাকা অমূলক নয়। তাই তাদের মধ্যে যদি ছোটখাটো কোনো দোষ-ত্রুটি দেখতে পাও, তখন এর জন্য বন্ধুত্ব ছিন্ন করবে না। বরং তাদের দ্বীন ও উত্তম চরিত্রের প্রতি লক্ষ রেখে তাদের সাথে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখবে এবং উত্তম উপায়ে যথাসম্ভব তা সংশোধনের চেষ্টা করবে।

টিকাঃ
৫. আল-ইহইয়া: ২/১৮৫
৬. আল-ইহইয়া: ২/১৮৬
৭. সহিহু মুসলিম: ২৫৬৬
৮. সহিহুল বুখারি: ৬৮০৬
৯. সুরা আল-কাহফ : ২২
১০. আল-আজলাহ : ৫১০
১১. সুরা আজ-জুখরুফ : ৬৭
১২. সহিহ মুসলিম: ২৬২৮
১৩. সুরা আশ-শুআরা: ১০০-১০১
১৪. আল-ইহয়া: ২/১৭৫
১৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/১৯৮

📘 পুণ্যবান বন্ধু জীবনসফরে উত্তম সহযাত্রী > 📄 বন্ধুদের সাথে মেলামেশা ও দেখা-সাক্ষাতের বিধান

📄 বন্ধুদের সাথে মেলামেশা ও দেখা-সাক্ষাতের বিধান


বন্ধুদের সাথে মেলামেশা ও দেখা-সাক্ষাৎ দুই কারণে হয়:
১. স্বাভাবিক মনের টান ও সময় কাটানোর জন্য। এই প্রকারের মেলামেশা ও দেখা-সাক্ষাতে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়। এর কারণে সবচেয়ে মারাত্মক যে ক্ষতিটা হয়, তা হলো অন্তর অসুস্থ হওয়া এবং সময় নষ্ট হওয়া।
২. আখিরাতে নাজাত (মুক্তি) লাভ এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণের জন্য। এতে অনেক উপকার রয়েছে। তবে তিন কারণে এ প্রকারের মেলামেশা ও দেখা-সাক্ষাৎও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে: ক. পরস্পরকে আকৃষ্ট করার জন্য অতিরিক্ত সাজগোজ করা। খ. প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কথা বলা ও বেশি মেলামেশা করা। গ. এ মেলামেশা ও দেখা-সাক্ষাৎ এমন অভ্যাসে পরিণত হওয়া, যা মূল উদ্দেশ্যকে বাধাগ্রস্ত করে।
সারকথা হলো, কারও সাথে মেলামেশা ও দেখা-সাক্ষাৎ করা হয়তো নফসে আম্মারার (কুপ্রবৃত্তি) প্ররোচনায় হয়, কিংবা নফসে মুতমায়িন্নার (পরিশুদ্ধ হৃদয়) উৎসাহে হয়। প্রথমটি মানুষকে ধ্বংস ও ভ্রষ্টতার পথে পরিচালিত করে। দ্বিতীয়টি হিদায়াত ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। ১৮
আবু হাতিম বলেন, 'ভালো মানুষের নিকট যখন সহানুভূতি কামনা করা হয়, তখন সহানুভূতি দেখায় এবং কোমল আচরণ করে। আর খারাপ মানুষ যেখানে সহানুভূতির প্রয়োজন, সেখানেও কঠোরতা করে। ভালো মানুষ সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান করে এবং নিকৃষ্ট লোকদেরও অসম্মান করে না। সে জ্ঞানীদের কষ্ট দেয় না। নির্বোধদের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে না। পাপীদের সাথে মেলামেশা করে না। সে নিজের বন্ধুকে সর্বদা নিজের ওপর প্রাধান্য দেয়। বন্ধুর পক্ষ থেকে অবন্ধুসুলভ কোনো আচরণ প্রকাশ পেলে তার প্রতিশোধ নেয় না। কারও পক্ষ থেকে বন্ধুত্বের আমন্ত্রণ পেলে পুরোনো শত্রুতা ভুলে তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। যথাসম্ভব বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকে; কখনো নিজের পক্ষ থেকে তা ভঙ্গ করে না।'১৯

