📄 আল্লাহর জন্য পরস্পর ভালোবাসা ইবাদত
প্রিয় মুসলিম ভাই, দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহর জন্য পরস্পর ভালোবাসা একটি উত্তম ইবাদত। এর জন্য কিছু শর্ত ও হক রয়েছে, যেগুলো যথাযথভাবে আদায় করা হলে পারস্পরিক বন্ধনটা হয় সকল ধরনের পঙ্কিলতা ও শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে মুক্ত। এবং অর্জিত হয় আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও দুনিয়া-আখিরাতে উচ্চ মর্যাদা।
মনে রাখতে হবে, বাছ-বিচার ছাড়া যে কাউকেই বন্ধু বানানো ঠিক নয়। আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল ইরশাদ করেন :
الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম (স্বভাব-চরিত্র) দ্বারা প্রভাবিত হয়, সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ করে সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।’
বন্ধুত্বের জন্য এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন করতে হবে, যার মধ্যে বিশেষ গুণ ও উত্তম চরিত্র রয়েছে, যা দেখে মানুষ তার সাথে বন্ধুত্ব করতে আগ্রহী হয়।
টিকাঃ
৩. মাকারিমুল আখলাক, তাবারানি: ১/৩১৪
৪. সুনানু আবি দাউদ: ৪৮৩৩, সুনানুত তিরমিজি: ২৩৭৮
📄 বন্ধুর উপকারিতা
বন্ধুত্বের মাধ্যমে মানুষ সাধারণত দুই ধরনের উপকারের প্রত্যাশা রাখে : পার্থিব উপকার ও দ্বীনি উপকার।
১. পার্থিব উপকার। যেমন: বন্ধুর সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি দ্বারা উপকৃত হওয়া অথবা শুধু দেখা-সাক্ষাৎ ও মেলামেশার মাধ্যমে স্বস্তি অনুভব করা।
📄 উত্তম বন্ধুর গুণাবলি
প্রিয় মুসলিম ভাই, যার সাথে তুমি বন্ধুত্ব করতে আগ্রহী, তার মধ্যে অবশ্যই পাঁচটি গুণ থাকতে হবে : ১. সে যেন জ্ঞানী হয়, ২. চরিত্রবান হয়, ৩. ফাসিক বা দুষ্কৃতকারী না হয়, ৪. বিদআতি না হয় এবং ৫. দুনিয়ালোভী না হয়।
আল্লাহ তাআলা উত্তম ও পবিত্র বন্ধুত্বের প্রশংসা করেছেন এবং এটাকে জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম কারণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যেমন হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: أَيْنَ الْمُتَحَابُّونَ بِجَلَالِي الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّي
'আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন বলবেন, "সেই সব লোকরা কোথায়, যারা আমার মহত্ত্বের জন্য পরস্পর ভালোবেসেছিল? আজ আমি আমার (আরশের) ছায়াতলে তাদের আশ্রয় দেবো। আজ আমার (আরশের) ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া নেই।"'৭
অন্য হাদিসে তিনি ইরশাদ করেন :
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ يَوْمَ القِيَامَةِ فِي ظِلِّهِ، يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ: إِمَامٌ عَادِلُ، وَشَابٌ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ اللهِ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ فِي خَلَاءٍ فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّق فِي المَسْجِدِ، وَرَجُلَانِ تَحَابًا فِي اللهِ، وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةُ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ إِلَى نَفْسِهَا، قَالَ: إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ، وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا صَنَعَتْ يَمِينُهُ
'সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ কিয়ামত দিবসে তাঁর (আরশের) ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন, যেদিন এই ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না। (তারা হলো) ১. ন্যায়পরায়ণ শাসক। ২. এমন যুবক, যে তার যৌবনকাল আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করে। ৩. এমন ব্যক্তি, যে একাকী বসে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার চোখদুটো আল্লাহর ভয়ে অশ্রুপাত করে। ৪. সেই ব্যক্তি, যার অন্তর সব সময় মসজিদের সাথে সংযুক্ত থাকে (অর্থাৎ প্রতি ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে জামাআত সহকারে আদায়ের জন্য উন্মুখ থাকে)। ৫. এমন দুই ব্যক্তি, যারা একমাত্র আল্লাহর জন্য একে অন্যকে ভালোবাসে এবং তাঁর জন্যই পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়। ৬. সেই ব্যক্তি, যাকে কোনো অভিজাত শ্রেণির সুন্দরী মহিলা ব্যভিচারের দিকে আহ্বান করলে সে প্রত্যাখ্যান করে বলে, "আমি আল্লাহকে ভয় করি।" ৭. সেই ব্যক্তি, যে এতটাই গোপনে দান-সদাকা করে যে, তার ডান হাত কী দান করেছে, তা বাম হাতও জানতে পারে না।'৮
সৎ ও পুণ্যবান লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করলে নিজের মর্যাদাও বৃদ্ধি পায়। যেমন : আসহাবে কাহফের সঙ্গ বেছে নেওয়ায় তাদের কুকুরটির মর্যাদা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে তার কথা উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ করেছেন:
سَيَقُولُونَ ثَلَاثَةٌ رَابِعُهُمْ كَلْبُهُمْ
'...এখন তারা বলবে, “তারা ছিল তিন জন; তাদের চতুর্থটি তাদের কুকুর।”'৯
বন্ধু হলো আয়নার মতো। মানুষ তার মাঝেই তোমার স্বরূপ ও প্রকৃতি দেখতে পাবে। তাকে দেখেই বুঝে নেবে, তুমি কেমন। কারণ, প্রত্যেক ব্যক্তি তার বন্ধুর ধর্ম (স্বভাব-চরিত্র) দ্বারা প্রভাবিত হয়। সুতরাং কারও সাথে বন্ধুত্ব করতে হলে খুব দেখেশুনে করতে হবে।
আবু সুলাইমান বলেন, 'রাসুল -এর হাদিস (الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ)-এর ব্যাখ্যা হলো, তুমি যার দ্বীনদারি ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে নিশ্চিত হবে, কেবল তাকেই বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে। কারণ তুমি যাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে, সে তার ধর্ম ও চিন্তা-চেতনার প্রতি তোমাকে আকৃষ্ট করবে। তোমার দ্বীনদারির ওপর ভরসা করে এমন লোককে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কোরো না, যার দ্বীনদারি ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে তুমি নিশ্চিত নও।'১০
প্রিয় মুসলিম ভাই, কথিত আছে, 'বিপদে বন্ধুর পরিচয়।' তাই বিপদে পাশে দাঁড়াবে না—এমন লোকদের সাথে বন্ধুত্ব কোরো না। এমন লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, যারা কিয়ামতের ভয়াবহতম দিনেও তোমার বন্ধু থাকবে, শত্রুতে পরিণত হবে না। এ সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ
'বন্ধুরা সেদিন একে অপরের শত্রু হবে, তবে আল্লাহভীরুরা নয়।'১১
হাদিস শরিফে উত্তম বন্ধু ও খারাপ বন্ধুর খুব সুন্দর উপমা বিবৃত হয়েছে। রাসুল বলেন: إِنَّمَا مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ، وَالْجَلِيسِ السَّوْءِ، كَحَامِلِ الْمِسْكِ، وَنَافِخِ الْكِيرِ، فَحَامِلُ الْمِسْكِ: إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةٌ، وَنَافِخُ الْكِيرِ: إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيحًا خَبِيثَةً
'উত্তম বন্ধু ও মন্দ বন্ধুর উদাহরণ হলো, সুগন্ধি বিক্রেতা ও হাপরে ফুঁকদানকারী। সুগন্ধিওয়ালা হয়তো তোমাকে উপহারস্বরূপ সুগন্ধি দেবে অথবা তার কাছ থেকে তুমি কিনে নেবে। তাও না হলেও তার কাছ থেকে অন্তত সুগন্ধি পাবে। আর হাপরে ফুঁকদানকারী হয়তো তোমার কাপড় পুড়ে ফেলবে অথবা দুর্গন্ধ পাবে।১২
আলি বলেন, 'তোমরা অবশ্যই পুণ্যবান লোকদের বন্ধু বানাবে, কারণ তারা দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের সাহায্যকারী হবে। তোমরা কি জানো না?-জাহান্নামিরা উত্তম বন্ধু না থাকার ওপর আক্ষেপ করে বলবে, فَمَا لَنَا مِنْ شَافِعِينَ * وَلَا صَدِيقٍ حَمِيمٍ (অতএব, আমাদের কোনো সুপারিশকারী নেই এবং কোনো সহৃদয় বন্ধুও নেই।১৩)'১৪
