📄 আধ্যাত্মিক নূর
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন। যারা তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করে তারা এমন এক আলো লাভ করে, যা তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আনে। এটি সেই আধ্যাত্বিক আলো, যা চলার পথকে আলোকিত করে এবং আলোকবাহীর অন্তরে দান করে তৃপ্তি ও প্রশান্তি। আল্লাহ বলেছেন,
• 'যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তাদেরকে তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে।... (সূরাহ বাকারাহ, ২:২৫৭)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আল্লাহ যার বক্ষ ইসলামের জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, অতঃপর সে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে আগত আলোর মাঝে রয়েছে। (সে কি তার সমান, যে এরূপ নয়) যাদের অন্তর আল্লাহ স্মরণের ব্যাপারে কঠোর, তাদের জন্যে দূর্ভোগ। তারা সুস্পষ্ট গোমরাহীতে রয়েছে।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:২২)
এই আলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইলম। এর মাধ্যমে একজন ঈমানদার সত্য-মিথ্যা ও ক্ষতিকর-উপকারী বিষয়ের মধ্যে ফারাক করতে পারেন। যারা আন্তরিকভাবে ইলম অনুসন্ধান করেন তাদেরকে আল্লাহ এই আলো দান করেন নিয়ামত হিসেবে। যে যত ইলম অন্বেষণ করবে, সে তত আলো লাভ করবে।
এই আলো বিচার দিবসে তাদের উপকারে আসবে। বিচার দিবসের এক পর্যায়ে সকলকেই পুলসিরাত অতিক্রম করতে হবে। এটি স্থাপিত হবে জাহান্নামের উপরে এবং সেটা অতিক্রম করতে পারলেই কেবল জান্নাতে পৌঁছানো যাবে। মুমিনদের উপরেও অন্ধকার ছেয়ে আসবে, কিন্তু তাদের দুনিয়ার ভালো আমলের সমানুপাতে আলো প্রদান করা হবে। এই আলোর সাহায্যে দ্রুতগতিতে তারা সেই ব্রিজ অতিক্রম করবে।
কাফিরদের জন্য সেই পুলসিরাত হবে অত্যন্ত সরু ও ধারালো, আর মুনাফিকরা পেছনে পড়ে রইবে। আল্লাহ বলেছেন,
• 'যেদিন আপনি দেখবেন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদেরকে, তাদের সম্মুখ ভাগে ও ডানপার্শ্বে তাদের জ্যোতি ছুটোছুটি করবে বলা হবেঃ আজ তোমাদের জন্যে সুসংবাদ জান্নাতের, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তাতে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই মহাসাফল্য।' (সূরাহ হাদীদ, ৫৭:১২)
শাইখ আল-আশকার বলেছেন, 'আমাদেরকে আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন যে ঈমানদার নারী-পুরুষদেরকে বিচার দিবসে আলো প্রদান করা হবে। যারা দুনিয়াতে হিদায়াতপ্রাপ্ত ছিল ও দ্বীনের আলোয় আলোকিত হয়ে পথ চলেছে, সেই আলোর সাহায্যে তারা চিরসুখের স্থান জান্নাতের পথ দেখতে পাবে এবং পথের পিচ্ছিলতা ও কন্টকময় বাধা-বিপত্তি এড়াতে পারবে।' [১]
টিকাঃ
১. al-Ashqar, U.S., 2003b, The Day of Resurrection in the Light of the Qur'an and Sunnah, Riyadh, Saudi Arabia: International Islamic Publishing House, p.370.