টিকাঃ
১৭. সুরা আল-আসর: ০
১৮. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬৮
১৯. রওজাতুল উকালা: ১৭৩

📘 পুণ্যবান বন্ধু জীবনসফরে উত্তম সহযাত্রী > 📄 প্রকৃত বন্ধুর পরিচয়

📄 প্রকৃত বন্ধুর পরিচয়


প্রকৃত বন্ধু সে, যার বন্ধুত্ব তোমার বেঁচে থাকা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রকৃত বন্ধু সে, যে তোমার মৃত্যুর পরও সত্যিকারের বন্ধুত্বের হক ও আবেদন পালন করে যাবে। এ সম্পর্কে মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ ইস্পাহানি-এর একটি কথা প্রসিদ্ধ আছে। তিনি বলেন, 'সে ব্যক্তি প্রকৃত বন্ধু নয়, যে বন্ধুর মিরাস বষ্টিত হওয়ার পর তাকে ভুলে যায়। প্রকৃত বন্ধু তো সে, যে বন্ধুর বিয়োগব্যথা আজীবন বয়ে বেড়ায় এবং গভীর রাতে কবরের শায়িত বন্ধুর জন্য আল্লাহর দরবারে অশ্রু বিসর্জন দেয়।'২০
সত্যিকারের বন্ধুত্বের এমন নজির আজও দেখা যায় পুণ্যাত্মা ব্যক্তিদের মাঝে। বন্ধুর মৃত্যুর অনেক বছর পরেও বন্ধুর জন্য তাদের দুআ করতে দেখা যায়। কোনো মজলিসে বন্ধুর কথা আলোচিত হলে সাথে সাথে তার জন্য রহমত ও মাগফিরাতের দুআ করে। আমি ও তুমি কি সেই পুণ্যাত্মা বন্ধুদের অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছি?
দুই বন্ধুর উপমা হলো দুই হাত, যারা একে অপরকে ধৌত করে পরিচ্ছন্ন রাখে। অনুরূপভাবে দুই বন্ধুও এমন হওয়া চাই, যারা সংশোধনের ক্ষেত্রে পরস্পরকে সাহায্য করবে। সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে থাকবে। একে অপরের জন্য সাহায্যকারী ও কল্যাণকামী হবে। একে অপরকে দুনিয়া থেকে আখিরাতের সফরের পাথেয় সংগ্রহ করতে সাহায্য করবে।
প্রিয় মুসলিম ভাই, তুমি যদি উত্তম ও পুণ্যবান বন্ধু খুঁজে না পাও, তাহলে একাকী থেকে কুরআন তিলাওয়াত করবে; বিভিন্ন উপকারী বই পড়ে সময় কাটাবে এবং একাকিত্বের সুযোগ নিয়ে ইবাদত ও নেক আমলের পরিমাণ উত্তরোত্তর বাড়িয়ে নেবে। ভালো মানুষ ছাড়া অন্য লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করার চেয়ে এটাই তোমার জন্য অধিক উপকারী ও কল্যাণকর।
মালিক বিন দিনার বলেন, 'যে বন্ধুর কাছ থেকে কোনো উপকার পাওয়া যায় না, তার সঙ্গ ত্যাগ করো।'২১