বন্ধুত্বের অনেক দাবি ও অধিকার রয়েছে। আতা বিন মাইসারা বলেন, 'বন্ধুত্বের দাবি তিনটি: ১. বন্ধু অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া। ২. ব্যস্ততার সময় তাকে সাহায্য করা। এবং ৩. সে কোনো বিষয় ভুলে গেলে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া।'১৫
মনে রাখবে, কোনো মানুষ দোষ-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। আসলে প্রত্যেক মাখলুকের মধ্যেই কোনো না কোনো দোষ অবশ্যই থাকে। সুতরাং দ্বীন ও উত্তম চরিত্র দেখে তুমি যাদের বন্ধু বানিয়েছ, তাদের মধ্যেও ছোটখাটো দোষ থাকা অমূলক নয়। তাই তাদের মধ্যে যদি ছোটখাটো কোনো দোষ-ত্রুটি দেখতে পাও, তখন এর জন্য বন্ধুত্ব ছিন্ন করবে না। বরং তাদের দ্বীন ও উত্তম চরিত্রের প্রতি লক্ষ রেখে তাদের সাথে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখবে এবং উত্তম উপায়ে যথাসম্ভব তা সংশোধনের চেষ্টা করবে।
টিকাঃ
৫. আল-ইহইয়া: ২/১৮৫
৬. আল-ইহইয়া: ২/১৮৬
৭. সহিহু মুসলিম: ২৫৬৬
৮. সহিহুল বুখারি: ৬৮০৬
৯. সুরা আল-কাহফ : ২২
১০. আল-আজলাহ : ৫১০
১১. সুরা আজ-জুখরুফ : ৬৭
১২. সহিহ মুসলিম: ২৬২৮
১৩. সুরা আশ-শুআরা: ১০০-১০১
১৪. আল-ইহয়া: ২/১৭৫
১৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/১৯৮
📄 বন্ধুদের সাথে মেলামেশা ও দেখা-সাক্ষাতের বিধান
বন্ধুদের সাথে মেলামেশা ও দেখা-সাক্ষাৎ দুই কারণে হয়:
১. স্বাভাবিক মনের টান ও সময় কাটানোর জন্য। এই প্রকারের মেলামেশা ও দেখা-সাক্ষাতে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়। এর কারণে সবচেয়ে মারাত্মক যে ক্ষতিটা হয়, তা হলো অন্তর অসুস্থ হওয়া এবং সময় নষ্ট হওয়া।
২. আখিরাতে নাজাত (মুক্তি) লাভ এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণের জন্য। এতে অনেক উপকার রয়েছে। তবে তিন কারণে এ প্রকারের মেলামেশা ও দেখা-সাক্ষাৎও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে: ক. পরস্পরকে আকৃষ্ট করার জন্য অতিরিক্ত সাজগোজ করা। খ. প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কথা বলা ও বেশি মেলামেশা করা। গ. এ মেলামেশা ও দেখা-সাক্ষাৎ এমন অভ্যাসে পরিণত হওয়া, যা মূল উদ্দেশ্যকে বাধাগ্রস্ত করে।
সারকথা হলো, কারও সাথে মেলামেশা ও দেখা-সাক্ষাৎ করা হয়তো নফসে আম্মারার (কুপ্রবৃত্তি) প্ররোচনায় হয়, কিংবা নফসে মুতমায়িন্নার (পরিশুদ্ধ হৃদয়) উৎসাহে হয়। প্রথমটি মানুষকে ধ্বংস ও ভ্রষ্টতার পথে পরিচালিত করে। দ্বিতীয়টি হিদায়াত ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। ১৮
আবু হাতিম বলেন, 'ভালো মানুষের নিকট যখন সহানুভূতি কামনা করা হয়, তখন সহানুভূতি দেখায় এবং কোমল আচরণ করে। আর খারাপ মানুষ যেখানে সহানুভূতির প্রয়োজন, সেখানেও কঠোরতা করে। ভালো মানুষ সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান করে এবং নিকৃষ্ট লোকদেরও অসম্মান করে না। সে জ্ঞানীদের কষ্ট দেয় না। নির্বোধদের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে না। পাপীদের সাথে মেলামেশা করে না। সে নিজের বন্ধুকে সর্বদা নিজের ওপর প্রাধান্য দেয়। বন্ধুর পক্ষ থেকে অবন্ধুসুলভ কোনো আচরণ প্রকাশ পেলে তার প্রতিশোধ নেয় না। কারও পক্ষ থেকে বন্ধুত্বের আমন্ত্রণ পেলে পুরোনো শত্রুতা ভুলে তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। যথাসম্ভব বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকে; কখনো নিজের পক্ষ থেকে তা ভঙ্গ করে না।'১৯
টিকাঃ
১৭. সুরা আল-আসর: ০
১৮. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬৮
১৯. রওজাতুল উকালা: ১৭৩