📄 একটি সুন্দর জীবন (হায়াতে তাইয়্যেবা)
আল্লাহতালা ঈমানদারদেরকে একটি সুখী, সুন্দর ও পরিতৃপ্ত জীবনের ওয়াদা করেছেন,
• 'যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ঈমানদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের কারণে প্রাপ্য পুরস্কার দেব যা তারা করত।' (সূরাহ নাহল, ১৬: ৯৭)
অর্থাৎ তারা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাকদীরের সকল বিধানের উপর পরিতৃপ্ত ও সন্তুষ্ট থাকবে। আল্লাহ বাড়িয়ে দেবেন তাদের রিজিক। মুমিনদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,
• '(তারা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে) যাতে আল্লাহ তাদের উৎকৃষ্টতর কাজের প্রতিদান দেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও অধিক দেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রুজি দান করেন।' (সূরাহ নূর, ২৪:৩৮)
এই বর্ধিত রিজিকের ফলে তাদের মানসিক 'ভালো থাকা'য় একটি ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হবে।
একটি চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে, মানসিক অসুস্থতা বিষয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক চাপ জমতে থাকলে এটি পরবর্তী মানসিক বৈকল্যের পূর্বাভাস প্রদান করে, বিশেষত বিষণ্ণতা ও উদ্বিগ্নতার ক্ষেত্রে। যেমন কিনা, বিভিন্ন স্টাডিতে দেখা গেছে জীবনে চাপ বাড়তে থাকলে পরবর্তীতে বড় আকারের বিষণ্ণতার সূত্রপাত হয়, চাপ ও বিষণ্ণতা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এ বিষয়টি একটু আগে উল্লেখিত কুরআনের আয়াতের সাথে মিলে যায়। সেসব স্টাডিতে একটি আলোচনা অনুপস্থিত, সেটা হলো-আল্লাহ তাআলাই মানুষের জীবন থেকে বিভিন্ন নিয়ামত উঠিয়ে নেন এবং তাকে বিভিন্ন পরীক্ষার মুখোমুখি করেন। এক্ষেত্রে পরীক্ষাগ্রস্ত ব্যক্তিকে বুঝতে হবে যে, তিনি আল্লাহর থেকে দূরত্বে ছিলেন এবং এ ধরনের পরীক্ষা তার জন্য প্রয়োজন ছিল। কেননা, এসব পরীক্ষার মাধ্যমেই তিনি আবার প্রত্যাবর্তন করতে পারেন সরল পথে। জীবনের ভালো-মন্দ পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে দেখতে পারলে সবকিছুই আমাদের জন্য কল্যাণকর। আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে এ-ও ওয়াদা করেছেন, তিনিই তাদেরকে প্রত্যেক কঠিন পরিস্থিতি থেকে বের করে আনবেন। [২]
• ‘...আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিস্কৃতির পথ করে দেবেন।’ (সূরাহ তালাক, ৬৫:২)
সুতরাং, মুমিনের জীবনে বিভিন্ন বাধাবিপত্তি, কঠিন পরিস্থিতি আসলেও তাদের অন্তর সন্তুষ্ট থাকে। কেননা, সে জানে আল্লাহ তাআলা কোনো না কোনো মুক্তির ব্যবস্থা করেই দেবেন।
• ‘যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরওয়ারদেগারের প্রতি ভরসা পোষণ করে। সে সমস্ত লোক যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদেরকে যে রুজি দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। তারাই হলো সত্যিকার ঈমানদার! তাদের জন্য রয়েছে স্বীয় পরওয়ারদেগারের নিকট মর্যাদা, ক্ষমা এবং সম্মানজনক রুজি।’ (সূরাহ আনফাল, ৮:২-৪)
• অন্যত্র বলেছেন,
‘আর যে কেউ আল্লাহর হুকুম এবং তাঁর রাসূলের হুকুম মান্য করবে, তাহলে যাঁদের প্রতি আল্লাহ নিয়ামত দান করেছেন, সে তাঁদের সঙ্গী হবে। তাঁরা হলেন নবি, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। আর তাদের সান্নিধ্যই হলো উত্তম।’ (সূরাহ নিসা, ৪:৬৯)
টিকাঃ
২. Kendler, K. S., Karkowski, L. M., & Prescott, C. A., 1999, Causal relationship between stressful life events and the onset of major depression, American Journal of Psychiatry, 156(6), pp. 837-841; Kessler, R. C, 1997, The effects of stressful life events on depression, Annual Review of Psychology, 48.