বকর বিন মুহাম্মাদ আল-আবিদ বলেন, 'আমাকে দাউদ আত-তায়ি বলেছেন, “হে বকর, তুমি (খারাপ) মানুষ থেকে দূরে থাকবে, যেভাবে তুমি হিংস্র প্রাণী থেকে দূরে থাকো।”'২২
আব্দুল আজিজ ইবনুল খাত্তাব বলেন, 'একদা মালিক বিন দিনার-এর পাশে একটি বিশাল ও ভয়ংকর আকৃতির কালো কুকুর বসে থাকতে দেখা গেল। তখন লোকজন তাকে বলল, “হে আবু ইয়াহইয়া, আপনার পাশে যে কুকুর বসে আছে?” তিনি উত্তর দিলেন, এটি খারাপ বন্ধুর চেয়ে উত্তম।”২৩
ইবরাহিম বিন আদহাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনি মানুষের সাথে মেলামেশা করেন না কেন?' তিনি বললেন, 'আমি যদি আমার চেয়ে উঁচু পর্যায়ের কারও সাথে মেলামেশা করি, তখন সে আমার সাথে অহংকার করবে। আর যদি আমার চেয়ে নিচু পর্যায়ের কারও সাথে মেলামেশা করি, সে আমার যথাযথ হক ও অধিকার আদায় করতে পারবে না। আর যদি আমার সমপর্যায়ের কারও সাথে মেলামেশা করি, তখন সে আমার প্রতি হিংসা করবে।'
প্রিয় ভাই আমার, যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসে, তাদের উচিত, আল্লাহর জন্যই একে অপরকে ঘৃণা করা। সুতরাং তুমি যদি কাউকে এ জন্যই ভালোবাসো যে, সে আল্লাহর বিধান মেনে চলে এবং সে আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দা; অতঃপর সে যদি আল্লাহর নাফরমানي করে, তাহলে অবশ্যই তুমি তাকে ঘৃণা করবে। কারণ এখন সে আল্লাহ তাআলার বিধান অমান্যকারী এবং তাঁর নিকট ঘৃণিত। ২৪
বিভিন্ন কারণ ও উপলক্ষকে কেন্দ্র করে মানুষের মাঝে পরস্পর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। যেমন: পরস্পর প্রতিবেশী হওয়ার কারণে, একই অফিসে চাকরি করার সুবাধে, একই মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করার কারণে কিংবা দূরপাল্লার কোনো বাস, ট্রেন, লঞ্চ বা বিমানে পাশাপাশি বসার কারণে একে অপরের সাথে পরিচিতি হয় এবং পরস্পরের মাঝে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। তা যে উপলক্ষকে কেন্দ্র করে বন্ধুত্ব হোক-এর পূর্বে অবশ্যই জেনে নিতে হবে, তুমি যার সাথে বন্ধুত্ব করতে যাচ্ছ, লোকটি ভালো কি না? জেনে নিতে হবে, সে আল্লাহর আনুগত্যশীল বান্দা কি না? কারণ উত্তম ও দ্বীনদার বন্ধু দুনিয়াতে আল্লাহর পরে সবচেয়ে উত্তম সহযোগী এবং আখিরাতের সফরে উত্তম সহযাত্রী হয়ে থাকে।

টিকাঃ
২০. আল-ইহইয়া: ২/২০২
২১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/৩৭২
২২. রওজাতুল উকালা: ৮২
২৩. রওজাতুল উকালা: ৮২
২৪. আল-ইহইয়া: ২/১৮১

📘 পুণ্যবান বন্ধু জীবনসফরে উত্তম সহযাত্রী > 📄 বর্তমান যুগের বন্ধুত্বের বেহাল দশা

📄 বর্তমান যুগের বন্ধুত্বের বেহাল দশা


প্রিয় মুসলিম ভাই, বর্তমানে আমাদের পারস্পরিক বন্ধুত্ব তাকাল্লুফ বা কৃত্রিমতায় ভরা। সবাই শুধু বন্ধুত্বের অভিনয় করে চলে। নিঃস্বার্থতা ও আন্তরিকতার প্রচুর অভাব আমাদের বন্ধুত্বে। এর কারণ কী? এর কারণ হলো, আমরা আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের হক ও দাবি সম্পর্কে তেমন জানি না। আমরা বুঝি না, বন্ধুত্বের এই বন্ধন আসলে কতটা শক্তিশালী। সুতরাং আমরা যদি চাই, আমাদের বন্ধুত্ব সালাফের বন্ধুত্বের মতো নির্ভেজাল ও অকৃত্রিম হোক, তাহলে বন্ধুত্বের অধিকার ও দাবিসমূহ জানা একান্ত আবশ্যক।
আব্দুল্লাহ বিন ওয়ালিদ বলেন, 'আবু জাফর মুহাম্মাদ আলি আমাকে ও আমার বন্ধুদের উদ্দেশ্য করে বললেন, "তোমরা কি একে অপরের পকেটে হাত দিয়ে যা খুশি তা-ই নিয়ে নিতে পারো?” আমরা বললাম, “না।” তখন তিনি বললেন, “তাহলে তোমরা এখনও পরস্পর আন্তরিক বন্ধু হতে পারোনি।”২৮
উত্তম বন্ধুর চরিত্র হয় পবিত্র এবং গুণাবলি হয় প্রশংসনীয়। পক্ষান্তরে খারাপ বন্ধুর চরিত্র ও গুণাবলিও তার মতো খারাপ হয়। জনৈক কবি উত্তম বন্ধু ও খারাপ বন্ধুর পার্থক্য নির্ণয় করে বলেন:
وَتَرَى الكَرِيمَ إِذَا تَصَرَّمَ وَصْلُهُ * يُخْفِي الْقَبِيْحَ وَيُظْهِرُ الْإِحْسَانَا وَتَرَى اللُّثِيمَ إِذَا تَقَضَّى وَصْلُهُ * يُخْفِي الْجَمِيلَ وَيُظْهِرُ الْبُهْتَانَا
‘সেই হলো উত্তম বন্ধু, যে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পরও তোমার নেতিবাচক বিষয়গুলো গোপন রাখে এবং ইতিবাচক বিষয়গুলো প্রকাশ করে। আর খারাপ বন্ধু হলো সে, যে বন্ধুত্ব ছিন্ন হওয়ার পর তোমার ভালো গুণসমূহ গোপন রাখে এবং খারাপ গুণসমূহ প্রকাশ তো করেই, তার সাথে তোমার কুৎসা রটিয়ে বেড়ায়।’২৯
অন্য এক কবি বলেন :
إِنَّ الْكَرِيمَ الَّذِي تَبْقَى مَوَدَّتُهُ . وَيَحْفَظُ السِّرَّ إِنْ صَافَى وَإِنْ صَرَمَا لَيْسَ الْكَرِيمُ الَّذِي إِنْ زَلَّ صَاحِبُهُ * بَثَّ الَّذِي كَانَ مِنْ أَسْرَارِهِ عِلْمَا
‘সেই হলো উত্তম ও প্রকৃত বন্ধু, যে কোনো কারণে বন্ধুত্ব ছিন্ন হয়ে গেলেও বন্ধুত্বের আবেদন রক্ষা করে চলে এবং বন্ধুর গোপনীয় বিষয়গুলো কারও সামনে প্রকাশ করে না। সে বন্ধু উত্তম ও প্রকৃত বন্ধু নয়, যে বন্ধুর সাথে সম্পর্ক শীতল হয়ে গেলে বন্ধুর সব দোষ সবার সামনে উগরে দেয়।’৩০
জনৈক উপদেশদাতা বলেন, ‘এমন ব্যক্তিকে বন্ধু বানাও, যে তোমার গোপন বিষয় ও দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবে; বিপদাপদে তোমার সাথে থাকবে; তোমার আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দেবে; তোমার ভালো ও ইতিবাচক বিষয়সমূহ প্রকাশ করবে এবং তোমার দোষ-ত্রুটি ও নেতিবাচক বিষয়গুলো গোপন রাখবে। যদি এমন বন্ধু পাওয়া না যায়, তখন কাউকে বন্ধু না বানিয়ে নিজের সাথেই বন্ধুত্ব করবে।'
আবু হাতিম বলেন, 'জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য এমন লোকের বন্ধুত্ব থেকে আল্লাহর পানাহ চাওয়া আবশ্যক, যে ব্যক্তি তার বন্ধুর ভালো কাজে উৎসাহ দেয় না এবং খারাপ কাজ থেকে অনুৎসাহিত করে না; বন্ধু আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল হয়ে পড়লে তাকে সেই গাফিলতির ওপর অটল থাকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। মনে রাখবে, যে ব্যক্তির বন্ধুবান্ধব খারাপ, সে ব্যক্তি তার বন্ধুদের চেয়েও খারাপ। কারণ, ভালো মানুষ ভালো মানুষদের সাথেই বন্ধুত্ব করে; আর খারাপ মানুষ বন্ধু হিসেবে খারাপ লোকদেরই বেছে নেয়। সুতরাং কারও সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইলে একমাত্র ভালো লোকদের সাথেই বন্ধুত্ব করবে।'৩১

টিকাঃ
২৬. রওজাতুল উকালা: ১৭৪
২৭. আজ-জুহদ, বাইহাকি: ৩১০
২৮. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/১৮৭
২৯. আল-ইহইয়া: ১৯৫/২
৩০. তারিখু বাগদাদ: ৫/১৫৮
৩১. রওজাতুল উকালা: ১০২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00